রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

যাপিত জীবন - ১১


ধর্মতলা থেকে নিউমার্কেট হয়ে মিউজিয়াম, বার তিনেক পাক খেতে খেতে বোধহয় হলো, কোলকাতা শহরে একা একা একা সময় কাটানো প্রায় ঢাকার মতই বোরিং। উদ্দেশ্যবিহীন কত ঘোরা যায়। দিনটা ছুটির বলে তাঁর সাথে দেখা কিছুতেই হবে না, তিনি গৃহবন্দী। অগত্যা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “বল তো আমি এই বিশাল শহরে একাকী কি করে আরো কয়েকঘন্টা পার করতে পারি, ঘরে ফিরে আরো বোর হওয়া সম্ভব না। এ আমার শহর নয়, এ তোর শহর তুইই বুঝবি ভালো।

তিনি যেকটা সাজেশন দিলেন, ভেবেচিন্তে আমার পছন্দ হলো নন্দন। শুনেছিলাম, নন্দনে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খানিকটা ছোঁয়া আছে। দলবেঁধে বহু লোকে শুধু আড্ডা দিতেই যায়। তো ভাবলাম যাই বরং দেখে আসি আড্ডা কিভাবে চলে এই শহরে। জেনে নিলাম, মেট্রোয় চেপে এসপ্লানেড থেকে রবীন্দ্র সদন স্টেশন গিয়ে নামতে হবে। ১০/১৫ মিনিটের পথ। আড্ডা দেখে সময় পার করা কনসেপ্টটা নতুন। তাই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই রবীন্দ্র সদন পৌঁছে গেলাম। নামার পরে পুরো তালগোল পকিয়ে গেল। এবারে বেরোবো কোন পথে? /৪ টে পথ পাতাল থেকে উপরে ওঠার, চক্কর কাটতে থাকলাম, ম্যাপ দেখেও ঠিক বুঝলাম না, কোন দিকে উঠবো। আরো অনেকেই দেখলাম আমার মতই চক্কর কাটছে, ভাবলাম এটাই হয়তো রীতি। জিজ্ঞেস করে খুব সুবিধা হলো না, যাকেই জিজ্ঞেস করি, কাকতালীয়ভাবে সেইই দেখি আমার মত কেস। আমার ভারি ইগোতে লাগলো, এভাবে আটকে যাওয়া অপমানজনক। সামনে যেই পথ পেলাম উঠে পড়লাম উপরে। জিপিএস অন করে দেখলাম, আমি নাকি প্রায় ১ কিলো দূরে। এমনই হবার কথা, আমার লটারীভাগ্য জঘন্য।        

পৌঁছে নাহয় গেলাম, এবারে করবোটা কি জুন মাসের এর এই ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে। ছোট্টই তো যায়গা দুপা দুপা করে আটদিকে হাঁটলেই শেষ। লোক দেখি প্রচুর, কিন্তু আড্ডা তো দেখি না। চিন্তা করে দেখলাম, আড্ডা হয়তো শেষ বিকালে জমে। সেপর্যন্ত উপায় একটাই, একটা যায়গা বেছে নিয়ে বসে ফোনে বই পড়া। তবে, তার আগে চা। ফাইন আর্টস এর দিকে গেটের পাশে চায়ের দোকানের ভাঁড় দেখে খুব পছন্দ হলো। বেশ বড় সাইজের ভাঁড়, ১০ টাকা করে অনেকটা চা। ওমা চা’ও দেখি ভালো। কোলকাতায় ঢোকার পর থেকে চায়ে কিছু একটা মিসিং মনে হচ্ছিলো। বাংলাদেশে আমরা যেমন খেয়ে অভ্যস্ত কিছুতেই যেন তেমন না। কিন্তু এই একটা চা, যা খেয়ে কোন মিসিং লিঙ্ক খুঁজতে হলো না। প্রায় ঘন্টা ২/৩ তিন পার করে দিলাম, যায়গা বদল করে করে বসে বই পড়ে। কিন্তু কিছুতেই যে শান্তি মেলে না। মিলবে কি করে? লোকের আড্ডা দেখে ঈর্ষা হচ্ছে তো। সন্ধ্যার একটু আগে মনে হলো, এনাফ ইজ এনাফ। যথেষ্ট হয়েছে। আই কুইট। এর চাইতে মে বি ঘরে বসে বোর হওয়াও ভালো। সবাই আড্ডা দিচ্ছে আশেপাশে,আর আমি ছিঁড়ছি। লাস্ট একটা সিগারেট খাবো, দেন কেটে পড়বো। এগিয়ে গেলাম একাডেমি বিল্ডিং এর পাশে সিগারেটের দোকানে। সিগারেট ধরিয়ে দুপা এগিয়েছি, পাশের রোল এর দোকান থেকে আওয়াজ এলো, দুটো এগ রোল দিন। ইন্সটিংক্ট বড় আজব জিনিস, পাশের আওয়াজে ঘুরে তাকানোটা এবসেন্ট মাইন্ডেড ইন্সটিঙ্কট। ঝাঁকড়া চুল আর অন্তত দুসপ্তা’র দাড়ি মুখে একটা ছেলে টাকা হাতে দাঁড়ানো। আরেহ যাহ বাঁড়া , এটা কৌস্তভ না?

দুজনের বহু প্ল্যান ছিলো আমি কোলকাতা গেলে আমরা কি কি করতে পারি। সবথেকে বড় প্ল্যান ছিল , আড্ডা দিতে পারি জমিয়ে। কিন্তু দেখা হওয়া তো দূরে থাক, আমি যাওয়ার ৩/৪ দিনের মাথায় হোয়াটসএপ এও কথা বন্ধ করে দিলো ছোকরা। প্রচন্ড চটে ছিলাম মনে মনে। কিন্তু ঐ সময়ে আমি প্রচন্ড মজা পেয়ে গেলাম। আমি চিনে ফেলেছি, কিন্তু আমাকে দেখেইনি। সাথে দেখলাম, প্রচন্ড মোটা লেন্সের চশমা পরা রোগা একটা ছেলে। আমি যখন মিটিমিটি হাসি নিয়ে ওদের চারপাশে বারবার ঘুরে ডাইনামিক এন্ট্রি প্ল্যান করছি, ছেলেটা দেখলাম আমকে খেয়াল করে বারবার সন্দেহ নিয়ে তাকাচ্ছে। স্বাভাবিক, আমার আচরণ সন্দেহজনক ছিলো তো বটেই। শেষমেষ , নাটকীয়তা আর না বাড়ীয়ে জোর গলায় বললাম, “কৌস্তভ, বলো তো, তোমাকে আমার  এখন কি করা উচিত?” রোল চিবোনো থমকে গেল। আমার দিকে মুখ তুলে, জাস্ট তাকিয়ে রইলো, অন্তত ঝাড়া ১৫ সেকেন্ড। প্রতি ক্ষণে ক্ষণে মুখে অনুভূতির এত পরিবর্তন আমি আগে দেখিনি কখনো। হতবাক, খুশি, অপ্রস্তুত, উচ্ছাস আরো কতরকম শেড। “আবাহন দা এটা তুমি?” চিৎকার দিয়ে এক লাফে জড়িয়ে ধরলো কৌস্তভ।

কিচ্ছু মনে রইলো না আমাদের, রাগ, বিরক্তি, হতবিহ্বলতা, কিচ্ছু না। মনে হলো আড্ডাটা জাস্ট সুইচ টিপে অন করে দেয়া হলো। চশমাওলা ছেলেটার নাম জানলাম সৌরজিত। শুরুতে একটু জড়তা থাকলেও , আমাদের উচ্ছাসের তোড়ে ওও ভেসে গেল। মনেই হচ্ছিলো না যে এই প্রথম আড্ডা দিচ্ছি, আগে সামনাসামনি দেখা হয় নি, বা সৌরজিতের ক্ষেত্রে এই প্রথম পরিচয়। প্রাণোচ্ছল আড্ডা বোধহয় একেই বলে, যেটার খোঁজে আমরা হয়ত তিনজনেই ছিলাম। কি করবো আর কি করবো না , তাই নিয়ে ভাবতে ভাবতে, কৌস্তভই বোধহয় জিজ্ঞেস করলো, দাদা ফাইন আর্টস এ ঢুকেছো কখনো? আমি আজই এলাম প্রথম, ওখানে কি ঢুকবো। তো দুজনেই বললো, চলো চলো, ইন্টারেস্টিং জিনিস আছে। ভাবছিলাম, কি এমন থাকত পারে একটা আর্ট গ্যালারিতে, যা আমার মত আর্ট জ্ঞানহীন পাবলিকের জন্যে ইন্টারেস্টিং হবে। একবার দু’বার বোধহয় বলেওছিলাম, যে সময়টা খামাখা নষ্ট করার দরকার নেই। একটু বাদেই ফিরতে হবে, সন্ধে পেরিয়েছে। ওরা জোর করেই ধরে নিয়ে গেল। টেনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো, এক শিল্পীর প্রদর্শনীর সামনে। জাস্ট হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। লিটারালি হাঁ, মেটাফরিক না। ছবি আমি একেবারে যে দেখিনি তা তো না। কিন্তু এ আবার কিরাম ছবি। ছোট্ট একটা এবসট্রাক্ট মাথা, সুতোর মত বডি নেমে গিয়ে বিশাল আকৃতির পাছা, তাতে  শুঁড়ের মত পা। গোটা সিরিজটাই এমন। নানান ভঙ্গিমায়, এই একই জিনিস। ঘুরেফিরে শুধু বিশাল পাছা। আরো বেশ কজন শক্ত শক্ত মুখ নিয়ে বোদ্ধার মত করে মাথা নাড়িয়ে দেখছে ছবিগুলো। একবার ভবলাম কাউকে বলি কেসটা বুঝিয়ে দিতে। বেটার জাজমেন্ট মানা করলো। এখানেই শেষ নয় বস, ছবির নিচে আবার দামও লেখা আছে। দামের অংক দেখে আমার মনে হলো আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, সব ছবিই কুড়ি হাজারের উপরে। আমরা তিনজনে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আচমকা হল কাঁপিয়ে হেসে উঠলাম। আশেপাশের অনুরাগীরা হয়তোবা বিরক্ত কয়েই তাকালো আমাদের দিকে , কে কেয়ার করে। সবাই কি আর শিল্পের কদর বোঝে? আমরা ঠিকঠাক বুঝেছি, ওগুলো কমেডি ছবি।

আমি বললাম, আজকের মত আমার এবসট্রাকশন হজম করার ক্ষমতা শেষ, আর কিছু দেখাতে চাও? পাশের গ্যালারিতে গেলাম, কি চমৎকার সব ল্যান্ডস্কেপ আঁকা। একটু দূর থেকে দেখলে মনেই হয় না যে হাতে আঁকা। অপর পাশের দেয়ালে নানান থিমেটিক ছবি। এই মনে হলো , না আসলেই উপভোগ করতে এসেছি আমরা। কিন্তু লোকের ভালো অন্যের সহ্য হবে কেন। গ্যালারির লোক এসে বললো, এবারে কেটে পড়ূন, আমরা বন্ধ করবো। চাপা স্বরে বাছা বাছা খিস্তি দিতে দিতে বেরিয়ে এলাম। অনেক বাজে, আমাকে ফিরতে হবে সোনারপুর, সৌরজিতকে দমদম, কৌস্তভই কেবল কাছেকোলে। তবুও আড্ডা ছাড়তে মন চায় না, একেই মে বি আড্ডাবাজ বলে। অন্তত একটা চা খাওয়া যাক, ওটা তো ডিউ আছে। সেই ১০ টাকার ভাঁড়। চা শেষ করে হাতুর তালুতে আঙুলের চাপে ভাঁড় ভাঙার ছেলেমানুষী। তবুও শেষ হতে হয় একসময় , সময়। ফিক্স হলো, নেক্সট শনি, ঠিক বিকাল ৪ টেয়। এভাবেই শুরু নন্দনে আমাদের ৩ জনের বিখ্যাত আড্ডা। যেই আড্ডায় কখনো সঙ্গী ছিলো কোন ইভেন্ট কাভার করতে আসা রিপোর্টার, যে আমাদের গাঁজা খাইয়েছিল। কখনো সঙ্গী ছিলো দিল্লী থেকে শর্ট ফিল্ম বানাতে কোল্কাতায় আসা এক মুসলিম ছেলে, যার ধারণা মানুষ যখন তখন হোমোসেক্সুয়াল হয়ে যেতে পারে। কখনো বা সঞগী ছিলো আমার বাঁকা হয়ে যাওয়া গিটার বা কৌস্তভের নিয়ে আসা গাঁজা। সময় উপভোগে এতই ব্যস্ত থাকতাম আমরা, টানা প্রায় ৩ মাস আড্ডার পরেও আমাদের কোন গ্রুপ সেলফি নেই। দরকার হবে মনেই আসে নি। হয়তো ভেবেছিলাম, এভাবেই যাবে দিনগুলো। ট্র্যাজেডি উইল নেভার কাম। কিন্তু তখন কি জানতাম, ট্র্যাজেডিই যে ভবিতব্য। সে অন্য দিনের জন্যে তোলা থাক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন