মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১৬

বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মৃতি রোমন্থন

১)
অক্টোবর ১৯৯৯ থেকে মার্চ ২০০৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ টানা ৭৫টা আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয় দেখে নি, ৭১ টা হার, দুটো ড্র, দুটো বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত।
২০০০ সালের জুন এ বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার মুহূর্তে, বাংলাদেশের কোন ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট ছিল না। স্কুল ক্রিকেট হত ৩৫ ওভার নক আউট, ক্লাব ক্রিকেটে ছিল শুধুই ওয়ান ডে। আন্তঃ জেলা টুর্নামেন্টের শেষ ধাপ, যেখানে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়নরা মুখোমুখি হয়, ৩ দিনের ম্যাচ হত। কিন্তু ফাইনাল ছাড়া আর কোন ম্যাচ আদৌ ৩ দিনে গড়াতো কিনা সন্দেহ। অর্থাৎ বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ ডিউরেবিলিটি ছিল ৩ দিন। ফলে নভেম্বরে প্রথম টেস্টে কি হলো, তা আমিনুল ইসলাম বুলবুল এর ভাষ্যে জেনে নেয়া যাক, ”চতুর্থ দিন আসতে আসতে আমরা ভুলেই গেলাম, যে আমাদের আরো ১৮০ ওভার বাকি আছে। আমাদের ড্রেসিং রুমের অবস্থা পুরো মেছোহাটের মত, মন্ত্রী আসছেন, বিসিবি প্রেসিডেন্ট, অতিথিরা আসছেন, সাবেক কোচরা আসছেন। অভিজ্ঞতার অভাব শুধু খেলোয়াড়দের না, সবার মধ্যে। ইংল্যান্ড এ, হায়দ্রাবাদ ব্লুজ এরকম দলের সাথে ৩ দিনের ম্যাচ খেলা টুকটাক অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল, কিন্তু আমাদের কোন ধারণাই ছিল না, ৫ দিনের ম্যাচ আসলে কি। আমরা টেস্ট খেললাম ৩ দিনের ম্যাচের মত। প্রথম তিন দিন আমরা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় তাও ছিলাম, চতুর্থ দিন থেকে আমরা পুরো অবিন্যস্ত, হারতামই”।

ক্রিকেট বোর্ড চলত তুঘলকি কায়দায়। এই আজকে প্রচুর খরচ করে এস্ট্রো টার্ফ বসানো হচ্ছে, দু’বছর পরের টুর্নামেন্টের জন্যে, এই আচমকা সবার প্রিয় কোচ গ্রিনিজকে বরখাস্ত করা হচ্ছে, কারণ খেলোয়াড়দের অভাব অভিযোগ ,সুযোগ সুবিধা নিয়ে তিনি বেশী মাথা ঘামান। ৯৯ সালের বিশ্বকাপ’এর এক বছর আগে ইংল্যান্ডে কন্ডিশনিং এ জাতীয় দলকে পাঠাতে প্রায় এক কোটি টাকা (১২৭০০০ ইউএস ডলার প্রায়) খরচ করা হলো, কিন্তু ৯০ দশকের গোড়ায় বাৎসরিক ৩০০০ ডলার বেতনে ডেভ হোয়াটমোর সেধে এসেছিলেন, কোচ করা হয় নি। বুলবুল এর ভাষ্যে, না তারা হোয়াটমোর সম্পর্কে জানতো, না আদৌ জানার কোন চেষ্টা তাদের মধ্যে ছিল। ১৯৯৯ থেকে টানা ৪৭ ওয়ানডে ম্যাচে ৩৯ জন নতুন মুখ আনা হয়েছিলো, (যা একটি বিশ্বরেকর্ড)।
২০১৪ সালে একের পর এক শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ হার, ৩৫ ম্যাচে ২২ টা। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ শুধু নেপাল , জিম্বাবুই আর আফগানিস্তানের সাথে ম্যাচ জিতেছিলো, আফগানদের সাথে একটা ম্যাচ হেরেছিলোও। পরের ম্যাচ র‍্যাঙ্ক টার্নার পিচ বানিয়ে জেতে।

কেন?

২)
বর্তমান “বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড” এর প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭২ সালে “বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড” নামে। একটা টেবিল সহ এক রুম এবং লাগোয়া ছোট্ট রান্নাঘর নিয়ে ছিল অফিস। রান্নাঘরে ছিল একটা সাইক্লোস্টাইল ছাপার মেশিন আর একটা কেরোসিন স্টোভ। অফিসের পিওন ওখানে নিজের সাইকেল এবং আনুসঙ্গিকও রাখতো, এই অফিসটাই তার থাকার যায়গা ছিল। অফিস কর্মকর্তারা স্টোভে চা ফুটিয়ে নিতো, পিওন রাঁধতো ভাত। মাঝে মাঝেই ক্লাব কর্তারা আসতো বোর্ড অফিসে, এসে পিওনকে পাঠাত পাশের ফুটবল ফেডারেশন অফিসে পরিচিত কেউ আছে কিনা দেখতে। চেনা লোক থাকলে টুক করে তারা ফেডারেশন অফিসে গিয়ে গল্প জুড়ে দিত, কারণ তাহলে কিঞ্চিত চা-নাস্তা মিলবে। ক্রিকেট বোর্ডের সামর্থও ছিলো না, সামান্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা করে
বোর্ডের বর্তমান ডিরেক্টর আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি’র স্মৃতিচারণে ফুটে ওঠে সেই সময়ের কথা। তখন ১৯৭৬-৭৭ মরশুম। আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে ক্রিকেটারদের প্র্যাকটিস সেশনের সময় সামান্য কোন খাবারও তাদের দেয়া যেত না। টাকা ছিলো না বোর্ডের। ববি রেডক্রসের অফিসে গিয়ে রিলিফের জন্যে আসা আহাই–প্রোটিন বিস্কুট চেয়ে নিয়ে আসতেন, প্লেয়ারদের খাওয়াতে। কিন্তু রিলিফ বিস্কুট দিয়ে তো ক্রিকেট হয় না, ক্রিকেট একটা স্পোর্টস, যেখানে সরঞ্জাম, মাঠ, আম্পায়ার ইত্যাদির জন্যে টাকা চাই। ক্লাবগুলো যদি জাতীয় দলের সাহায্যার্থে না এগিয়ে আসতো সেসময়, আজ হয়তো এতদূর ক্রিকেট গড়াতোই না। ববি বলেন, ”আইসিসি স্ট্যাটাস, টেস্ট পারফরমেন্স দূরে থাক, একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পেলেই আমরা খুশি থাকতাম”
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। চার বছর পরে, অস্ট্রেলেশিয়া কাপে বাংলাদেশের সপ্তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, অস্ট্রেলিয়ার সাথে। অজি অফ-স্পিনার পিটার টাইলর বাংলাদেশের তৎকালীন সেরা ব্যাটসম্যান আকরাম খানকে আগে কখনো ব্যাটিং করতে দেখেন নি। তিনি একটা বল করলেন আকরামের বিরুদ্ধে, সাথে সাথেই লেগ সাইডে একজন এক্স্ট্রা ফিল্ডার দাঁড় করিয়ে দিলেন। বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা অবাক, এটা কি হলো? কেমন হলো? কেম্নে কি? একটু পরেই তাঁরা সবাই বুঝে গেলেন, আকরামের বটম-হ্যান্ড ব্যাট গ্রিপিং টাইলর বুঝে গেছেন। গ্রিপ দেখেই বুঝেছেন, আকরাম লেগ সাইডে বেশী খেলেন। আকরাম ওই ম্যাচে করেছিলেন ৪৪ বলে ১৩, বাংলাদেশ ধুঁকতে ধুঁকতে ৫০ ওভারে ১৩৪। এমন কিছু এর আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট ঠিকঠাক জানতোই না।

নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ মানেই যে মুহূর্তে সব এক্সপোজড, এই অতি সাধারণ বোধটা এর পরেও পুরোপুরি আসার সুযোগ ছিলো না, কারন একটাই। বাংলাদেশ ক্রিকেটে বোর্ডের চাইতে ক্লাবের দৌরাত্ম বেশী থাকা। তখন অবশ্য ক্লাবের বদান্যতায় জাতীয় দল চলত, পয়সা দিই ব্যাডা, স্বাভাবিক। আর কবে কোনকালে বছরে ১/২ ম্যাচ, কি আসে যায়? কিন্তু হচ্ছিলো টা কি আসলে? “যে কোন মূল্যে ম্যাচ জিততে হবে” ক্লাবগুলোর এটাই ছিলো মূলমন্ত্র। আর বংলাদেশের এভারেজ পিচে কে ম্যাচ জেতাতে পারে? কে আবার? অফব্রেক ফিঙ্গার স্পিনার। জোরের উপরে বলটা ছেড়ে দাও, আনইভেন বাউন্স আর মিনিমাম স্পিনেই হয়ে যাবে। ফাস্ট বোলারদের অস্তিত্বই ছিলো না বলতে গেলে, দুই চারজন যাও বা লিগ পেত , ম্যাচ পেত না। না, আপনাদের অনেকেরই ভুল ধারণা, যে বাংলাদেশ বরাবর বাঁহাতি স্পিনের খনি। ২০০০ এর গোড়ায় রফিকের উত্থানের পরেই শুধু বাঁহাতি স্পিন ওভারহাইপড হয়, তার আগে ঐ জোরের উপরে ডানহাতি স্পিনই হতো। ট্রাজেক্টরি চেঞ্জ করতে হাত বাঁকানো সোজা করা আকছার চলতো। তো এদিকে আন্তর্জাতিক খেলতে এসে বাংলাদেশ দল পেল শুধু আনরিলায়েবল একদল বোলার, আনরিয়ালেবল একদল ব্যাটসম্যান, এবং মোহাম্মদ আশরাফুল, যিনি কুম্ভকর্নের মত বছরে দু বার ঘুম থেকে জেগে ভালো ইনিংস খেলেন।

২০০৭ এর গোড়ায় কিছু ন্যাচারাল তরুণ ক্রিকেটার প্রায় স্থায়ী হলো বাংলাদেশ দলে; তামিম, সাকিব, মুশফিক, আফতাব, নাফিস, নাজিমুদ্দিন, কাপালি । ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত , সাউথ আফ্রিকাকে হারালো এই টিম। তারপরের বছরই প্রতিবেশী দেশের ধাক্কা, ICL (ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ)। বোর্ডবিদ্রোহী লিগ খেলতে গেলো; আফতাব, যার কথা তামিম বলেন বাংলাদেশ দলের সবথেকে বড় ক্ষতি; অলক কাপালি, ২০০৮ এশিয়া কাপ এ ভারপ্তের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি ছিলো; শাহরিয়ার নাফিস, অস্ট্রেলিয়ার সাথে টেস্ট সেঞ্চুরি ছিলো। বাংলাদেশ ১৫ জনের স্কোয়াডে ফার্স্ট চয়েস এমন ৬ জন প্লেয়ার নাম লেখালেন আইসিএল এ। ফলাফল তামিমের মুখে, “একটা গ্রুপ হয়ে আমরা ২০০৭-৮ এ অনেকগুলো ম্যাচ খেলে ফেলেছিলাম। সবার অভিজ্ঞতা বাড়ছিল। সবাই জয়ের স্বাদ পাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় আমাদের বাধ্য হতে হলো একদম নতুন একটা দল তৈরী করতে, তাদেরকে আরো ২/৩/৪ বছর সময় দিতে। আইসিএল এ খেলতে যাওয়া প্রতিটা সক্রিয় খেলোয়াড়কে প্রাথমিকভাবে ১০ বছরের জন্যে বাংলাদেশ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো।

৩)
এরপরে জিমি সিডন্সকে বাংলাদেশ দল তৈরীটা একদম স্ক্র্যাচ থেকে শুরু করতে হয়েছিলো। সেই বিল্ড আপ প্রোসেস চলতে চলতে কখনো তামিম, কখনো সাকিব, কখনো মাশরাফির ইন্ডিভিজুয়াল পারফরমেন্স। সিডন্সের পরে স্টুয়ার্ট ল আর ইউর্গেনসেন এর সাথে ২০১১, ২০১৩ নিউজিল্যান্ড সিরিজ জয়, মাহমুদুল্লাহ, নাসিরদের মত পারফরমারদের আগমন, সামনে নিজের দেশে ওয়ার্ল্ড টি২০, এশিয়া কাপ সব মিলে ২০১৪ তো সাফল্যের চুড়ায় ওঠারই কথা ছিলো। কিন্তু ২০১৪ তে বাংলাদেশ দলের পিঠ একেবারেই ঠেকে গেলো দেয়ালে, কিছুতেই ম্যাচ জেতাটা আর হয়ে উঠছিলো না। সেই সাথে ২০১৪ সালে বড় ৩ বোর্ড ক্রিকেট বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেললো। বাংলাদেশের ভয় , তারাই সবার আগে হয়তো দ্বিতীয় সারিতে নেমে যাবে, এতদিনের সব পরিশ্রম বৃথা।
কোথায় ফলদায়ক বছর হওয়ার কথা, উল্টো একগাদা ক্লোজ ম্যাচ হেরে গেলো – ২ রান, ১৩ রান আর দুইবার ৩ উইকেটে শ্রীলংকার সাথে, পাকিস্তানের সাথে ৩ উইকেটে, হংকং এর সাথে ২ উইকেটে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ৩ উইকেটে। ভারতের সাথে ২৭৯ করে হেরেছে, পাকিস্তানের সাথে ৩২৬ করেও। ৬৭ রানে শ্রীলঙ্কার ৮ উইকেট ফেলে দিয়ে, হেরেছে। ভারতকে ১০৫ অলআউট করেও হার, পরের ম্যাচে ভারতকে ১১৯/৯ এ দাঁড় করানোর পরে ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যায়। তামিম বলেন, “জয়ের অভ্যাসই যদি না থাকে, কি করে জিততে হয় তা আপনার ধারনাতেও থাকবে না। একটা সময় ছিলো, আমরা জানতামই না ,আসলে ম্যাচ জেতার জন্যে কি করতে হয়”।

২০১৫ এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এই যে জয়ের অভ্যাস, জয়ের ধারা চলছে, এমনি আসেনি। আসলে একটা সময় আসতেই হতো, হয়তো এক বছর আগেই আসতো ২০১৪ সালে, কিন্তু এমনটা হতোই। হয়তো ঘরের মাঠে, তাও জয়টা অভ্যাস করাটাই তো আগে কখনো হয়ে ওঠেনি। এখন খুব সতর্কতার সময়, ক্রিকেটিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দলের জন্যে, সমর্থকদের জন্যে। এই দুই বছরে বাংলাদেশ দল দেখিয়েছে, দেশের মাটিতে তারা যে কোন ম্যাচ জিততে পারে। অন্তত ওয়ান্ডে ম্যাচ এ তারা আশা করে যে কোনখানে য্বে কাউকে হারাতে পারবে। ক্রিকেটাররা নিজেদের অল্পবয়সী খামখেয়ালিপনা ছেড়েও বেরিয়ে এসেছেন। তাঁরা ঘরের মাঠে এবং দেশের বাইরে পেশাদারিত্বের সাথেই ক্রিকেটে আরও জয় আনবেন, অন্তত জেতার চেষ্টা করবেন, এটা সমর্থক সহ সকলের কাম্য। সমর্থকের মধ্যে সহিষ্ণুতা চাই, জিতছে মানেই অতীত ভুলে যাওয়া নয়, জিতছে মানেই প্রতিপক্ষ দেশ নোংরামির লক্ষবস্তু নয়, এটুকু পরিপক্কতা বাংলাদেশের আবেগী একনিষ্ঠ সমর্থকদের থেকে আশা করাই যায়। বাংলাদেশ দল এরপরে শুধু জিতবেই না, আরো অনেক ম্যাচ হারবেও, এটা ভুলে যাওয়া কারোই উচিৎ হবে না।

http://www.thecricketmonthly.com/…/1046331/we-are-bangladesh এই আর্টিকেল থেকে সংক্ষেপিত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন