রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

মগজ ধোলাই - শেষ পর্ব


মগজ ধোলাই (ঘরোয়া নির্যাতন) – শেষ পর্ব

মগজ ধোলাই থেকে কিভাবে মুক্ত হবেন এবং নিজের মনের উপরে নিয়ন্ত্রণ ফেরাবেন

গত পর্বে আমরা জেনেছি মগজধোলাই কি, কেন মগজকে ধোলাই করা হয়, এবং কিভাবে তা করা হয়। আপনার আমার আপন লোকেরাই, শুধুমাত্র নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নিজের অনুগত বানিয়ে রাখতে এই পদ্ধতি অবলম্বন করে। আমরা অনেকেই কম বা বেশি এই মগজধোলাই এর শিকার হই। কিন্তু এই মগজধোলাই থেকে কি মুক্তি লাভ করা সম্ভব? সম্ভব কি এর ইফেক্ট থেকে আরোগ্য লাভ?

হ্যা অবশ্যই সম্ভব। একবার যদি আপনি বুঝে যান অভিজ্ঞতাটা, আপনি নিজেই পারবেন মগজধোলাই থেকে মুক্ত হতে, উদ্ধার পেতে পারবেন এই সকল ঘরোয়া নির্যাতন থেকে । প্রথমে আপনাকে জানতে হবে, কি কি উপায়ে নির্যাতনকারী আপনার মগজকে ধোলাই করে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এরপরে আপনাকে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ কৌশল শিখতে হবে যেন আপনি শৃঙ্খলমুক্ত হতে পারেন। বিশ্বাস করুন, মগজ ধোলাই হতে যত সময় লেগেছে, তার থেকে অনেক কম সময়ের মধ্যেই আপনি মুক্ত হতে পারবেন। মগজধোলাই এর পদ্ধতি কায্যর্করী হওয়াটা বেশ সময়স্বাপেক্ষ। কেননা, গোটা ব্যাপারটাই আপনার সচেতনতার জগতের বাইরে চলতে থাকে। না আপনি জানতে পারেন কি ঘটছে, না পারেন আন্দাজ করতে। অতি সতর্কতার সাথে আপনাকে কিচ্ছু বুঝতে না দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এমনকি নির্যাতনকারীও হয়তো অনেকক্ষেত্রে বুঝতে পারে না সে কি করছে। তবে, আসলে তার জানা না জানায় কিছুই আসে যায় না। তারা কাজটা করছে, এবং আপনাকে এর থেকে মুক্ত হতে হবে।

যদি আপনার এই নিবন্ধ পড়ার কারণ এটা হয়, যে আপনি জানেন আপনার মগজকে ধোলাই করা হয়েছে, তাহলে বলা যায় আপনি সবথেকে কষ্টসাধ্য ধাপ পেরিয়ে এসেছেন। আপনি এখন জাগ্রত, সচেতন। যদি আপনার পড়ার উদ্দেশ্য এই হয়, যে আপনার মনে হচ্ছে, আপনার কোন প্রিয় মানুষের মগজকে ধোলাই করা চলছে, আপনার আসলে খুব বেশি কিছু করার নেই। তাকে সেই আবিষ্কার , খুশি ও আশাবাদের জাদুকরী জাগরণ এর মুহূর্তে পৌঁছাতে দিতে হবে। আপনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করোতে পারেন এ ব্যাপারে। যেমন,
·        তাকে বিশ্বাস ও আস্থা জোগান দিন
·        আগেই পরামর্শ না দিয়ে , ধৈর্য্য ধরে তার কথা শুনুন
·        তাকে বলুন, আপনার মনে হচ্ছে সে নির্যাতনের শিকার। প্রয়োজনে ওয়েবসাইট বা পুস্তিকা পড়তে দিন। তার ব্যাপারে যা ভয় পাচ্ছেন, তা লুকিয়ে না রেখে পরিষ্কার জানান
·        চমকার আচরণ গুণাবলী সম্পর্কে তাকে অবহিত করুন
·        তাকে বিচার করতে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন

মগজধোলাই থেকে নিজেকে মুক্ত করতে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করুন

Dr. Michelle Toomey এই জাগরণকে ভাবনা ও আবেগের সমন্বয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যখন আমি আমার নিজের জাগরনের সময়ের কথা ভাবি, আমার মনে পড়ে সেই অনুভুতির কথা যে কত বছর পরে এই আমি প্রথম ঠিকমত ভাবতে পারছি। যখন আমার চিন্তা ও আবেগ একাকার হয়ে বছরের পর বছর চলে আসা উকন্ঠা উদ্বেগের বোঝা হালকা করছিলো, আমার ভেতরের আমি’র উফুল্ল চিকার আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। অবশেষে আমি যখন নিজের ভাঞা টুকরোগুলো জোড়া দিলাম,  অসম্ভব উদ্বিপ্ত, উত্তেজিত ছিলাম। বিন্তু তারপরে, আমার নির্যাতনকারীর ভয়ঙ্কর স্বরূপ আমার সামনে উন্মোচিত হলো, আমি সাংঘাতিক ভীত হয়ে পড়লাম। সে যে “সবজান্তা ও সর্বশক্তিমান” এই ভাবনাটা (যা মগজ ধোলাই এর সময় আমার মতধ্যে প্রেথিত করা হয়েছিলো) আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। আমার একটাই ভাবনা ছিলো, কি করে এই পাকচক্র থেকে আমার মুক্তি ঘটবে ? এই পরিস্থিতি যখন আসবে আসবে আপনার সামনে নিচের পদ্ধতি অবলম্বন করুনঃ

১) নিজের একাকীত্ব ভেঙে বেরিয়ে আসুনঃ
নিজের ভিতরের এই ভয় থেকে বেরিয়ে আসার দ্রুততম উপায় হচ্ছে, সাইকোলজিস্ট, সোশাল নেটওয়ার্ক, অনলাইন ফোরাম, ক্লাব বন্ধুমহল বা এমনকি নিজের পরিবারের মধ্যে নিজেকে উন্মুক্ত করুন। সবথেকে ভালো হয়, যদি আপনি নিজের উপরে চলতে থাকা নির্যাতন এর ব্যাপারটা প্রকাশ করতে পারেন। আমি জানি, আচমকা কারো কাছে গিয়ে প্রথমেই ”এই জানো, আমার পার্টনার না আমাকে রোজ নির্যাতন করে” এভাবে শুরু করাটা সম্ভব না। তবে, আপনি যে কোন কিছু নিয়ে কথা বা আড্ডা শুরু করে নিজের এবং নিজের ভাবনার উপরে কনফিডেন্স জড়ো করতে পারেন। কিন্তু দয়া করে, আপনার থেরাপিস্ট বা যার উপরে আপনার আস্থা আছে বা যারা আপনাকে সাহায্য করোতে পারে, তাদেরকে জানানো থেকে বেশিদিন বিরত থাকবেন না।
যদি প্রকাশ না করেন, এই যন্ত্রনা নিজের মধ্যে আটকে রাখতে রাখতে আপনি ক্রমাগত খারাপ থেকে আরো খারাপ অনুভব করতে থাকবেন। এমনি এমনকি নিজেকে এও বুঝিয়ে ফেলতে পারেন , যে আপনার পার্টনার আপনাকে নির্যাতন করছে এটা আসলে কাউকে বলার প্রয়োজন নেই, কারণ আপনি এই নানা বিষয়ের আড্ডা নিয়েই তো আগের চাইতে বেশ ভালো আছেন। যদি আপনি পিছিয়ে যেতে যাকেন, নিজেকে মনে করিয়ে দিন, এই নিজের প্রতি বা সাহায্য নেয়ার প্রতি যেই দ্বিধা, তার কারণ ঐ মগজধোলাই। মগজধোলাই করতে আরোপ করোতে হয় একাকীত্ব, যেমন নির্যাতন করোতে চাই নিরবতা। নিজেকে একাকীত্ব থেকে বের করলেই মগজধোলাই আপনাআপনি থেমে যাবে না। আপনাকে আপনার আশেপাশে সেই সকল লোকেদের জড়ো করতে হবে, যারা জানে আপনি নির্যাতিত হচ্ছেন। আপনার ধোলাই হয়ে  পরাবাস্তবতায় পৌঁছে যাওয়া মননে যৌক্তিকতার কষ্ঠস্বর হয়ে থাকবে তারা। আপনি যদি অনকে না জানান আপনি প্রতিনিয়ত কিসের সম্মুখীন হচ্ছেন, আপনি আসলে কিছুতেই জাল কেটে বেরোতে পারবেন না।

যদি মনে করেন আপনি আসলে বুঝতে পারছেন না কিভাবে নিজের সাপোর্ট নেটওয়ার্কে নিজের হাল জানাবেন, প্রকাশের ধরণটা প্র্যাকটিস করে নিতে পারেন। এনোনিমাসলি অনলআইন ফোরামে বিভিন্নভাবে  হিসেবে লিখতে পারেন। Verbal Abuse Journals বা এমন আরো কিছউ ওয়েবসাইট আছে , যেখানে আপনার পুরো গল্পটা লিখে জানাতে পারেন। এবং সবসময়ের জন্যে কাউকে কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করুন, যে আপনাকে সাপোর্ট , উসাহ অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাবে

২) সকল  প্রকার নির্যাতন সম্পর্কে জানুন, নিজেকে শেখানঃ
ঘরোয়া নির্যাতন সম্পর্কিত জ্ঞান, আপনাকে অবমাননা ও মর্যাদাহানী করার সকল প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আপনার শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আপনি যখন জানতে পারবেন , নির্যাতনকারী আপনাকে আঘাত করছে আপনার উপরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে। আপনার দোষ আছে বলে নয়, শুধুই বিধ্বস্ত করার জন্যে, তখন আসলে আর আপয়ান্র প্রতি ধেয়ে আসা তার কথা বা কাজে নিজের খারাপ লাগাটা এত বাড়বে না।
ঘরোয়া সহিংসতা ও নির্যাতন সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব জানুন এবং শিখুন।  নির্যাতন মোটামুটি এই কয় প্রকারের হয়
Ø মৌখিক নির্যাতন ঃ অনেক রকমভাবেই এই নির্যাতন করা হয়। কথার সাথে সাথে  বডি ল্যাংগুয়েজ এরও ভূমিকা থাকে। ধরুন ধমকানো, মারতে যাওয়া, অমমান করা, অপদস্ত করা , গলা টিপে ধরতে যাওয়া, ইত্যাদি
Ø আর্থিক নির্যাতনঃ দাম্পত্য তহবিলে যোগান দিতে পারলে এবং অধিকার থাকলেও,  আপনি এই নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। হয়তো, আপনাকে প্রতিনিয়ত নিজের টাকার গরম দেখাচ্ছেন বলে খোঁযা দেয়া হবে। আপনার খরচের পাই টু পাই হিসাব চাওয়া হবে। কোন কাজে এক পয়সা দিতে চাইবে না, উলটো বিভিন্ন আর্থিক দায় আপনার উপরেই চাপাবে
Ø মানসিক নির্যাতনঃ মগজ ধোলাই থেকে নিয়ে অযথা দোষারোপ এবং আপনার প্রতি না বলা কথাকেও নিজের মনে তৈরি করে আপনাকে অভিযুক্ত করা, এসকলই আপনার প্রতি মানসিক অত্যাচার ।
Ø সামাজিক নির্যাতনঃ নির্যাতনকারী আপনাকে লোকের মধ্যে অপদস্ত করবে, পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আপনাকে অবমাননা করার চেষ্টা করবে। আপনার সন্তান বা পরিবারের লোকেদের সামনে আপনাক নিচে নামাবে। আপনাকে সবার থেকে সরে থাকতে বাধ্য করবে। এবং পাবলিক প্লেসে এমন আচরণ করবে যেন আপনি লজ্জায় মিশে যান
Ø যৌন নির্যাতনঃ আপনার পার্টনারই আপনাকে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষন করতে পারে। আপনার ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতি কোন গুরুত্ব না দিয়ে আপনাকে যৌন সামগ্রী হিসেবে দেখতে পারে। আপনার অনিচ্ছার উপরে জোর পূর্বক নিজের যৌন আচরণ চাপিয়ে দিতে পারে। সার্বক্ষনিক যৌন প্রতারনার অভিযোগ জারি রাখতে পারে।
Ø শারিরীক নির্যাতনঃ শারিরীক নির্যাতন তখন আসে, যখন আপনি তার কঠা শুনবেন না, নির্দেশ মানবেন না, নিষেধ মানবেন না, নিজের মতকে প্রাধাণ্য দেবেন। আপনাকে চড়-ঘুষি-লাথি মাথা হতে পারে, চুল ধরে টানা হেঁচড়া করা হতে পারে , জোর খোঁচা মারা হতে পাড়ে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হতে পাঁড়ে, বেদম পেটানো হতে পারে। হতে পাড়ে আরো অনেক কিছুই।
আপনি যখন এগুলো সম্পর্কে জানবেন, আপনি বুঝতে পারবেন, কি ধরণে আচরণ বা নির্যাতন আপনার সাথে করা হচ্ছে। আপনার ধোলাই হওয়া ভাবনায় আসতে থাকে “এই তো স্বাভাবিক” বা “আসলেই আমার দোষ” জাতিয় ভবাবনার সাথে যুঝতে আপনাকে সাহায্য করবে এই শিক্ষা।

একটা প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই আসে, “আমাকে ও এত অত্যাচার কেন করছে?” এসব নিয়ে ভেবে বেশি সময় নষ্ট করবেন না। আপনার স্বাভাবিক সহমর্মিতাবোধ হয়ত আপনাকে ভাবাবে, যে আপনার অত্যাচারি পার্টনারের প্রতি সহানুভুতিও দেখানো উচি বা ভাবতে পারেন, ভালোবাসা দিয়েই হয়তো তার মানসিক সুস্থতা এনে দেবেন। একদমই এসব ভাববেন না, এসব একদম ভুল। ক্রমাগত মগজধোলাই ও নিত্ররযাতন আপনার মধ্যে ভালোবাসার বোধ এবং অর্থ সম্পূর্ণ বিকৃত করে ফেলেছে।  এই মুহূর্তে “ভালোবাসা” ব্যাপারটার উপরেই আস্থা রাখা উচি হবে না , বিশেষ করে আপনার নির্যাতনকারী পার্টনারের প্রতি তো বটেই। কেননা আপনার ধোলাই হওয়া ভাবনা আপনার ভালোবাসার উপলব্ধিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

৩) আপনার উদ্বেগ ও কষ্টকর ভাবনাগুলোকে স্বীকার করুন ও মেনে নিনঃ
যেই সময়টাতে আপনি মগজধোলাই থেকে মুক্ত হচ্ছেন, নিজের মনকে পুনরায় জোড়া লাগাচ্ছেন এবং নির্যাতনকারীর প্রভাব ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন, নানারকমের আপ্রীতিকর আবেগ বা অনুভুতি  মনে আসতে পারে। কিছু কিছু প্রেথিত ভাবনা হয়তো ভুল প্রমাণীত হবে, যেমন “আসলে সে আমাকে আঘাত করতে চায় না” বা “ভিতরের মানুষোটা কিন্তু আসলে ভালো”। সত্যি স্বীকার করা আসলেই কঠিন। বিশেষত নির্যাতিত হতে হতে ট্রমা’র মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরে আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সাধারণত ঘরোয়া নির্যাতনের ফলে নিচের তিন ধরণের ট্রমা পরবর্তী স্ট্রেস ডিজওর্ডার (Posttraumatic Stress Disorder/PTSD) দেখা যায়ঃ
Ø এড়িয়ে চলা ও অবসাদ্গ্রস্ততা
·        কিছু মনে রাখতে সমস্যা হওয়া
·        মনযোগ দেয়াটা অসম্ভব হয়ে পড়া
·        ভালো লাগার কাজগুলো থেকে মন উঠে যাওয়া
·        যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিগুলো নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া
·        কাছের সম্পর্কগুলো মেইনটেইন করতে মুশকিল হওয়া
·        এবং মনের দিক থেকে সম্পূর্ণ অনুভুতিহীন হয়ে যাওয়া

Ø অতিরিক্ত উদ্বেগ ও অতি উত্তেজনা
·        সবসময় আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকা ও চমকে যাওয়া
·        হাত পা কাটা, নেশা বা অতি ভোজনের মত আত্মবিধ্বংসী আচরণ
·        হ্যালুসিনেশন
·        নিজের প্রতি দূর্বার অপরাধবোধ/ লজ্জা অনুভব করা
·        ঘুমে সমস্যা হওয়া

Ø অযাচিত স্মৃতিকাতরতা
এগুলো হচ্ছে সেই সমস্ত স্মৃতি যা আপনাকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেফেলে। আপনি নিজের মনে এগুলো বারয়াবার নাড়াচাড়া বন্ধই করোতে পারেন না। আচমকা চিন্তার জগতে ফ্ল্যাশব্যাক এনে বর্তমান এবং সেই সময় গুলিয়ে ফেলেন অনেকসময়। ঘুমের মধ্যেও বারবার হানা দিতে থাকে সেই ঘটনাগুলোর ভুত
যেই না আপনি নিজের কাছে স্বীকার করবেন তার মিষ্টি স্বভাবের মুখোশের আড়ালে সে আসলে আপনাকে আহত করতে চায়, একদা ভালোবাসার মানুষোটার প্রতি তীব্র যন্ত্রনাদায়ক ভীতি অনুভব করবেন। এপর্যাওন্ত যদি আপনি কোন সাইকো থেরাপিস্ট এর কাছে না গিয়ে থাকেন, দয়া করে এবারে যান। ভয় সম্ভবত আমাদের সবতঝেকে সঙ্গত ও অসঙ্গত অনুভুতিগুলোর একটা। উচ্চতাভীতি বা শুঁয়োপোকা দেখে আতঙ্ক বা এজাতীয় আতঙ্কগুলোর মতই সমান তীব্রতা ও বাস্তবিকতা নিয়ে হাজির হতে পারে এই ভীতি। কিভাবে একই সাথে সঙ্গত ও অসঙ্গত অনুভুতি আসতে পারে দেখুন – যখন নির্যাতনকারী মুখে খুন করবে বলে আপনার দিকে তেড়ে আসে, আপনাকে কি খুন করে ফেলতে পারে? এটা খুবই সঙ্গত আচরণ যে, সে করতেই পারে ভেবে আপনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববেন। কিন্তু যদি আপনি ভাবেন, আপনাকে খুন করতে পারে তাই আপনি তাকে কিভাবে আগেই আঘাত করবেন, এটা অসঙ্গত ভাবনা। একজন ভালো থেরাপিস্ট আপনার মনে খুঁটি গাঁড়া এই ভীতি সরানোর ব্যাপারে সর্বোত সাহায্য করতে পারবেন।

স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাওয়ার সর্বকালের অন্যতম সেরা উপায় হচ্ছে নির্যাতনকারীকে ছেড়ে চলে যাওয়া। সারাক্ষণ ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলতে থাকা ঐ অসহ্য মানুষটার উপস্থিতি না থাকলে অনেক বেশি শান্তি পাবেন। হ্যাঁ মানছি, চাইলেই ছেড়ে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না, বা অনেকে বেরিয়ে আসতেও চান না। তাই বলা চলে , স্ট্রেস থেকে মুক্ত হতে পারার পদ্ধতিগুলো প্রায় মানবজাতির মতই অসংখ্য। প্রাণায়াম অভ্যাস করোতে পারেন, সঠিক চিকিসা সেবা, সুষম খাবার, আত্মনিয়ন্ত্রণ , হাঁটাহাঁটি করা, ভালো গান/সিনেমা/বই, এমনকি প্রেমও আপনাকে স্ট্রেসমুক্ত রাখতে সাহায্য করোতে পারে।
এই গোটা নিবন্ধটাতে আপনার উপরে নির্যাতন , তার ফল এবং মগজধলাই থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ জীবন যাপনের ব্যাপারে যথাসম্ভব তথ্য প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে , এখানেই গল্পের শেষ নয়। মগজধোলাই থেকে সম্পূর্ণ নিরাময়ের আরো পথ আছে। আশা করি সামনে আরো নতুন নতুন দিক খুলে যাবে।

সংযুক্তি ঃ

মগজ ধোলাই - ১


যে কোন মানুষ, নারী বা পুরুষ অপর একজন নারী বা পুরুষের নির্যাতনকারী হতে পারে। যে কোন ধরণের নিকট সম্পর্ক, বিয়ে বা  বিসমকামী/সমকামি প্রেম, দেখাশোনাকারী-বৃদ্ধ সম্পর্ক, মাতাপিতা-সন্তান সম্পর্ক বা আপনার ভাবনায় আসতে পারে এমন যে কোন কিছুই অবমাননাকর হয়ে উঠতে পারে। এবং এই নির্যাতনের মধ্যে সবথেকে মারাত্মক হচ্ছে মগজধোলাই (Brainwashing)

মগজধোলাই কি?
আপনার ভাবনা ও চিন্তাজগতের উপরে অবমাননা ও নির্যাতনের যেই প্রভাবগুলো আপনার উপরে পড়ে সেগুলোকে এক কথায় বলা যায় মগজ ধোলাইএকমুহূর্তের জন্যেও ভাববেন না নির্যাতনকারী আপনার মগজকে ধোলাই করার জন্যে যথেষ্ট চৌকষ নয়। কাউকে ব্রেইনোয়াশ করতে পারার ক্ষমতার সাথে চৌকষ হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই
·        অনেক নির্যাতনকারীই অতীতে নিজে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, এবং নিজের নির্যাতনকারীর থেকে স্বাবভাবিকভাবেই আত্মস্থ করেছে
·        অনেক নির্যাতনকারী আছে যাদের কোন মানবতা বা বিবেকবোধ নেই (সাইকোপ্যাথ বা সোশিওপ্যাথ) এবং খুব অল্প বয়স থেকেই পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করতে শেখে
·        এছাড়াও অনেকে আছে, যারা মিলিটারি স্কুলে শত্রুকে ব্রেইনওয়াশ করতে শেখে, এবং ব্যক্তি সম্পর্কের মধ্যে এগুলোকে অপব্যবহার করে
·        এমনকি অনলাইনে পড়াশুনা করেও অনেকে শিখতে পারে
বলা হয়ে থাকে, এমনকি নিয়ান্ডারথালরাও অন্যের মগজকে ধোলাই করতে শিখতে সক্ষমআপাতঃভাবে আপনি হয়তো ব্রেইনওয়াশের কাছে নতি স্বীকার করার মত বোকা নন। ব্রেইনওয়াশিং টার্মটা তুলনামূলক নতুন হলেও, এর চর্চার ইতিহাস প্রায় পৃথিবীর মতই প্রাচীন। মানবজাতি বরাবরই জানে, কিভাবে কাউকে আঘাত করতে হয় এবং কিভাবে সেই ক্ষত সারানো যায়। একজন নির্যাতনকারীর শিকার বাছাই করার পিছে  মানবতার উপকারের প্রতি সেই মানুষটির স্বাভাবিক ঝোঁক এর বেশ খানিকটা ভূম্মিকা আছে। অন্যের দুঃখ দুর্দশার প্রতি আপনার যেই সহানুভুতি , সহমর্মিতা ও সচেতনতা আপনার ভিতরেকে পোড়ায়, সেই অনুভুতিকেই সচরাচর টার্গেট করা হয়ে থাকে।

কিভাবে নির্যাতনকারী আপনার মগজকে ধোলাই করে
একবার নির্যাতনকারী আপনার সহমর্মিতা (ও মনযোগ) আদায় করতে পারলে “মনস্তাত্বিক নিয়ন্তণ পদ্ধতি” (Psychological Coercion Techniques)* অবলম্বন করে। Albert Biderman নামে এক সমাজতাত্বিক ১৯৫৭ সালে এই  পদ্ধতির রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের “রিপোর্ট অফ টর্চার”এ একে গ্রহণ করেছে । এই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিম্নরুপঃ

১) বিচ্ছিন্নকরণ

নির্যাতনকারী তার শিকারকে নিজের পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেযদি নির্যাতনকারী আপনাকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারে, তাহলে এই সম্পর্কের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হবার সম্বভাবনা খুবই কম। কারণ আপনার পরিবার ও বন্ধুরা আপনাকেই সমর্থন দিয়ে যাবে এবং আপনার এই নতুন ভালোবাসার মানুষটির যেসমস্ত ব্যাপারগুলো তারা অপছন্দ করে, তা আপনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে। আপনার নির্যাতনকারী আপনাকে যা বিশ্বাস করাতে চায়, এই সাপোর্ট নেটওয়ার্ক  তার বিরুদ্ধে বাস্তবতা নির্ধারক হিসেবে কাজ করে।

ধর্মান্ধ বা এজাতীয় গোষ্ঠী যারা মানুষকে নিয়ন্তণের জন্যে মগজধোলাই করে থাকে, তাদের অনেক সদস্য থাকে যারা ইতিমধ্যেই গোষ্ঠীগুলোর ধুম্রজালে আবদ্ধ। তাদের সঙ্গে চলার আকাঙ্খা থেকেই তারা অন্যদের করায়ত্ব করতে নেতাদেরকে সহযোগীতা করে। আপনার নির্যাতনকারী ওয়ান-ম্যান-ব্যান্ড (বা ওয়ান-ওম্যান-বান্ড) হওয়ায়, আপনাকে আলাদা করতে তাকে গোষ্ঠীনেতাদের চাইতে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। নিম্নলিখিত উপায়ে আপনার এবং আপনার পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হবেঃ

·        আপনার বন্ধুদের দোষ খুঁজে বের করা এবং প্রকারান্তরে বোঝানো যে আপনি আসলে তাদের মত হতে চান না

·        নিজের বন্ধুমহলে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং জোর দিয়ে বোঝানো যে তার বন্ধুরা আপনার বন্ধুদের চাইতে উন্নততর। শুধুমাত্র তার বন্ধুদের আয়োজিত সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে জোরাজুরি করা

·        ঈর্ষান্বিত আচরণ প্রদর্শন করা এবং প্রকারান্তরে বোঝানো, আপনার বন্ধু বা যে কারো প্রতি আপনার যৌনকামনা আছে

·        আপনার পিছে কথা বলা, এবং আপনার বন্ধুদের মনকে আপনার প্রতি বিষিয়ে তোলা (বিশেষ করে আপনার বন্ধু যদি হিংসুটে, অল্পবয়সী বা সদ্যপরিচিত হয়)

·        এমন মহান নারি বা পুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রদর্শন করা, যে আপনার সরলবিশ্বাসী বন্ধু ভাবতেই পারবে না এই নির্যাতনকারী আসলে কতটা জঘন্য ও পৈশাচিক চরিত্র

·        আপনাকে নিজের আদর্শ জীবনসঙ্গী বলে চলে এবং এমন এক কাল্পনিক জগত তৈরি করে, যেখানে আপনারা দুজন ছাড়া কারো অস্তিত্ব নেই

·        আপনাক যারা ভালোবাসে তাদের ছেড়ে অনেক দূরে, নিজের পছন্দমত স্থানে চলে যেতে উদ্বুদ্ধ করে

আপনার অনাগত সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে, বন্ধুদের সাথে সংযোগ এর ব্যাপারে সদা সচেতন থাকুন। যদি কখনো আপনার মনে হয় সাপোর্ট সিসয়টেম থেকে দূরে সরে সাচ্ছেন, সাথে সাথে পুনঃ সংযোজিত হোন

২)  অনুভব কুক্ষিগতকরণ

“অনুভব কুক্ষিগতকরণ” এর মত চটকদার টার্ম ব্যবহার করে বাইডারম্যান আসলে নিচের চারটা জিনিস বুঝিয়েছেনঃ

·        নির্যাতনকারী আপনার মনযোগকে সম্পূর্ণ নিজের প্রতি টেনে রাখবে (হতে পারে এমন ভালোবাসা দেখাবে যে আপনি কিছুতেই ছেড়ে থাকতে পারবেন না, সম্পর্কের মধ্যে নাটকীয়তা আসতে পারে, ঈর্ষা দেখাতে পারে, অসংলগ্ন আচরণ করতে পারে, কথায় কথায় কান্নায় ভেঙে পড়তে বা রাগে ফেটে পড়তে পারে এবং আপনি অবশ্যই কারণটা জানবেন এমন প্রত্যাশার প্রদর্শন করতে পারে, ইত্যাদি)

·        নির্যাতনকারী এমন সমস্ত কথা বলবে, যে আপনি পুরোপুরি অন্তর্মুখী হয়ে নিজের ভিতরের সমস্যাগুলো দূর করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন (সমস্যার অস্তিত্ব আসলেই থাকুক বা না থাকুক)

·        আপনার যেসমস্তব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়, সেগুলো থেকে আপনাকে সরিয়ে দেয়া্র চেষ্টা করবে (চাইবে না আপনি বিশেষ কোন টেলিভিশন শো দেখেন, বা আপনার নিজস্ব পরিমন্ডল বা গ্রুপ নিয়ে বাজে কথা বলবে, কোথা থেকে আপনার জামাকাপড় কিনবেন সেটা ডিক্টেট করবে বা আপনাকে নিয়ে যেতে চাইবে – বুঝতেই পারছেন পুরোটা)

·        নির্যাতনকারী আপনাকে যা করতে মানা করবে, তা করাটা আপনার জন্যে অসম্ভব করে তুলবে। (আপনি বন্ধুদের সাথে থাকলে সার্বক্ষণিক কল বা টেক্সট, আচমকা হাজির হয়ে যাওয়া, অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করা,...এককথায় আপনাকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করবে কিন্তু এমনভাবে যেন মনে হয় এই বশ্যতা আপনার স্বেচ্ছাকৃত)

৩) দুর্বলতা ও অবসাদ’এর প্রণোদনা দেয়া

নির্যাতনকারীর নিয়ন্ত্রণকে প্রতিহত করার আপনার যে সহজাত ক্ষমতা আছে, সেটাকে নিম্নরূপে দুর্বল করে ফেলা হবেঃ

·        আপনার বিশেষ বিশেষ অনুভুতিকে অগ্রহণযোগ্য বলা, বা বিশেষ বিশেষ অনুভুতি প্রকাশ করলে আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা (যেমন, আপনার কোন অধিকারই নেই রাগ করার বা ভয় পাওয়ার বা কাঁদার বা সার্কাজম বাদে অন্যকিছুতে মজা পাওয়ার। সার্কাজম আসলে কৌতুকের মাধমে অবমাননাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা)

·        তার সাথে একমত না হলে বা তার কথামত না চললে আপনাকে অপরাধবোধে ভোগানোর উপায় খুঁজে বের করা

·        জোর দিয়ে আপনাকে নিচুশ্রেণীর বলা এবং নিজেকে শুধরে নিতে জোরাজুরি করা

·        নিজের বস এর স্বামী বা স্ত্রীর সাথে বন্ধুত্ব করতে এবং তার নিজের ক্যারিয়ারে উন্নতি হয় এধরণের সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জোর দাবী রাখা

·        একটা সম্পর্কে যেসমস্ত দায়িত্ব থাকা উচিৎ তার থেকে অতিরিক্ত এবং অসংগতিপূর্ণ দায় আপনার জীবনে চাপিয়ে দেয়া

·        এবং আপনার সময় ও স্বভাবের উপরে চাপানো এত ভারী বোঝা স্বত্বেও আপনাকে খুশি ও সন্তুষ্টি  দেখাতে বাধ্য করতে যে কোন কিছু করা

৪) হুমকি

নির্যাতনকারী আপনাকে হুমকি দেবে যদি আপনি অমুক অমুক (নিজে শুন্যস্থান পুরন করে নিন) না করেন তাহলে সে আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে (বা তার চাইতেও অনেক বেশি খারাপ কিছু করবে)। নির্যাতনকারীর হুমকিগুলো আপনার কাছে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে

৫) কদাচিৎ প্রশ্রয়

নির্যাতনকারী কখনো কখনো আপনার প্রতি খুব ভালো আচরণ করবে বা “ভাল” হয়ে থাকার জন্যে সাময়িক স্বাধীনতা দেবে। নির্যাতন চক্রের মধ্যে এই প্রশ্রয়ের সময়টাকে হানিমুন পিরিয়ড বলা হয়, যার পরপরই আসে সুতীব্র আনুভুতিক , মৌখিক বা শারীরিক নির্যাতন পর্ব। এই কদাচিৎ প্রশ্রয় তখনই মেলে যখন নির্যাতনকারীর মনে হয় সে আপনাকে খাদের কিনারে নিয়ে যাচ্ছে এবং আপনি আর হয়তো তার এসমস্ত আচরণ নিতে পারছেন না।

আপনার ইচ্ছার প্রতি নির্যাতনকারীর এই সাময়িক প্রশ্রয় আসলে আপনাকে তার হাতের মুঠোয় রাখতে সাহায্য করে। এমনিকি হাজার ইচ্ছাকে গলা টিপে মারার পরেও সামান্য একটা ইচ্ছাপুরণ হলেই আপনি নির্যাতনকারীকে বশ্যতা মেনে তার চাহিদামত চলতে চাইবেন, বা ভাববেন এতে হয়তো আপনার আরো কিছু ইচ্ছাপুরণ হবে। আপনি এমনকি এই ভ্রান্তিতেও চলে আসতে পারেন, যে নির্যাতনকারী হয়তো ভালো হয়ে যাচ্ছে বা পাল্টাচ্ছে

উল্টোভাবে ভেবে দেখুন, একটা বাচ্চার  বায়নাক্কা এবং মেজাজের কথা চিন্তা করুন । টানা তিন দিন যাবত আপনি তার বায়নাক্কা উপেক্ষা করে গেলেন এবং সে যা চাইছে তা দিলেন না। এবারে , চতুর্থ দিনে আপনি আর সহ্য করতে পারলেন না এবং তাকে তার পছন্দের চকোলেট কিনে দিলেন। পঞ্চম দিনে সেই বাচ্চা কি করবে বলে আপনার মনে হয়? হাজার খারাপ কিছুর পরে একটা ভালো কিছুই আপনাকে দিয়ে নির্যাতনকারীর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করানোর জন্যে যথেষ্ট – বিশেষ করে যখন আপনার সাপোর্ট নেটওয়ার্ক নেই, নির্যাতনকারীই আপনার ভাবনা জগতের একমাত্র কেন্দ্র এবং তার চাহিদা পুরণ করতে করতে আপনি শারীরিক ও মানসিকভাবে নিঃশেষিত

৬) “সর্বশক্তিমত্তা” প্রদর্শন

অধিকাংশ নির্যাতনকারীর সম্পর্ক চলাকালীন সময় আপনাকে অনুসরণ করবে, নিজের বন্ধুদের ব্যবহার করে বা দৈবচক্রে  জানা কোন ঘটনার সুযোগ নিয়ে প্রমাণ করবে, সে অনুপস্থিত থাকাকালীন আপনার সমস্ত কার্যকলাপ সে আসলে জানতে পারে। হয়তো সে  সামরিক বাহিনীতে আছে বা কম্পিউটার নিয়ে কাজ করে এবং আপনাকে উপলব্ধি করাবে  সে সবসময় জানতে পারে, আপনি কোথায় আছেন (কিন্তু আসলে হয়তো সে আপনার গড়িতে বা ব্যাগ এ জিপিএস লোকেটর সেট করে রেখেছে)। আপনার নির্যাতনকারী ধারনা দেবে সে সবসময়ই আপনার আশেপাশে আছে এবং কোন সামান্য সময়ের জন্যেও আপনি একা নন।

এছাড়াও, নির্যাতনকারী নিজের সর্বশক্তিমত্তা প্রকাশের জন্যে নিজেই জাজ, জুরি ও প্রসিকিউটর এর রোল প্লে করবে। সে বলবে আপনি কি করেছেন, কেন করেছেন এবং আপনার অপরাধের জন্যে কি শাস্তি দেয়া উচিৎ। আপনার বলা কোন কথাই তার দেয়া শারিরিক বা বাক্যিক শাস্তির নৃশংশতা থামাতে পারবে না, এবং যতক্ষণে নির্যাতনকারী তার মারধোর বা অত্যাচার থামাবে, ততক্ষণে আপনারই মনে হবে আসলেই হয়তো শাস্তিটা আপনার প্রাপ্য ছিলো।

৭) তুচ্ছ দাবীগুলো আদায় এ জোর করা

জনৈক নারীকে তার স্বামী বলেছিলো, তার জানা উচিৎ একতা বাথটাব পরিষ্কার করতে ঠিক কতটা খরচ হয়। তার দাবী ছিলো ক্লিনিং প্রোডাক্ট এর দাম, তার স্ত্রী কতটা ব্যবহার করেছে, এবং কতক্ষণ সময় লেগেছে বাথটাব পরিষ্কার করতে, তার পুংখানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। সে জোর দিয়ে বলেছিলো, তার স্ত্রীর সময়ের দাম আসলে সর্বনিম্ন মজুরির সমান এবং দাবীটা ছিলো তাকে জানাতে হবে, প্রতি সপ্তায় বাথটাব পরিষ্কারে তার ঠিক কত টাকা খসছে। আপনার নির্যাতনকারী ঠিক এভাবেই আপনার সময় , ভাবনাজগত এবং মানসিক শক্তির উপরে চাপ প্রয়োগ করবে , যে কথা না শুনলে কি আপনার উপরে কি আসতে যাচ্ছে, তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে থাকবেন।

এই দাবিটা এমনকিছু নিয়ে হতে পারে , যা আপনাকে একসময় আনন্দ দিতো , যেমন বাগান করা বা ছবি আঁকা। তো যাই হোক, আপনার নির্যাতনকারীর এই বিকৃত দাবী যে আপনাকে ঠিক এভাবেই করতে হবে, বা অমুক সময় করতে হবে বা এই পরিস্থিতে করতে হবে , এসব শুনে আস্তে আস্তে আপনি আপনার সেই শখের ( বা চাকরির) প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন

৮) সম্মানহানী

নির্যাতনকারী আপনার সবথেকে বেশি ক্ষতি তখন করবে, যখন আপনি তার নির্দেশ প্রত্যাক্ষান করবেন এবং নিজের ভাবনাকে প্রাধাণ্য দেবেন। যতবার আপনি প্রচন্ড রেগে যাবেন এবং নির্যাতনকারীকে আপনার ক্রোধ সামলাতে হবে, ততবারই আপনাকে স্বাভাবিকের চাইতেও  ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে। আপনার মনে হতে থাকবে, প্রত্যাখান না করে বশ্যতা স্বীকার করাতেই হয়তো খানিকটা হলেও আত্মসম্মান বজায় থাকতো।

আপনাকে নিচে নামানোর জন্যে নির্যাতনকারী যাচ্ছেতাই বলতে পারে, শারীরীক ও যৌন নির্যাতন বা ধর্ষন করতে পারে, এবং  নিজের বন্ধুবান্ধব বা আপনার সহকর্মীদের সামনে যখন তখন আপনাকে অবমাননা করতে পারে। এই অবমাননা আপনার আত্মসম্মান বা মূল্যবোধকে কমোডে লেগে থাকা নোংরার চাইতেও নিচে নামিয়ে দিতে পারে। নিজের কাছেই নিজেকে তুচ্ছ মনে হবে। নির্যাতনকারীর নির্দেশমাফিক যে কোন কিছু তার ইচ্ছানুযায়ি করে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে আপনি উঠেপড়ে লাগবেন, কেননা ততদিনে আপনার পৃথিবীতে আপনি আর নির্যাতনকারী ব্যতীত আসলে আর কেউ নেই।

যেই সুস্থ্য ভাবনা ও মধুর সম্পর্ক নিয়ে আপনার মনে সুখের স্বপ্ন ছিলো, তা আপনার মাথা থেকে ধুয়ে মুছে নিঃশেষিত হয়ে যাবে।

 

 

এই লেখাটা লিখতে গিয়েই নিজেকে নিঃশেষিত মনে হচ্ছে, কারন আমার মনে পড়ে যাচ্ছে ঠিক এভাবেই আমার এক্স আমাকে ব্রেইনওয়াশ করতো। আমার এবং আমার মত লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যারা ব্রেইনওয়াশের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছে। আপনি এই নির্যাতন এবং ব্রেইনওয়াশ এর পরবর্তি প্রভাব থেকে খুব কম সময়েই মুক্ত হতে পারেন, এমনকি যতটা সময় নিয়ে আপনাকে আপনার নির্যাতনকারী নিজের কন্ট্রলে এনেছিলো, তার চাইতেও কম সময় লাগতে পারে। কিন্তু কিভাবে, তা জানবেন পরের পর্বে

(চলবে)

 

* http://www.theneurotypical.com/psychological_coercion.html