মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১৬

বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মৃতি রোমন্থন

১)
অক্টোবর ১৯৯৯ থেকে মার্চ ২০০৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ টানা ৭৫টা আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয় দেখে নি, ৭১ টা হার, দুটো ড্র, দুটো বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত।
২০০০ সালের জুন এ বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার মুহূর্তে, বাংলাদেশের কোন ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট ছিল না। স্কুল ক্রিকেট হত ৩৫ ওভার নক আউট, ক্লাব ক্রিকেটে ছিল শুধুই ওয়ান ডে। আন্তঃ জেলা টুর্নামেন্টের শেষ ধাপ, যেখানে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়নরা মুখোমুখি হয়, ৩ দিনের ম্যাচ হত। কিন্তু ফাইনাল ছাড়া আর কোন ম্যাচ আদৌ ৩ দিনে গড়াতো কিনা সন্দেহ। অর্থাৎ বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ ডিউরেবিলিটি ছিল ৩ দিন। ফলে নভেম্বরে প্রথম টেস্টে কি হলো, তা আমিনুল ইসলাম বুলবুল এর ভাষ্যে জেনে নেয়া যাক, ”চতুর্থ দিন আসতে আসতে আমরা ভুলেই গেলাম, যে আমাদের আরো ১৮০ ওভার বাকি আছে। আমাদের ড্রেসিং রুমের অবস্থা পুরো মেছোহাটের মত, মন্ত্রী আসছেন, বিসিবি প্রেসিডেন্ট, অতিথিরা আসছেন, সাবেক কোচরা আসছেন। অভিজ্ঞতার অভাব শুধু খেলোয়াড়দের না, সবার মধ্যে। ইংল্যান্ড এ, হায়দ্রাবাদ ব্লুজ এরকম দলের সাথে ৩ দিনের ম্যাচ খেলা টুকটাক অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল, কিন্তু আমাদের কোন ধারণাই ছিল না, ৫ দিনের ম্যাচ আসলে কি। আমরা টেস্ট খেললাম ৩ দিনের ম্যাচের মত। প্রথম তিন দিন আমরা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় তাও ছিলাম, চতুর্থ দিন থেকে আমরা পুরো অবিন্যস্ত, হারতামই”।

ক্রিকেট বোর্ড চলত তুঘলকি কায়দায়। এই আজকে প্রচুর খরচ করে এস্ট্রো টার্ফ বসানো হচ্ছে, দু’বছর পরের টুর্নামেন্টের জন্যে, এই আচমকা সবার প্রিয় কোচ গ্রিনিজকে বরখাস্ত করা হচ্ছে, কারণ খেলোয়াড়দের অভাব অভিযোগ ,সুযোগ সুবিধা নিয়ে তিনি বেশী মাথা ঘামান। ৯৯ সালের বিশ্বকাপ’এর এক বছর আগে ইংল্যান্ডে কন্ডিশনিং এ জাতীয় দলকে পাঠাতে প্রায় এক কোটি টাকা (১২৭০০০ ইউএস ডলার প্রায়) খরচ করা হলো, কিন্তু ৯০ দশকের গোড়ায় বাৎসরিক ৩০০০ ডলার বেতনে ডেভ হোয়াটমোর সেধে এসেছিলেন, কোচ করা হয় নি। বুলবুল এর ভাষ্যে, না তারা হোয়াটমোর সম্পর্কে জানতো, না আদৌ জানার কোন চেষ্টা তাদের মধ্যে ছিল। ১৯৯৯ থেকে টানা ৪৭ ওয়ানডে ম্যাচে ৩৯ জন নতুন মুখ আনা হয়েছিলো, (যা একটি বিশ্বরেকর্ড)।
২০১৪ সালে একের পর এক শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ হার, ৩৫ ম্যাচে ২২ টা। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ শুধু নেপাল , জিম্বাবুই আর আফগানিস্তানের সাথে ম্যাচ জিতেছিলো, আফগানদের সাথে একটা ম্যাচ হেরেছিলোও। পরের ম্যাচ র‍্যাঙ্ক টার্নার পিচ বানিয়ে জেতে।

কেন?

২)
বর্তমান “বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড” এর প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭২ সালে “বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড” নামে। একটা টেবিল সহ এক রুম এবং লাগোয়া ছোট্ট রান্নাঘর নিয়ে ছিল অফিস। রান্নাঘরে ছিল একটা সাইক্লোস্টাইল ছাপার মেশিন আর একটা কেরোসিন স্টোভ। অফিসের পিওন ওখানে নিজের সাইকেল এবং আনুসঙ্গিকও রাখতো, এই অফিসটাই তার থাকার যায়গা ছিল। অফিস কর্মকর্তারা স্টোভে চা ফুটিয়ে নিতো, পিওন রাঁধতো ভাত। মাঝে মাঝেই ক্লাব কর্তারা আসতো বোর্ড অফিসে, এসে পিওনকে পাঠাত পাশের ফুটবল ফেডারেশন অফিসে পরিচিত কেউ আছে কিনা দেখতে। চেনা লোক থাকলে টুক করে তারা ফেডারেশন অফিসে গিয়ে গল্প জুড়ে দিত, কারণ তাহলে কিঞ্চিত চা-নাস্তা মিলবে। ক্রিকেট বোর্ডের সামর্থও ছিলো না, সামান্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা করে
বোর্ডের বর্তমান ডিরেক্টর আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি’র স্মৃতিচারণে ফুটে ওঠে সেই সময়ের কথা। তখন ১৯৭৬-৭৭ মরশুম। আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে ক্রিকেটারদের প্র্যাকটিস সেশনের সময় সামান্য কোন খাবারও তাদের দেয়া যেত না। টাকা ছিলো না বোর্ডের। ববি রেডক্রসের অফিসে গিয়ে রিলিফের জন্যে আসা আহাই–প্রোটিন বিস্কুট চেয়ে নিয়ে আসতেন, প্লেয়ারদের খাওয়াতে। কিন্তু রিলিফ বিস্কুট দিয়ে তো ক্রিকেট হয় না, ক্রিকেট একটা স্পোর্টস, যেখানে সরঞ্জাম, মাঠ, আম্পায়ার ইত্যাদির জন্যে টাকা চাই। ক্লাবগুলো যদি জাতীয় দলের সাহায্যার্থে না এগিয়ে আসতো সেসময়, আজ হয়তো এতদূর ক্রিকেট গড়াতোই না। ববি বলেন, ”আইসিসি স্ট্যাটাস, টেস্ট পারফরমেন্স দূরে থাক, একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পেলেই আমরা খুশি থাকতাম”
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। চার বছর পরে, অস্ট্রেলেশিয়া কাপে বাংলাদেশের সপ্তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, অস্ট্রেলিয়ার সাথে। অজি অফ-স্পিনার পিটার টাইলর বাংলাদেশের তৎকালীন সেরা ব্যাটসম্যান আকরাম খানকে আগে কখনো ব্যাটিং করতে দেখেন নি। তিনি একটা বল করলেন আকরামের বিরুদ্ধে, সাথে সাথেই লেগ সাইডে একজন এক্স্ট্রা ফিল্ডার দাঁড় করিয়ে দিলেন। বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা অবাক, এটা কি হলো? কেমন হলো? কেম্নে কি? একটু পরেই তাঁরা সবাই বুঝে গেলেন, আকরামের বটম-হ্যান্ড ব্যাট গ্রিপিং টাইলর বুঝে গেছেন। গ্রিপ দেখেই বুঝেছেন, আকরাম লেগ সাইডে বেশী খেলেন। আকরাম ওই ম্যাচে করেছিলেন ৪৪ বলে ১৩, বাংলাদেশ ধুঁকতে ধুঁকতে ৫০ ওভারে ১৩৪। এমন কিছু এর আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট ঠিকঠাক জানতোই না।

নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ মানেই যে মুহূর্তে সব এক্সপোজড, এই অতি সাধারণ বোধটা এর পরেও পুরোপুরি আসার সুযোগ ছিলো না, কারন একটাই। বাংলাদেশ ক্রিকেটে বোর্ডের চাইতে ক্লাবের দৌরাত্ম বেশী থাকা। তখন অবশ্য ক্লাবের বদান্যতায় জাতীয় দল চলত, পয়সা দিই ব্যাডা, স্বাভাবিক। আর কবে কোনকালে বছরে ১/২ ম্যাচ, কি আসে যায়? কিন্তু হচ্ছিলো টা কি আসলে? “যে কোন মূল্যে ম্যাচ জিততে হবে” ক্লাবগুলোর এটাই ছিলো মূলমন্ত্র। আর বংলাদেশের এভারেজ পিচে কে ম্যাচ জেতাতে পারে? কে আবার? অফব্রেক ফিঙ্গার স্পিনার। জোরের উপরে বলটা ছেড়ে দাও, আনইভেন বাউন্স আর মিনিমাম স্পিনেই হয়ে যাবে। ফাস্ট বোলারদের অস্তিত্বই ছিলো না বলতে গেলে, দুই চারজন যাও বা লিগ পেত , ম্যাচ পেত না। না, আপনাদের অনেকেরই ভুল ধারণা, যে বাংলাদেশ বরাবর বাঁহাতি স্পিনের খনি। ২০০০ এর গোড়ায় রফিকের উত্থানের পরেই শুধু বাঁহাতি স্পিন ওভারহাইপড হয়, তার আগে ঐ জোরের উপরে ডানহাতি স্পিনই হতো। ট্রাজেক্টরি চেঞ্জ করতে হাত বাঁকানো সোজা করা আকছার চলতো। তো এদিকে আন্তর্জাতিক খেলতে এসে বাংলাদেশ দল পেল শুধু আনরিলায়েবল একদল বোলার, আনরিয়ালেবল একদল ব্যাটসম্যান, এবং মোহাম্মদ আশরাফুল, যিনি কুম্ভকর্নের মত বছরে দু বার ঘুম থেকে জেগে ভালো ইনিংস খেলেন।

২০০৭ এর গোড়ায় কিছু ন্যাচারাল তরুণ ক্রিকেটার প্রায় স্থায়ী হলো বাংলাদেশ দলে; তামিম, সাকিব, মুশফিক, আফতাব, নাফিস, নাজিমুদ্দিন, কাপালি । ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত , সাউথ আফ্রিকাকে হারালো এই টিম। তারপরের বছরই প্রতিবেশী দেশের ধাক্কা, ICL (ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ)। বোর্ডবিদ্রোহী লিগ খেলতে গেলো; আফতাব, যার কথা তামিম বলেন বাংলাদেশ দলের সবথেকে বড় ক্ষতি; অলক কাপালি, ২০০৮ এশিয়া কাপ এ ভারপ্তের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি ছিলো; শাহরিয়ার নাফিস, অস্ট্রেলিয়ার সাথে টেস্ট সেঞ্চুরি ছিলো। বাংলাদেশ ১৫ জনের স্কোয়াডে ফার্স্ট চয়েস এমন ৬ জন প্লেয়ার নাম লেখালেন আইসিএল এ। ফলাফল তামিমের মুখে, “একটা গ্রুপ হয়ে আমরা ২০০৭-৮ এ অনেকগুলো ম্যাচ খেলে ফেলেছিলাম। সবার অভিজ্ঞতা বাড়ছিল। সবাই জয়ের স্বাদ পাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় আমাদের বাধ্য হতে হলো একদম নতুন একটা দল তৈরী করতে, তাদেরকে আরো ২/৩/৪ বছর সময় দিতে। আইসিএল এ খেলতে যাওয়া প্রতিটা সক্রিয় খেলোয়াড়কে প্রাথমিকভাবে ১০ বছরের জন্যে বাংলাদেশ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো।

৩)
এরপরে জিমি সিডন্সকে বাংলাদেশ দল তৈরীটা একদম স্ক্র্যাচ থেকে শুরু করতে হয়েছিলো। সেই বিল্ড আপ প্রোসেস চলতে চলতে কখনো তামিম, কখনো সাকিব, কখনো মাশরাফির ইন্ডিভিজুয়াল পারফরমেন্স। সিডন্সের পরে স্টুয়ার্ট ল আর ইউর্গেনসেন এর সাথে ২০১১, ২০১৩ নিউজিল্যান্ড সিরিজ জয়, মাহমুদুল্লাহ, নাসিরদের মত পারফরমারদের আগমন, সামনে নিজের দেশে ওয়ার্ল্ড টি২০, এশিয়া কাপ সব মিলে ২০১৪ তো সাফল্যের চুড়ায় ওঠারই কথা ছিলো। কিন্তু ২০১৪ তে বাংলাদেশ দলের পিঠ একেবারেই ঠেকে গেলো দেয়ালে, কিছুতেই ম্যাচ জেতাটা আর হয়ে উঠছিলো না। সেই সাথে ২০১৪ সালে বড় ৩ বোর্ড ক্রিকেট বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেললো। বাংলাদেশের ভয় , তারাই সবার আগে হয়তো দ্বিতীয় সারিতে নেমে যাবে, এতদিনের সব পরিশ্রম বৃথা।
কোথায় ফলদায়ক বছর হওয়ার কথা, উল্টো একগাদা ক্লোজ ম্যাচ হেরে গেলো – ২ রান, ১৩ রান আর দুইবার ৩ উইকেটে শ্রীলংকার সাথে, পাকিস্তানের সাথে ৩ উইকেটে, হংকং এর সাথে ২ উইকেটে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ৩ উইকেটে। ভারতের সাথে ২৭৯ করে হেরেছে, পাকিস্তানের সাথে ৩২৬ করেও। ৬৭ রানে শ্রীলঙ্কার ৮ উইকেট ফেলে দিয়ে, হেরেছে। ভারতকে ১০৫ অলআউট করেও হার, পরের ম্যাচে ভারতকে ১১৯/৯ এ দাঁড় করানোর পরে ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যায়। তামিম বলেন, “জয়ের অভ্যাসই যদি না থাকে, কি করে জিততে হয় তা আপনার ধারনাতেও থাকবে না। একটা সময় ছিলো, আমরা জানতামই না ,আসলে ম্যাচ জেতার জন্যে কি করতে হয়”।

২০১৫ এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এই যে জয়ের অভ্যাস, জয়ের ধারা চলছে, এমনি আসেনি। আসলে একটা সময় আসতেই হতো, হয়তো এক বছর আগেই আসতো ২০১৪ সালে, কিন্তু এমনটা হতোই। হয়তো ঘরের মাঠে, তাও জয়টা অভ্যাস করাটাই তো আগে কখনো হয়ে ওঠেনি। এখন খুব সতর্কতার সময়, ক্রিকেটিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দলের জন্যে, সমর্থকদের জন্যে। এই দুই বছরে বাংলাদেশ দল দেখিয়েছে, দেশের মাটিতে তারা যে কোন ম্যাচ জিততে পারে। অন্তত ওয়ান্ডে ম্যাচ এ তারা আশা করে যে কোনখানে য্বে কাউকে হারাতে পারবে। ক্রিকেটাররা নিজেদের অল্পবয়সী খামখেয়ালিপনা ছেড়েও বেরিয়ে এসেছেন। তাঁরা ঘরের মাঠে এবং দেশের বাইরে পেশাদারিত্বের সাথেই ক্রিকেটে আরও জয় আনবেন, অন্তত জেতার চেষ্টা করবেন, এটা সমর্থক সহ সকলের কাম্য। সমর্থকের মধ্যে সহিষ্ণুতা চাই, জিতছে মানেই অতীত ভুলে যাওয়া নয়, জিতছে মানেই প্রতিপক্ষ দেশ নোংরামির লক্ষবস্তু নয়, এটুকু পরিপক্কতা বাংলাদেশের আবেগী একনিষ্ঠ সমর্থকদের থেকে আশা করাই যায়। বাংলাদেশ দল এরপরে শুধু জিতবেই না, আরো অনেক ম্যাচ হারবেও, এটা ভুলে যাওয়া কারোই উচিৎ হবে না।

http://www.thecricketmonthly.com/…/1046331/we-are-bangladesh এই আর্টিকেল থেকে সংক্ষেপিত

সোমবার, ৩০ মে, ২০১৬

ইসলামের উত্থানে রোমান ক্যাথলিকদের ভুমিকা - একটি কপটিক গল্প

এক বিষয় নিয়ে তথ্য খুঁজতে গিয়ে আকষ্মিকভাবে মাঝেমধ্যে অদ্ভুত  অদ্ভুত এক একটা বিষয় নজরে আসে।  তেমনি, সেদিন নজরে এলো, একটা Web Text Repository. কপ্টিক খ্রিস্টানদের সাথে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের বা আরেকটু বিস্তারিতভাবে দেখলে, ক্যাথলিকদের সাথে প্রোটেস্টেন্টদের বিরোধ নিয়ে মূলত: এই ওয়েব লাইব্রেরি। কপ্টিক অর্থোডক্স খ্রিস্টানরা নিজেদেরকে প্রকৃত খ্রিস্টান ভাবে, রোমান ক্যাথলিকরা ওদের দৃষ্টিতে ভন্ড স্বার্থান্বেষী। কপ্টিক ক্রিশ্চিয়ান সম্পর্কে একটু ছোট্ট ইন্ট্রো দেই, কনস্ট্যানটাইন ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ানিজম আমদানি করার আগের ৩০০ বছরে, রোমান এবং ইহুদীদের তাড়া খেয়ে প্রারম্ভিক যুগের খ্রিস্টানরা উত্তর আফ্রিকা এবং আরব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ওদের বক্তব্যমতে Mark the Evangelist এই কপটিকদের নিয়ে বেরিয়ে আসে এবং আরব ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে দেয় খ্রিস্টের গসপেল (ক্যাথলিক গসপেল এর সাথে বেশ কিছু অমিল আছে, কপটিকদের ভাষায়, রোমানরা নিজেদের সুবিধামত চেঞ্জ করে নিয়েছে)। 

নিচে আমি লিঙ্ক দিয়ে দিচ্ছি, স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজীতে সবকিছু। যাঁরা ইংরেজী দেখলেই সাপ দেখার মত আঁতকে ওঠেন, তাঁদের জন্যে সংক্ষেপিত একটা অনুবাদ দিচ্ছি, মূল বক্তব্য বুঝতে পারবেন। কিন্তু পুরোপুরি রস আস্বাদন করতে হলে, আপনাকে মূল লেখাটা পড়তে হবে। এদের বক্তব্য অনুসারে মূল লেখাটা Alberto Rivera নামে একজন সাবেক Jesuit প্রিস্টের, যিনি পরবর্তিতে প্রোটেস্টেন্ট মতে কনভার্টেড হন। The Prophet নামে একটি বই প্রকাশ করেন  তিনি, যেখানে তাঁর ভাষ্যমতে ভ্যাটিকান এ লুকিয়ে রাখা ক্যাথলিকদের বিভিন্ন অপকর্ম প্রকাশ করেছেন। এই বইটা প্রকাশের পর থেকেই তাঁর উপরে বহুবার হত্যাপ্রচেষ্টা চালানো হয় এবং অবশেষে খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁর মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়। 

ভূমিকা শেষ। এবারে মূল গল্প (তীব্র ধর্মান্ধতাপূর্ণ লেখা, এটা পড়তে গিয়ে মাথায় রাখতে হবে, লেখক একজন খ্রিস্টান প্রিস্ট, তাঁ্র কাছে পুরো ব্যাপারটাই ঐশ্বরিক এবং শয়তানী শক্তির দ্বন্দ্ব। ঈশ্বরবিরোধী কোনকিছু এখানে নেই। এবং এটা একটা Alternate History, বেশ কিছু ভ্রান্তি আছে ইতিহাস নিয়ে।  সত্যতা বা রেফারেন্স আমার কাছে জানতে না চেয়ে নিচের মূল সোর্স দেখাটাই কাম্য। নিচে মূল আর্টিকেল এর লিঙ্ক আছে, সাথে The Vision at Fatima নামে একটা ধর্মীয় ঘটনার উইকি লিঙ্ক, ঘটনাটা অন্য সোর্স থেকেও নিশ্চিত হতে পারবেন):

"প্রারম্ভিক যুগের খ্রিস্টানরা  গসপেল'এর মতাদর্শ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিলো চতুর্দিকে এবং ছোট ছোট চার্চ স্থাপন ও বাণী প্রচারের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছিলো। কিন্তু শুধু এটুকু করতে গিয়েও তারা ইহুদী এবং শক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যের তীব্র বিরোধিতা, অত্যাচার ও বিতাড়ণের শিকার হয়। কিন্তু ইহুদীরা রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে এবং ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল টাইটাস এর নেতৃত্বে রোমান সেনাবাহিনী জেরুজালেম এ প্রবেশ করে সলোমনের মন্দির, ইহুদীদের সবথেকে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থনাস্থল সম্পূর্ণ  ধ্বংস করে দেয়, জীবিত ইহুদীরা ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন দিকে। 

হাওয়া চিরকাল একদিকে বয় না। দুর্নীতি, লালসা, বিকৃতি, নৃশংসতা এবং বিদ্রোহ রোমান সাম্রাজ্যের ভিত কুরে কুরে খেয়ে ফেলছিলো, একদিন ভেঙেচুরে পড়তোই। খ্রিস্টানদের উপরে নির্যাতন চালানোটা, আসলে কোন কাজেই আসেনি। প্রারম্ভিক খ্রিস্টানেরা গসপেল বিশ্বাসকে বজায় রাখতে রোমান তলোয়ারের নিচে মাথা ঝুঁকিয়ে দিতে, জীবন বিসর্জন দিতেও পিছপা হয় নি। শুধু শয়তানের পক্ষেই সম্ভব ছিলো ঈশ্বরের দেখানো পথ বানচাল করে, সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এক খ্রিস্টান ধর্ম সৃষ্টি করা। 

আর এর জন্যে শয়তানের হাতে একমাত্র সমাধান ছিলো রোম। এই সেই রোম, যাদের ধর্মের উদ্ভব হয়েছিলো অভিশপ্ত ব্যাবিলন থেকে, শুধু নবরূপ দেয়াটুকুর প্রয়োজন ছিলো। তবে রাতারাতি কিছুই হয় নি, প্রারম্ভিক "Church Father"দের লেখনীর মাধ্যমে শুধু আরম্ভ হয়েছিলো। তাদের লেখনীর মাধ্যমেই ধীরে ধীরে এই নতুন ধর্ম রূপ লাভ করতে থাকে, রোম শহরের জুপিটারের মূর্তি হয়ে যায় সেইন্ট পিটার, ভেনাসের মূর্তি হয়ে দাঁড়ায় ভার্জিন মেরি। নিজেদের সদরদপ্তরের জন্যে তারা বেছে নেয় "Vaticanus" নামে এক পাহাড়চূড়া, যেখানে আগে ছিলো দানবীয় দেবতা Janus'এর (আরম্ভ, সময়, সিদ্ধান্ত, দরজা এবং যাত্রাপথের রোমান দেবতা) মন্দির।

সমধর্মী প্রধাণ তিনটে ধর্মের একটা ব্যাপারে খুব মিল আছে। ক্যাথলিকেরা তাদের সমস্ত আশা প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে পবিত্র ভ্যাটিকান শহরের দিকে, ইহুদিদের কাছে আশা ভরসার স্থল জেরুজালেমের বিলাপরত দেয়াল এবং মুসলিমদের কাছে, কাবাঘর। এদের প্রত্যেকেই বিশ্বাস করে, একবার তারা তাদের সব থেকে পবিত্র স্থান ভ্রমণ করে প্রার্থণা করলেই, সারাজীবনের জন্যে ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হবে। কালে কালে জেরুজালেম শহর ক্যাথলিকদের হাতছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু অমূল্য ধর্মীয়, ঐতিহাসিক এবং স্ট্যাটেজিক অবস্থানের জন্যে জেরুজালেমকে দখলে রাখা খুব জরুরী হয়ে পড়েছিলো ক্যাথলিকদের জন্যে। তাদের নিজেদের তো লোকবল এত ছিলো না, তাই তাদের নজর পড়েছিলো, ইসমাইলের বংশধর, বেচারা আরবদের দিকে।

গোড়ার দিকে,  বিভিন্ন আরব গোত্র এই "ঈশ্বরের গৃহে" অর্ঘ এবং উপহারসামগ্রী নিয়ে আসতো, কাবা'র তত্বাবধায়কেরা আগমনকারী সবাইকেই সমান সদয় দৃষ্টিতে দেখতো। এমনকি অনেকে নিজেদের গোত্রের দেবমূর্তি নিয়ে এলেও তাদের মনে যেন আঘাত না লাগে, তাই মূর্তিগুলোকে এই পবিত্র স্থানে রেখে দেয়া হতো। বলা হয়ে থাকে, পার্শ্ববর্তি ইহুদিরা কাবা'কে প্রত্যন্ত মন্দির ভেবে ভক্তি শ্রদ্ধা করতো, কিন্তু মূর্তি স্থাপনের ফলে দুষিত হয়ে যাওয়ায় তারা এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। জমজম কূপ নিয়ে গোত্রদ্বন্দের কারণে একসময় কাবা থেকে সমস্ত উপঢৌকন এবং মূর্তি নিয়ে এসে জমজমে ফেলে বালি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়, জমজমের অবস্থান লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। বহু বছর পরে, আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখে জমজম কূপ খুঁজে বের করে। সে মক্কার সবথেকে মান্যগণ্য ব্যক্তি হয়ে যায়, এবং মোহাম্মদের পিতামহ হওয়াটাও তার ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ায়।

এর বেশি কিছুদিন আগে, অগাস্টিন যখন উত্তর আফ্রিকার বিশপ হলো , তার স্বপ্ন ছিলো গোটা আরবে রোমান ক্যাথলিসিজম ছড়িয়ে দেয়া। তার অনুসারীরা শুধু ব্যাক্তি বিশেষ নয়, কিছু ক্ষেত্রে গোটা গোত্রকেও কনভার্ট করতে সক্ষম হয়েছিলো। এই কনভার্টেড আরব ক্যাথলিকদের মধ্যেই আস্তে আস্তে একজন আরব নবীর ভাবনা ডালপালা মেলতে শুরু করে।

শৈশবেই পিতা, মাতা এবং পিতামহকে হারানো মোহাম্মদ, চাচার ঘরে বেড়ে উঠছিলো। একবার ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার সময় মোহাম্মদকে সাথে নিয়ে যায়, আবু তালিব। সেখানে তাদের সাথে দেখা হয় এক ক্যাথলিক সন্ন্যাসীর। মোহাম্মদের পরিচয় জানার পরে সে তালিবকে বলে,

"যত দ্রুত সম্ভব তোমার এই ভাতিজাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাও, আর ওকে ভালোভাবে পাহারা দিয়ে রাখো। কারণ আমি এর সম্পর্কে যা জানি, তা যদি ইহুদীরা জানতে জানতে পারে,  তাহলে ওর বিভিন্ন রকম ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। এই ছেলে ভবিষ্যতে বিশাল বড় কিছু হতে চলেছে"

মোহাম্মদের অনুসারীদের হাতে ভবিষ্যত ইহুদী নিধনযজ্ঞের বীজ, মূলত: এই রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসীর মাধ্যমেই প্রেত্থিত হয়।

জেরুজালেম শহরের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক এবং স্ট্রাটেজিক গুরুত্বের কারণে ক্যাথলিকেরা এই শহরটিকে করায়ত্ব করার ওতপ্রোত চেষ্টা করছিলো, বাধা হয়ে ছিলো ইহুদীরা। ওদের আরেকটা জ্বলজ্যান্ত সমস্যা ছিলো উত্তর আফ্রিকার গসপেল অনুসারী সত্যিকারের খ্রিস্টানরা। শক্তি এবং ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিপক্ষের প্রতি অসহিষ্ণুতাও উত্তরোত্তর বেড়ে চলছিলো। রোমান ক্যাথলিকদের জন্যে জরুরী হয়ে পড়েছিলো এমন একটা অস্ত্র, যা দিয়ে একইসাথে ইহুদি এবং ক্যাথলিসিজম অস্বীকারকারী সত্যিকারের খ্রিস্টানদের নির্মূল করা যায়। আরব থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত তাকিয়ে, তাদের নজরে এসেছিলো, বিশাল আরব সম্প্রদায়, যাদের ব্যবহার করে নিজেদের নোংরা কার্য্য সমাধা করা সম্ভব। রোমান নেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে কিছু আরব ক্যাথলিককে সরাসরি নিয়োগ করা হয়েছিলো, যাদের কাজ ছিলো এলাকাভিত্তিক তথ্য ভ্যাটিকানে সরবরাহ করা। বাকিদের দিয়ে গড়ে তোলা হয় আন্ডারগ্রাউন্ড স্পাই নেটওয়ার্ক, যারা ঐ ক্যাথলিসিজম প্রত্যাখ্যানকারী বিশাল আরব সম্প্রদায়কে নিয়ন্ত্রণ করার রোমান মাস্টারপ্ল্যানকে সুচতুরভাবে এগিয়ে নিয়ে চলছিলো। 

অগাস্টিন যখন দৃশ্যপটে এলো, অনেকদূর এগিয়ে গেছে কার্যক্রম। তার নেতৃত্বে ক্যাথলিক মঠগুলোর কাজ ছিলো, মূল খ্রিস্টানদের থেকে আসল বাইবেলের কপি খুঁজে বের করে বিনষ্ট করে ফেলা। ভ্যাটিকান চাইছিলো, আরবদের মধ্য থেকে একজন মসীহা তৈরী করতে, এমন একজন যাকে বড় মাপের নেতা হিসেবে সামনে রাখা যায়, অসামান্য প্রতিভাধর একজন মানুষ যাকে তারা প্রশিক্ষিন দিতে পারে, এবং একসময় সকল নন-ক্যাথলিক আরব জনতাকে তার অনুসারী বানিয়ে গড়ে তোলা যেতে পারে এক বিশাল সেনাবাহিনী, যার মাধ্যমে জেরুজালেমকে হাতের মুঠোয় নেয়া যাবে।

ভ্যাটিকান কার্ডিনাল Augustine Bea জেসুইট দের ব্রিফিং দেয়ার সময়  বলেছিলো:

পোপের বিশ্বস্ত অনুসারী এক ধন্যাঢ্য আরব মহিলা ছিলো এই নাটকের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকায়। তার নাম ছিলো খাদিজা, একজন বিধবা। নিজের সমস্ত সম্পত্তি চার্চে দান করে, কনভেন্টে সন্ন্যাসীর জীবন কাটাচ্ছিলো, কিন্তু তাকে একটা এসাইনমেন্ট দেয়া হলো, সেই মুহাম্মদ এখন এক প্রত্যয়দীপ্ত মেধাবী যুবক, তাকে করায়ত্ব করতে হবে। ভ্যাটিকানের আরেক বিশ্বস্ত অনুসারী, খাদিজার চাচাতো ভাই ওয়ারাক্বাহকে নিযুক্ত করা হলো মুহাম্মদের পরামর্শদাতা হিসেবে এবং সেই সাথে নিযুক্ত করা হলো আরো কিছু প্রশিক্ষক, যারা সেইন্ট অগাস্টিনের লেখাগুলো বোঝানোর মাধ্যমে মোহাম্মদকে প্রস্তুত করবে তার নবুওতের জন্যে। ক্যাথলিক আরবদের মাধ্যমে গোটা আরব-উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে রটিয়ে দেয়া হলো, ঈশ্বরের মনোনীত এক মহামহিমান্বিত পুরুষের আগমন ঘটতে যাচ্ছে। মোহাম্মদকে বোঝানো হলো, রোমান ক্যাথলিকরাই আসল ঈশ্বরবিশ্বাসী খ্রিস্টান, ইহুদীরা শয়তান, আর বাকি খ্রিস্টানরা ভ্রান্ত পথের পথিক, যাদের অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।

অবশেষে এক সময় মোহাম্মদ "ওহী" প্রাপ্ত হতে থাকলো  এবং ওহী বিশ্নেষনের কাজে ওয়ারাক্বাহ সাহায্য করতে থাকলো। শুরু হলো কোরান রচনা। পূর্বাত্মন ধর্মবিশ্বাসকে অস্বীকার করায় মক্কায় অত্যাচারের শিকার হতে শুরু করার পরে, মোহাম্মদ তার কিছু অনুসারীকে আবিসিনিয়া পাঠালো, এবং সেখানকার রোমান ক্যাথলিক রাজা নেগি তাদের সাদর অভ্যর্থনা জানালো, কারণ মোহাম্মদের দৃষ্টিভঙ্গীতে বর্ণিত ভার্জিন মেরীর সাথে ক্যাথলিক বিশ্বাসের বেশ মিল ছিলো। 

ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, ইসলামের আবির্ভাবেরও বহূ আগে থেকে আরবের Sabean সম্প্রদায় উপাসনা করতো এক চন্দ্র দেবতার, যার তিন দেবী সন্তান ছিলো, যাদেরকে গোটা আরবে "আল্লাহর কন্যাত্রয়" হিসেবে উপাসনা করা হতো। ১৯৫০ সালে প্যালেস্টাইনের হাজর এ খননকার্য্যের সময় পাওয়া যায় একটি মূর্তি, সিংহাসনে আল্লাহ আসীন, যার বুকের উপরে বাঁকা চাঁদ। মুহাম্মদ ঘোষনা দিলো , আল্লাহর তরফ থেকে ওহী এসেছে, "তুমি আল্লাহর রাসুল"। মুহাম্মদের যখন মৃত্যু হয়, ইসলাম তখন বিষ্ফোরণোন্মুখ।  যাযাবর আরব গোত্রগুলো আল্লাহ এবং তার রাসুল মোহাম্মদের নামে একীভুত হচ্ছিলো। মোহাম্মদের কিছু বক্তব্য কোরান হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে, বাকিগুলো জনসম্মুখে আসে নি, ওগুলো আছে, আয়াতুল্লাহদের হাতে। কার্ডিনাল বি'র ভাষ্যমতে,
"মুহাম্মদের এসমস্ত কথা সুরক্ষিত রাখা, কারণ এগুলোতে ইসলামের সৃষ্টির পিছনে ভ্যাটিকানের কলকাঠি নাড়ার  তথ্য আছে।" 
মুসলিম এবং ক্যাথলিক, উভয়ের হাতেই দুপক্ষের সম্পর্কে এত গোপনীয় তথ্য আছে, যে যদি কখনো প্রকাশ পায়, দুটো ধর্মের জন্যেই তা হবে প্রলয়ঙ্করী

কোরানে জেসাসকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নবী হিসেবে উল্লেখ করা আছে। যদি পোপ দুনিয়াতে সেই জেসাস এর প্রতিনিধি হয়, তাহলে পোপ নিজেও ঈশ্বরের দূত। এই কারণেই মুহাম্মদের অনুসারীরা পোপকে বড় মাপের ঐশী পুরুষ হিসেবে ভয় পেত, শ্রদ্ধা করতো। পোপ আরব জেনারেলদের উত্তর আফ্রিকা আক্রমণের অনুমতি দিলো। শুধু তাইনা, কয়েকটা শর্তে আরবদের অভিযানে অর্থ সংস্থানও করলো। শর্তগুলো হচ্ছে:
১) সকল ইহুদী এবং ভিন্ন মতাবলম্বী  খ্রিস্টানদের খতম করতে হবে
২) অগাস্টিনিয়ান সন্ন্যাসী এবং ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের  সুরক্ষা দিতে হবে
৩) ভ্যাটিকানের তরফ থেকে জেরুজালেম দখল করতে হবে।

সময়ের সাথে সাথে মুসলিমদের সামরিক শক্তি প্রচন্ডরূপ ধারণ করলো। ইহুদী এবং প্রকৃত খ্রিস্টানরা হত্যাকান্ডের শিকার হলো, জেরুজালেম মুসলিমদের হস্তগত হলো। কিনতি এই গোটা সময়টাতে না ক্যাথলিকদের কোন ক্ষয়ক্ষতি হলো, না তাদের কোন মঠ আক্রান্ত হলো। কিন্তু যখন তাদের কাছ থেকে জেরুজালেম বুঝে নিতে চাওয়া হলো, পোপকে হতবাক করে দিয়ে  তারা অস্বীকার করে বসলো। নিজেদের সামরিক শক্তি এবং সাফল্যে মত্ত মুসলিম জেনারেলদের, পোপের কথায় ভয় পাওয়ার কোনই কারণ ছিলো না এবং তাদের নিজেদের পরিকল্পনার বাইরে অন্য কিছু ভাবার ইচ্ছাও ছিলো না। 

ওয়ারাক্বার পরিকল্পনামাফিক মুহাম্মদ লিখেছিলো, ইব্রাহিম তার সন্তান ইসমাইলকে উৎসর্গ করতে যাচ্ছিলো। বাইবেল এ ইসহাকের কথা লেখা থাকলেও, মুহাম্মদ সেটা সরিয়ে  ইসমাইলের নাম ঢুকিয়েছিলো। ইসমাইলকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং মেরাজ এর কাহিনীর কারণে বিশ্বাসী মুসলিমেরা ডম অফ রক নামে একটা মসজিদ তৈরী করেছিলো জেরুজালেমের ঠিক সেই স্থানে, যেখানে ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা ইহুদিদের মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো। এটা মুসলিমদের কাছে দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান। বিদ্রোহ  জন্ম না দিয়ে  কিভাবে সম্ভব জেরুজালেমকে পোপের হাতে তুলে দেয়া?

পোপ যখন শুনতে পেলো, তাকে মুসলিমেরা কাফির বলছে, তখন তার উপলব্ধি হলো, তারা যেই দানবের জন্ম দিয়েছে, সে এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ততদিনে মুসলিম সেনাপতিরা আল্লাহর নামে পৃথিবী দখল করার পাঁয়তারা কষছে এবং তাদের নজর পড়েছে ইউরোপের দিকে। ইসলামী দূত ভ্যাটিকানে এসে পোপের কাছে ইউরোপিয়ান দেশগুলো আক্রমণের অধিকার দাবী করলো। ভ্যাটিকান ক্ষোভে ফেটে পড়লো, অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো যুদ্ধ। মুসলিমরা ইউরোপ আক্রমণ করলো, স্পেন থেকে পর্তুগালের কিছু অংশ পর্যন্ত দখল করে ফেললো। মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমার নামে পর্তুগালের একটা পাহাড়ি এলাকার নামকরণও করলো (অবশ্য ওরা স্বপ্নেও হয়তো ভাবে নি, একদিন এই নাম বিখ্যাত হয়ে যাবে),  আরেকদিকে তুরষ্কের উপরে চলতে লাগলো মুহুর্মুহু আক্রমণ। 

ভ্যাটিকানের কিছু সময় লেগে গেলো, নিজেদের সামরিক শক্তি গুছিয়ে নিতে। কিন্তু অবশেষে ইসমাইলের বংশধরদের থেকে ক্যাথলিক ইউরোপকে রক্ষা এবং পবিত্র জেরুজালেম উদ্ধারের লক্ষে ক্রুসেড শুরু করা হলো। কয়েকশো বছর ধরে, ক্রুসেড চলার পরেও জেরুজালেম তো উদ্ধার হলোই না, উলটো তুরষ্কও মুসলিমদের করায়ত্ব হয়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত, যখন সার্ডিনিয়া এবং কর্সিকা দ্বীপে সেনা জমায়েত করলো, ইটালি আক্রমণের জন্যে, মুসলিম সেনাপতিদের বোধোদয় হলো, তারা তাদের সামরিক শক্তি খুব বেশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ফেলেছে, যুদ্ধ না করে বরং শান্তি আলোচনা করাই উত্তম। মুসলিমদেরকে ক্যাথলিক বিশ্বে তুরষ্ক অধিকৃত রাখতে দেয়া হলো এবং বিনিময়ে ক্যাথলিকরা আরব বিশ্বে লিবিয়া অধিকৃত রাখলো। চুক্তিতে এটাও ছিলো, মুসলিমেরা যেকোন ক্যাথলিক দেশে মসজিদ তৈরী করতে পারবে, যতক্ষন পর্যন্ত ক্যাথলিকদেরকে মুসলিম দেশে ধর্ম প্রচার করতে দেয়া হবে।। 

এভবেই আস্তে আস্তে বাইবেলের প্রকৃত সত্য থেকে পৃথিবীবাসীকে বিমুখ করে ফেলা হলো। মানুষকে বিভ্রান্ত রাখার এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্যাথলিক প্রচেষ্টা এখানেই শেষ নয়। ১৯১০ সালের দিকে  পর্তুগাল সোশালিজমের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলো, লালা পতাকা উড়ছিলো, ক্যাথলিক চার্চগুলো বন্ধের উপক্রম হচ্ছিলো। ১৯১৭ সালে সেই ফাতিমা গ্রামে "The Vision at Fatimah" নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ করা হয়, ভার্জিন মেরি এসে দেখা দিলো , তিনটে ভবিষ্যতবাণী করলো। এতটাই সফল মঞ্চায়ন ছিলো এই বিশ্বাসের নাটকের, পর্তুগাল থেকে সোশালিজম চিরতরে বিদায় নেয়, ক্যাথলিক চার্চ ফের পূর্বাবস্থা ফিরে পায়। এই ভবিষ্যতবাণীর রেশ ধরেই পরবর্তিতে পোপ Pius XII, নাৎসিদের দিয়ে ইহুদী নিধনযজ্ঞ চালায়, রাশিয়া এবং তার অর্থোডক্স চার্চ ধ্বংস করতে রাশিয়া আক্রমণ করায়। শয়তান এভাবেই ১৭০০ বছর ধরে ক্যাথলিকদের মাধ্যমে পৃথিবীবাসীকে ভ্রান্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে"

মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০১৬

স্বগতোক্তি

ভাবনা ভাবিতে মোর লাগে বড় শঙ্কা
এত ভেবে হবে কিবা, কোন লবডঙ্কা
চিন্তা মুক্ত নই, মুক্তির চিন্তা
মুক্ত চিন্তা মোর, তা ধিন ধিন তা
চারপাশে যত দেখি, footage'এর রাজ্য
Footage আমারও চাই, জ্ঞান পরিত্যাজ্য
মুখস্থ বিদ্যায়, কিবোর্ড ও মাউসে
একই কথা ঘুরে ফিরে, একঘেয়ে হাউশে
ধর্মকে তুলোধুনা, মারি চার ছক্কা
এই এলো চাপাতি, এই হলো অক্কা
উদার গ্রহণ মনে, চায় কোন জন
জয় গুরু Rigidity, কষে বাঁধি মন
সকলে সমান, আরে, বলছো এ কি গো?
আমি ম্যাঁও, হুলো ক্যাট, মোর আছে ego
"আমি" তো অনেক হলো, মোর কথা কই
এত কেন ভাগাভাগি, ভাগের পরেও ভাগ?
আমরা আমরাই তো, তবু কেন এত রাগ?
কাঁদি, হাসি, ভালোবাসি, রোজ অনলাইনে
কবে  কে বা ঠুকে দেবে, ৫৭ আইনে
ভারি লেখা, মোটা বই, হয়নাকো পড়া
বসে বসে তাই লিখি, কাপলেট এ ছড়া

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

যৌন মনস্তত্ব - ১

বিবেক বলে আসলে কিছু হয় না, ভাগ্য টাইপ ধ্যানধারণা। আসল কারণ Psychosexuality (হায় রে মাতৃভাষা মোর, এসব শব্দের একটা সহজ বাংলা নেই, "অবচেতন যৌন মনস্তত্ব" এর চাইতে সাইকোসেক্সুয়ালিটি সহজবোধ্য)। ধরা যাক একটা ছেলেকে ছোটবেলায় তার Biological পরিবার থেকে আলাদা করা হলো। সে আর কোনদিনও জানতে পারলো না , নিজের বায়োলজিকাল ফ্যামিলি মেম্বারদের ব্যাপারে। ধরা যাক তার একটা বোন আছে , কিন্তু সে জানে না, এটা তার বোন। এবারে ছেলেটা সেই মেয়েটার প্রতি Sexual Atraction ফিল করতে পারে, সেক্স হতে পারে।  আমাদের সমাজের Social Construct (Construct অর্থ সাইকোসেক্সুয়ালিটিকে প্রভাবিত এবং বাধাগ্রস্ত করে এমন কিছু) আসলে এধরণের সম্পর্কগুলোকে জেনেশুনে তৈরী না হওয়ার পিছে মূল ভুমিকায়। সামাজিকভাবে ধারাটা এমন, তাই, জেনারেশনের পরে জেনারেশন এটাই ফলো করে আসছে।

কিন্তু সাইকোসেক্সুয়ালিটি এত সহজে ডিফাইন করে ফেলা যায় না। অনেক রকমের কন্ট্রাস্ট। তাই তো বর্তমান সমাজেও মা-ছেলে বাবা-মেয়ে ভাই-বোন, তথাকথিত অজাচার দেখা যায়, উল্লেখ্যোগ্যরকম কম হলেও। এখানে বিবেকের ভুমিকা খুব কম। সাইকোসেক্সুয়ালিটিকে যদি সোশাল কন্সট্রাক্ট ব্যহত না করতো। তাহলে হয়তো অজাচার নামক টার্মটা থাকতো না। একটা সময় তুলনামূলক সভ্য সমাজেও সেক্সুয়ালিটি এত গোপন গহীন কোটরে রাখার ব্যাপার ছিলো না। তাই প্রাচীন স্ক্রিপচারে আমরা বিভিন্ন রকম সেক্সুয়াল রিলেশনশিপ পাই, যেগুলো সেই সময় অজাচার বা ব্যাভিচাররূপে গন্য ছিলো না। Freud নামক লোকটিকে অপছন্দ করার আমার অনেক কারণ আছে। Freudian তত্বানুসারে সাইকোসেক্সুয়ালিটি জগৎময়, কৃষ্ণের মত। ভদ্রলোক মায়ের দুধ খাওয়ার সময়কালীন বাচ্চাদের মায়ের স্তনের প্রতি এডিকশনকে সাইকোসেক্সুয়ালিটির প্রারম্ভিকতা বলেছেন। এবং আপনি ভালো খাবার খাওয়ার খেয়ে পাওয়া পরিতৃপ্তি, Pleasure, আপনার Sexuality'র অংশ, Freud-Jung এর তত্বানুসারে। গল্পের গরু গাছে ওঠার আগে প্রসঙ্গে আসি।

এই দুই ভদ্রলোক Oedipus Complex নামক একধরনের সাইকোসেক্সুয়াল থিওরি দিয়েছেন, এবং সম্ভবত এখন পর্যন্ত সবথেকে প্রতিষ্ঠিত হাইপোথিসিস। মায়ের প্রতি ছেলের অবিচেতন যৌন আকর্ষন বা ভাইস ভার্সা। হয়তো আমাদের অনেকের ধারণা নেই, আমাদের সমাজে এমন সাইকোসেক্সুয়াল প্রান্তিক মানুষ আছেন, তাঁ্রা পারেন না নিজেদের সাইকোসেক্সুয়ালিটিকে সামাজিক কন্সট্রাক্ট'এ আটকে রাখতে, তাঁ্রা সেক্সুয়ালি একটিভ হয়ে যান, যা থেকে পুত্রবধুর আত্মহত্যা পর্যন্ত ঘটে থাকে অনেকক্ষেত্রে। এখানে পারষ্পরিক আপত্যস্নেহের সেক্সুয়াল দখলদারিত্ব দেখা যায়। আমাদের চোখে এটা অজাচার কারণ অন্তত গত এক হাজার বছর ধরে একে সম্পূর্ণরূপে সামাজিক অজাচার বলে গণ্য করে আসছে, তার আগে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে অজাচার হিসেবে গণ্য হতো না। তবে এই Oedipus আমার কাছে Freud এর নিষ্ঠুরতা মনে হয় আমার কাছে। গ্রিক মূল গল্পে, ওদিপাউস আর তার মা  জন্মলগ্নে আলাদা হয়ে যায়, কেউ কাউকে চিনতো না, পাকেচক্রে পড়ে আলাদা হওয়ার ২৫ বছর পরে বিয়ে হয় এবং তাদের সন্তান হয়। এবং একসময় তারা জানতে পারে, মহিলা আত্মহত্যা করেন, ওদিপাউস নিজের চোখ উপড়ে ফেলে পরিতাপ করতে সব ছেড়ে চলে যায়। এটা মোটামুটি ২০০০ বছর আগের গল্প, তখন একে অজাচার ধরা হহতো, কিন্তু ঠিক হাজার কখানেক ববছর আগেও গ্রিসে মমা ছেলে সম্পর্ক অজাচার গণ্য হতো না। আমি সবার আগে যে কথা বলছিলাম, আপনার না জানা থাকলে সেক্সুয়াল এট্রাকশন থেকে সেক্স সবই হতে পারে। এবং শুধু সোশাল কন্সট্রাক্টের কারণে এধরণের সাইকোসেক্সুয়ালিটি সচরাচর প্রস্ফুটিত হয় না।

এঁদের আরেকটা অবদান Electra Complex, বাবা-মেয়ে সাইকোসেক্সুয়ালিটি। উদাহরণ কম চোখে বাধে না। আরব অসভ্যরাই নয় শুধু, পশ্চিমা তথাকথিত সভ্য থেকে আমাদের মত মডারেট রক্ষণশীল সমাজেও। ওদিপাউস কমপ্লেক্স যেখানে স্নেহমূলক দখলদারিত্বের সাইকোসেক্সুয়াল প্রতিরূপ, ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স সেখানে Power and Dominance মূলক মনস্তাত্বিক যৌন দখলদারিত্ব। তবে ওদিপাউসের গল্পটা যদিওবা তত্বের সাথে Relevant, ইলেক্ট্রার গল্প দেখলে একেবারে বাজে Metaphor. কোন এক গ্রিক দ্বীপের রাজা বর্তমান স্ত্রী এবং তার প্রেমিকের ষড়যন্ত্রে খুন হয়। রাজার আগের পক্ষের মেয়ে ইলাক্ট্রা, প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে এতটাই ফ্যানাটিক হয়ে ওঠে, প্রতিশোধ না নিয়ে মৃতদেহ সৎকার অস্বীকার করে এবং একসময় সৎ মা ও তার প্রেমিককে খুন করে প্রতিশোধ নেয়। তত্বের সাথে কোন মিল পেলেন? :D যাই হোক, বাবার অধিকার নিয়ে বা নজরে বেশি আসা নিয়ে মা মেয়ের নির্মল মধুর দ্বন্দ, Freud-Jung এএ দৃষ্টিতে ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স সাইকোসেক্সুয়ালিটি এবং এটা যে একেবারে ফেলে দেয়ার মত নয় তার প্রমাণ, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অনেকসময় বাবা-মা-মেয়ের সাইকোসেক্সুয়াল ট্রায়াঙ্গল আমাদের কানে আসে। এটা অসুস্থতা নয়, সাইকোসেক্সুয়াল স্বাভাবিকতা।

ভাই-বোন "অজাচার" কিভাবে সামাজিক কন্সট্রাক্টের উপরে ভিত্তি করে প্রেথিত, তার একটা সহজ উদাহরণ দেয়া যাক। মুসলিম সমাজে তুতো ভাই-বোনের  মধ্যে বিয়ে অসম্ভব কমন ব্যাপার। এদিকে ইহুদি-খ্রিস্টানরা ফার্স্ট কাজিনের সাথে (মানে আপন চাচাতো বা মামাতো) বিয়ে এলাউ করে না। হিন্দুদের সমাজে সকল কাজিন ভাই বোন (অন্তরালে যৌন সম্পর্ক অনেক আছে)।  তাহলে সেই কন্সট্রাক্ট, কাউকে যৌনাচার এলাউ করছে, কাউকে বলছে এটা অজাচার। যদি সোশাল কন্সট্রাক্ট না থাকতো, তাহলে এই সাইকোসেক্সুয়ালিটি অনেকের মধ্যেই প্রস্ফুটিত হতে পারতো হয়তো বা। যেমনটা হয়েছিলো রোমান সাম্রাজ্যে। ক্রিশ্চিয়ানিটি রোমকে গ্রাস করার আগে পর্যন্তও ভাই বোন যৌনতা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিলো তৎকালীন রোম এ, অজাচার বলতে কিছুর অস্তিত্বও ছিলো না।

তাহলে, অজাচার বা Incest নামক কালের বিচারে সাম্প্রতিক টার্মকে কিছুতেই বিবেক বা ধর্ম নামক বায়বীয় অযৌক্তিকতা দিয়ে বিচার করতে পারি না। মানুষের স্বাভাবিক সাইকোসেক্সুয়ালিটি, সামাজিক কন্সট্রাক্ট দ্বারা অবদমিত হয়ে, অজাচারে রূপান্তরিত হয়েছে। কারণ আসলে আমাদের সমাজ সাইকোসেক্সুয়াল প্রান্তিকতা নিয়ে সচেতন নয়। আমার মনে হয়, আধুনিকতা এবং  যৌক্তিকতার বর্তমান বিশ্বে প্রান্তিক যৌনতার মানুষ এবং প্রান্তিক মনস্তাত্বিক যৌনতা নিয়ে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।

শনিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৬

ঈশ্বরের রূপকথারা ১

মোটামুটি দেখা যায়, Neolithic  যুগের শুরু থেকে, মানে আনুমানিক ১০০০০ BCE, স্টোন এজ শেষ হচ্ছে, কৃষি যুগ শুরু হবে হবে করছে, সামনে ধাতব যুগ, মানুষের খাবার নিয়ে চিন্তা কমছে, অলস সময় বাড়ছে, ঈশ্বর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে, কিন্তু যার যার ঈশ্বর তার তার, ঈশ্বরের মানে স্রষ্টা পালনকর্তা তখনো হয় নি, অনেকটা এমিবা লেভেলের ঈশ্বর, কালেকটিভ। এর আগে পর্যন্ত মানুষ ছিলো হান্টার-গ্যাদারার, টোটেম পূজা প্রচলণ ছিলো, হিংস্র পশু থেকে রক্ষা, শিকার বেশি পাওয়া, এমন বিভিন্ন ফাংশনাল টোটেম। কৃষিযুগ শুরুর পরে টোটেম চেঞ্জ হয়, নারী টোটেম পূজা চালু হয়, গর্ভবতী নারী টোটেম, ঊর্বরতার প্রতীক, প্রধাণ উৎসব ফসল তোলার উৎসব, উর্বরতা উদযাপন, উদ্দাম যৌনতা। পাশাপাশি, চন্দ্র-সূর্য্য ইত্যাদি টোটেম। এটা ক্লাসিক Paganism এর সূচনা।   আমরা Göbekli Tepe (আনুমানিক ১০০০০বিসি - ৮০০০ বিসি) কে উদাহরণ ধরে দেখতে পারি। এটা এ পর্যন্ত খুঁড়ে বের করা সব থেকে প্রাচীন উপাসনালয়, বর্তমান তুরস্কে।  এখানে খুব সম্ভব আশেপাশের একটা রেডিয়াসের সব ট্রাইব এক হতো নিজেদের টোটেম নিয়ে। কালেকটিভ ঈশ্বরদের একের সাথে অন্যদের দেখা হতো। ঈশ্বর তখনো পরাক্রমিশালী নন, বস্তুত ঈশ্বরের ধারণারই তখন সবে ভ্রূণ দশা।
 (উপরে খননকার্য্য চলাকালীন  Göbekli Tepe, নিচে, শিল্পীর তুলিতে)
                  



ঈশ্বরেরা হালকা পাতলা কাজ কর্ম নিয়ে দিব্যি ছিলো বহু  যুগ, প্রায় ৬০০০ বছর। , কৃষিযুগ বিবর্তিত হয়ে ধাতব যুগ শুরুর সাথে সাথে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার সূচনা হয়, বিশেষ করে একদিকে নাইল আর অন্যদিকে  ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস অববাহিকায়, আনুমানিক ৩৫০০ বিসি তে। মুশকিল হলো, ধাতু আবিষ্কারের পর থেকে, বিশেষ করে কপার আবিষ্কারের পরে ব্রোঞ্জ বানাতে শিখে এবং পরবর্তিতে সোনা মূল্যবান বিবেচিত হবার পরে, এই ব্রোঞ্জের প্রাচুর্যের উপরে ভিত্তি করে শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র (Warlord State) গড়ে উঠতে থাকলো। ব্রোঞ্জের অস্ত্র, সামরিক পাল্লা অনেকের ভারী করে দিলো। মিশরে তাদের ওল্ড কিংডম, বা তৎকালীন মেসোপটেমিয়ায়, সুমেরীয়, বা এশিয়া মাইনরে প্রোটো-ইন্দো-ইরানিকদের নগর। সুমেরিয়াতে আবার ১২-১৫ টা নগর। সব নগরের ওয়ারলর্ড, গড কিং, বাকি সমস্ত টোটেমের চাইতে গড কিং বেশি পূজ্য। মিশরের মত বড় রাষ্ট্রে, গড কিংকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাধারণ রাজনীতিবিদদের একটা কিছু প্রয়োজন ছিলো। ওরা প্রথম  অরগানাইজড মোল্লাতন্ত্র চালু করে। ঈশ্বর(গন) এই প্রথম, শক্তিশালী পরাক্রমশালী হয়ে উঠলো। গড কিং এবং গড মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলো। (সিন্ধু উপত্যাকায় বা চীন এলাকায় ব্রোঞ্জ যুগ কাছাকাছি সময়ে কিন্ত, এখানে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা আরো পরে)। আমরা এখান থেকে শুরু করবো:

প্রাচীন মিশর, পৌরণিক মিশর
-------------------------
প্রাচীন মিশর আর পৌরণিক মিশর এক সময়কাল নয়। প্রাচীন মিশরের সময়কাল, আনুমানিক ৫০০০BC নাগাদ। এটা এক আশ্চর্য্য সময়, প্রায় কাছাকাছি সময়ে (৫০০০-৪০০০ বিসি), চারটে নদী অববাহিকায় গড়ে ওঠে বৃহৎপ জনপদ; মিশর, মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু উপত্যকা এবং চিন ।  ৪০০০ বিসি নাগাদ প্রাইমারি ব্রোঞ্জ যুগের শুরু, মিশরও দুই ভাগে বিভক্ত, Upper Egypt, Lower Egypt. ভুমধ্যসাগরের দিকটা ছিলো লোয়ার ইজিপ্ট, লোহিত সাগর থেকে মরুভুমির ভিতর পর্যন্ত আপার ইজিপ্ট। দুই ইজিপ্টের দুই রাজা ছিলো, অবশ্যই গড কিং। আর যত Deity থাকুক, কিং সবার বড় ঈশ্বর। আনুমানিক ৩২০০ নাগাদ, সুমেরিয়রা অক্ষর আবিষ্কার করে এবং পরবর্তি ১০০ বছরের মধ্যে মিশরীয়রাও Hieroglyphics তৈরী করে ফেললো এবং লিপিবদ্ধ করলো ওদের Cosomology, ঈশ্বরতত্ব বললে ঈশ্বরতত্ব, সৃষ্টিতত্ব বললে তাই।. খুব সরল সাদাসিধে ওদের কসমোলজি,

" প্রথমে ছিলো শুধু Chaos (বিশৃঙ্খলা, উথাল পাথাল, অন্ধকার, Primordial Beginning),  আচমকা স্থিতি এলো, ক্যাওস থেকে এলো Maat (শৃঙখলা, আলো, ন্যায়, একতা, Primordial Balance, Order)। মা'ট সৃষ্টির ফলে ক্যাওস সরে গিয়ে যেই শুন্যতা সৃষ্টি হলো, সেখানে এলো অনন্ত জলধি Nun, তার উপরে সমতল পাতের মত পৃথিবী, পুরুষ Geb, উপরে বিছিয়ে রাখা আকাশ, নারী Nut, (নুট এবং গেব স্বামী-স্ত্রী), সূর্য্য Helios, সূর্য্যের অধিকর্তা Ra, চাঁদ Khonsu, জ্ঞান Thoth এবং Duat. এই ডুয়াট তখন শুধুই Spiritual plain, আধ্যাত্মবাদি জায়গা, সূর্য্য ডোবার পরে সূর্য্যের পুনর্জন্ম হয় এই ডুয়াট এ। ক্যাওস কিন্তু মা'ট পছন্দ করে না, সে ধ্বংস করে দিতে চায়, তার পারসোনিফিকেশন হচ্ছে মহানাগ Apophis, যে প্রতিমুহুর্তে চেষ্টা করে যাচ্ছে মা'ট গ্রাস করার। তার বিরুদ্ধে সেনাপতি রা, এপোফিসের সাথে রা এর এটারনাল যুদ্ধ। রা সবার নেতা। "

এপর্যন্ত মিশরের দেবতারা মানুষের কোন কিছু নিয়ে মাথা ঘামায় নি, নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতো, দুই গড কিং , আপার লোয়ার মিশর চালাচ্ছিলো। কিন্তু আশে পাশের ট্রাইব, যেমন মেসিডোনিয়ান, এসিরিয়ান, সুমেরিয়ান, নাবাতিয়ান, ইজরাইলি (ইব্রাহিমের সম্প্রদায়, এরা ঐ জেরুজালেম এলাকায় ছিলো প্রায় ৭০০০ বিসি থেকে), এরা নিয়মিত দুপাশ থেকে হামলা করতো মিশরে। দুই অংশেই ছিলো দুর্বল শাসক। এই সুযোগে সিভিল ক্যু হয়ে গেলো। মিশরিয় প্রিস্ট সম্প্রদায় তাদের জাদুবিদ্য নিয়ে রাজনীতিতে ঢুকে পড়লো, তারা এক সাবেক রাজপুত্রকে নেতা হিসেবে রেখে, গৃহযুদ্ধ শুরু করে দিলো। Namor (আনুমানিক ৩১০০ বিসি) প্রথম ফারাও হিসেবে দুই মিশর একীভুত করে সম্রাট হয়ে ওঠে, মোল্লাদের সাহায্য নিয়ে। শুরু হয় ডাইন্যাস্টিক মিশরের। পালটে গেলো কসমোলজি, পালটে গেলো ঈশ্বরের ভুমিকা, পালটে গেলো ডুয়াট, পালটে গেলো মিশরিয় সভ্যতার ধরণ। এবারে ফারাও নিজে ঈশ্বরের অবতার, মোল্লা আর তলোয়ার যুথবদ্ধতার সূচনা এই প্রথম মিশরিয় সাম্রাজ্য থেকেই। পৌরণিক মিশর এই শুরু হলো। এবারে যা ঈশ্বরতত্ব এলো  :

" আচমকা রা এর কাছে ভবিষ্যতবাণী, নুট-গেবের সন্তানদের কাছে রা রাজত্ব হারাবে। রা, নুট এবং গেব এর মিলন বন্ধ করে দিলো। তাও ফাঁকি দিয়ে তারা মিলিত হলো। নুট গর্ভবতী, রা জানতে পারলো, সে ডিক্রি জারি করলো, সূর্য্য চলবে এমন কোন দিনে নুট বাচ্চার জন্ম দিতে পারবে না। প্রসব বেদনায় ছটফট করছে, কিন্তু জন্ম দেয়ার সুযোগ নেই। এমন সময় নুট, চন্দ্রের সাথে জুয়া খেললো। জুয়া খেলে চন্দ্রের কাছ থেকে কিছু চন্দ্রালোক জিতে নিলো, সেই আলো দিয়ে নুট ৫ টা দিন তৈরী করলো, সেই ৫ দিনে জন্ম দিলো Osiris, Isis, Set, Nephthys এবং Haroeris। ডিসেম্বর ২৭-৩১, এই ৫ টা দিনকে বলা হয় Demon Days (আগে মিশরের ক্যালেন্ডারে ৩৬০ দিন ছিলো, ডেমন ডে যুক্ত হবার পরে আনুমানিক ৩০০০ বিসি, ফাইনাল মিশরিয় ক্যালেন্ডার তৈরী হয়)।  তো যাই হোক, ঈশ্বরেরা পলিটিক্স শিখলো , ওসিরিসের সাথে বিয়ে হলো আইসিস এর, সেট এর সাথে নেফথাইস এর, ওসিরিস সবথেকে পাওয়ারফুল, কিন্তু সেট সবথেকে ম্যাজিকালি স্ট্রং, সে গড অব কেওয়াস কন্ট্রোল, রা এর ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট, ওসিরিস রিজার্ভ ফোর্স। আইসিস প্রেগন্যান্ট হলো, ছেলে হবে, আইসিসের মধ্যে ক্ষমতার লোভ দেখা দিলো।

মিশরিয় Conocept of Soul মতে, আত্মা বা স্পিরিট, ৬ অংশে বিভক্ত, Ib (হৃদয়, ভাবনা, চিন্তা), Sheut (ছায়া, প্রতিচ্ছবি, আকার, আত্মপ্রকৃতি), Ren (প্রকৃত নাম, পরিচয়, জীবনের প্রতি মুহুর্তের স্মৃতি , এক কথায়, স্বত্বা, Ba (ব্যক্তিত্ব), Ka (জীবনীশক্তি) এবং Akh (পারলৌকিক আত্মা)। এই পর্যায়ে এসে আমরা পরবর্তিকালের স্পিরিচুয়ালিজম এর অনেকগুলো ভেরিয়েশন দেখতে পাচ্ছি। যাই হোক, আইসিস প্রেগন্যান্ট হবার পরে ভাবলো, যদি ওসিরিস রাজা না হয়, তাহলে তাদের সন্তানের ভবিষ্যত কি হবে। আইসিস জাদুবিদ্যার দেবী, সে একটা ফন্দী আঁটলো, রা এর শরীরের ঘাম সংগ্রহ করে সেটা মিশিয়ে একটা বিষাক্ত সাপ বানালো এবং সেই সাপ গিয়ে রা কে কামড় দিলো। কোনকিছুতেই আর সাপের বিষ থেকে রা মুক্ত হতে পারে না , সমস্ত চিকিৎসা ব্যর্থ। এসময়ে আইসিস এসে বললো, সে ট্রাই করে দেখবে , আইসিসকে দেখেই রা যা বোঝার বুঝে ফেলেছিলো,কিন্তু কিছু করার ছিলো না, বিষের যন্ত্রণায় রা বাধ্য আইসিসের কথা শুনতে। আইসিস বললো, বিষ সরানো সম্ভব, যদি রা আইসিসকে নিজের Ren জানায়,  শুধু তাহলেই এই বিষ নামানো সম্ভব (তৎকালীন প্রচলিত তত্বমতে, Ren বা প্রকৃত নাম কেউ জানার অর্থ হচ্ছে, যার রেন তার উপরে সমস্ত ক্ষমতার অধিশ্বর হয়ে যাওয়া। যে কোন জাদু ব্যবহার করা যাবে, যা খুশি তাই করিয়ে নেয়া যাবে, তাই অতি বিশ্বস্ত একান্ত আপন ১/২ জন ছাড়া কেউ রেন প্রকাশ করতো না)। তো রা বাধ্য হয়ে আইসিসকে নিজের রেন জানিয়ে দিলো , আইসিস বিষ সরিয়ে, সেই রেন ইউজ করে, রা কে অবসর নিতে বাধ্য করে। এবারে সান বোটের সিংহাসনে বসবে ওসিরিস।

Duat, এ পর্যন্ত ছিলো, আধ্যাত্ববাদ। এবারে ডুয়াট হয়ে গেলো , পার্থিব জগৎ বাদে সব কিছু। সেখানে এখন আন্ডারওয়ার্ল্ড, সেখানেই ঈশ্বরের রাজ্য, সেখানেই নরক, সেখানেই স্বর্গ। স্বর্গ বা নরক যদিও Vague তখনও, কিন্তু এই প্রথম কনসেপ্টটা এলো। ক্যাওসও ওখানেই, লর্ড অফ ডেমনস এপোফিস এগিয়ে আসতে চাইছে প্রতি মুহুর্তে। সূর্যাস্তের পরে, সান বোট, পশ্চিম দুয়ার দিয়ে ডুয়াটে প্রবেশ করে, বারো টা প্রহর River of night এবং Lake of fire এর মধ্যে ভ্রমণ করে, পূর্ব দুয়ার দিয়ে বেরিয়ে যায়। এর মধ্যে বোট কয়েকটা Pit Stop  নেয়। তেমনই একটা পিট স্টপ হচ্ছে Throne Room,  রাজ দরবার। ওসিরিস এখন ফারাও, প্রথম ফারাও, সব দেব দেবী কম বেশি মেনে নিয়েছে, কিন্তু রা এর লেফটেন্যান্ট গড অফ ক্যাওস কন্ট্রোল সেট, তার কোন খোঁজ নেই। প্রথম রাতে, রাজদরবারে প্রথমবারের মত সিংহাসনে বসে আছে ওসিরিস, এমন সময় এলো সেট, টানটান উত্তেজনা, সেট কি ওসিরিসকে চ্যালেঞ্জ করবে? কিন্তু না, রহস্যময় হাসি মুখে নিয়ে, সেট ওসিসিরিসের বশ্যতা স্বীকার করে নিলো।

সেট বললো, " মহান ফারাও, আপনার অভিষেক উপলক্ষে আমি একটা জিনিস প্রস্তুত করেছি, অনুমতি দিলে আনতে বলি?"
ওসিরিস আনন্দিত হয়ে বললো, "অবশ্যই ভ্রাতা, তুমি কি উপহার এনেছো সেটা আমারও দেখতে তর সইছে না।"
সেট হুংকার দিলো , "এই কে আচিস, লিয়ে আয়"

সেটা ছিলো অসম্ভব সুন্দর ডিজাইনে ব্রোঞ্জ আর সোনা দিয়ে তৈরী Sarcophagus (মিশরীয় কফিন, যেখানে মামি রাখা হয়), এত আকর্ষনীয় আর জাদুশক্তি ঠিকরানো ছিলো, প্রত্যেক দেবতাই লোভে পড়ে গেলো। কিন্তু সেট বললো, শুধু যে যোগ্য সেই এই সারকোফেগাসে শুতে পারবে। মহান ওসিরিস, দেখিয়ে দিন, শুধু আপনিই যোগ্য। গর্বে ওসিরিসের বুক ফুলে উঠলো, তাড়াতাড়ি নেমে ওর মধ্যে ওসিরিস শুয়ে পড়তেই, ঢাকনা বন্ধ হয়ে গেলো। যাদু দিয়ে বন্ধ করা, সেট নিজে ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব না খোলা, কারো কিচ্ছু করার নেই। রা এর প্রতিনকরা অন্যায় এর প্রতিশোধ নিলো সেট। আইসিসকেও মারতে যাচ্ছিলো, কিন্তু আইসিস শেষ মুহুর্তে চিল'র রূপ ধারণ করে পালিয়ে যায়। সেট ওসিরিরসের শরীর ওই কফিনের মধ্যেই টুকরো টুকরো করে, সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয় (বলা হয়, ওসিরিসের শরীরের টুকরো যেখানে যেখানে পড়েছে, সেখানে সেখানে মরুদ্যান তৈরী হয়েছে)।

আইসিস পৃথিবীতে লুকিয়ে থেকে জন্ম দেয় সন্তান হোরাসকে, তৎকালীন মিশরীয় ক্যালেন্ডার অনুসারে ২১, ২৩ বা ২৫ ডিসেম্বর (২৫ ডিসেম্বর এর উল্লেখ সবথেকে বেশি পাওয়া যায় এবং ধারণা করা হয় এখান থেকেই যীশু খ্রিস্টের জন্ম রহস্য এসেছে)। ফ্যালকন গড হোরাস, যুদ্ধের দেবতা, যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে সেট এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের, আইসিস তখন মরুভুমি ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওসিরিসের টুকরো। অবশেষে একদিন ওসিরিসএর শরীরের সমস্ত টুকরো এক করে সাজিয়ে, তার মধ্যে একে একে Ib, Sheut, Ba, Ka এবং Akh প্রবেশ করিয়ে সর্বশেষ সেই শরীরের উপরে Penis বসিয়ে তাতে Ren প্রবেশ করায় (নিচে তৎকালীন মিশরীয়দের আঁকা এই বিষয়ের ছবি দ্রষ্টব্য)। ওসিরিস পুনরুত্থিত হয় ঠিক, কিন্তু শরীরের মৃত্যু হয়েছে, সে পার্থিব জগৎে থাকতে পারবে না, তাকে ডুয়াটেই থাকতে হবে। তো হোরাসকে এখন ফারাও এর সিংহাসনও দখল করতে হবে। ফাইনালি হোরাসের শক্তি আর আইসিস এর জাদু মিলে সেট কে পরাস্ত করে হোরাস ফারাও হয়ে বসে। ওসিরিস হয়ে যায় পরকালের শাসনকর্তা, সেখানে সেট এর ছেলে আনুবিস গড অফ ডেথ।"

(উপরের ছবিতে প্রাচীন মিশরীয়দের আঁকা "ওসিরিরসের পূনর্জীবন",
নিচের ছবিতে হোরাস এবং সেট এর যুদ্ধ, হোরাসের বাঁ হাতে ধরা ফারাও এর রাজপ্রতীক Crook এবং Flail)


এবারে এই ঐশ্বরীক সাম্রাজ্যের আক্ষরিক কপি নাকি মিশরীয় সাম্রাজ্য। ফারাও কখনো ওসিরিস, কখনো হোরাস, কখন কেউ আইসিস। যদি ভাই ওসিরিস আর বোন আইসিস ধরে নেয় পুরোহিতরা তাহলে ভাই বোন বিয়ে। ফারাও যা করছে তা আসলে ঈশ্বরের কাজ। (খুব সম্ভব এই সময়েই তৎকালীন মেসোপটেমিয়াতে আব্রাহামের জন্ম)। এই ঈশ্বরেরা লোকের শোবার ঘরেও ঢুকে গেলো। ফারাও হবার আগে, একেক এলাকার দায়িত্বে ছিলো একেক দেবতা। হোরাস ফারাও হওয়াটা হচ্ছে, unification of upper and lower Egypt, সূর্য দেবতা রা এর সাথে Mysticism এর দেবতা Amon একীভুত হয়ে আমন রা হয়ে গেলো, এমন অনেক কিছু ঘটিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত ঈশ্বর-তলোয়ার-জীবন একাকার করে দেয়া হলো। খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫০-২৬৫৯ পর্যন্ত এই প্রাথমিক ফারাও বংশ টিকে ছিলো এবং অন্তত ঐ সময় পর্যন্ত মিশরীয়রাই ছিলো পৃথিবীর একমাত্র Gods' Warlord's Kingdom.


(চালানোর চেষ্টা করা হবে...........)

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

আমরা, বাংলাদেশী ক্রিকেট সমর্থক

বাংলাদেশে আমাদের বাংলাদেশ  ক্রিকেট নিয়ে খুব একটা মাথাব্যাথা ছিলো না। কলোনির মধ্যে ফুটবল প্লেয়াররাই দেখতাম ক্রিকেটার হয়ে ক্রিকেট খেলতো। গোটা থানায় আমাদের কলোনির টিমই বেটার ছিলো, আমাদের নিজেদের মধ্যে ৪ টে টিম পর্যন্ত করা যেত। যাই হোক, ক্রিকেট বলতে ওটুকু, খুব বেশি হলে আবাহনী মহামেডান ম্যাচ, ব্যাস। এরপরে   সবাই হয় ভারত সাপোর্টার, নয়তো পাকি সাপোর্টার, সংখ্যালঘু কিছু এদেশ ওদেশ সাপোর্টার ছিলো,  হালে পানি পেতো না। বাংলাদেশ দলের খোঁজ আমরা রাখতাম না, লাভ কি? প্লেইং ইলেভেনের ১১ জনের নামই জানতাম না , যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম। জানলাম, এস্ট্রো টার্ফ বসিয়ে ন্যাশনাল টিম প্র‍্যাকটিস করবে,  ৯৭ এ নাকি ICC Trophy,  ৯৯'এর বিশ্বকাপে যাবে যদি চ্যাম্পিয়ন বা রানার্স আপ হয়। খ্যা খ্যা করে হাসলাম, "সাব্বাস জাকির ভাই, শাহীন ভাই বাল শুধু চারই মারে, ছয় মারে না", "সাইদ আনোয়ারের আগে ৫০ সেঞ্চুরি হবে না, তেন্ডুলকারের?", "এই হচ্ছে ক্লাস, আকরাম কোমরে বেল্ট বেঁধে সুইং করায়, মইন-আকরাম লেট অর্ডারে একসাথে মানে যাতা", "সৌরভ-তেন্ডুলকার ওপেনিং ভার্সাস আমির-সাইদ সোহেল", বাংলাদেশ, who? আমরা ৯০ দশকের ৯০% আম বাংলাদেশী ক্রিকেট দর্শক।

এসএসসি'র আগে টেস্ট শেষে ৩ মাস প্রিপারেশন ব্রেক। এই সময় আইসিসি ট্রফি, মালয়েশিয়ায়। তখন ডিশ লাইন ঘরে ঘরে ছিলো না, বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রচার করেছিলো কিনা মনে নেই, আর গ্রামাঞ্চলে তো বিদ্যুৎই ছিলো না, টিভি কোত্থেকে।    রেডিও বাংলাদেশই একমাত্র ভরসা ছিলো।  খবরের কাগজে হেব্বি চলছে, বাংলাদেশের ওয়ার্লড কাপ খেলতে পারার সম্ভাবনার কাটাছেঁড়া। আমরা বাংলাদেশ স্কোয়াড দেখছি , কয়েকজনের নাম জানি , আবাহনী মহামেডানে খেলে , বুলবুল, আকরাম, নান্নু, আতাহার, রফিক, শান্ত, পাইলট এমন ৭/৮ জন, বাকিদের এই প্রথম খেয়াল করছি বোধহয়। আমরা তখনো হাসি ঠাট্টা করছি বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেলবে, খ্যা খ্যা খ্যা। এতবার আইসিসি খেললো, প্রতিবার ২/৩ টে করে দেশ যায় ওয়ার্লড কাপে বাংলাদেশ ছিঁড়েছে , এবারে এস্ট্রো টার্ফে প্র‍্যাকটিস করেও ছিঁড়বে, ধ্যুস। চলে গেলো ওরা মালয়েশিয়া, সাথে গেলো বাংলা ধারাভাষ্য দিতে লিজেন্ডারি চৌধুরী জাফরুল্লা শরাফত এবং ইংরেজীর জন্যে শামীম আশরাফ চৌধুরী। শরাফত তখন ক্রিকেটারদের চাইতে বড় স্টার, বাংলাদেশের কমেন্ট্রি জগতের রজনীকান্ত।

ফলো করতে হবে তাই করা উদ্দেশ্য নিয়ে রেডিও খুলে বসতাম আমরা, ছুটি কোন কাজ নেই,  শরাফতের কমেন্ট্রি শুনি।  মনে মনে খসড়া করছি, জিম্বাবুয়ে নেই, মানে একটা ঝামেলা নেই।, কিন্তু কেনিয়া , আজ পর্যন্ত হারানো যায় নি। ধ্যুস,  হবে না। সেমি ফাইনালে আসার পরে আমরা আসলে একটু নড়ে চড়ে বসলাম। জাফরুল্লাহ শরাফত আর শামীম আশরাফ আমাদের নড়িয়ে ছাড়লো। এর আগে পর্যন্ত ১২ দেশের লিগ চলছিলো, এবারে সেমি ফাইনাল, শীর্ষ ৩, ৯৯ ওয়ার্ল্ড কাপ খেলবে।  এখন তো নিজের দেশ ছয়ের পরে ছয় খেলেও কাঠের মত মুখ করে তারিফ করতে হয় কমেন্ট্রি দিতে গেলে, তখন তো আর তা হতো না, ওরা দুইজনে সমস্ত আবেগ ঢেলে কমেন্ট্রি দিচ্ছিলো।  আমরা তখন ১৫ জনেরই নাম জানি, কে কে খেলছে।  অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, বাংলাদেশ দল, প্লেইং ইলেভেনে ১০ জন ব্যাটসম্যান, ৯ টা বোলার :)।  রিয়েলি, ব্যাটসম্যানদের চারজন পার্টটাইম বোলার, বোলারদের ৩ জন পার্টটাইম ব্যাটসম্যান, একজন পার্টটাইম অলরাউন্ডার, একটু ব্যাটিং একটু বোলিং।  বাংলাদেশ টিম একটা চুড়ান্ত প্যাচ আপ। প্রতিটা আউন্স সামর্থ্য দিয়ে সেমি ফাইনাল পর্যন্ত এসেছে, দাঁত নখ সবকিছু দিয়ে হাঁচড়ে পাঁচড়ে ।  বাংলাদেশ যখন সেমি ফাইনাল জিতলো, আমরা, সিম্পলি স্টানড, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলবে, আমরা বিশ্বকাপ খেলবো। ফাইনাল, কেনিয়া, আমরা কোনদিন হারাতে পারিনি ,  শামীম আশরাফ চৌধুরী আজ মাফ চেয়ে নিচ্ছে, সে বাংলায় ধারাভাষ্য দেবে, আবেগের কাছে প্রোফেশনালিজম ছেঁড়া যায়। কেনিয়া যখন ২৪১  করে ফেললো,  আমরা হতাশ, হতাশ, আমাদের সামর্থ্যই নেই এত রান চেস করবো। কিন্তু সেদিন বৃষ্টি, বাংলাদেশের ইনিংস হলো না। রিজার্ভ ডে ছিলো হাতে, পরদিন বাংলাদেশ শুরু করলো, প্রপথম বলেই ওপেনার বোল্ড, বৃষ্টি শুরু ফের। বৃষ্টি থামার পরে ডি/এল মেথডে টার্গেট দাঁড়ালো ২৫ ওভারে ১৬৬। খেলা শুরু করতে হবে, নয়তো আরো পরে হয়তো আরো বিচ্ছিরি টার্গেট হবে।  শুধু কুয়ালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠের গ্রাউন্ডসম্যানরাই না, বাংলাদেশী রফিক পাইলট শান্ত সুজনরাও স্পঞ্জ আর বাকেট হাতে মাঠে নেমেছিলো, খেলা শুরু করতে হবে। আমরা ভুলতে পারি না সেই দিনগুলো। ভুলতে পারি না , কিভাবে সবাই মিলে একটু একটু করে জড়ো করেছিলো ১৬৬ রান।  বাংলাদেশ দলকে একটা ম্যাচ জিততে এমন আকুতি করতে দেখিনি আর কখনো। ১ বলে ১ রান দরকার ছিলো, পাইলটের ব্যাটে বল লাগার পরে, চোখ বন্ধ করে দৌড় দিয়েছিলো ও আর শান্ত। ভুলতে পারিনা চিৎকার করতে করতে, ভাঙা গলায় শামীম আশরাফের কমেন্ট্রি। আমাদের ক্রিকেটাররা তখনো আমিনুল ইসলাম বা খালেদ মাসুদ হয়নি, বুলবুল বা পাইলট ছিলো।

বাংলাদেশ ভেসে গেছিলো, ভেসে গেছিলো সেদিন, পরের দিন। একটা কোন গাড়ি ছিলোনা রাস্তায়, যেটা রঙিন নয়, রাস্তায় পয়েন্টে পয়েন্টে রঙের বালতি হাতে ছেলেপিলে, রঙ না খেয়ে কোন গাড়ি যাবে না। ভিল্ডিং এর ছাদ থেকে রঙ এর বালতি উপুড়, লোকের গায়ে। আমাদের এখানে তো হোলি বলে কিছু নেই, সেই দিনটা বোধহয় হোলির থেকেও রঙিন। মালয়েশিয়া গেছিলো প্রায় অখ্যাত কতগুলো ক্রিকেটার, ফিরে এলো হিরো, রফিক, পাইলট, আতাহার,দুর্জয়। উই আর ইন ওয়ার্ল্ড কাপ।

 এবারে আমরা দেখলাম আমাদের সমস্যা, আমাদের পাইপলাইন বলে কিছু নেই। এই যে ১৫ জন গিয়ে খেলে এলো, এদের কোন রিপ্লেসমেন্ট নেই। ৯৯ এ এই বুড়োরাই খেলবে, আমাদের সেকেন্ড পেসার, হাহ, ইন্টারন্যাশনাল খেলার মত সেকেন্ড পেসার একজন পেতে পেতে ফার্স্ট পেসার হারিয়ে গেলো, ১২৫+ গতির শান্ত ১৩৫+ তুলতে গিয়ে লাইন লেন্থ সব হারিয়ে ফেলেছে। জোড়াতালি দিয়েও পেসার মিলছে না। জিম্বাবুয়ে তো বটেই, কেনিয়াও বলে বলে হারাচ্ছে। সুজন থার্ড পেসার, স্পিনারের বলও বোধহয় ওর চাইতে বেশি গতির। আমাদের ভরসা সেই, বাঁ হাতি স্পিনার, তিনজন পার্টটাইম অফ স্পিনার। আমাদের ভারত পাকিস্তান সাপোর্টাররা এখনো বাংলাদেশকে সাপোর্ট করতে পারছে না একেবারে প্রাণ থেকে। বিশেষ করে পাকিস্তান সাপোর্টাররা, একই গ্রুপে পাকিস্তান বাংলাদেশ, একটা নোংরা মাছি। খুব আস্তে আমরা শিফটেড হচ্ছিলাম, নিজেদের টিমের দিকে। কত জল্পনা কল্পনা,  বাঁ হাতিপেসার, আহা শান্ত যদি গতি বাড়ানোর দিকে না ঝুঁকতে যেত। সুজন কি হাস্যকর একশনে বোলিং করে, একদম একটা গোলগাল পোকার মত লাগে, এই নিয়ে নাকি বিশ্বকাপ খেলবে। আমরা জানি  তো, বিশ্বকাপে আমাদের সবাই বলে বলেই হারাবে। কিন্তু ভাই, পরের বারে আইসিসি ট্রফি খেলে আবার আসতে পারবো কিনা জানিনা তো। আমাদের পাইপলাইনে কিচ্ছু নেই, এই বুড়োদের দলই আমাদের শেষ ভরসা। এটলিস্ট আমাদের এখন ওপেনিং ব্যাটসম্যান আছে।

৯৯, বিশ্বকাপ, ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ দল রওনা হবার আগে সংবাদ সম্মেলন করলো, হারজিত বড় কথা নয়, অংশগ্রহণই আসল। আমরা জানতাম তো, কি হতে চলেছে, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে খেলবে এই তো কত, আর কিছু আমাদের চাই না, ওরা বলে হারাতে চাইবে , টাইগারস তোমরা লড়ে হারবে। আর কিচ্ছু চাইনা। আচ্ছা স্কটল্যান্ডকে সেমিতে হারিয়েছুলাম। আমাদের গ্রুপেই, ওদের কি আরেকবার হয় না? আমাদের বুলবুল ইংল্যান্ডে খেলতো তো, হবে না? আমাদের জোড়াতালি বোলিং , কিন্তু রফিক আছে তো , বাঁ হাতি স্পিনে একটু তো চমকে দেবেই সবাইকে।   আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা আর বিশ্বকাপ একই সাথে। তাই বলে কি আর খেলা দেখা ছাড়া যায়, বাংলাদেশের খেলা তো একটা বলও মিস করা যাবে না। স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে দিলাম, বিশ্বকাপে ম্যাচ জয় পেয়ে গেলাম, আমাদের বাংলাদেশী দর্শকদের আশা পূর্ণ। নিউজিল্যান্ড ছেলে খেলা করে হারালো, অস্ট্রেলিয়া গলির ক্রিকেটার বানিয়ে ছাড়লো। আমাদের, সাপোর্টারদের কিচ্ছু ছেঁড়া যায় না তাতে, এমন হবে আমরা তো জানিই। এন্ড দেন পাকিস্তান ম্যাচ, ওরা সংবাদ সম্মেলনে বলছিলো , বাংলাদেশীরা নাকি ভাই এর মত, এ বাকি ভাই ভাই এর খেলা। আমরা গজরাচ্ছিলাম, অনেকেই। আমরা অনেকেই তখন সাবেক পাকিস্তান সাপোর্টার, পাকিস্তানকে সাপোর্ট করতাম বলে লজ্জিত হতে শুরু করেছি, ভাই তাই না, চুদির ভাই কোথাকার। আমার সবথেকে দুর্বল সাব্জেক্ট ছিলো ম্যাথ পার্ট টু, পরীক্ষার ঠিক আগেরদিন বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ। বাবার সাথে জরুরী বৈঠকে বসলাম, এমন ম্যাচ আর আসবে না , কোনটা আগে, ম্যাচ নাকি পরীক্ষা? অনেক যুক্তি তর্ক করে ডিসিশন নেয়া হলো, ফেল তো আর করবো না , আগে ম্যাচ, তারপরে অন্য কথা।


আমরা সেই স্পিন নির্ভর টিমই তো ছিলাম, কিন্তু দুজন বাঁহাতি স্পিনার অলরাউন্ডার খেলানোর সাহস আমাদের ছিলো না। মণি আর রফিক সমান ইফেক্টিভ ছিলো, বলে ব্যাটে। কিন্তু এক ম্যাচ রফিক, এক ম্যাচ মনি। যাকগে, তো আকরাম-ওয়াকার-শোয়েব-সাকলাইন আমাদের গিলে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করলো, গিলেও ফেললো, কিন্তু লেজ বেরিয়ে রইলো। ২২৩/৯, সাকলাইন ৫/৩৫। জিতবি জেত, অল আউট তো করতে পারিস নি। ক্যাপ্টেন বুলবুল জুয়ো খেললো। দলের সবথেকে স্লো বোলার সুজনকে দিয়ে ওপেন করালো। সুইসাইড ওটা, সুইসাইড। সাইদ আনোয়ার আর শহীদ আফ্রিদির সামনে নতুন বলে ১১০-১২০ স্পিডের পেসার। আমরা খিস্তিয়ে লাট করে দিলাম, সুজনকে বল দিতে দেখে। প্রথম ওভারে আফ্রিদি আউট, চোখ বন্ধ করে চালাতে গিয়ে সুপার স্লোয়ার না বুঝে। সুজনের ৭ ওভারের ম্যাজিকের মত ওর এক স্পেলে পাকিস্তানের মেরুদন্ড ভেঙে গেলো। ১২.৩ ওভারে, ৪২/৫, আনোয়ার-আফ্রিদি-ইজাজ-ইনজি-মালিক আউট। কি থেকে কি হয়ে গেলো। আমরা পাগল হয়ে গেছি ততক্ষনে, পাগল। পাকিস্তানের তৎকালীন বিখ্যাত লম্বা লেজ, আজাহার-আকরাম-মইন, কিছুতে কিছু হলো না, আনবিলিভেবল। চাচা, সুজন, আমাদের দৃষ্টিতে ১১ জনের কোটা পুরণ করতে দলে রাখা। সে কিনা ম্যান অফ দা ম্যাচ হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শ্যাম্পেনের বোতল নিচ্ছে (বাবার কাছে শুনেছিলাম, ইংল্যান্ডের মাঠে ম্যান অফ দা ম্যাচ হলে বোতল দেয়, সবাইকে নিতে দেখলাম, পাকিস্তানীদের নিতে দেখিনি, বাংলাদেশী কি করে সেটা দেখার আলাদা আগ্রহ ছিলো)। দিনকাল তখন অমনই ছিলো, অঘটন জন্ম না দিতে পারলে বাংলাদেশ জিততে পারতো না। আর আমাদের চাচাকে যে পাকিস্তানিরা খেলতে পারতো না, মুলতান টেস্ট তার প্রমাণ। আমদের ঐ দিনের মত খুশি বিশ্বকাপ জেতার পরেও অনেক সাপোর্টাররা হয় নি। ১০০ তে ৫২ পাওয়া মাফ হয়ে গেছিলো আমার, আর অন্য কিছু।



তারপরে তো ওয়ানডে স্ট্যাটাস, আর ডালমিয়ার বদান্যতায় তড়িঘড়ি টেস্ট স্ট্যাটাস। আমরা জানতাম আমাদের কি হাল, এই আশরাফুলের আগে, পাইপলাইন থেকে আমাদের কোন সম্ভাবনা ছিলো না। বিকেএসপি তখন সবে সাকিব, মুশফিকদের ব্যাচ তৈরী করছে। বুড়ো এবং কম বুড়ো অল্টার করে চালাতে হচ্ছিলো, বোর্ডকে। প্রতিটা ম্যাচ দেখতাম আমরা, দেখতাম কি করে এমনকি টাইট ম্যাচগুলোও ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে, ক্রস ব্যাট স্ট্রেইট হয় না, শুধু স্নিক আর স্নিক, আউট সুইঙ্গার মানেই কুপোকাত, এক্সট্রা বাউন্স মানেই ক্রশ ব্যাট, কুপোকাত।  আহারে আমাদের বোলিং চলনসই ব্যাটিংটা যদি একটু হতো, একটু যদি ফিল্ডিংটা পাকিস্টান টাইপ না হতো, প্রাণ ভরে খিস্তাতাম ওদের ম্যাচ শেষে।  চোখে জল চলে আসতো একেকদিন, ঠিক করে ফেলতাম, এদের খেলা আর দেখবো না, ঠিকই পরের ম্যাচের আগেই ভুলে যেতাম আগের ম্যাচে কি হয়েছিলো। নতুন করে আশায় বসা। ম্যাচের পরে ম্যাচ হারতে দেখেছি, সিরিজের পরে সিরিজ হারতে দেখেছি, হোয়াইটওয়াশ হতে দেখেছি, আমাদের এগেইন্সটে বোলিং ব্যাটিং রেকর্ড হতে দেখেছি।   সমর্থন দিয়ে গেছি। ১০ বলে ১০০ রান যখন দরকার হয়েছে সমর্থন দিয়েছি, গিলেস্পি টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলেছে সমর্থন দিয়েছি, হেরে যাওয়া ম্যাচের শেষ বলে কেউ চার মারলে শেষ ওভারে কেউ উইকেট পেলেও উল্লাস করেছি। ছেলেরা চেষ্টা তো করে,  আমরা পাশে না থাকলে কি করে হবে। পাশে আছি, রণে বনে ঝড়ে ঝঞ্ঝাটে পাশে আছি। শত সহস্রবার হারুক, আমরা বাংলাদেশী সমর্থক, পরের ম্যাচে প্ল্যাকার্ড, পতাকা , পুতুল হাতে ফের লাফাবো।








অনুবাদ - ১ (Ransom of Red Chief)

মাথায় দারুণ একটা প্ল্যান এসেছিলো,  এর চাইতে ভালো প্ল্যান আর হতেই পারেনা, কিন্তু দাঁড়ান, আগে পুরোটা শুনে নিন। আলাবামার ডাউন সাউথে ছিলাম আমরা তখন -- বিল ড্রিশোল আর আমি -- যখন অপহরণের বুদ্ধিটা মাথায় এলো। পরবর্তিতে বিল এ নিয়ে বলেছিলো, "ওই সময়টাতে আমাদের মাথায় ভুত ভর করেছিলো"; কিন্তু ফেঁসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি। শহরটার নাম ছিলো সামিট, একদম ফ্লানেল কেকের মত সাধারণ। এর অধিবাসী হচ্ছে একদল অখাদ্য, আত্মতৃপ্ত চাষা, মে'পোল'এর চারধারে যেমনটা সচরাচর ঘুরতে দেখা যায়।

বিল আর আমার যৌথ পুঁজি ছিলো ৬০০ ডলারের মত, ইলিনয়স'এ একটা ভুয়া জমি নিয়ে ঠগবাজীর ফন্দী খাটাতে আমাদের দরকার ছিলো আর ২০০০। একটা হোটেলের সিঁড়িতে বসে আমরা এই নিয়েই ভাবছিলাম। আমরা ভাবছিলাম, এই সমস্ত আধা গ্রাম্য এলাকার লোকেরা খুব বেশিই বাৎসল্যপ্রবণ, তো মূলত এটাই এবং আরো কিছু কারণে, আমরা ভেবে দেখলাম,  খবরের কাগজ এবং সাংবাদিকের দৌরাত্মপূর্ণ শহুরে এলাকাগুলোর চাইতে এখানেই বরং অপহরণ প্রকল্প সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করা যাবে। এখানে ঐ যত্রতত্র নাক গলানো সাংবাদিকেরা ঘাঁটাঘাটিও করতে আসবে না। আমরা জানতাম, সামিট আমাদের পিছনে সর্বোচ্চ ব্যয় করতে পারে, গোটা দুই  কনস্টেবল, দু' চারটে অলস বুড়ো কুকুর আর বড়জোর সাপ্তাহিক কৃষক সংবাদে এক বা দুই কলামে দু' চারটে তীব্র শব্দ। সবকিছু মিলে ঠিকঠাকই মনে হলো।

শহরের এক বিশিষ্ট নাগরিক ইবনেজার ডরসেট'এর একমাত্র সন্তানকে আমরা শিকার হিসেবে বাছাই করলাম। বাপটা বেশ সম্মানীয় একজন বন্ধকী কারবারী, চার্চের দানপাত্রে সচরাচর টাকা ফেলে না এবং প্রথম সুযোগেই বন্ধক রাখা জিনিস গিলে ফেলে। আর বাচ্চাটা, ১০ বছরের মুখে ফুটিফুটি দাগওলা একটা ছেলে, চুলের রংটা হচ্ছে ট্রেনে ওঠার আগে পত্রিকার স্টল থেকে কেনা ম্যাগাজিনের কাভারের মত। বিল আর আমি হিসাব করে দেখলাম, ইবনেজার বেশ বিগলিত হয়েই ২০০০ ডলারের প্রতিটা পাই পয়সা চুকিয়ে দেবে। দাঁড়ান, আগে বলা শেষ করি।

সামিট থেকে মাইল দুয়েক দূরে ঘন সিডার গাছে ছাওয়া একটা ছোট পাহাড়। এর পিছন দিকের খাড়াইতে একটা গুহা ছিলো। সেখানে আমরা রসদ জমা করে রাখলাম। একদিন সন্ধ্যায়, সূর্যাস্তের ঠিক পরপর একটা বাগিতে চেপে আমরা ডরসেটের বাড়ি থেকে একটু দূরে গিয়ে থামলাম। ছেলেটাকে দেখলাম  রাস্তায় দাঁড়ানো, রাস্তার ওপারে বেড়ার উপরে দাঁড়ানো বেড়ালের গায়ে পাথর ছুঁড়ছে।
"এই যে বাবু', বিল বললো, "চকোলেট খাবে? তোমাকে গাড়িতে চড়াবো।"
ছেলেটা বিলের চোখ বরাবর নিখুঁত নিশানায় একটা ঢিল ছুঁড়ে মারলো।
"এর জন্যে ওর বাপের থেকে বাড়তি ৫০০ ডলার আদায় করে ছাড়বো", তাড়াতাড়ি গাড়িতে চড়তে চড়তে বিল বললো।
ছেলেটা আমাদের সাথে একটা ছোটখাটো বাদামী ভালুকের মত লড়ছিলো, কিন্তু শেষপর্যন্ত ওকে আমরা কোনমতে বাগির ফ্লোরে চেপে ধরে কেটে পড়লাম। ওকে গুহায় ঢুকিয়ে রেখে, সিডার ঝোপের মধে ঘোড়া বেঁধে এলাম। পুরো অন্ধকার হয়ে এলে, আমি বাগিটাকে যেখান থেকে ভাড়া করে এনেছিলাম, তিন মেইল দূরের সেই ছোট্ট গ্রামটাতে চালিয়ে নিয়ে গেলাম, আর হেঁটেই ফিরলাম পাহাড়ে।

বিলকে দেখলাম, শরীরের এখানে ওখানে, আঁচড় আর থেতলানো জায়গায় মলম লাগাচ্ছে। গুহায় ঢোকার  মুখের কাছে একটা বড় পাথরের চাঁই এর আড়ালে আগুন জ্বলছে, ছেলেটা ফুটন্ত কফির কেটলির দিকে তাকিয়ে, ওর লাল চুলে বাজার্ডের লেজের দুটো পালক গোঁজা। আমাকে আসতে দেখেই, একটা লাঠি আমার দিকে তাক করে বললো,
"রে অভিশপ্ত পাঁশুটেমুখ, কোন সাহসে তুই সমতলের আতঙ্ক রেড চিফ'এর আস্তানায় পা দিয়েছিস?"
"ও একদম ঠিক আছে", ট্রাউজার গুটিয়ে হাঁটুর নিচে ছড়ে যাওয়া জায়গা টিপেটুপে দেখতে দেখতে বিল বললো। "আমরা ইন্ডিয়ান ইন্ডিয়ান খেলছি। আমাদের খেলার তুলনায় বাফেলো বিলের শো'কে মনে হবে টাউন হলে দেখানো প্যালেস্টাইনের ম্যাজিক ল্যান্টার্ন ছায়াচিত্র। আমি ওল্ড হ্যাঙ্ক, ফাঁদি, রেড চীফের বন্দী এবং কাল ভোরে আমার মাথার ছাল ছাড়ানো হবে। জেরোনিমোর কসম,  কি জোরে লাথি মারে ছোঁড়াটা!"
হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, জীবনের সেরা মুহূর্ত কাটাচ্ছে। বাইরে পাহাড়ি গুহায় ক্যাম্পিং করার মজায় ও ভুলেই গ্যাছে, ও নিজেই একজন বন্দী। কালবিলম্ব না করে ও আমার নাম দিয়ে দিলো, স্নেক আই, গুপ্তচর এবং ঘোষনা দিলো, ওর দলের যোদ্ধারা ফিরে এলে, কাল সূর্যোদয়ের সময় আমাকে খুঁটিতে বেঁধে অগ্নিকুন্ডে ঝলসানো হবে।

এরপরে আমরা রাতের খাবার সেরে নিলাম; আর ও মুখ বেকন, ব্রেড আর ঝোলে ভর্তি করে বকবকানি শুরু করলো। ওর ডিনারটাইম বক্তব্যগুলো ছিলো খানিকটা  এরকম,
"আমার খুবই ভালো লাগছে। আগে কখনো এভাবে ক্যাম্পিং করিনি; কিন্তু আমার একসময় একটা পসাম ছিলো, আর গত জন্মদিনে আমার বয়েস ছিলো নয়। আমার স্কুলে যেতে একদমই ভালো লাগে না। জিমি ট্যালবট'এর চাচীর ছিটে মুরগীটার ষোলটা ডিম ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে। আচ্ছা এই বনের মধ্যে কি সত্যিকারের ইন্ডিয়ান আছে? এই আমাকে আরেকটু ঝোল দে। আচ্ছা, গাছ নড়ে বলেই কি হাওয়া ওঠে? আমাদের ৫ টা কুকুরছানা আছে। এই হ্যাঙ্ক, নোর নাক এত লাল কেন? আমার বাবার অনেক টাকা। তারাগুলো কি খুব গরম? গত শনিবার আমি এড ওয়াকারকে পিটিয়েছি, দু'বার। আমি মেয়েদের দেখতে পারিনা। ভালো সুতো না হলে ব্যাঙ ধরা সহজ না। গরু আওয়াজ করে কেন? কমলালেবু গোল হয় কেন? গুহায় শোয়ার জন্যে বিছানা আছে? এমোস মারে'র পায়ে ছ'টা করে আঙ্গুল। তোতাপাখি কথা বলতে পারে কিন্তু বাঁদর বা মাছ পারে না। আচ্ছা, ১২ হতে আর কতদিন লাগবে?"
একটু পরপরই ওর মনে পড়ে যাচ্ছিলো ও ঝামেলাকারী লালমুখো, আর ওর লাঠি রাইফেল নিয়ে পা টিপে টিপে গুহার মুখে গিয়ে চোখ বুলাচ্ছিলো, ঘৃণ্য পাঁশুটেমুখদের কোন স্কাউট নজরে আসে কিনা। যখন তখন আচমকা যুদ্ধ নিনাদ ছাড়ছিলো, শুনে ফাঁদি ওল্ড হ্যাঙ্ক কেঁপে কেঁপে উঠছিলো। ছেলেটা একদম গোড়া থেকেই বিলকে আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে।

"রেড চীফ," আমি ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, "বাড়ি যেতে হবে না?"
"ওহ! কেন?" ও বললো, "বাড়িতে কোন মজা নেই। স্কুলে যাওয়াটা আমার খুবই অপছন্দ। আমার এমন বাইরে থাকতেই ভালো লাগে। এই স্নেক আই,  তুই আমাকে আবার বাড়িতে রেখে আসবি না তো?"
"নাহ, এখনই না," আমি বললাম, " আমরা এই গুহায় থাকবো ক' দিন।"
"ঠিক আছে," ও বললো, "তাহলে ভালোই হবে। আমার জীবনে কোনদিন এত মজা পাই নি"
১১ টা নাগাদ আমরা শুয়ে পড়লাম। একটা বড় কম্বল পেতে, চাদর বিছিয়ে, রেড চীফকে দুজনের মাঝখানে রাখলাম। ও পালিয়ে যাবে সেই ভয় একেবারেই ছিলো না। প্রায় ঘন্টা তিনেক ও আমাদের জাগিয়ে রাখলো, পাতা নড়ার বা আগুনে ডালের গিঁট ফাটার আওয়াজকে নিজের মনে ও কল্পনা করে নিচ্ছিলো আউটলদের এগিয়ে আসার আওয়াজ, আর আমাদের দুজনের কানের কাছে তীক্ষ্ণ আওয়াজে বলে উঠছিলো, "এই হুঁশিয়ার"। অবশেষে একসময় আমি ঘুমিয়ে গেলাম, আর স্বপ্ন দেখলাম, আমাকে লাল চুলের এক ভয়ঙ্কর ডাকাত অপহরণ করে এনে গাছের সাথে শিকল দিয়ে আটকে রেখেছে।

ঠিক ভোরবেলা, বিলের  মুহুর্মুহু  ভয়াবহ চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। সেগুলো, হুঙকার বা ধমক বা গর্জন বা হাঁকডাক বা সতর্ক সংকেত, মানে পুরুষের কন্ঠস্বর থেকে যা বেরোতে পারে এমন কিছুই ছিলো না --- ওগুলো ছিলো শ্রেফ অশোভন, আতঙ্কিত, অবমাননাকর আর্তনাদ, যা সাধারণত ভুত বা শুঁয়োপোকা দেখে মেয়েদের গলা থেকে বেরোয়। ভোরবেলা গুহার মধ্যে একটা মোটাসোটা, শক্তিশালী, বেপরোয়া লোকের থেকে এমন অসংযত আর্তনাদ শোনা একটা ভয়াবহ ব্যাপার।

ঘটনা কি বুঝতে এক লাফে উঠে বসলাম। দেখি কি, বিলের বুকের উপরে রেড চীফ বসে আছে, এক হাতে চুল মুঠ করে ধরা। আরেক হাতে আমাদের বেকন কাটার ধারালো ছুরি; ও খুব অধ্যাবসায়ের সাথে বাস্তবিকই বিলের মাথার ছাল ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, আগেরদিন সন্ধ্যায় বিলের জন্য যেই শাস্তির ঘোষনা দিয়েছিলো।
আমি ওর হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিয়ে ওকে ফের শুইয়ে দিলাম। কিন্তু, ওর পর থেকেই বিলের মনোবল ভেঙে গিয়েছিলো। এরপরে ছেলেটা আমাদের সাথে যতক্ষন পর্যন্ত ছিলো, বিল এক মুহুর্তের জন্যেও চোখ বোজেনি। আমি কিছুক্ষন ঝিমাচ্ছিলাম, কিন্তু যেই সূর্যোদয়ের সময় এগিয়ে আসতে  লাগলো, আমার মনে পড়ে  গেলো যে রেড চীফ বলেছিলো, সূর্যোদয়ের সময় আমাকে খুঁটিতে বেঁধে আগুনে পোড়ানো হবে। আমি যে ঠিক নার্ভাস ছিলাম বা ভয় পাচ্ছিলাম, এমন নয়; কিন্তু তাও আমি উঠে একিটা পাথরে হেলান দিয়ে বসে পাইপ জ্বালালাম।

"কিরে স্যাম, এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি যে?" বিল জিজ্ঞেস করলো।
"আমি?" আমি বললাম, "ওহ, ঐ আমার কাঁধের পাশটায় কেমন একটা ব্যাথা মনে হচ্ছে। ভাবলাম, হেলান দিয়ে বসলে হয়তো একটু আরাম হবে।"
"তুই একটা মিথ্যুক," বিল বললো, "তুই ভয় পাচ্ছিস। সূর্যোদয়ের সময় তোকে পোড়ানোর কথা, তুই ভয়ে আছিস, ও ঠিক সেটা করবে। আর ও তা করবেও, যদি দেশলাই হাতে পায়। কি ভয়াবহ ব্যাপার বল, স্যাম? তোর কি আসলেই মনে হয়, এমন একটা শয়তানের বাচ্চাকে কেউ পয়সা খরচ করে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে চাইবে?"
"অবশ্যই," আমি বললাম, " এমন বদমাশ বাচ্চারাই বাপ মায়ের নয়নের মনি হয়। যাকগে,  এবারে তুই আর রেড চীফ মিলে ব্রেকফাস্ট তৈরী কর; আমি এইফাঁকে উপরে উঠে আশপাশ ভালো করে ঝালিয়ে নিই।"

আমি পাহাড়ের চুড়ায় গিয়ে উঠলাম এবং আশপাশের বিস্তির্ণ এলাকায় ভালো করে নজর বুলিয়ে নিলাম। সামিটের দিক থেকে  একদল গাট্টাগোট্টা চাষাকে পিচফর্ক আর কাস্তে হাতে বদমায়েশ অপহরণকারীর খোঁজে ঝোপঝাড় ঠেঙাতে ঠেঙাতে এগিয়ে আসতে দেখবো বলে আশা করছিলাম। কিন্তু, যা দেখলাম, তা হচ্ছে, শান্ত প্রকৃতির মধ্যে  একটা মাত্র লোক মেটে রঙের খচ্চর দিয়ে লাঙল টানছে।  কেউ খাঁড়িতে জাল টানছে না, চিন্তিত বাবা-মা এর কাছে খবর দিতে বার্তাবাহকের এদিক ওদিক ছোটাছুটিও দেখা যাচ্ছে না। শান্ত বনানীর ঘুমঘুম পরিব্যপ্তিময় এলাবামার গ্রামাঞ্চল আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। "সম্ভবত," আমি নিজেকে বললাম, "গৃহস্ত এখনো জানেই না, নেকড়ের পাল এসে ঘরের কোণ থেকে মেষশাবক ধরে নিয়ে গ্যাছে। ঈশ্বর নেকড়ের পালের সহায় হোন!" এই বলে, ব্রেকফাস্টের জন্যে নিচে নেমে এলাম।

গুহায় ফিরে দেখি, বিল একপাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে, আর ছেলেটা, আধখানা নারকোল সাইজের একটা পাথর হাতে ওর মাথা থেঁতলে দেবে বলে শাসাচ্ছে।
"ও আমার পিঠের উপরে একদন গনগনে গরম একটা আলু রেখে, পা দিয়ে ভর্তা করেছে," বিল শশব্যস্ত হয়ে বললো, "আর আমি ওর কান মুচড়ে দিয়েছি। এউ স্যাম, তোর কাছে পিস্তল টিস্তল কিছু আছে?"
আমি ছেলেটার হাত থেকে পাথর নিয়ে একরকম মিটমাট করে দিলাম। "আমি তোকে দেখে নেবো," বিলকে বাচ্চাটা বললো, " আজ পর্যন্ত কেউ রেড চিফের গায়ে হাত তুলে রেহাই পায় নি। তুই সাবধানে থাকিস।"
ব্রেকফাস্ট শেষ করে, বাচ্চাটা পকেট থেকে ফিতে জড়ানো একটা চামড়ার টুকরো বের করে পাক খুলতে খুলতে গুহা থেকে বেরিয়ে গেলো।
"ও আবার কি করতে যাচ্ছে?" বিল উদ্বেগের সাথে বললো, " তোর কি মনে হয়, ও পালিয়ে যাবে না তো?"
"নাহ, এ নিয়ে ভাবছিই না, " আমি বললাম, "ওকে দেখে ঠিক ঘরে বসে থাকা বাচ্চা তো মনে হয় না। কিন্তু মুক্তিপনের ব্যাওয়ারে আমাদের জলদি একটা কিছু একটা করতে হবে। ওর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে সামিটের আশেপাশে তেমন কোন আলোড়ন তো নজরে এলো না, হয়তো এখনো বোঝেই নি, ও গায়েব। হয়তো ওর আত্মীয়স্বজন ভাবছে, ও কোন পাড়া পড়শির বাড়ি রাত কাটাচ্ছে। যাই হোক, আজ ঠিকই সবার টনক নড়বে। আজ রাতের মধ্যেই মুক্তিপণ বাবদ দুহাজার ডলার চেয়ে একটা চিঠি ওর বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।"

ঠিক তখনই আমরা একরকম যুদ্ধ হুঙ্কার শুনতে পেলাম, যেমনটা হয়তো গোলিয়াথকে হারানোর পরে ডেভিডের মুখ থেকে বেরিয়েছিলো। ঘুরে দেখি রেড চীফ, ও পকেট থেকে ওটা পাথর ছোড়ার স্লিং বের করেছিলো, সেটা এখন মাথার উপরে ঘোরাচ্ছে।
আমি বসে পড়লাম, আর শুনলাম  খুব জোর ধুপ করে একটা শব্দ, এবং বিলের থেকে দীর্ঘশ্বাসের মত একরকম আওয়াজ; অনেকটা পিঠ থেকে জিন নামানোর পরে ঘোড়া যেমন আওয়াজ করে থাকে। ঠিক ডিমের সাইজের একটা কালো পাথর বিলের কান বরাবর গিয়ে লেগেছে। বিল কাটা কলাগাছের মত পড়ে গেলো, আর পড়বি তো পড়,  বাসন কোসন ধোয়ার জন্যে জল গরম হচ্ছিলো, ঠিক তার উপরে। আমি তারাতাড়ি ওকে টেনে নিয়ে এসে, আধাঘন্টা ধরে ওর মাথায় গায়ে ঠান্ডা জল ঢাললাম।

একটু সুস্থির হয়ে বসে, কানের পিছনটা ডলতে ডলতে বিল বললো,  " স্যাম রে, বাইবেলের কোন চরিত্রটা আমার সবথেকে প্রিয় জানিস?"
"আরে, শান্ত হ," আমি বললাম, "একটু পরেই মন মাথা সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"কিং হেরড," ও বললো, "তুই আমাকে এখানে একা ফেলে রেখে চলে যাবি না তো স্যাম?"
আমি বাইরে এসে ছেলেটাকে পাকড়ে ধরে দাঁত খিঁচুনি না ওঠা পর্যন্ত ঝাঁকাতে থাকলাম।
"তুই যদি তোর আচরণ ঠিক না করিস," আমি ওকে বললাম, "আমি এক্ষুনি তোকে বাড়ি রেখে আসবো। এবার বল, তুই লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবি কিনা"
"আমি তো শুধু একটু মজা করছিলাম," ও থমথমে মুখে বললো, "হাঙ্ককে মারার কোনই ইচ্ছা ছিলো না আমার। ও আমার গায়ে হাত তুললো কেন? ঠিক আছে স্নেক আই, আমি দুষ্টুমি করবো না, যদি আমাকে বাড়ি না রেখে আসিস, আর আমাকে আজ ব্ল্যাক স্কাউট খেলতে দিস।"
"আমি ওসব খেলা টেলা জানি না," আমি বললাম, "তুই আর বিল মিলে ঠিক কর, কি খেলবি। আজকের মত ও'ই তোর সাথে খেলবে। আমি একটা কাজে কিছুক্ষনের জন্যে বাইরে যাচ্ছি। এখন তুই ভিতরে এসে বিলের সাথে মিটমাট করে নে, ওকে মারার জন্যে সরি বল, নয়তো  এক্ষুনি বাড়ি রেখে আসবো।"
আমি বিলের সাথে ওর হাত মিলিয়ে দিলাম, এরপরে বিলকে একপাশে ডেকে বললাম, এখান থেকে মাইল তিনেক দূরের পপলার কোভ গ্রামে যাচ্ছি। ওখানে গিয়ে বুঝেশুনে দেখি, সামিটের লোকেরা অপহরণ নিয়ে কেমন কি ভাবছে। তাছাড়া ভাবছি  মুক্তিপনের পরিমাণ আর কিভাবে সেটা দিতে হবে সেই নিয়ে নির্দেশমূলক একটা চিঠি ডরসেটকে আজকের মধ্যে পাঠানোই ভালো হবে।

"দেখ স্যাম," বিল বললো, " আমি সব সময়  কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তোর সাথে থেকেছি। ভুমিকম্প, টর্নেডো, বন্যা, অগ্নিকান্ড, সাইক্লোন, পুলিশ রেইড, পোকার টেবিল, ট্রেন ডাকাতি, ডিনামাইট বিস্ফোরণ, সব কিছুতে। কিন্তু এই দুপেয়ে পটকাকে অপহরণের আগে পর্যন্ত আমি সাহস হারাই নি। ও আমাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে। তুই আমাকে খুব বেশি সময়ের জন্যে ওর সাথে একা রেখে যাবি না তো, স্যাম?"
"আমি আজ বিকেলের মধ্যেই ফিরবো এক সময়," আমি বললাম, "তোর কাজ হচ্ছে আমি ফেরা পর্যন্ত বিচ্ছুটাকে মাতিয়ে রাখা, ওকে শান্ত রাখা। আর আয়, এখনই ডরসেটের কাছে চিঠি লেখার কাজটা সেরে নিই।
আমি আর বিল, কাগজ পেন্সিল নিয়ে চিঠি খসড়া করতে বসলাম, আর রেড চীফ নিজেকে কম্বলে মুড়ে, পায়চারি করতে করতে গুহার মুখ পাহারা দিতে লাগলো। মুক্তিপণের টাকা দুই হাজার থেকে পনেরশ'তে নামাতে প্রায় চোখে জল এনে কাকুতি মিনতি করছিলো বিল।
 "দেখ, আমি সুপ্রসিদ্ধ আপত্যস্নেহের নৈতিক দিক নিয়ে  প্রশ্ন তোলার কোন চেষ্টাই করছি না," বিল বলছিলো, "কিন্তু এটা মানবিকতার প্রশ্ন, আর এই ৪০ পাউন্ড ওজনের হিংস্র বনবেড়ালের জন্য কাউকে দুই হাজার দিতে বাধ্য করাটা একেবারেই অমানবিক হবে। তুই চাইলে আমার থেকে বাকিটা নিয়ে নিস।"
তো বিলকে শান্ত করতে আমি মেনে নিলাম ওর কথা, আর দুজনে মিলে যে চিঠিটা লিখলাম, তা অনেকটা এরকম:

ইবনেজার ডরসেট মহোদয়,
আপনার ছেলেকে আমরা সামিট থেকে বেশ দূরে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছি। শুধু আপনি নিজেই না, সবথেকে দক্ষ গোয়েন্দা দিয়েও খোঁজাখুঁজির চেষ্টা চালানোটা নিরর্থক। শুধুমাত্র যেই শর্তে আপনি ওকে ফিরে পেতে পারেন, তা হচ্ছে: ওকে ফিরিয়ে দিতে আমাদের দাবী হচ্ছে বড় অঙ্কের নোটে পনেরোশ ডলার; টাকাটা আজকে মাঝরাতেই পৌঁছাতে হবে ঠিক একই জায়গার একই বাক্সে, যেখানে আপনার জবাবের চিঠি রাখতে বলা হয়েছে -- জায়গাটার বর্ণনা নিচে দিচ্ছি। আমাদের শর্তে রাজি থাকলে, আজ রাত ঠিক সাড়ে আটটার সময়, একজন বাহক মারফত আপনার জবাব লিখে পাঠাবেন।  পপলার কোভ'এ যাওয়ার পথে ওল্ড ক্রিক পার হবার পরে, রাস্তার ডান হাতে গম ক্ষেতের বেড়ার কাছে, ১০০ গজ পরপর, তিনটে বড় গাছ আছে। তিন নম্বর গাছটার ঠিক বিপরীতে বেড়ার একটা খুঁটি, ওর নিচে একটা কার্ডবোর্ড বাক্স রাখা আছে। আপনার বার্তাবাহক ঐ বক্সে জবাব রেখে কালবিলম্ব না করে সামিটে ফিরে যাবে। যদি কোনরকম প্রতারণার আশ্রয় নেন, অথবা আমাদের দাবী মানতে রাজী না হন, তাহলে আপনার ছেলেকে আর কোনদিন দেখতে পাবেন না। যদি দাবী মোতাবেক টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে তিন ঘন্টার মধ্যে আপনার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দেয়া হবে। আমাদের শর্তটাই চুড়ান্ত, যদি আপনি রাজী না হন, আপনার সাথে যোগাযোগের আর কোন চেষ্টা করা হবে না
ইতি,
দুজন বেপরোয়া লোক।

খামের উপরে ডরসেটের ঠিকানা লিখে চিঠিটা পকেটে পুরলাম। আমি রওনা দিতে যাবো, এমন সময় বিচ্ছুটা আমার কাছে এসে বললো,
"এই স্নেক আই, তুই যে তখন বললি, তুই যাওয়ার পরে আমি ব্ল্যাক স্কাউট খেলতে পারবো।"
"খেল না, মানা করলো কে," আমি বললাম, "বিল তোর সাথে খেলবে। আচ্ছা খেলাটা আসলে কেমন?"
"আমি ব্ল্যাক স্কাউট," রেড চীফ বললো, "ঘোড়ায় চড়ে প্রতিরক্ষাব্যুহে গিয়ে আমাকে বসতিকারীদের সতর্ক করতে হবে, যে ইন্ডিয়ানরা আসছে। নিজে ইন্ডিয়ান সাজতে সাজতে বিরক্তি ধরে গেছে। এবারে আমি ব্ল্যাক স্কাউট হতে চাই।"
"ঠিক আছে," আমি বললাম, "শুনতে তো নিরীহই লাগছে। আশা করি বিল তোর সাথে মিলে ঐ বুনো বর্বরদের হারিয়ে দেবে।"
"আমাকে কি করতে হবে?" সন্দেহের দৃষ্টিতে বিচ্ছুটার দিকে তাকিয়ে বিল জিজ্ঞেস করলো।
"তুই হচ্ছিস ঘোড়া," ব্ল্যাক স্কাউট বললো, "আয় হামাগুড়ি দিয়ে বস। ঘোড়া না হলে আমি কিসে চড়ে প্রতিরক্ষ্যাবুহ্যে যাবো?"
"আমাদের ফন্দীটা খেটে না যাওয়া পর্যন্ত তুই ওকে মাতিয়ে রাখাটাই ভালো হবে," আমি বিলকে বললাম, "আরে এত ভাবিস না তো।"
বিল চার হাতপায়ে ভর দিয়ে বসলো, ওর চোখেমুখে ফাঁদে আটকা পড়া খরগোশের মত ভাবভঙ্গী ফুটে উঠছিলো।
"এই ছোঁড়া, প্রতিরক্ষাবুহ্য কতদূর রে?" নিরস কন্ঠে বিল জিজ্ঞেস করলো।
"নব্বই মাইল," ব্ল্যাক স্কাউটের নির্বিকার জবাব, "আর সময়মত ওখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তোর পিঠ বাঁকা হয়ে যাবে। এই ঘোড়া, চল হ্যাট"
একলাফে ব্ল্যাকস্কাউট বিলের পিঠে চড়ে বসে, গোড়ালি দিয়ে পাঁজরে জোর ঘা বসিয়ে দিলো।
"ঈশ্বরের দোহাই," বিল বললো, "জলদি ফিরিস স্যাম, যত জলদি পারিস। ইস মনে হচ্ছে, যদি মুক্তিপণটা হাজার ডলারের বেশি না ধরতাম। এই ছোঁড়া, তুই যদি লাথি মারা বন্ধ না করিস, আমি সোজা উঠে দাঁড়াবো, তখন বুঝবি মজাটা।"

আমি হাঁটতে হাঁটতে পপলার কোভ'এ গিয়ে, পোস্ট অফিস আর মুদি দোকানের আশেপাশে বসে কাজে আসা নোংরা লোকগুলোর সাথে খোশগল্প মারতে লাগলাম। এক দেড়েলের কাছ থেকে শুনতে পেলাম,  ইবনেজার ডরসেটের ছেলে হারিয়ে গ্যাছে বা চুরি হয়ে গ্যাছে বলে গোটা সামিট শহর খুবই অস্থির। এটুকুই জানার দরকার ছিলো। আমি পাইপের জন্যে খানিকটা তামাক কিনলাম, ক্যাজুয়ালি বিউলির ডালের দাম জিজ্ঞেস করলাম, চুপি চুপি চিঠিটা পোস্ট করে, কেটে পড়লাম। পোস্টমাস্টারের কাছে শুনেছিলাম, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই রানার এসে  চিঠিগুলো সামিটে নিয়ে যাবে।
যখন ফিরলাম, দেখি বিল বা ছোঁড়াটা কেউই নেই। আমি গুহার আশেপাশের তল্লাট তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই দু' চারবার নাম ধরে চেঁচালামও, কিন্তু কোন পাত্তা নেই।
তো আমি পাইপ ধরিয়ে বসে রইলাম, দেখি কি দাঁড়ায়।

প্রায় আধা ঘন্টা বাদে, ঝোপঝাড় ভাঙার আওয়াজে মুখ ফিরিয়ে দেখি, বিল ঝোপ ঠেলে লেংচাতে লেংচাতে গুহার সামনের ফাঁকা জায়গায় ঢুকছে। ওর পিছনে একগাল হাসি নিয়ে বিচ্ছুটা স্কাউটের মত পা টিপে টিপে এগোচ্ছে। বিল থামলো, হ্যাট খুললো, একটা লাল রুমালে মুখ মুছলো, বিচ্ছুটা বিলের ঠিক আট ফিট দূরে থেমে গেলো।
"স্যাম রে," বিল বললো, "আমার মনে হয় তুই আমাকে এখন আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভাববি, সে তুই ভাব, কিন্তু আমার আসলে কিচ্ছু করার ছিলো না। আমি একজন পৌরুষদীপ্ত আত্মরক্ষাপ্রবণ পূর্ণবয়স্ক মানুষ, কিন্তু কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন অহংবোধ বা আত্মশ্লাঘা কিচ্ছু কাজ করে না, কিচ্ছু না। ছেলেটা চলে গ্যাছে। আমি ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। সব খতম," বিল বলেই চলেছে, "এককালে লোকে আত্মোৎসর্গ করতো, নিজের বিশ্বাস পরিত্যাগের চাইতে মৃত্যুযন্ত্রণাকেও শ্রেয় ভাবতো। কিন্তু তাদের মধ্যেও কাউকে আমার মত এমন অতিপ্রাকৃত অত্যাচার সহ্য করতে হয় নি। আমাদের কুকর্মের নীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকার খুব চেষ্টা করেছি রে, কিন্তু সহ্যের তো একটা সীমা আছে।"

"হয়েছেটা কি, খুলে বলবি?" আমি জিজ্ঞেস করলাম
"ওকে পিঠে নিয়ে আমাকে ছুটতে হয়েছে," বিল বললো, "রক্ষণবুহ্য বরাবর পাক্কা ৯০ মাইল, এক ইঞ্চিও কম হবে না। এর পরে যখন বসতিকারীদের রক্ষা করা শেষ হলো, ও আমাকে ওট খেতে দিলো। কিন্তু বালি, ওটের খুব একটা স্বাদু বিকল্প নিশ্চয় না। আর তারপরে,  একঘন্টা ধরে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে, গর্তের মধ্যে ফাঁকা থাকে কেন, রাস্তার দুই দিক হয় কেন, ঘাস সবুজ হয় কেন। তুইই বল স্যাম, মানুষের সহ্যশক্তির তো একটা সীমা থাকে। তো আমি ওর কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে পাহাড় থেকে নামালাম। নিচে নামার পথে আমার হাঁটু নিচে এলোপাথাড়ি লাথিয়েছে, কামড়ে বোধহয় আমার বুড়ো আঙ্গুল আর হাত থেকে দুই চার টুকরো মাংসও তুলে নিয়েছে।"
"কিন্তু ও চলে গ্যাছে," -- বিল বলেই চলেছে--, "ও বাড়ি চলে গ্যাছে। আমি ওকে সামিটের পথ দেখিয়ে, পিছনে এক লাথ মেরে আট ফিটের মত পথ এগিয়েও দিয়েছি। আমি খুবই দু:খিত দোস্ত মুক্তিপণের টাকাটা আমাদেরকে হারাতে হচ্ছে; কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিলো, হয় এটা, নয়তো বিল ড্রুশোল পাগলাগারদে।"
বলতে বলতে বিল হাঁফাচ্ছিলো, কিন্তু ওর নধর গোলাপি চেহারায় ফুটে উঠছিলো অনাবিল প্রশান্তি, আর পরিতৃপ্তির ছাপ।

"ইয়ে, বিল," আমি আস্তে করে বললাম, "তোর ফ্যামিলির মধ্যে কারো তো হার্টের সমস্যা নেই, তাই না?"
"নাহ," বিল বললো, "ম্যালেরিয়া আর দুর্ঘটনা ছাড়া তেমন দীর্ঘমেয়াদী কিছুই নেই।"
"তাহলে এক কাজ কর," আমি বললাম, "ঘুরে দাঁড়িয়ে তোর পিছনে তাকা।"
বিল ঘুরেই ছেলেটাকে দেখলো এবং ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, আর ও ওখানে ধপ করে বসে পড়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘাস পাতা কাঠি নাড়তে শুরু করলো। পরের একঘন্টা আমি ধরেই নিয়েছিলাম বিলের মাথা খারাপ হয়ে গ্যাছে। আমি ওকে বোঝাতে থাকলাম, যে আমার ফন্দীটা হচ্ছে পুরো কাজটা ঝটপট সেরে ফেলা, আর ডরসেট আমাদের প্রস্তাব মেনে নিলে আজ মাঝরাতের মধ্যেই মুক্তিপণের টাকাটা নিয়ে কেটে পড়া। তো বিল আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিলো। বিচ্ছুটার দিকে মুখ ফিরিয়ে দুর্বল একটা হাসি দিলো, এবং একটু সুস্থ বোধ করলে জাপান যুদ্ধে রাশিয়ানের ভুমিকায় খেলতেও রাজি হলো।

আমার ফন্দীটা ছিলো একদম পেশাদার কিডন্যাপারের  মত, পালটা ফাঁদ এড়িয়ে মুক্তিপণ হাতিয়ে নেয়া। যেই গাছের নিচে চিঠি, এবং পরবর্তিতে টাকা রাখার কথা, সেটা চতুর্দিক খোলা বিশাল ফাঁকা মাঠের পাশে। তো একদল পুলিশ যদি নজর রাখে, তো বহু দূর থেকে দেখা যাবে রাস্তা বা মাঠ দিয়ে কে আসছে যাচ্ছে। না, আমাকে এত বোকা ভাববেন না। সাড়ে আট বাজার অনেক আগেই আমি গাছে উঠে গেছো ব্যাঙের মত ডালের সাথে লেপ্টে বসে বার্তাবাহকের আসার অপেক্ষায় ছিলাম।
একদম সময়মত, একটা উঠতি বয়েসি ছেলে রাস্তা ধরে বাইসাইকেল চালিয়ে এসে, গাছের কাছে থেমে, বেড়ার ধারে কার্ডবোর্ডের বাক্সটা খুঁজে নিয়ে, একটা ভাঁজ করা কাগজ রেখে, ফের প্যাডেল করে সামিটের দিকে ফিরে গেলো।

আমি ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করে সিদ্ধান্তে এলাম, সবই ঠিকঠাক আছে। আমি গাছ থেকে নামলাম, নোটটা পকেটে পুরলাম, বেড়ার ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চট করে টপকে জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম, এবং আধা ঘন্টার মধ্যেই গুহার ধারে পৌঁছে গেলাম। আমি কাগজের ভাঁজ খুলে, লন্ঠনের কাছে নিয়ে বিলকে পড়ে শোনাতে লাগলাম। চিঠিটা কলম দিয়ে লেখা, হাতের লেখাও জঘন্য। সার সংক্ষেপ মোটামুটি এমন:

দুই বেপরোয়া ভদ্রমহোদয়,
আমার ছেলের মুক্তিপণ দাবী করে পাঠানো চিঠিটা, ডাক মারফতে আজকেই পেয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, আপনারা বেশ খানিকটা বেশিই দাবী করে বসেছেন, বরং আমি আপনাদের কাছে একটা পালটা প্রস্তাবনা রাখছি, যা আমার বিশ্বাস আপনারা সানন্দে গ্রহণ করবেন। আপনারা জনিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবেন এবং আমাকে নগদ আড়াইশো ডলার দেবেন, বিনিময়ে আমি আপনাদের হাত থেকে ওকে ছুটিয়ে নিতে সম্মত হবো। খুব ভালো হয়, যদি আপনারা রাতের দিকে আসেন, কারণ পাড়া পড়শি বিশ্বাস করে বসে আছে, ও হারিয়ে গ্যাছে, আর যদি ওরা কাউকে দেখে ওকে ফিরিয়ে দিয়ে যেতে, তাহলে ওরা তাকে যা করবে, তার দায় আমি নিতে পারবো না।
অত্যন্ত শ্রদ্ধাবনত,
ইবনেজার ডরসেট।

"পেনজান্সের জলদস্যু," আমি বললাম, "কি অসম্ভব ধৃষ্টতা--"
কিন্তু বিলের দিকে চোখ পড়তেই আমি থমকে গেলাম। ওর মুখ যেন অপার্থিব আলোয় উদ্ভাসিত।
"স্যাম," ও বললো, "মোটে আড়াইশো ডলার আর এমন কিই বা বল? আমাদের কাছে তো টাকা আছেই। আর একটা রাত ওর সাথে কাটাতে হলে, ছোঁড়াটা আমাকে ঠিকই পাগলাগারদে পাঠাবে। ডরসেট আসলে শুধু একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোকই নন টাকা পয়সা নিয়েও ভাবেন না তেম,  নয়তো এত উদারমনা প্রস্তাব কেউ দেয়। এই সুযোগ তুই কিছুতেই ছাড়ছিস না, তাই না?"
"সত্যি বলতে কি বিল," আমি বললাম, "এই ছোট্ট মেষশাবক আমার নার্ভের অবস্থাও খারাপ করে ফেলেছে। তাহলে এটাই ঠিক রইলো, ওকে আমরা বাড়ি নিয়ে যাবো এবং মুক্তিপণের টাকাটা পরিশোধ করে সটকে পড়বো।"
আমরা ঐ রাতেই ওকে বাড়ি দিয়ে এলাম। বাড়ি ফিরতে আমরা ওকে এই বলে রাজী করালাম, যে ওর বাবা ওর জন্যে একটা রূপোর কাজ করা রাইফেল আর একজোড়া মোকাসিন কিনেছে, এবং পরের দিন ওই রাফেল নিয়ে আমরা তিনজনে ভালুক শিকারে বেরোবো।

ইবনেজারের বাড়ির দরজায় যখন নক করলাম, তখন কাটায় কাটায় রাত বারোটা বাজে। মূল প্রস্তাবনা অনুসারে ঠিক যেই মুহূর্তে গাছের নিচের কার্ডবোর্ড বাক্স থেকে পনেরশো ডলার হস্তগত করার কথা, ঠিক সেই মুহুর্তেই বিল গুনে গুনে আড়াশো ডলার ডরসেটের হাতে তুলে দিচ্ছিলো।
ছোঁড়াটা যখন টের পেলো, ওকে আমরা বাড়িতে ফেলে যাচ্ছি, সপ্তস্বরে চিলচিৎকার জুড়ে দিলো, আর জোঁকের মত বিলের পা আঁকড়ে ধরে রইলো। ওর বাবা ওকে কাপড়ের তৈরী প্লাস্টার ছাড়ানোর মত করে আস্তে আস্তে ছুটিয়ে নিলো।
"ওকে কতক্ষন আটকে রাখতে পারবেন?" বিল জিজ্ঞেস করলো।
"এখন আর আগের মত শক্তি নেই আমার শরীরে," বুড়ো ডরসেট বললো, "কিন্তু আমার মনে হয়, অন্তত মিনিট দশেক সময় আপনাদের দিতে পারি।"
"যথেষ্ট," বিল জবাব দিলো, "দশ মিনিট সময়ের মধ্যে আমি দক্ষিন আর মধ্য পশ্চিমের স্টেটগুলো পার হয়ে কানাডিয়ান সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে যাবো।"

আর, তারপরে? রাতটা খুবই অন্ধকার ছিলো, বিলও খুব মোটাসোটা এবং আমি খুব ভালো দৌড়াতে পারি বলেই জানতাম, কিন্তু অবশেষে যখন আমি দৌড়ে বিল'এর ধারে কাছে পৌঁছাতে পারলাম, ও ততক্ষনে সামিট থেকে মাইল দেড়েক পেরিয়ে এসেছে।

ইতিহাস - ১ (এসাসিন)



জুন ১১৭৬, সারাসিন খলিফা সালাদিন, ক্রুসেডে ইউরোপিয়ানদের হটিয়ে তৃপ্ত হয়ে হোমগ্রাউন্ডে মনযোগ দিয়েছেন। সিরিয়ানরা খুব জ্বালাচ্ছে, সিরিয়া নিয়েই যখন এত যুদ্ধ, সিরিয়াকে বরং দখলই করে রাখা যাক। ঐ নিজারি শিয়াগুলোকে এই ফাঁকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হবে। হারামজাদাদের বড্ড বাড় বেড়েছে, অন্যদের তো দূরে থাক,  এত বড় খলিফা সালাদিন, একদম পাত্তাই দেয় না।  জেরুজালেমের রাজা প্রথম সুযোগেই সন্ধি করে ফেললো। সিরিয়ার অন্য শাসকেরাও জুলাই এর মধ্যেই বায়েত নিয়ে নিলো সালাদিনের। শুধু বাকি ঐ নিজারিদের ৯ টা দূর্গ, মোটে ৯ টা দূর্গই তো। কত আছে একেকটা দূর্গে যোদ্ধা - ৪/৫'শ করে, তাও আবার আলাদা আলাদা,  ফুউউহ, ঝড়ের মত উড়ে যাবে, এলিট মিশরিয় বাহিনীর কাছে।

আগস্ট ১১৭৬, ১৫ হাজারের এলিট ইউনিট সাথে রেখে বাকি ৪০/৫০ হাজারকে মিশরের পথে রওনা করিয়ে দিলেন সালাদিন। ঝড়ের মত ঢুকে পড়লেন সিরিয়ার আন-নুসারিয়া পার্বত্য অঞ্চলে। ইচ্ছা, এমাথা থেকে ওমাথা সুইপ অপারেশন, নাজারিরা খতম। গোটা এলাকা তছনছ করে ফেললেন সালাদিন ১৫/২০ দিনে, কিন্তু একটা দূর্গও দখল হলো না। প্রত্যেকটা দূর্গ পাহাড়ের মাথায়, চারদিক থেকে আক্রমণ সম্ভব না, অবরোধ না করে উপায় নেই। আর ৯ টা দূর্গ আলাদা আলাদা করে অবরোধ করতে হবে। কি মুশকিল! বেশ সিজই যখন করতে হবে, সবার আগে মাথা, মাসিয়াফ দূর্গ অবরোধ করতে হবে আগে, খবর আছে ওদের নেতা,  রাশিদ আদ-দিন সিনান মাসিয়াফেই আছে। একঢিলে দুই পাখি। এবার নিজারিদের একদিন কি সালাদিনের একদিন।

মাসিয়াফ দূর্গটা খুব বিশাল না, কিন্তু দুর্ভেদ্য। কারণ পেছনে খাড়াই, দুপাশে খাদ, শুধু সামনে থেকে আক্রমণ করা যায়। ১৫ হাজার সৈন্য, বারে বারে হামলা চালানো যাবে সিজ ইঞ্জিনগুলো দিয়ে। আর তাতেও যদি কাজ না হয়, গেঁড়ে বসে থাকলেই তো হবে, সাপ্লাই বন্দ হয়ে গেলেই ওরা কাত। কতমাস আর চলবে স্টোর দিয়ে। বিশাল ক্যাম্পের সুরক্ষাবুহ্যের মাঝখানে অন্তত ৩/৪ টে ডিকয় রেখে চতুর্দিক আগুন জ্বালিয়ে তাঁবুর চারপাশে শুকনো পাতা বিছানো, শব্দ গোপন করে কারো আসার কোন সুযোগ নেই, নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন সালাদিন। হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলো, আচমকা। পেশাদার যোদ্ধার প্রশিক্ষিত সতর্কতা সালাদিনের। চোখ মেলেই দেখলেন, একটা ছায়ামূর্তি তাঁবুর পাশ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো। মাথার পাশে বালিশে ছুরি দিয়ে গাঁথা একটা ত্রিকোন প্রতীক, হাসাসিনদের প্রতীক, মানে ওটা বিষাক্ত ছুরি। তাতে একটা চিঠি আটকানো:
"মহামান্য খলিফা, ইচ্ছা করলেই ছুরিটা বালিশে না গেঁথে, আরো নরম কোথাও গাঁথা যেত। কিন্তু আপনাকে বোঝানোটাই জরুরী ছিলো। আপনাকে মেরে ফেলার কোন ইচ্ছা আমাদের নেই। আমাদেরকে আমাদের মত থাকতে দিন, নিজেও সুস্থ থাকুন। আমরা আপনার বন্ধু না হলেও শত্রু নই। আমি নিজে না এসে অন্য কাউকেও পাঠাতে পারতাম। কিন্তু আপনার সম্মানার্থে, আমি নিজেই প্রস্তাব রেখে গেলাম। চলে যান এখান থেকে, আমাদের তরফ থেকে আপনার উপরে আর কোন হামলা হবে না -- রাশিদ আদ-দিন সিনান, আমির-ই-হাসাসিন"
সালাদিন দুদিন পরেই মিশরের পথে ফিরতি যাত্রা করেন। ১১৭৬ সাল ছিলো ৩০০ বছরেরও বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করা হাসাসিনদের প্রাইম টাইম, যৌবনকাল বলা যায়। ১১৭৩ থেকে, ৩ বছরে সালাদিনকে অন্তত ৫ বার খুন করার চেষ্টা করেছিলো তারা। এই ৩০০ বছরের মধ্যে ওরা অন্তত দুই জন খলিফা, আর অসংখ্য অসংখ্য উজির, সুলতান আর ক্রুসেড নেতাদের খুন করেছে, ছোটখাটো তো ছিলোই। গুপ্তঘাতকের ল্যাটিন পরিভাষা, Assassin, এই হাসাসিনদের থেকেই এসেছে।

এই কাহিনীর শুরু ১০৭০ এর দিকে, মিশর এবং আরব তখন শিয়া ফাতিমিদ খিলাফত এবং খলিফা একজন ইসমাইলি শিয়া, আল-মুস্তান। পারস্য, ইরাক ও সিরিয়া তখন সুন্নী সেলজুকদের দখলে। পারস্য শাষন করছে  গ্রান্ড উজির নিজাম-উল-মুলক, নিজের চরম শিয়া বিদ্বেষী । পারস্যের ১৭ বছরের তরুণ স্কলার হাসান-ই-সাব্বাহ একজন শিয়া সে ফাতিমিদ খলিফার আনুগত্য স্বীকার করলো, কয়েক বছরেই ফিদাই (সাধারণ সমর্থক) থেকে দায়িই (আদর্শ প্রচারক) তে পদোন্নতি হলো, এবং নিজাম-উল-মুলক'এর কোপানলে পড়ে গেলো। পারস্য এখন বিপদজনক, তাই হাসান ভাবলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র কায়রো ঘুরে আসা যাক, জ্ঞানও অর্জন হবে, খলিফাকেও দেখা হবে, আর খলিফাই তো ইসমাইলিদের ইমাম। ১০৭৬ এ রওনা দিয়েও পারস্য থেকে কায়রো যেতে দুই বছরের বেশি লেগে গেলো হাসানের। কারণ, পথে যতগুলো বড় শহর পড়েছে সবখানেই কিছুদিন থেকে মানুষের চিন্তাভাবনা, পলিটিকাল ধারণা, ধর্মীয় নেতাদের ভাবনা, এগুলো স্টাডি করছিলো হাসান। ফাইনালি হাসান যখন ১০৭৮ এ কায়রো পৌঁছালো, সেখানে তখন প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলছে। মুস্তানের বড় ছেলে নিজার, স্বাভাবিকভাবেই পিতার মৃত্যুর পরে তার খলিফা হবার কথা। কিন্তু প্রধাণ সেনাপতি বদর আল-জামালির ইচ্ছা পুরোই ভিন্ন কিছু। হাসানের খবর সবাই আগেই জানতো  তাই উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলো। কিন্তু  নাজিরকে সমর্থন দেয়ার কারণে সেনাপতি বদর তাকে জেলে পুরে দিলো, এবং কোন এক রাতের অন্ধকারে বন্দী হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর থেকে পারস্যের জাহাজে উঠিয়ে দিলো।

জাহাজ যখন দামাস্কাস বন্দরের কাছাকাছি তখন ঝড়ে পড়ে জাহাজ বিদ্ধস্ত হয় এবং হাসান সিরিয়ারই কোন এক উপকূলে ভেসে যায়। পরের ১০ বছরে হাসানের একটাই উদ্দেশ্য ছিলো, এই নাজির সমর্থক ইসমাইলি বা নিজারি ইসমাইলিদের সংগঠিত করা। সিরিয়া পারস্য আর ইরাকের সমস্ত এলাকা ঘুরে সবথেকে নিবেদিতদের নিয়ে বড় আকারে হাসাসিন (কোড অফ হাসান) নামে একটা এক্সিকিউটিভ গোষ্ঠী  তৈরী করে  এবং তাদেরকে মেরিট অনুসারে তিনটে ইউনিটে ভাগ করে ১) দাইই (প্রচারক) ২) রাফিক (প্রচারণা সঙ্গী) ৩) লাসিক (অনুগত নির্বাহক)। ততদিনে নিজাম উল মুলক'এর টনক নড়েছে, একা হাসানই যথেষ্ট মাথা ব্যাথার কারণ ছিলো ১২ বছর আগে, এবারে সে দলবল নিয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সেনাবাহিনী পাঠায় নিজাম, হাসানকে দলবলসহ চিরতরে বিনাশ করতে। হাসান তার দল নিয়ে আল বুর্জ পার্বত্য অঞ্চলের এত গভীরে ঢুকে যায়, যে গোটা পারস্য ফোর্স দিয়েও হয়তো ওদের খুঁজে বের করা সম্ভব না। ওখানে গা ঢাকা দিয়ে থাকা অবস্থায় হাসান ভাবতে থাকে, নিজেদের একটা শক্তিশালী আস্তানা দরকার, যেখান থেকে নিজেদের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা যাবে। তার মনে পড়ে বেশ কিছুদিন আগে দেখা, আলামুত নামে একটা পার্বত্য দূর্গের কথা।

তৎকালীন পারস্যের রুদবার নামে পার্বত্য এলাকায়, পর্বতশ্রেণীর মাঝে ৫০ কিলোমিটার লম্বা ও ৫ কিলোমিটার চওড়া একটা উপত্যকার মাথায় অবস্থিত আলামুত দূর্গ, প্রাকৃতিক সুরক্ষায় সুরক্ষিত। শোনা যায়, প্রায় বিনা রক্তপাতে দখল করেছিলো আলামুত। প্রথমে ঐ এলাকায় দাইই এবং রফিকদের পাঠানো হয়, যারা আলামুত উপত্যকার সাধারণ মানুষের মন জয় করে তাদের নাজারি ইসমাইলি আদর্শে দীক্ষিত  করে। এরপরে ১০৯০ এর দিকে সাধারণের সাথে ভিড়িয়ে দেয়া হয় লাসিকদের এবং লাসিকরা দূর্গে অনুপ্রবেশ করেই দূর্গাধিপতি এবং তার কাছের লোকজনকে জিম্মি করে ফেলে। ফলাফল, প্রায় বিনা রক্তপাতে দূর্গ দখল। এর পরে আরো ৩৫ বছর জীবিত ছিলো হাসান-ই-সাব্বাহ, কিন্তু একদিনের জন্যেও আলামুত ছেড়ে বের হয় নি। ব্যস্ত ছিলো দর্শন, স্থাপত্য, জ্যোতির্বিদ্যা, এলকেমি, চিকিৎসা শাস্ত্র ও গণিত নিয়ে গবেষনায় এবং অবশ্যই হাসাসিনদের প্রশিক্ষন ও নিজারি ইসমাইলি দর্শন প্রচার,  প্রসার এবং নীতি নির্ধারণে।

হাসাসিনিদের প্রশিক্ষন শুরু হতো ১০/১২ বছর বয়স থেকে। ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক আচরণ এবং পাশাপাশি অস্ত্রকৌশল বিশেষ করে নাইফ ফাইটিং, ছদ্মবেশ, আত্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সমরকৌশলের শিক্ষা দেয়া হতো। ৭/৮ বছরের মধ্যেই ওরা হয়ে উঠতো লিভিং উইপন, ফিদায়ান (আত্ম নিবেদিত যোদ্ধা)। যেকোন মূল্যে সিভিলিয়ানদের উপরে কোন আঘাত নয়, এই ছিলো ওদের কৌশল। যে কোন এলাকায় গিয়ে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে একদম মিশে যেত একজন হাসাসিন। টার্গেটের সাইকোলজি স্টাডিও ওদের কৌশলের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। শোনা যায় একটা এসাসিনেশন প্রচেষ্টার শারীরিক ও মানসিক শক্তিবৃদ্ধি ও স্থিরতার জন্য শেষ ধাপের আগ মুহুর্তে ওরা হাশিশ ব্যবহার করতো, যদিও এই হাইপোথিসিস তর্কস্বাপেক্ষ। সচরাচর বিষ মাখানো ছুরিই ব্যবহার করতো ওরা খুনের জন্যে এবং খুনগুলো করা হতো সর্বসম্মুখে,  যেন লোকে বোঝে এটা হাসাসিনদের কাজ। আতঙ্ক সৃষ্টি করা হাসাসিনদের রাজনৈতিক কৌশল। কালক্রমে শুধু এই হাসানের কাল্টকেই নয়, গোটা নিজারি ইসমাইলি সেক্টকেই হাসাসিন বলার চল শুরু হয়। পারস্য এবং সিরিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের আলাদা আলাদা এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠে নিজারি ইসমাইলি রাষ্ট্র এবং পুরোটাই হাসাই-ই-সাব্বাহ'র জীবৎকালে।

হাসাসিন রাষ্ট্র গঠনের প্রধান পদক্ষেপ ছিলো নিজাম-উল-মুলক'কে হত্যা এবং হত্যাকান্ড ঘটানো হয় প্রকাশ্য দরবারে। নিজাম-উল-মুলকই প্রথম হাই প্রোফাইল খুন। সেলজুকেরা প্রথম থেকেই হাসাসিনদের উচ্ছেদের প্রচেষ্টা চালায়, ফলস্রুতিতে ওদের অন্তত ৫ জন সুলতান খুন হয় এদের হাতে। মিশরের ফাতিমিদ খিলাফতকে উচ্ছেদ করার পরে সুন্নি খলিফারা ইসমাইলিদের উপরে অত্যাচার শুরু করে, সে সময় অন্তত দুই জন খলিফা খুন হয় হাসাসিনদের হাতে। গ্রান্ড মাস্টার রাশিদ আদ-দিন সিনানের সময়ে হাসাসিন এবং সারাসিনদের কমন শত্রু হয়ে দাঁড়ায় ক্রুসেডাররা। সালাদিন, রাশিদের সাথে সন্ধি চুক্তি করে এবং হাসাসিনরা বেশ কিছু বড় বড় ক্রুসেড নেতা ও জেনারেলকেও খুন করে। এও শোনা যায়, কিং রিচার্ডের সাথেও একটা সময় সন্ধি চুক্তি হয় রাশিদের, রাশিদের মধ্যস্ততায়ই সালাদিন ও রিচার্ড সাময়িক সন্ধি করে এবং সারাসিন ও ক্রুসেডারদের মধ্য থেকে সুবিধাবাদী পঁচা আপেলদের খতম করে ফেলা হয়, অবশ্যই হাসাসিনদের সাহায্যে। সাইকোলজিকাল ওয়ারফেয়ারও হাসাসিনদের পছন্দের কৌশল ছিলো, খুন করার ঝামেলায় না গিয়ে ভয় দেখিয়ে সাবমিশনে বাধ্য করা। সেলজুক সুলতান মোহাম্মদ তাপারকে খুন করার পরে ওর ছেলে সাঞ্জার যখন সুলতান, সালাদিনের মত একই পদক্ষেপ নেয়া হয়, হাসাসিন দূতকে দরবার থেকে চাবকে বের করে দেয়ার পরে। সাঞ্জার ভয় পেয়ে শুধু হাসাসিন এলাকার ট্যাক্সেশনই বন্ধ করেনি, ঐ এলাকার সমস্ত টোল আদায়ের অধিকারও হাসাসিনদের দিয়ে দেয়। পারস্য থেকে তুরষ্ক, সিরিয়া থেকে মিশর, যখনই যেখানে নিজারি ইসমাইলিদের উপরে আঘাত এসেছে, হাসাসিনরা সেখানেই অপারেট করে গ্যাছে প্রায় দুইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

১২৫০ এর দিকে হাসাসিনরা একটা ভুল পদক্ষেপ নিয়ে বসে। মোঙ্গল শাসক মোংকে খানকে এসাসিনেট করে। পরবর্তি খান, হালাকু ক্ষমতায় বসেই প্রধান সেনাপতি কিতুবাকে নিযুক্ত করে হাসাসিনদের ঝাড়ে বংশে বিনাশ করতে। ১২৫৩ থেকে কিতুবা হাসাসিনদের ৯ টা দূর্গে উপর্যুপরি হামলা চালিয়েও যখন সুবিধা করতে পারলো না, হালাকু খান স্বয়ং আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে আসে ১২৫৬ তে। ফাইনালি ১২৫৬'র ডিসেম্বরে আলামুত দূর্গ অবরোধ করা হয়। প্রায় ৩/৪  মাসের অবরোধে থাকার পরে হাসাসিনরা গোপন পথে আলামুত ছেড়ে চলে যায়। ১২৭৫ এ ফের আলামুত দখল করে হাসাসিনরা, কিন্তু ততদিনে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা নি:শেষিত। হাসাসিনদের পারস্য ফ্রাকশন শ্রেফ মিলিয়ে যায়। কিন্তু সিরিয়া ফ্রাকশনকে তৎকালীন মামলুক সুলতাম বাইবার ১২৭৩ এ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। পরবর্তি ১০০ বছরে মামলুকরা হাসাসিনদের নিজেদের কাজে লাগাতো। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা, মামলুক সালতানাত ভ্রমণের সময় হাসাসিনদের সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছিলো, যেমন খুন প্রতি ফিক্সড রেট কত। কিন্তু শেষপর্যন্ত হাসাসিনরা তাককিয়া (আদর্শ ও আত্মপরিচয় গোপনের নীতি) অবলম্বন করে অপেক্ষা করতে থাকে, কবে তাদের মধ্য থেকে একজন গ্রান্ড মাস্টার উঠে আসবে এবং ফের তারা পূর্বের গৌরবে ফিরবে। এভাবেই মোটামুটি ৩০০ বছরের মধ্যেই সে যুগের সবথেকে দুধর্ষ ও আতঙ্কজাগানিয়া হাসাসিন গোষ্ঠী বিলুপ্ত হয়ে যায়। উল্লেখ্য এই নিজারি ইসমাইলিদেরই একটা সেক্ট পরবর্তিতে আগাখানি শিয়া নামে পরিচিত হয়।

যাপিত জীবন - ১০

সমস্যাটা ছিলো, আমরা বাইকটাকে খুব বেশি ভালোবাসতাম। আমরা মানে আমি আর আমার দেন ক্লোজেস্ট ফ্রেন্ড অনুপম। প্রায় তিনবছর আমরা একই সাথে আছি , আর বাইকটাও আমাদের সাথে আছে দুবছরের বেশি, একটা সিলভার কালার CBZ। মোডিফিকেশনের মহামারি শুরু ব্যাঙ্গালোরে শুরু হয়েছিলো মোটামুটি ২০০১ থেকেই, কিন্তু অনুপম বাইকটা কিনলো পরের বছর। ছোটখাটো সাইজ ওর, মাত্র ৫ ফিট ৪, অতবড় আর ভারি বাইকটার সাথে একাত্ম হতেও ওর কিছু সময় লেগে গেলো। তাই আমরা যখন মোডিফিকেশনে নামলাম, ততদিনে খুব সম্ভব ব্যাঙ্গালোর শহরের ইয়ংস্টারদের পাছার নিচে থাকা সবগুলো সিবিজি'ই মোডিফায়েড। অনেক হিসাব করে দেখলাম, যদি রেডি এক্সিলারেশন ফিচার আনতে যাই, তাহলে টপ স্পিড কমে যাবে, আর এটা তো স্পোর্টস বাইক না, যে আহামরি রেসিং ফিচার পাওয়া যাবে আলটিমেটলি। রেডি এক্সিলারেশনের জোরে বাকি বাইকগুলো হয়তো ৪০ বা ৫০ পর্যন্ত স্পিড আমাদের কয়েক সেকেন্ড বা একমিনিট আগে তুলবে, কিন্তু তারপরে? তাই আমরা ইঞ্জিনের ক্যাপাসিটি বাড়ানোয় জোর দিলাম, ২০০৩ এ এসে ব্যাঙ্গালোর শহরে আর কোন ১৫০ সিসি বাইক ছিলো না যেটার টপ স্পিড ১২৫ পার করতে পারে, আমাদেরটার টপ স্পিড চেক করেছিলাম, ১৩৪। তার মানে আমরা যখন তখন অন্যদের চাইতে বেশি স্পিড রিজার্ভ রাখতে পারছি, স্পোর্টস বাইক ছাড়া আসলে শহরের মধ্যে বা বাইরে, রেসে আমাদের বাইককে টপকাতে পারে নি আর কোন বাইক ২০০৩ এর মাঝামাঝি থেকে। স্পোর্টস এর সাথে টক্কর দেয়ার বোকামি আমরা করিও নি, কারণ এ অসম্ভব ব্যাপার। এরপরে ভাবা হলো, স্পিড তো বেশি ওঠে, এবারে টার্নিংগুলোর দিকে মনযোগ দেয়া দরকার। চাকার টর্ক আর গ্রিপের সমস্যায় টার্নিং এ স্পিড কমিয়ে ফেলতে হয়, সাহসে কুলায় না স্পিড বেশি রেখে বাইক বেশি কাত করতে। তাই আমরা সবদিক বিবেচনা করে পিছনের চাকার ফর্মেশনই পালটে দিলাম, পিছে বাজাজ এলিমিনেটরের মোটা এবং খাটো চাকা লাগানো হলো, এতে ১৩২ স্পিড হয়তো আর পাবো না, কিন্তু ১২৫ এর নিচে তো নামছে না, আর টার্নেও বেশি স্পিডের সুবিধা পাচ্ছি টর্ক আর গ্রিপের কারণে। প্রমাণ পেয়েছিলাম উলসুর লেকে রোডে একবার আচমকা ঢুকে পড়ে। রাস্তাটা আমাদের পরিচিত ছিলো না, যখন ঢুকলাম, অন্তত ১০০ স্পিড আচমকা সামনে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি বাঁক, স্পিড কমানোর সময় নেই, কন্ট্রোল চলে যাবে, টার্নে যখন এলাম, স্পিড ৭০ এর কাছাকাছি, নিখুঁত টার্ন হলো, বিষ্ময় উপভোগ করারও সময় পেলাম না, মুহুর্তে ডানে বাঁয়ে আরো তিনটে একই রকম বাঁক এলো, যখন বেরিয়ে এলাম, স্পিড তখনো ৬০, ওয়াও, যাস্ট ওয়াও। বাইকটাকে অসম্ভব ভালোবাসতাম, আমরা দুজনেই শুধু না, আমাদের টিমের বাকি ৯ জনও।

আমাদের সময় শেষ হয়ে গেলো ২০০৪ এ। ফাইনাল দিয়ে এবারে দেশে ফেরার পালা, কিন্তু বাইকটার কি হবে? কি আবার হবে, দেশে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কিভাবে? বাইক নিয়ে আমাদের যত নলেজ, এসব আইন কানুন নিয়ে তো তার ১০% ও নেই। ব্যাঙ্গালোর থেকে কোলকাতা নিয়ে তারপরে বাংলাদেশে ঢোকাতে হবে। আমরা বোকাচোদা পোলাপান, ভাবলাম, বাইকও হয়তো ল্যাপটপেরই মত বগলদাবা করে বর্ডার পার করা যাবে। আসলে অন্য কিছু ভাবা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না, সেপারেটেড কি করে হবো, আমাদের সুইটহার্টের থেকে। ফার্স্ট স্টেপ ফার্স্ট, ব্যাঙ্গালোর আরটিএ'তে এপ্লিকেশন এবং ফি দিয়ে এনওসি নেয়া হলো, ওয়েস্টবেঙ্গলের জন্যে। এই কাগজের বলে ওয়েস্টবেঙ্গলে নিশ্চিন্তে বাইক চালানো যাবে। এদিকে ওয়েস্ট বেঙ্গলের বা বাংলাদেশের মডেলের সাথে ওদিকের মডেলের খানিকটা ডিফারেন্স আছে, তাই যেখানে যেখানে যা স্পেয়ার দরকার সেগুলো ব্যাঙ্গালোর ছাড়ার আগেই লাগিয়ে ফেলা হলো, ফলে ট্রেনে বাইক বুকিং দিয়ে আমাদের দুজনের রিজার্ভেশন যখন করানো হলো, আমাদের হাতে আর টাকা প্রায় নেই বললেই চলে। লেকিন, কুছ পরোয়া নেহি, সোনারপুরে অনুপমের প্রচুর আত্মীয় থাকে, বড়মামা , পিসতুতো দিদি, আরো কে কে যেন।  আমরা ওখানেই কিছুদিনের পিটস্টপ নেবো, অনুপমের বাবা টাকা পাঠালে আমরা নেক্সট চিন্তা করে দেখবো। অনুপমদেরও  একটা জায়গা কেনা আছে সেখানে, খানিকটা তদারকিও হবে। রথ দেখা, কলা বেচা, ইত্যাদি ইত্যাদি। আহোয়, সোনারপুর, উই আর কামিং।

জানা গেলো স্টেশন থেকে বাইক ছাড়াতে আরো হাজারখানেক ঢালতে হবে এবং অন্তত ৩/৪ দিন পরে দেবে। সো, অনুপমের টাকা আসা পর্যন্ত ওয়েট করতেই হবে। নো প্রব্লেমো , আমরা মামাবড়ি উপভোগ করতে লাগলাম। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো, পরদিন বাইক রিলিজ করা যাবে, আমরা হাইলি ইলেটেড। ট্রেনে তুলে দেয়ার আগে আমরা মাস্ক খুলে রেখেছিলাম, কারণ প্রায় আড়াই হাজার কিলো ট্রেন রাইডের পরে মাস্ক অক্ষত থাকবে এই ভরসা ছিলো না। ট্যাঙ্কও খালি করে রেখেছি, কারণ এমনিতেই খালি হয়ে যেত। সেই শুভদিনে আমরা দুজনে বাইকের মাস্ক, আর এক লিটারের বোতলে হাফ লিটার তেল নিয়ে ট্রেনে চাপলাম, সকালে ৮ টার দিকে, দুগগা দুগগা। ১০ টার মধ্যে হাওড়া স্টেশন, পেপারস জমা দিয়ে যা জানলাম, ১ টার আগে আর বাইক পাওয়ার সুযোগ নেই,  ওয়েস্ট বেঙ্গল অথরিটিকে খিস্তাতে খিস্তাতে আর আহা ব্যাঙ্গালোরে কি স্বর্গে ছিলাম ভাবতে ভাবতে অপেক্ষা করছি, ৩ ঘন্টা অপেক্ষা, চাট্টিখানি কথা নাকি, তাও আবার আমাদের মত এডিএইচডি'র পক্ষে। মনের দু:খে হাওড়া স্টেশনের পাশে গাঁজা খুঁজে বের করে ফেললাম, ইয়ে মানে গাঁজার স্পট বের করার আনক্যানি ক্ষমতা ছিলো আমার আরকি। আমরা ভুলে গেছিলাম, ওটা মে মাস, কোলকাতায় পিচগলা গরম পড়ছে, তিন বছর হয়, যেই গরমের সাথে আমাদের সাক্ষাত হয় নি। গাঁজা ফাজা খেয়ে আর প্রচন্ড গরমে আমরা দুজনে কেলিয়ে গেছি ১২টার মধ্যেই, জিভ বেরিয়ে গ্যাছে। আশেপাশে ঠান্ডা বলতে শুধু স্টেশন, কিন্তু কতক্ষন স্টেশনের মধ্যে থাকা যায়, তাও যদি মেইন স্টেশন আর স্টোরেজ কাছাকাছি হতো। ফাইনালি আমরা বাইক পেলাম, আড়াইটা নাগাদ। মাস্ক লাগানো হলো, টুকলিট সাথেই ছিলো, ট্যাঙ্ক চাবিতে খোলে না , বিশেষ ভাবে চাপ দিয়ে খুলতে হয়, এটা ঠিক করাতে খেয়াল ছিলো না, তেলও ভরা হলো, বাইকে উঠে স্টার্ট দেবে, কিন্তু চাবি? আমরা চাবি ফেলে এসেছি। মনে হলো বাইকটা ফেলে রেখে, ওখানেই শুয়ে পড়ি, সে কি আর সম্ভব। বাইক স্টার্ট দিতে হবে, সিনেমায় দেখায় ফটাফট দুটো তার টেনে হট ওয়ারিং করে স্টার্ট দেয়া যায়, বাস্তবে অত মাখনের মত মোলায়েম কাজ নয়, ফের মাস্ক খোলো, তারগুলো সামনে আনো, কোনটা লুজ করতে হবে, কোনটা জোড়া দিতে হবে এই করতেও আধা ঘন্টা। এর মধ্যে ইনফো নিয়ে নিলাম, এই দেড় দুই কিলো পরেই অমুক মোড়ে চাবিওলার দোকান, সেও খুঁজে বের করতে আধাঘন্টা, চাবি বানানো, মেকানিকের দোকান বের করে ফের ঠিকঠাক করা, তেল নিতে নিতে ৪ টে। সব ঠিক বেরিয়েই এক আধা মাতাল ট্রাফিক পুলিশ ৫০ টাকা খেয়ে নিলো, কিসের কাগজ কিসের কি, কিছুই মানতে রাজি না, টাকা দিতেই হবে। এদিকে কোলকাতা থেকে বেরোনোর রুটও জানি না। আমি চিন্তা করলাম, রুট জানতে চাইবো ট্রাফিক পুলিশের কাছেই, তাহলে ওরা আটকে টাকাও খেতে চাইবে না, আবার ঠিকঠাক বলবেও। এভাবেই আমরা খোঁজ পেলাম, ইএম বাইপাসের এবং ফাইনালি বিকাল ৬ টা নাগাদ সোনারপুর,  আমরা তখন বিধ্বস্ত।

আরো দিন দশেক ছিলাম, সেবারে। সোনারপুর এলাকা চষে ফেলা হলো, প্রায় প্রতিদিন একবার কোলকাতা আসতাম, একটা না একটা ছুতো বাধিয়ে। কোলকাতার কিছুই চেনা হয় নি, কারণ আমার এসবে তুমুল আগ্রহ থাকলেও অনুপম বড়ই নিরাসক্ত মাল। ফাইনালি এক ভোরে, আমরা ট্যাক্সিতে মালপত্র তুলে, বনগাঁ বর্ডারের দিকে রওনা দিলাম, আমি ট্যাক্সিতে, অনুপম বাইকে। এই লম্বা রাস্তা আর অপরিচিত এলাকা, আমাকে বাইক চালাতেই দেবে না। আমার কি? বুঝবে মজা অনুপম। বর্ডারে এলাম বোধহয় ১১ টার দিকে, এবারে ছোটাছুটি শুরু হলো, বাইক কিভাবে পার করা যায়। প্রায় ২/৩ ঘন্টা এখানে ওখানে দৌড়ে জানলাম, উঁহু, ওসব হবে না, বিআরটিএ'র ছাড়পত্র আনতে হবে আগে বাংলাদেশ থেকে তবেই বর্ডার ক্রস করতে দেবে, আমরা শ্রেফ হাল ছেড়ে বসে পড়লাম। উপায় একটা আছে, বাইকটা স্মাগল করানো তারপরে কাস্টমসে ধরিয়ে দেয়া, ওরা যখন অকশনে তুলবে তখন সেখান থেকে কিনে নেয়া, কিন্তু এটা যদি কাস্টমস খেয়ে ফেলে, কোন গ্যারান্টি নেই। ফাইনালি ডিসিশন নেয়া হলো, ওপারে নেয়া যাবে না, এপারেই রাখতে হবে, কিন্তু কোথায়? বাড়িতে পরামর্শ করে জানা গেলো, ২৫/৩০ কিলো দূরে, ভোমরা বর্ডারের কাছে গ্রামে ওদের পরিচিত লোক আছে সেখানে রাখা যাবে, আপাতত:, কিন্তু সে পর্যন্ত যেতে হবে তো, গ্রামের রাস্তায় বাইক চালানো মুখের কথা নাকি, আমি নোভাইস, অনুপমের আর শরীরে কুলাচ্ছে না। অত:এব খুলনা থেকে আমাদের এক ফ্রেন্ড সোহেলকে ডেকে আনা হলো, ৩০০ টাকায়, টারজান ভিসায় এপারে আনা হলো,  আমি দুজনের ব্যাগেজ নিয়ে বর্ডার ক্রস করলাম, টারজান ভিসাওয়ালাদের অফিসে অনুপমের ব্যাগ দুটো রেখে বাড়ির পথ ধরলাম, ওরা ওপারে বনগাঁ থেকে ভোমরা।

২)
জুলাইতে আমরা ফের ব্যাঙ্গালোর যাবো, মার্কসশিট, টিসি ইত্যাদি ইত্যাদি তুলতে হবে। আর যাওয়ার পথে ভোমরা থেকে বাইক কালেক্ট করবো, তাই মাল্টিপল বর্ডার এন্ট্রি ভিসা এবারে। আমি দুদিন আগেই খুলনায়, হয়তো এবারেই শেষবারের মত যাচ্ছি আমি ইন্ডিয়া, মন যথেষ্ট খারাপ, তুমুল আড্ডাবাজি করে নেয়া যাক। মেলা রাত পর্যন্ত মেলা গাঁজা খেয়েছি, বর্ডার পার হবার দিন সকালে তাই দুজনের ফিজিকাল কন্ডিশনই নড়বড়ে। আমাদের দুজনের জিনিস অনুপমের বিশাল হ্যাভারস্যাকে ভরা, অনুপম বাইক চালাবে, আমি পিঠে হ্যাভারস্যাক ঝুলিয়ে পিছে বসবো, অনুপমের এত ফিজিকাল স্ট্রেন্থ বা ব্যালান্স নেই, যে ওই বড় আর ভারি ব্যাগ সামলাবে, তাই ওই চালাবে। ভোমরা বর্ডার সচরাচর স্টুডেন্ট ভিসাধারী পায় না, তাই আমরা অলমোস্ট ভি আই পি ট্রিটমেন্ট পেলাম, এত স্মুদ ইমিগ্রেশন কাস্টমস আগে কখনো হয় নি। ওয়েল, মর্নিং শোজ দা ডে, আমরা খুবই আহ্লাদিত, সবই ঠিকঠাক হবে। কিন্তু, বর্ডার যখন পার হলাম তখন ১ টা পার হয়ে গ্যাছে, ঐ গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরো আধা ঘন্টা, বাইক নিয়ে তেল ভরতে ভরতে প্রায় ৩ টে। গ্রামের লোকে অতিথিপরায়ন, দুপুরে না খাইয়ে ছাড়লোই না। এবারে বাইক স্টার্ট দিয়ে রওনা হবার পরে দেখি, একি, আওয়াজ এমন কেন? কি স্মুদ রেসিং কন্ডিশনের বাইক, খুব লাইট আওয়াজ ছিলো, এখন এমন খড়খড়ে আওয়াজ করছে কেন? গিয়ার ফেলতে এত কষ্ট হচ্ছে কেন? ৪০ এর উপরে স্পিড তুললেই এমন ভাইব্রেশন কেন? হারামজাদারা গ্রামের রাস্তায় চালিয়ে বাইকের কন্ডিশন হেল করে ফেলেছে। গাঁড় মেরেছে, এভাবে যদি ৬০ এর উপরে স্পিডই না তুলতে পারি সোনারপুর তো সোনারপুর, কোলকাতাই পৌঁছাতে পারবো না আজ। সবথেকে বড় কথা রাস্তা তো জিজ্ঞেস করে যেতে হবে, আমাদের পরিচিত না। আর আমাদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে, আমরা ভোমরা থেকে বনগাঁ হয়ে না গিয়ে মাঝখান থেকে শর্টকাটে গেলে কম পথ পড়বে, এখন তো সাহসেই কুলাচ্ছে না, কি করা যায়? নেক্সট যেই শহর পড়লো, সেখানে এক চায়ের দোকানে বসে চা সহকারে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে আমরা আলোচনা করছি নেক্সট মুভ। আমাদের বন্ধু সঞ্জয়ের ফ্যামিলি, এই মাস ৭/৮ হলো কুমিল্লা থেকে বারাসাত শিফটেড হয়েছে। তো আমাদের উপায় এখন একটাই, এনিহাউ বারাসাত পৌঁছানো , সঞ্জয়দের বাড়ি, কোলকাতার কথা আর ভাবছিও না।

আমাদের আলোচনা শুনে চায়ের দোকানের কয়েকজন নিজেদের মধ্যে অনেক তর্ক বিতর্ক করে পরামর্শ দিলো, এই রাস্তা বারাসাত যাবে না, তাই আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে কিছুদূর, সেখানে জিজ্ঞেস করলে বারাসাতের রাস্তা দেখিয়ে দেবে। তখন শেষ বিকেল, আমরা হতাশ, ক্লান্ত, বিধস্ত, রওনা দিলাম, যা হয় হোক আমাদের, বারাসাত পৌঁছাতে হবে। বাইকে স্পিডও ৫০/৬০ এর উপরে নেয়া যাচ্ছে না, ভাইব্রেশনে মনে হচ্ছে সব খসে পড়বে, ইঞ্জিন পুরো শেষ, হায় রে আমাদের ১২৫ টপস্পিড। আমাদের কোন কিছু ভাবার শক্তি নেই, সিঙ্গেল ফোকাস মনে, বারাসাত। প্রতিটা বাজারে একবার করে থেমে, দাদা বারাসাতের রাস্তা কোনট? আমরা কি ঠিক পথে যাচ্ছি? সন্ধ্যে পার হয়ে গ্যাছে, রাত, আমরা তখনো পথে, কোথায় বারাসাত? কতদূরে? হয়তো খুব বেশি সময় লাগতো না, যদি আমরা রাস্তা চিনতাম, কিন্তু এ তো অচেনা পথ, যখন তখন রঙ টার্ন হতে পারে, এক কিলোও এক্সট্রা চলার সামর্থ্য নেই। মনে হচ্ছিলো, আমরা বুঝি অনন্তকাল ধরে পথ চলছি, পথ আর ফুরাচ্ছে না, নিজেরা কথা বলারও শক্তি নেই। অবশেষে যখন বারাসাত ঢুকলাম, তখন বোধহয় ৮ টা বাজে। আমাদের কাছে ঠিকানা আছে সঞ্জয়দের বাড়ির, আর একটুখানি কষ্ট। কিন্তু একবার দুর্ভোগ শুরু হলে এত সহজে রেহাই মেলে? খুঁজে খুঁজে যখন ওদের বাড়ি পৌঁছালাম, সঞ্জয় বাড়ি নেই, বেড়াতে গ্যাছে, ওর মা-বাবা আমাদের চেনেন না। আমরা তখন নি:শেষিত, সামান্য কোন শক্তি নেই আর অবশিষ্ট। আর এক কিলোও বাইক চালানো সম্ভব না। গাঁজা ফাজা খেলে হয়তো সম্ভব হতো, কিন্তু আমরা সকাল থেকেই কফি উইথ নো এডেড সুগার অর ক্রিম। এই সাড়ে আটটার সময় এখন কোথায় যাবো? হোটেলই ভরসা। দুটো হোটেলে ফেল মারলাম, ওরা বাইক রাখতে দেবে না। শেষ পর্যন্ত যখন ডিসাইডেড, জাহান্নামে যাক বাইক, আগে আমরা নিজেরা বাঁচি, এমন সময় তিন নম্বর হোটেলে বাইক রাখার জায়গা মিললো। শুধু রুম পর্যন্ত উঠে, বিছানায় বডি ফেলার শক্তিটুকু অবশিষ্ট তখন। রেজিস্টার রুমে পাঠিয়ে দিতে বললাম, দাঁড়িয়ে লেখার সামর্থ্য নেই। ওদের নিজেদের রেস্টুরেন্ট ছিলো, তাই রাতে খাওয়ার সুযোগ মিললো, নইলে হয়তো না খেয়েই ঘুমিয়ে যেতাম, আর খাওয়ার পরে বয়কে দিয়ে এক পাইন্ট রামও আনানো হতো না, ওটুকু খুবই দরকার ছিলো।

পরদিন ঘুম ভাংলো ১০ টার দিকে, প্রায় ১২ ঘন্টা পরে। আমরা খেয়ে দেয়ে কোলকাতার পথ ধরলাম, এবারে পুরো চেনা পথ, এবং দিনের বেলা, আর কোন কষ্ট হয় নি। এই ব্যাঙ্গালোর থেকে বর্ডার - বর্ডার থেকে সোনারপুর, এটাই আমাদের শেষ অভিযান এবং সম্ভবত বোকাচোদামো টু ইটস এক্সট্রিম, অপটিমাস, ম্যাক্সিমাস।

রূপকথার রূপকল্প

আমাদের বাংলা রূপকথার গল্পগুলো প্রজন্মের পরে প্রজন্ম ধরে অপরিবর্তিত আছে। আমাদের বাব-মা, তাদের বাবা-মা, হয়তো বা তাদেরও বাবা-মা শুনে এসেছেন, পড়ে এসেছেন এইসমস্ত আবহমান রূপকথাগুলো। কুঁচবরণ কন্যার মেঘবরণ কেশ, সোনার কাঠি রূপোর কাঠি, ডালিমকুমার, অরূণ বরূণ কিরণমালা, সুখু-দুখু এমন আরো বেশ অনেকগুলোই। বাংলা ভাষাভাষীদের বাইরেও বাংলায় বেশ কিছু রূপকথা আছে আদিবাসীদের। মোটাদাগে প্রায় তিনরকম রূপকথা পাওয়া যায়, আমি গল্পের ধরণ ভেদে ভাগ করছি:

১) রাজকুমার, রাক্ষস, ডাইনি, রাজকন্যা
২) রাজপুত্র, রাজকন্যা, দু:খ, হাহাকার, আনন্দ
৩) অন্তর্নিহিত অর্থবাচক

আর এই রূপকথার গল্পের কিছু কমন ফ্যাক্টর হচ্ছে, রাজ্য, রাজকুমার, রাজকন্যা, রাক্ষস, খোক্কস, ডাইনি, পঙখীরাজ, দৈত্য, ভুত, সুতানাগ, সুয়োরাণী, দুয়োরাণী, সন্ন্যাসী, জাদু। সমস্ত গল্পগুলোই এগুলোকে ভিত্তি করে আবর্তিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাংলায় রূপকথা সেই ১০০ বছর আগেই থেমে গ্যাছে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীই সম্ভবত শেষ মৌলিক রূপকথা লিখেছেন, এর পরে আর কেউ ভাবেও নি রূপকথাকে সাহিত্যের একটা ধারা হিসেবে। ফলে আমাদের রূপকথার ধারাবাহিকতা ওখানে শুধু থমকেই যায় নি, একরকম হয়তো শেষই হয়ে গ্যাছে। আমাদের পরের প্রজন্ম কি আদৌ সন্তুষ্ট থাকবে বা সন্তুষ্ট থাকা আদৌ কি সম্ভব, সেই ১০০ বছর আগেকার ভাবনা সংশ্লিষ্ট রাক্ষস খোক্কস দৈত্য দানবে? এমনকি যেখানে আরো অনেএক পুরোনো পারস্যের আরব্য রজনী বা হাতিম তাই এর গল্প আমাদের বাংলা রূপকথা থেকে অনেক বেশি উত্তেজনাকর, অনেক বেশি ফ্লুইড, অনেক বেশি বিস্তৃত, সেখানে বাংলায় আমরা একদমই এগোতে পারিনি আমাদের রূপকথা নিয়ে। আমাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কি এতই থমকে গ্যাছে যে সেই কোন হাজার বছর আগেকার রামায়ন/মহাভারতের পরে আমরা বিস্তৃত পটভূমি নিয়ে কোন রূপকথা লিখতেই পারিনি?

এত লম্বা ভুমিকা টানার উদ্দেশ্য আসলে বাংলা সাহিত্যকে ধাক্কা টাক্কা দেয়া নয়, আমার মত মানুষের ধাক্কায় বাংলা সাহিত্য একচুল নড়বেও না। কাজের সংজ্ঞা বলছে, বল প্রয়োগে বস্তুর অবস্থার পরিবর্তনই হচ্ছে কাজ, তা বাদে বাকি সবই অকাজ। আমি খামাখা অকাজে সময় নষ্ট করি না, তাই সাহিত্যে কোন বল প্রয়োগ করার বিন্দুমাত্র শখ আমার নেই। তাই আসল কথায় আসি। আমাদের গদ্যসাহিত্য মোটামুটি ইংরেজী গদ্য সাহিত্যকেই অনুসরণ করে চলে। ইংরেজী গদ্যের প্রায় সব শাখাকেই আমরা বাংলা সাহিত্যে স্থান দিয়েছি, শুধু সযতনে একটা শাখাকে এড়িয়ে গেছি, Fantasy Fiction, রূপকল্প। অনেকেই ফ্যান্টাসি ফিকশন পড়ে থাকেন, কিন্তু একই সাথে অনেকেরই হয়তো ধারণাও নেই ফ্যান্টাসি ফিকশন এখন সম্ভবত ইংরেজী সাহিত্যের সবথেকে জনপ্রিয় শাখা। ফ্যান্টাসি বলতে আমি শিশুতোষ হ্যারি পটারকে বোঝাচ্ছি না। হ্যারি পটার সিনেমা তৈরী শুরু না হলে হয়তোবা এত জনপ্রিয় হতোও না।, আমি ফ্যান্টাসি ফিকশনের সবথেকে জনপ্রিয় ধারা নিয়ে আমার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই শুধু। ধারাটার নাম হচ্ছে Epic Fantasy।

 আসলে বাংলাকে খুব একটা দোষ দিয়ে লাভ নেই।  ইংরেজী সাহিত্যও এপিক ফ্যান্টাসিকে কখনো তেমন সুনজরে দেখেনি। কেনই বা দেখতে যাবে,  ইউরোপের বিভিন্ন এলাকার পৌরণিক গল্প আছে, ইংরেজীতে সেগুলো অনুবাদ করেই তো চলছিলো। আমাদের রাক্ষস খোক্কসের বিকল্প ছিলো ওদের, সেগুলো নিয়েও সুখে শান্তিতে ছিলো। হালকা চালে একটা দুটো ফ্যান্টাসি উপন্যাস, কিছু ছোটদের, কিছু বড়দের। কেউ লিখছে ড্রাগন আর নাইট নিয়ে, কেউ লিখছে ম্যাজিক নিয়ে, কেউ লিখছে মিথিকাল ক্রিয়েচার নিয়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পরে দিয়ে ফ্যান্টাসি ফিকশন ঘরানায় কিছু পরিবর্তন আসছিলো। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের আফ্রিকাকেন্দ্রিক ফ্যান্টাসিগুলো ফ্যান্টাসি উপন্যাসের ধারা পালটে দিচ্ছিলো, যদিও সবাই সেভাবে হ্যাগার্ডকে গ্রহণ করেনি তখনো, বিশেষ করে নাক উঁচু ইংলিশরা। The Inklings নামে উঠতি লেখকদের একটা গ্রুপ তৈরী হয় এই ১৯৩০ এর দিকে,  যারা হ্যাগার্ডের ন্যারেটিভ এবং ফ্যান্টাসির অভিনবত্বকে নিজেদের জন্যে অনুকরণীয় বলে ধরে নেয় এবং এধরণের ন্যারেটিভ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালানো শুরু করে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, ফ্যান্টাসি ফিকশনকে পুরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে হবে। প্রথম প্রোজেক্ট শুরু করেন C. S. Lewis, তাঁ্র The Chronicles of Narnia সিরিজ দিয়ে। দু:সাহস কিছুটা কম ছিলো, তাই ন্যারেটিভ আর পটভুমির ব্যাপকতা সত্বেও প্রচলিত ঘরানা থেকে খুব একটা বেরোতে পারেন নি ভদ্রলোক, এবং তাঁ্র সিরিজটাও শিশুদের উপযোগী। কিন্তু এর পরপরই ফ্যান্টাসি ফিকশনের সমস্ত ধ্যান ধারণা পালটে দিলেন J. R. R. Tolkien। সমস্ত মিথ, সমস্ত লিজেন্ড তিনি একাকার করে দিলেন, শুধু তাই না, প্রচলিত ধারা ভেঙে অলটারনেটিভ রিয়েলিটি নিয়ে এলেন তিনি। লিখলেন The Lord of the Rings, তৈরী হলো সম্পূর্ণ নতুন একটা শাখা Epic Fantasy।  সাহিত্য জগতে তোলপাড় হয়ে গেলো, ফ্যান্টাসি ফিকশনের মাইলফলক গেঁথে দিলেন তিনি। এতটাই ব্যপকত্ব তাঁ্র এই সিরিজের,  এমনকি অধুনা George R. R. Martin পর্যন্ত Tolkien'এর ছায়া থেকে বেরোতে পারেন নি A Song of Fire & Ice (HBO তে Game of Thrones নামে ড্রামা সিরিয়াল এই এপিক ফ্যান্টাসি সিরিজের আলেখ্যেই তৈরী) সিরিজটার মত ডার্ক এবং প্রায় ইউনিক একটা প্লট নিয়ে। Tolkien ফ্যান্টাসি সমস্ত কল্পনাকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছেন,   Warrior, Prince, Elf, Dwarf, Troll, Ogre, Orc, Goblin, Wizard, Wraith, Sentinel, Dragon, Giant,  Giant Bird, Magic Sword, Magic Stone, Magic Song, Magic Talisman, Healer, Assassin, Dark Power; মোটামুটি এগুলোই একটা এপিক ফ্যান্টাসির মূল উপাদান, রেয়ার দুই একজন এর বাইরে কিছু ভাবতে পেরেছেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, Tolkienই যদি সব করে ফেললেন, তাহলে বাকিরা এতদিন ধরে বসে কি করছেন, চর্বিত চর্বন হচ্ছে তো, তাই না? না, উনি শুধু পথ দেখিয়েছন, সবকিছু এক জায়গায় জড়ো করে দেখিয়েছেন, কিভাবে ধারাটা এগিয়ে নিতে হবে।  পরের ধাপে আমি দেখাচ্ছি, বিভিন্ন লেখক এই এলিমেন্টগুলো নিয়েই কিভাবে নিজেদের মত অসাধারণ কিছু এপিক সিরিজ লিখেছেন (অবশ্যই আমার সীমিত অভিজ্ঞতার আলোকে)।

★প্রথমেই আসি Robert Jorden এর Wheel of Time প্রসঙ্গে। ভালো এপিক ফ্যান্টাসির একটা সমস্যা হচ্ছে শুরুটা খুব স্লো এবং বোরিং হয়, হাতে গোনা দুই একটা এর ব্যতিক্রম। এখন একটা বই যখন ৪০০+ পাতার হয়, আর সিরিজ যদি অন্তত ৩ পর্ব ধরে চলে বোরিং স্টার্টিং তো হতেই পারে। রবার্ট জর্ডান এই বোর হবার ব্যাপারটাকেও শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন। হুইল অফ টাইম সিরিজের ১৪ টা বই, ১০০০০+ পাতা সব মিলে, অন্তত কয়েকশ রেগুলার চরিত্র, প্লটের ভয়াবহতা ভেবে দেখুন। আমি অন্তত দুবার সিরিজ থামিয়ে দিয়েছিলাম, ক্লান্ত হয়ে।  কমন প্লট গল্পের, গ্রামের সাধারণ ছেলে, ম্যাজিক সোর্ড, ডার্ক লর্ড, ম্যাজিক, এপিক জার্নি, এসব নিয়েই। কাহিনী বিস্তৃত করতে করতে ভদ্রলোক সম্ভবত ৫/৬ টা বইএর পরে খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ এর পরের ৩/৪ টে বই প্রায় একই জায়গায় পাক খেয়েছে, প্রায় একই রকম প্লট এই ৩/৪ টে বই এর,ল। শেষ ৪ টে বই তে আবার গল্পের রাশ টেনে ধরেছেন। এই সিরিজের মত বিস্তৃত করে অলটারনেট পৃথিবীর বর্ণনা বা চরিত্রগুলোর এপিক চরিত্র হয়ে বেড়ে ওঠা, এমনটা খুব কম পাওয়া যায়। আর ১০০০০+ পাতা বই লেখার সাহসও খুব কম মানুষের আছে।  সিরিজটার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যদিও মূল প্রোটাগনিস্ট তিনজন পুরুষ, বাকি প্রধাণ সমস্ত চরিত্রই নারী। নারী চরিত্রগুলোর দৃড়তা, তাদের স্ট্রেন্থ, পার্সোনালিটি, পাওয়ার, এভাবে আর কোন সিরিজে আমি দেখিনি। এমন কিছুই না হুইল অফ টাইম, কিন্তু কাহিনী বিস্তারের জন্যেই অনন্য এক স্থানে থাকবে সিরিজটা। হিন্দু, বৌদ্ধ, তাও, ক্রিশ্চিয়ান ফিলোসফির খানিকটা ছোঁয়া আছে গল্পে। আছে আরব বেদুইন, ফিউডাল জাপান, রেড ইন্ডিয়ান, ১৯৮৪ সালে লেখা শুরু করেন, ২০০৭ এ যখন মারা যান, তখন সিরিজের শেষ বইটা ধরেছেন সবে। বই শেষ না করেই মারা যাওয়ায়, জর্ডানের স্ত্রী এবং এডিটর Harriet অনেক ভেবে চিন্তে এই সিরিজের ডাই হার্ড ফ্যান আরেকজন ফ্যান্টাসি লেখক Brandon Sandarson'কে নিযুক্ত করেন বইটা শেষ করার কাজে, শেষ হবার পরে দেখা যায়, খুব বেশি বড় হয়ে গ্যাছে, গুরুর চাইতেও এককাঠি বাড়া শিষ্য। বইটাকে তখন ৩ ধাপে পাবলিশ করা হয়, ফাইনালি ১৯ বছর পরে ২০১৩ তে শেষ হয় সিরিজ। যদি অসম্ভব ধৈর্য্য এবং অফুরন্ত সময় থাকে হাতে, সিরিজটা পড়া শুরু করা যেতেই পারে।

★খুব সম্ভবত এই সিরিজটা শেষ করার সময়ই Brandon Sanderson তার নিজের লেখার জন্য একটা প্লট ভাবছিলেন, যার ফলস্রুতিতেই ২০১৪ তে দখা গেলো প্রায় ইউনিক প্লট সেটিংস নিয়ে হাজির ভদ্রলোক। ম্যাজিক সোর্ড এবং ডার্ক পাওয়ার, এটুকুই শুধু কমন বাকি ফ্যান্টাসিগুলোর সাথে। The Stormlight Archive, পুরোপুরি ইউনিক তার প্লট সেটিং, ক্যারেকটার বিল্ড আপ,   অলটারনেট রিয়েলিটি বা পাতার সংখ্যার দিক দিয়েও। এপর্যন্ত দুটো পর্ব এসেছে, দুটোই ১০০০+ পাতা, তৃতীয় পর্বে শেষ হবে বলে ধারণা করছি, কারণ আমি চতুর্থ পর্বে যাওয়ার মত ম্যাটেরিয়াল ভাবতে পারছি না। এখানে পৃথবী একেবারেই আলাদা, সূর্য্য একটা হলেও, চাঁদ তিনটে। কন্টিনিউয়াস, হাইস্টর্ম বয়ে যায় বলে, মানুষ ছাড়া বাকি সব জীবই খোলসওলা,  অর্থ্রোপোডা বা স্কেলড শরীর। গাছপালা নড়াচড়া করতে পারে, এবং হাইস্টর্মের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে মুড়ে ফেলতে পারে। সবথেকে বড় কথা এই সিরিজের একটা গোছানো প্লট আছে, এন্টিসিপেট করা যায় কিসের পরে কি হতে পারে, একঘেয়ে বয়ে চলা নয়।

★Jim Butcher এর Codex Alera সিরিজটা মিলিটারি, ম্যাজিক, এন্ড অফ ওয়ার্ল্ড এই তিন ঘরাণার মিশ্রণ। অনেকটা রোমান এম্পায়ার ধাঁচে সাজানো প্লট, মাইট এন্ড  ম্যাজিক দুই এর কম্বিনেশন। ৬ টা পর্বে ধাপে ধাপে বেড়ে উঠেছে গল্পের এন্টাগোনিস্ট, আছে কিছু মিথিকাল ক্রিয়েচার। তবে রোমান ধাঁচটাই এই সিরিজের মূল বৈশিষ্ট্য। বুচারকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিলো, চুড়ান্ত এবসার্ড এলিমেন্টাল কম্বিনেশন থেকে ফ্যান্টাসি গল্প লিখতে পারবেন না। বুচার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে এলিমেন্ট ধরিয়ে দেয়া হয়, Lost Roman legion এবং Pokemon। ভদ্রলোক ভালোই করেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। একটা ভালো প্লট, ভালো গাঁথুনি, এলিমেন্টাল এবসার্ডিটিকেও দিব্যি মিলিয়ে দিয়েছেন। ম্যাজিকাল ট্যালেন্টবিহীন কিশোর এন্টাগোনিস্টের শুধুমাত্র নিজের উইটের বলে একের পরে এক বাধা পার হয়ে, শেষ পর্যন্ত ম্যাজিক খুঁজে পাওয়া এবং হ্যাপি এন্ডিং, মোটের উপরে খারাপ না।

★Thomas Harlan, জার্মান রাইটার হলেও,  ওর Oath of Empire সিরিজটা ইংলিশ ফ্যান্টাসির মধ্যে আনছি অনন্য এক কারণে। ভদ্রলোক অলটারনেট রিয়েলিটি তৈরী করেন নি  অলটারনেট সিচুয়েশন তৈরী রী করেছেন, আমাদের খুব পরিচিত সেনারিও থেকে। পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে লড়াই চলছে, রোম থেকে তৎকালীন সিজার ভাবছে, রোমান বাইজেন্টাইন সম্মিলিত শক্তি নিয়ে লড়াই পারস্যের একদম সেন্টারে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু পারস্যের ম্যাজিকাল শক্তি তো অনেক বেশি তাই মাইনর স্যাক্রিফাইস চাই। নাবাতিয়া আর প্যালমিরা কে স্কেপগোট করে পারস্যের ডার্ক ম্যাজিককে ওখানে ফোকাস করাতে পারলেই নিরাপদে অন্য পথ ধরে এগিয়ে পারস্যের একদম ভিতরে ঢুকে যাওয়া যাবে নিরাপদে। আর ম্যাজিকাল পাওয়ার যদি না থাকে, মিলিটারি পাওয়ারে রোমানদের কাছে পারস্য কিছুই না। পারস্যের ডার্কেস্ট ম্যাজিশিয়ান যখন প্যালমিরার উপরে তান্ডব চালাচ্ছে, শ্রেফ কর্তব্যের খাতিরে সেখানে আটকা পড়ে গেছিলো আরব বেদুইন ব্যাবসায়ীদের নেতা মুহাম্মদ। ডার্ক ম্যাজিক দেখে ফাইনালি তার বোধ হলো, এর হাতে পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে, এর কাউন্টার ম্যাজিক চাই, আরবে ফিরে সে সন্ধানে নেমে পড়লো ম্যাজিক অফ লাইটের, এহেন একদিন গুহায় বসে ধ্যানের সময়, তীব্র আলোর ঝলকানি, আওয়াজ এলো, "পড়, পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন............."। রোমানদের দখানো পথেই মোহাম্মদ নেমে পড়লো ধখল এবং সাম্রাজ্য বিস্তার করে শক্তি বৃদ্ধিতে, ডার্ক ম্যাজিকের মোকাবিলা করতেই হবে।
সচরাচর এমন অলটারনেট হিস্ট্রি, অল্টারনেট সিচুয়েশন নিয়ে এমন বিস্তারে লেখা হয় না, ওথ অফ এম্পায়ার সিরিজটা সেদিক দিয়ে খানিকটা ইউনিক তো বটেই। মুহাম্মদের অলটারনেট হিস্ট্রি উপভোগ্যও

★Steven Ericson এর Malazan Book of the Fallen সম্ভবত সবথেকে কমপ্লেক্স হাই ফ্যান্টাসি গল্প। আমি দুইবার চেষ্টা করেও ধাক্কা খেয়ে বন্ধ করেছি এই সিরিজটা। কি বিশাল বিস্তৃত প্লট, ম্যাজিক, পাওয়ার, মিথিকাল ক্রিয়েচার, রিয়েলিটি, আর কি অসম্ভব জটিল ঘটনাবিন্যাস কিছুক্ষন পরপর খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। এত ধরণের এলিমেন্ট আর ক্রিয়েচার, মনে রাখতে গেলে গল্প ভুলে যেতে হয়, গল্প মনে রাখতে গেলে এলিমেন্ট ভুলে যেতে হয়। কোন সিরিজের সাথে সামান্য একটুও মিল নেই। এই সিরিজের কোন ক্রোনোলজিকাল অর্ডার নেই, একটা গল্প শুরু হয়ে সেটার সাবপ্লট নিয়েই আরেকটা সিরিজ,  ফের যখন গল্পে ফিরলো, দেখা গেলো আগের চরিত্রগুলোর কোন অস্তিত্বই নেই, সম্পূর্ণ ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন চরিত্র নিয়ে কথা হচ্ছে। সিরিজের প্রপথম ৫ টা বই, একটার সাথে আরেকটার কোন স্টোরিলাইন কানেকশন নেই। ৬ নম্বর বইতে গিয়ে সব এক হয়ে একক গতিতে এগিয়েছে। আমার গোটা পাঠক জীবনে এত কমপ্লেক্স কোন চ্যালেঞ্জের মুখে আমি পড়িনি। তারপরেও প্লটের ইউনিকনেসের জন্য এটাকে অনেকের থেকেই এগিয়ে রাখবো

এছাড়াও, Kingliller Chronicles, Chronicles of Amber, Memoy-Sorrow-Thorn, Death Gate Cycle, The First Law, Farseer,  Daggar and Coin এমন যেকটা সিরিজ পড়েছি  সবাইকেই দেখেছি নিজেদের সর্বোচ্চ ইমাজিনেশন দিয়ে চেষ্টা করতে, কি করে কিছু ইউনিক প্লট, ইউনিক রিয়েলিটি, ইউনিক ম্যাজিক সেট, ইউনিক ক্রিয়েচার ব্যবহার করে এপিক ফ্যান্টাসিকে এপিক করে তুলতে। রূপকথা আজ আর শুধুই জাদুর তলোয়ার নিয়ে দুষ্টের দমনের মত সাদা কালোয় আটকে নেই, প্রচুর গ্রে এরিয়া আছে।  রূপকথার নারী চরিত্রগুলো আজ শুধুই  Damsel in Distress নয়, তারাও Radient Knight। রুপকথা শুধুই বাচ্চাদের জন্যে নয়, সেক্স আর তুমুল ভায়োলেন্স মেশানো, বড়দের জিনিস। সময় যাদের হাতে আছে, শুরু করে দেখুন একটা এপিক ফ্যান্টাসি, নেশায় পড়ে যাবেন, গ্যারান্টেড।