আপনাদের মনে আছে জুলহাজ আর তনয় এর কথা? ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে জুলহাজ এর বাসায় ঢুকে তাদের দুজনকে হত্যা করা হয়। হত্যার কারণ ছিলো, তারা সমকামী অধিকার কর্মী। বাংলাদেশের একমাত্র সমকামীদের পত্রিকা রুপবান এর অন্যতম ফাউন্ডার। তাদের অপরাধ, তারা সমকামী। বাংলাদেশে ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর চাইতে বড় অপরাধ খুব কম আছে। জুলহাজ-তনয় হত্যার পরে এমনকি দেশের প্রধাণমন্ত্রী ,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত জুলহাজদেরকেই দায়ী করেন মৃত্যুর জন্যে। তাদের বক্তব্য ছিলো, এ নাকি বিকৃতি, জুলহাজদের নাকি উচিৎ ছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে পশ্চিমা বিকৃতিকে বর্জন করা। একবার ভাবুন তো তাদের মনুষ্যত্ববোধ। ভাবুন তো একবার এদেশের সমাজের মনস্তত্ববোধ। ২০১৪ সালে রূপবান ম্যাগাজিন এবং বয়েজ অফ বংলাদেশ নামে একটি গ্রুপ বাংলাদেশ জুড়ে জরিপ চালায়। জরিপের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে সেখানে তারা বলছে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ সমকামী জনগোষ্ঠী রয়েছে। জরিপে তৃতীয় লিঙ্গকে আওতায় নেয়া হয়নি। সমাজ ও রাষ্ট্রের বক্তব্য , তাদের ১০ শতাংশ মানুষ নাকি
শ্রেফ বিকৃতিতে আসক্ত। যেই দেশে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ১.৮ কোটি মানুষ সমকামী, সেখানে সমকামীদের অধিকারের কি সার্বিক পরিস্থিতি তা দেখা যাকঃ
২০১৪
২০১৪ সালের ১৮ই জানুয়ারি দেশে সমকামীদের পত্রিকা ‘রূপবান’ প্রকাশিত হলে তুলকালাম সৃষ্টি হয়। চারদিকে এগুলোকে নির্মূল করার আহ্বান জানানো হয়। এ বছরেরই পহেলা বৈশাখে প্রথমবারের মত রংধনু র্যালি আয়োজন করা হয়। এই খবরটি প্রায় নিউজ ব্ল্যাক আউট এর শিকার হয়। হাতে গোনা দু একটি খবরের কাগজে ছোট করে নিউজ আসে বটে, কিন্তু আপনি এখন হাজার চেষ্টা করেও তেমন কোথাও এই প্রথম র্যালির খবর খুঁজে পাবেন না। অনলাইন থেকে প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে।
২০১৫
২০১৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর বৃটিশ কাউন্সিলে একটি সমকামী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেদিন ২০০-এর বেশি সমকামী তরুণ-তরুণী জড়ো হয়েছিল। যেখানে ‘ধী’ নামে একটি সমকামী কমিক উপস্থাপন করা হয়েছিল। আর এর চরিত্র ধারণ করেছিলেন দেশের খ্যাতনামা এক সাংস্কৃতিক দম্পতির মেয়ে। সেদিনকার সমাবেশে সমকামীদের অধিকারের পক্ষে ‘নিজেরা করি’ এনজিওর সমন্বয়কারী নানা কথা বলেছিলেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। বৃটিশ কাউন্সিলের সমকামীদের সে সমাবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়।
২০১৬
২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখে টিএসসি তে ফের একবার রংধনু র্যালির আয়োজন করা হয়। কিন্তু র্যালিটি ঠিক শুরুর মুখেই পুলিশ লাঠিচার্জ করে অংশগ্রহণকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। গ্রেফতার করে ৪ জন সমকামীকে। মূলত এই সময় থেকেই টার্গেট হন জুলহাজ মান্নান। যার পরবর্তিতে ২৫ এপ্রিল খুন হন জুলহাজ ও তনয়। থেমে যায় সমকামী অধিকার আন্দোলনের প্রকাশ্য সকল কার্যক্রম। গা ঢাকা দিতে হয় এই আন্দলোনের সম্মুখভাগের প্রকাশ্য মুখদেরকে।
২০১৭
২০১৭ সালের ১৯ মে ঢাকার কেরানীগঞ্জ এর একটি কমিউনিটি সেন্টার থেকে গ্রেফতার করা হয় ২৮ জন সমকামীকে। সকলেই ছিলেইন সমকামি অধিকার কর্মী। তাঁদের সেই অপরাধেই গ্রেফতার করা হয় বটে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে মুখরক্ষার খাতিরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে। আদালত তাদের মধ্যে থেকে ৪ জনকে রিমান্ডে পাঠায়। এ বছরেরই জুন মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে সমকামীদের মৃত্যুদন্ড বিলোপের বিপক্ষে ভোট দেয় বাংলাদেশ সরকার।
২০১৮
২০১৮ সাল প্রায় শেষের মুখে। এবছরই ভারতে এলজিবিটি অধিকারবিরোধী ৩৭৭ ধারা বাতিল করা হয়। কিন্তু ঠিকা পাশের দেশ বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার নিয়ে একটা টুশব্দও শোনা যায় না কোথাও। এতটাই নিপুণভাবে স্টিমরোলার চালানো হয়েছে, সমকামী অধিকার কর্মীরা জীবনের ভয়ে প্রকাশ্য কোন ধরণের কথা বলা তো দূরে থাক আজকাল হয়তো গোপনে একত্রিত হতেও আর সাহস পান না। পার্শ্ববর্তী ভারতে এত বিশাল বিজ্যের পরেও তাই বাংলাদেশে সমকামীদের তরফ থেকে কোন মিডিয়াতেই কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নি। সুনিপুণভাবে দমন করা হয়েছে তাদের অধিকারের দাবী।
এ তো গেল সমকামী অধিকার কর্মীদের কথা। তাদের বিরুদ্ধে এদেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে
মনোভাবের দিকে একটু নজর বুলিয়ে নেয়া যাক। ৩৭৭ ধারা বাংলাদেশেও বিদ্যমান। এই ধারা অনুযায়ী সমকামীতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন ও সর্বনিম্ন শাস্তি ১০ বছরর কারাদন্ড। সাথে বাধ্যতামূলক অর্থদন্ড। কোন ধরণের ভিজুয়াল মিডিয়ায় সমকাম নিয়ে যেকোন ধরণের আলোচনা ব্লায়ক আউট এর শিকার। নেগেটিভ বা পজিটিভ কোন ধরণের কথাই আনফিশিয়ালি নিষিদ্ধ। প্রিন্ট মিডিয়াতে তথাকথিত প্রগতিশীল এবং রক্ষণশীল খবরের কাগজ বা পত্রিকাগুলো সমকামীদের নিয়ে সমস্ত আলোচনা পজিটিভ আলোচনা বয়কট করে চলছে। চালিয়ে যাচ্ছে নানাবিধ অপপ্রচার ও প্রচারণা। ভারতের আদালতে ৩৭৭ ধারা বাতিলের পরে, প্রাথিমকভাবে জনপ্রিয় সকল প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া দায়সারাভাবে তথ্য সম্প্রচার করলেও, ডুকরে আর্তনাদ করে ওঠে বাংলাদেশের রক্ষণশীল মিডিয়া , নামকরা সমাজকর্মী এবং গোটা বাংলাদেশ সমাজ। নিজেদের আধুনিক ও প্রগতিশীল দাবি করা জাতীয় দৈনিক “কালের কন্ঠ” ধর্মের দোহাই পেড়ে প্রচার করেঃ
“হাজারো বছর আগে লুত (আ.)-এর জাতি সমকামিতার মতো ঘৃণ্য অপকর্ম আবিষ্কার করেছিল। বর্তমান যুগের ‘সভ্য’ লোকেরা সে জাতিকে অজ্ঞ, অশিক্ষিত ও মূর্খ ছাড়া আর কিছুই বলে না। আশ্চর্য হলো, সেই অজ্ঞ, অশিক্ষিত ও মূর্খ জাতির মাধ্যমে আবিষ্কৃত এই সমকামিতা বর্তমানের সভ্যতা-গর্বিত লোকেরা সাদরে গ্রহণ করেছে! বর্তমানে পাশ্চাত্যের বেশির ভাগ ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নৈতিকতার কোনো অস্তিত্ব নেই। পাশ্চাত্য জগতে অবাধ যৌনাচার কথিত সভ্য লোকদের পশুত্বের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। ফলে পরিবার গঠন, সামাজিক শৃঙ্খলা ও বিবাহ পদ্ধতি সেসব দেশে বিলুপ্তির পথে। সমকামিতার মতো ঘৃণ্য অপকর্ম লুত (আ.)-এর জাতির মাধ্যমে শুরু হলেও এর সপক্ষে ‘যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা’ দাঁড় করিয়েছে গ্রিক জাতি। তাদের দর্শন এ ঘৃণ্য অপরাধকে চারিত্রিক সৌন্দর্যের মর্যাদায় ভূষিত করতে চেষ্টা করেছে। গ্রিক সভ্যতার ধ্বংসস্তূপে আধুনিক ইউরোপের জন্ম। আর সমকামিতার বাস্তবিক কাঠামো তৈরিতে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেছে আধুনিক ইউরোপ। পশ্চিমা দেশগুলোতে এর সপক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানো হয়েছে।“
জাগো নিউজ নামে একটি জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা “ভারতে এই রায়ের ফলে বাংলাদেশ এইডস এর ঝুঁকিতে পড়ে যাবে শীর্ষক প্রচারণা চালায়। তাদের বক্তব্য
“সমকামিতার পক্ষের এই রায়কে দেশটির সমাজ কাঠামোর জন্য ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচনা করছেন অনেকে। মরণঘাতি রোগ এইডস-এর বিস্তারেও সহায়ক হবে এই রায়, এমনটি মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ রায়ে ভাবনা বাড়িয়েছে বাংলাদেশেও। ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা বাংলাদেশের সামাজিক রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বহু আগে থেকেই হয়ে আসছে। দু’দেশের মানুষের মধ্যকার আচরণগত মিলও দৃশমান। বাংলাদেশে মরণঘাতি এইডস-এর বিস্তারে যে কয়টি কারণ উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে ভারতের সীমান্ত অন্যতম। বিশেষত, পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে এইডস-এর ঝুঁকি বাড়ছে ভারতের সীমানা থেকেই। সীমান্তের স্থলবন্দরগুলোয় যৌনকর্মীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশাই এ ঝুঁকির কারণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় ওঠে এসেছে।
সমকামিতা
নিয়ে
ভারতের
সর্বোচ্চ
আদালতের
রায়ের
ব্যাপারে
কথা হয় বাংলাদেশের সমাজবিদ ও সাবেক মন্ত্রী ড. মীযানূর রহমান শেলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই রায়টি বাংলাদেশ তো নয়-ই, ভারতের সমাজ বাস্তবতার সঙ্গেও যায় না। ভারতে এই রায়ের প্রভাব পড়লে, বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়বে। ভারতে এইডস-এর ঝুঁকি বাড়লে বাংলাদেশেও বাড়তে পারে।’
একই বিষয়ে কথা হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (ন্যাশনাল এইডস/এসডিসি কন্ট্রোল) ডা. শের মোস্তফা সাদীক খান-এর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ভারতের আদালতের রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে সমকামিতা বা যে কোনো বিকৃত যৌনকর্মই এইডস’র জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় আমাদের এখানে এমন যৌনকর্মকে কখনই সমাজ বা রাষ্ট্র সমর্থন করবে না। তবে পাশের দেশ ভারতে এইডস’র বিস্তার ঘটলে বাংলাদেশে ঝুঁকি বাড়তেই পারে!”
রক্ষণশীল ও মৌলবাদি গোষ্ঠী পরিচালিত জনপ্রিয় দৈনিক নয়া দিগন্ত এই রায়ের পরে প্রচার করে
“মূলত কথিত পশ্চিমা সভ্যতার বিকারগ্রস্ততা থেকেই সমকাম নামক ফেতনার আবির্ভাব হয়েছে। দ্বৈত যৌনজীবন একটি স্বীকৃত ও স্বাভাবিক মাধ্যম হলেও রুচিবিকৃতির কারণেই যৌনতাকে নানা অপবিশেষণ দেয়া হয়েছে। লত সব বিষয়ে যেমন স্বাভাবিক ও স্বীকৃত পন্থা আছে, ঠিক তেমনি যৌনতাও সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সংবিধিবদ্ধ। অনেকে সমকামিতাকে মানবাধিকারের সাথে গুলিয়ে ফেললেও তা কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। সমকামিতাকে যদি মানবাধিকার বলা হয়, তাহলে ড্রাগ নেয়া, আত্মহত্যা ও নিজ শরীরের যেকোনো ক্ষতিসাধনকেও বৈধতা দিতে হবে। কারণ, সমকামিতা যেমন অন্যের অধিকার লঙ্ঘন বা ক্ষতি করে না, ঠিক তেমনি ড্রাগ গ্রহণ, আত্মহত্যা বা নিজের শরীরের ক্ষতিসাধনও ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট। এতে অন্যের ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
আসলে সমকামিতা কোনো কামাচার নয়, বরং রুচিবিকৃতির নিকৃষ্টতম পর্যায়। কারণ, এতে অতিপ্রাকৃত নিয়মের লঙ্ঘন করা হয়। মানুষসহ প্রত্যেক জীবের জৈবিক প্রবৃত্তি নিবৃতির জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক পন্থা রয়েছে। বস্তুত বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শুধু মানুষ নয়, সব জীবই আকর্ষণ অনুভব করে। আর এভাবেই সৃষ্টির ধারাবাহিকতাও রক্ষিত হচ্ছে। মজার বিষয় হলো- মানুষ রুচিবিকৃতির কারণে বিপরীত লিঙ্গের পরিবর্তে সমলিঙ্গে আকর্ষণ অনুভব করলেও কোনো ইতর প্রাণীকে এমনটা কখনো দেখা যায়নি। যদিও সমকামিতার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে কেউ কেউ ইতর প্রাণী বিশেষের সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের কল্পকাহিনী প্রচার করে থাকেন। কিন্তু তথ্য-প্রমাণ ও যৌক্তিকতার মানদণ্ডে তা গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়নি।“
এ তো গেল সমকামীতা নিয়ে
বাংলাদেশের
মূলস্রোতের
অবস্থান।
স্রোতের বিপরীতে চলা বাংলাদেশের নাস্তিক ও মুক্তমনা কমিউনিটি কিন্তু সমকামী অধিকার প্রসঙ্গে সুস্পষ্টভাবে দ্বিধাবিভক্ত। অধিকাংশই এ নিয়ে বিপক্ষে অবস্থান করেন। সমকামীতা এখানেও অধিকাংশের কাছে বিকৃতি। তাঁরাও সামাজিক প্রেজুডিস
ও ইনহিবিশন থেকে বেরোতে পারেন নি সকলে। মুক্তমনা আন্দোলনের পুরধা ও বাংলাদেশে সমকামীতা নিয়ে প্রথম বই এর রচয়িতা অভিজিত রায় , ও তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদ, সমকামী অধিকারের পক্ষে নাস্তিক কমিউনিটির সবথেকে সরব কন্ঠ ছিলেন। অভিজিত এর জীবিত থাকাকালে তাঁকে নিজেদের কমিউনিটি থেকেও প্রচুর গালমন্দ শুনতে হয়েছে। নিরব এবং সরব দুরকমের অসহযোগীতাই পেতে হয়েছে সহযোদ্ধাদের থেকে। মৌলবাদীদের হাতে ২০১৫ সালে তিনি নিহত হবার পরে সেভাবে দৃঢ় কোন বক্তব্য আমরা আর কারো তরফ থেকে দেখি না। নাস্তিকেরা ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের তথাকথিত জিহাদ চালানোয় যতটা ব্যস্ত, ধর্ম নিয়ে নিজেদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যতটা সোচ্চার, দেশের ১০ শতাংশ মানুষের স্বাভাবিক যৌন অধিকারের প্রশ্নে তারা ততটাই নিশ্চুপ। এই মৌনতা কিন্তু সম্মতির লক্ষণ নয়, বরং এভাবে মৌন থেকে তাঁরাও প্রকারান্তে নিজেদের সমকাম বিরোধী অবস্থান প্রকাশ করছেন। হাতে গোনা দু চারজন সেলিব্রেটি এবং কতিপয় নন সেইব্রেটি নাস্তিকের থেকে কদাচিত বক্তব্য ব্যতীত সমকামীতার পক্ষে বিষমকামী লিবারালদের তরফ থেকে কোন ধরণের শক্তিশালী সমর্থন বা প্রচার আমরা পাই না। প্রকারান্তে এড়িয়েই চলেন তাঁরা।
তবুও আশার কথা জার্মানি ভিত্তিক বাংলা অনলাইন পোর্টাল ডয়েচ ভেল এবং লন্ডনভিত্তিক বিবিসি বাংলা পোর্টাল নিয়মিতভাবে সমকামী অধিকারের দাবী তুলে প্রবন্ধ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সমকামীদের বক্তব্য, তাদের পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলে। পুরোপুরি সমর্থনহীন অবস্থান হয়তো নয় এদেশের সমকামী জনগোষ্ঠী। তবে রূপান্তরকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরকে নিয়ে আমি কাউকেই বলতে শুনি না, সমকামীদেরকেও না। তাঁরা সর্বত্র ব্রাত্য।
আমার এত কিছু লেখার উদ্দেশ্য খুব সিম্পল। আমাদের আসলে সময় পেরিয়ে গ্যাছে, আমাদের দেশের প্রান্তিক যৌনতার এই মানুষগুলোর সাংবিধানিক ও মৌলিক জীবনাধিকার নিয়ে কাজ করার। আমরা যারা নাস্তিক , নিজেদেরকে মুক্তমনা, প্রগতিশীল, লিবারাল, বিজ্ঞানমনষ্ক বলে দাবী করি, তারাই যদি সোচ্চার না হই এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক যৌন অধিকারের দাবীতে, না দাঁড়াই এই প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের পাশে, তবে কিসের মুক্তমনা, কিসের অধিকার আদায় কর্মী আমরা? সমাজের মৌলবাদ, রক্ষণশীলতা, অধিকার হরণ ও অতীতমুখীতার বিরুদ্ধে কিসের সংগ্রাম আমাদের , যদি আমরা এই প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের সহযোদ্ধা না হতে পারি? শুরু হোক প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। যুদ্ধে আসুক নতুন মোড়। আসুন সবাই একজোট হয়ে
লড়াই করি ভালোবাসার অধিকার আদায়ের লক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে, সাংবিধানিক অধিকার, নিজস্ব যৌন অধিকারের পক্ষে। আমাদের কিন্তু আসলেই হারানোর কিছু নেই
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন