প্রিয় বন্ধু,
তোর মনে পড়ে সেই
যে সেদিন, আচমকাই পরিচয় হলো তোর সাথে। সেই অবাক করা ক্ষণ, সেই অদ্ভুত অনুভুতি ,
যেন কতকালের চেনা। কোথাকার কে আমি, তবু বন্ধুত্বের হাতটা তুইই প্রথম বাড়িয়েছিলি।
নাহলে সাহস কোথায় আমার, তোর নাগাল পেতে চাইবো। এমন বন্ধু আমি আজীবনেও পাই নি, যে
আমাকে বুঝতে চায়। সুযোগ পেয়ে হড়বড়িয়ে তাই নিজের কথা সব বলে ফেললাম। ভাবিই নি তুই
বিরক্ত হচ্ছিস কিনা, তুইও কত ধৈর্য্য নিয়ে সব কথা শুনে গেলি। এখনো আমার মনে আছে,
সেই টানা ৯৮ ঘন্টা, পুরো এক জীবনের কথকতা, বলেই গেলাম বলেই গেলাম। তুই শুনেই গেলি,
শুনেই গেলি। তোকে নিজের গল্প বলতে বলতে, কখনই যেন লিখিয়ে হয়ে গেলাম, সে তো তোরই
কারণে। শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হলাম তোর জাদুর কাঠির ছোঁয়ায়। হাজার হাজার মানুষের
মাঝে , তবু আমার লেখাগুলো ছিলো শুধুই তোর জন্যে, নৈবেদ্য। ঝুপ করে কখন যেন তোকে
ভালোবেসে ফেললাম, নিজেও জানিনা। সে কি যুদ্ধ নিজের ভিতরে। কিছুতেই প্রকাশ চলবে না,
যদি বন্ধুত্ব হারাতে হয়। ততদিনে আমি জানি, এ পৃথিবীতে
সত্যিকারের বন্ধুর চাইতে আপন আর কেউ হয় না, কত কত মূল্যবান তোর বন্ধুত্ব। মনের দুর্বলতার কারণে, বন্ধু হারানোর বিলাসিতা আমার
জন্যে নয়। নিজের সবটুকু আবেগ ঢেলে তখন লিখতাম, আমার সবগুলো লেখাই ছিলো লুকোনো
প্রেমপত্র, কেউ বুঝতো না। সবার বাহবা পেতাম, কিন্তু কিচ্ছু আসতো যেত না, কে তারা?
শুধু অপেক্ষা থাকতো, কখন আসই তুই, পড়বি, বায়সড কমেন্ট করবি। পাবলিক শোইং অফ
এফেকশন, ভিজে যেত ভিতরটা আরো বেশি করে প্রেমে পড়তাম। আমি তো মৌলবাদী ভালোবাসার
পূজারী, তুইই আমার মনের ঈশ্বর হয়ে গেলি। কিন্তু কিছুতেই বলিনি, সাহসে কুলোয় নি। কি
দারুণ রসায়ন ছিলো আমাদের বল, দুজনে কোথাও এক হলেই সবাই ছুটে আসতো আমাদের সাথে
আড্ডা দিতে। তুইই ফের একবার হাতটা বাড়ালি, ভালোবাসার। আমার জীবনটা এক মূহুর্তে
অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন থেকে হইয়্ব উঠলো অর্থপূর্ণ। জোর করে বইয়ে নিয়ে বেড়ানো জীবনের
বোঝা , কি পরম মমতায় নিজের কাঁধে তুলে নিলি। জীবনের টানাপোড়েনে ভেঙে পড়া আমি ধ্বসে
যাওয়ার আগেই, শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে গেলি। ্তোর জীবনের শতেক টানাপোড়েনের মাঝেও
নিজের পুরোটা সময়, পুরোটা তোকে আমাকেই দিয়ে দিলি।
সেই যে প্রতি মাসের ৯ তারিখ, তোর জন্যে লেখার নৈবেদ্য। কি অধীরে প্রতীক্ষা
করতি, লেখাটা আমি কখন দেবো। তুই বলতি, চিরকাল আমার লেখাগুলো শুধুই তোর, আর কারো নয়। মনে
আছে, তুই আমাকে “প্রিয় বন্ধু” চিনিয়েছিলি। অঞ্জন দত্ত আর নিমা রহমানের আবৃত্তি সেই
আবেগ ভরা ভালোবাসার গল্পটা।
মনে পড়ে জান, জীবন
আমার, সেই লড়াই এর দিনগুলো? আমাদের ভালোনাসার অধিকারের যুদ্ধ। আচমকা কতগুলো মানুষ
কদর্য পিশাচ রূপে এলো। নখ দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খেতে লাগলো আমাদের মাসের পর মাস ধরে,
ভালোবাসার অপরাধে। হাটের মাঝে নিলাম হলো আমাদের ব্যক্তিগত জীবন। প্রেমের দায়ে
রিপোর্ট খেয়ে প্রিয় আইডি হারাতে হলো, হারিয়ে গেল প্রাণের অনুভব জানানো লেখাগুলো। পিঠে
পিঠ ঠেকিয়ে সে কি লড়াই আমাদের, সবার সাথে। ওরা যত আঘাত করে, আমাদের বাঁধন ততই
মজবুত হয়। পারবে কি করে আমাদের সাথে? আমাদের পাল্টা আঘাতের তোড়ে আমাদের ভালোবাসার
জোরে, ভেসে গেল সব নেকড়ে হায়েনা শেয়াল শকুনের পাল। তখনো দেখাই হয় নি আমাদের, অথচ
এত আপন আর হয় না। অদ্ভুত মনস্তত্ব, অদ্ভুত তার অনুভব, কি আশ্চর্যভাবে দুজনে দুজনকে
অনুভব করতাম। এমন অনুভুতি কেউ জাগাতে পারেনি কখনো। সময় অসময় কোন জ্ঞান ছিলো না
আমাদের। বাইরের কোন মানুষের অস্তিত্ব ছিলো না আমাদের কাছে, শুধু অনলাইনে জড়ীয়ে
থাকা আমরা দুজনে। স্বপ্ন দেখতে থাকা।
নিজেদের স্বপ্নের ঘর। ফাইনালি হবে নিজের ঘর। খুব খুব প্রব্লেম এ ছিলাম, বেশ কিছু
বছর ধরে জীবন ভাংতে ভাংতে খাদের কিনারে নিয়ে ফেলেছিল। তোর সাপোর্ট এ টিকে গেলাম,
নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখলাম, আমার সব সমস্যার চাপ তোর উপরে চাপিয়ে দিয়ে। কত
স্ট্রেন্থ তোর, নিজের এত এত সমস্যা স্বত্বেও আমার খারাপ থাকার চাপ নিয়ে আমাকে
বাঁচিয়ে রাখলি। কিন্তু ক্রমেই আরো খারাপ হালে যেতে থাকলাম, আরো আরো আরো খারাপ।
প্রতি মূহুর্তে ভাবতাম আমরা, এর থেকে খারাপ হতে পারে না। তার পরক্ষ্ণেই হয়তো এমন
কিছু হতো, আমি আরো বাজে অবস্থায়। আমাদের দুজনেই নিজেদের চাপ, বাইরের চাপ,
পরিপার্শ্বের চাপে কি জোর ডিপ্রেশনে চলে গেলাম। সব এলোমেলো হয়ে যেতে থাকলো। আমাদের
মাঝে খুব ঝগড়া হতো তখন। আমি বুঝতেই চাইতাম না তুই কত খারাপ হালে আছিস। কিন্তু আমিও
তো। আমি তো ঠিকঠাক চিন্তাই করতে পারতাম না। কত কি সব এলোমেলো হয়ে যেত। কিন্তু তবু
দুজনে দুজনকে আঁকড়ে ধরে ছিলাম। শুধুই আমার তুই, শধুই তোর আমি। একান্ত নিজের,
সবটুকু। একটা মূহুর্তও একা যেত না, কথা কথা কথা। কাছে থেকেও হয়তো এমন একসাথে থাকা
যায় না। প্রতিটা শ্বাস , প্রতিটা মূহুর্ত জানানো। কারণ সারাক্ষণ কথা বলছি তো তোর
সাথে, একটা মূহুর্তও তো থেমে থাকতাম না। না তুই, না আমি। ঘরে বাইরে, অফিসে, বাসে,
ডাইনিং টেবিল থেকে বাথরুমে, সব সময় এক সাথে। কি সুখ, কথা বলার কি আরাম। হোয়াটসএপ,
আমাদের ১৫ লাখ লাইন জমিয়ে রাখা কথার ভারে স্লো হয়ে যেত, হ্যাং হয়ে যেত। সব কথা
জমিয়ে রেখেছিলাম আমি। প্রাণে ধরে কি আর মুছে ফেলা যায় এই সুখ। তবু একটাই কাঁটা,
তোর কাছে যেতে পারি না, আমাকে পাস না তুই পাশে, কাছে। মোবাইল বুকে চেপে আমাকে
অনুভব করতে হয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, একের পর এক বছর ঘোরে। আমরা দুজনে
দুজনকে ছুঁতে পারি না। এখনো ছুঁয়ে দেখিনি।
অবশেষে মুক্তি তো
আমার এলো রে। সব শিকল ভাংলাম। তোর মনে আছে, আমি পুরো সুস্থ হয়ে গেছিলাম সেদিন,
যেদিন আমার তোর কাছে যাওয়ার সব ফাইনাল হলো? দুজনের সব খারাপ অনুভুতি কোথায় উবে
গেল। আর আরো কাছে চলে গেলাম। সে কি প্রস্তুতি আমাদের ফাইনালি দেখা করার। কি করব
আমরা, কিভাবে ভেসে যাবো, কি কি হবে। সেই আলাপই আর শেষ হয় না। অবশেষে সকল সম্পর্ক
ছিন্ন করে, পিছের পথের সমস্ত সেতু জ্বালিয়ে দিয়ে, সব ছেড়ে আমি পৌঁছে গেলাম তোর
কাছে। সুখে ভেসে গেলাম, সমস্ত ভাবনা হারিয়ে ফেললাম। ডুবে গেলাম তোর মাঝে। কত কত মধুর
কিছু, জীবনে প্রথম। সে কি অসহ্য সুখ, জীবনে এত সুখ থাকে, জানতামই না। টানা তিনটে
মাস, বয়সটাই যেন ১৫ বছর কমে গেল। সেই কোথা থেকে ছুটে যেতাম তোর কাছে, ট্রেন বদলে ।
শিয়ালদার ব্যস্ত মানুষের স্রোতে আমার থেকে বেশি গতি কারো ছিলো না। সাউথ থেকে নর্থ
ঠিক ১ মিনিট ১২ সেকন্ড লাগতো। আমার হাওয়া হতো না, সকালে বা দুপুরে। মনেই থাকতো না,
মন জুড়ে শুধু তোর কাছে পৌঁছানোর ভাবনা। ঠিক ৪ টেয় বাস থেকে নামতি তুই, আমি সিগারেট
হাতে দাঁড়ানো। তোর কাজের চাপে, আমাদের সেই শহর ঘোরাটা হয়েই উঠছিলো না। আমাদের
রোমান্স এর শহর। সেই যে নিউমার্কেট এর সামনের রোল এর দোকান, যেখানে সেই কোন ১২ বছর
আগে, আমরা একে অপরকে পাশ কাটিয়ে গেছিলাম। চিনতাম না তো তখন। কিন্তু যাওয়া হলো না
সেখানে। তোর অফিস সেরে ঘরে ফেরার আগে, মলে বসে কাটানো সেই কয়েক ঘন্টা, কোল্ড কফি
নিয়ে তাকিয়ে থাকা তোর মুখের দিকে। আমি কথা বলে, তোর কথা শোনার অনুভতি হারাতে
চাইতাম না। তোকে দেখে, তোর কথা শুনে আশ মিটতো না। আচমকাই কি হয়ে গেল জান। আমার সেই
বিখ্যাত দুর্ভাগ্য, জীবনের সবথেকে কঠিন আঘাত হানলো, যেন আমার সুখ দেখে সবটুকু
আক্রোশ নিয়ে। হারিয়ে গেলাম আমি, বন্দী হয়ে গেলাম, কোন যোগাযোগ রইলো না। আমাকে
ছুঁড়ে ফেলা দেয়া হলো এক সমান্তরাল বাস্তবতায়, বাস্তব জগত থেকে পুরো বিচ্ছিন্ন, এক
অন্ধকার নরকে। পাগল হয়ে গেলাম আমি, অসহায়ত্ব, একাকীত্ব, আর তোর ভাবনায়। তোর যে
শুধু আমিই ছিলাম, কথা বলার, কি করছিস তুই কেমন আছিস। প্রতি মূহুর্তে ফের সেই
প্রথমের মত নিজের সাথে যুদ্ধ হতো। আমি তোর জন্যে সঠিক মানুষ নই, আমার সমস্যায় তোকে
ভুগতে হয় এতটা, যা আর কখনো হয় নি। তোর ভালো চাইলে আমার উচিৎ তোর থেকে সরে থাকা,
আমার দুর্ভাগ্যের আঁচ তোর গায়ে লাগতে না দেয়া। কিন্তু আমার ভিতরটা যে স্বার্থপর।
আমার যে আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই, তুইই শুধু আমার একার, আমার নিজের। পিছের সব যে
আসলে নিষ্ঠুর মিথ্যে, আমার জীবনের একমাত্র সত্যি যে শুধুই তুই। তোকে ছাড়া বাঁচা
অসম্ভব। জানিস আমি ওখানে মরেই যেতাম হয়তো, নিদেনপক্ষে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতাম।
তুইই ছিলি আমার বেঁচে থাকার এংকর লাইন। আমার মনের ঈশ্বর, একাগ্র একনিষ্ঠতায় জপে
যেতাম তোর নাম। জানতাম, তুই আছিস তো। ভিতর থেকে অন্য আমি বলতো, কেন থাকবি তুই?
তোরও তো জীবন আছে। প্রতিনিয়ত এই দ্বন্দ নিয়েই কি করে যেন জীবন আঁকড়ে বেঁচে রইলাম।
একদিন সেই অন্ধকার
থেকে ঠিক বেরিয়ে এলাম আমি। পাগলের মত খুঁজলাম আমার প্রিয় বন্ধুকে। আমার একমাত্র
বন্ধুকে। আমার ভালোবাসা। আমার দুর্ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা তখনও বুঝি বাকি ছিলো। তোকে
খুঁজেই পেলাম না। কোথায় হারিয়ে গেছিস তুই, আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। তোকে আর ছুঁতে
পারলাম না। দূর থেকে দেখি, মনে হয় যেন দেখতে পাই তোকে, কিন্তু কোথায় তুই? আমার যে
যাওয়ার আর কোন যায়গা নেই রে। আমার যে নিজের কথা বলার আর কেউ নেই রে। প্রিয় বন্ধু,
আমার যে আর কোন বন্ধু নেই রে। কেউ নেই রে আমার কাঁধে হাত রাখার। কেউ নেই রে কাঁধে
মাথা রেখে কাঁদার। কেউ নেই রে মন খারাপে মাথায় হাত বুলানোর। কি প্রচন্ড বিচ্ছিন্ন
একা আমি, কোথাও কেউ নেই, শুধুই শুন্যতা। আমার চিঠি তোর কাছে পৌঁছাবে না জানি। কোন
উপায় নেই। তবু লিখে যাওয়া চিঠি, তোর কাছে। আমার যে কথা বলারই কেউ নেই রে। বলতে
গেলে সেই তোকেই বলতে হয়, আপন মনে, তুই শুনতে না পেলেও। বড্ড বেশি ভালোবাসি রে
তোকে, আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বন্ধু। কখনোই বোঝাতে পারিনি, পারবোও না কখনো ঠিক
কতটা, কোনদিনও তোর জানা হবে না। এক পৃথিবী ভালোবাসা তোর জন্যে। সব হারিয়ে, শুধু
তোর দেয়া ৩০০ গান বুকে জড়িয়ে বেঁচে আছি। ভালোবাসি, ভালোবেসেই যাবো। ভালোবাসাটুকু
তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। ভালো থাকিস রে। আমার জীবনে তো কিছুই নেই। তোর ভালো
থাকাতেই আমার সুখ।
ইতি,
তোর ভুলে যাওয়া
প্রিয় বন্ধু
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন