বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

যাপিত জীবন - ১০

সমস্যাটা ছিলো, আমরা বাইকটাকে খুব বেশি ভালোবাসতাম। আমরা মানে আমি আর আমার দেন ক্লোজেস্ট ফ্রেন্ড অনুপম। প্রায় তিনবছর আমরা একই সাথে আছি , আর বাইকটাও আমাদের সাথে আছে দুবছরের বেশি, একটা সিলভার কালার CBZ। মোডিফিকেশনের মহামারি শুরু ব্যাঙ্গালোরে শুরু হয়েছিলো মোটামুটি ২০০১ থেকেই, কিন্তু অনুপম বাইকটা কিনলো পরের বছর। ছোটখাটো সাইজ ওর, মাত্র ৫ ফিট ৪, অতবড় আর ভারি বাইকটার সাথে একাত্ম হতেও ওর কিছু সময় লেগে গেলো। তাই আমরা যখন মোডিফিকেশনে নামলাম, ততদিনে খুব সম্ভব ব্যাঙ্গালোর শহরের ইয়ংস্টারদের পাছার নিচে থাকা সবগুলো সিবিজি'ই মোডিফায়েড। অনেক হিসাব করে দেখলাম, যদি রেডি এক্সিলারেশন ফিচার আনতে যাই, তাহলে টপ স্পিড কমে যাবে, আর এটা তো স্পোর্টস বাইক না, যে আহামরি রেসিং ফিচার পাওয়া যাবে আলটিমেটলি। রেডি এক্সিলারেশনের জোরে বাকি বাইকগুলো হয়তো ৪০ বা ৫০ পর্যন্ত স্পিড আমাদের কয়েক সেকেন্ড বা একমিনিট আগে তুলবে, কিন্তু তারপরে? তাই আমরা ইঞ্জিনের ক্যাপাসিটি বাড়ানোয় জোর দিলাম, ২০০৩ এ এসে ব্যাঙ্গালোর শহরে আর কোন ১৫০ সিসি বাইক ছিলো না যেটার টপ স্পিড ১২৫ পার করতে পারে, আমাদেরটার টপ স্পিড চেক করেছিলাম, ১৩৪। তার মানে আমরা যখন তখন অন্যদের চাইতে বেশি স্পিড রিজার্ভ রাখতে পারছি, স্পোর্টস বাইক ছাড়া আসলে শহরের মধ্যে বা বাইরে, রেসে আমাদের বাইককে টপকাতে পারে নি আর কোন বাইক ২০০৩ এর মাঝামাঝি থেকে। স্পোর্টস এর সাথে টক্কর দেয়ার বোকামি আমরা করিও নি, কারণ এ অসম্ভব ব্যাপার। এরপরে ভাবা হলো, স্পিড তো বেশি ওঠে, এবারে টার্নিংগুলোর দিকে মনযোগ দেয়া দরকার। চাকার টর্ক আর গ্রিপের সমস্যায় টার্নিং এ স্পিড কমিয়ে ফেলতে হয়, সাহসে কুলায় না স্পিড বেশি রেখে বাইক বেশি কাত করতে। তাই আমরা সবদিক বিবেচনা করে পিছনের চাকার ফর্মেশনই পালটে দিলাম, পিছে বাজাজ এলিমিনেটরের মোটা এবং খাটো চাকা লাগানো হলো, এতে ১৩২ স্পিড হয়তো আর পাবো না, কিন্তু ১২৫ এর নিচে তো নামছে না, আর টার্নেও বেশি স্পিডের সুবিধা পাচ্ছি টর্ক আর গ্রিপের কারণে। প্রমাণ পেয়েছিলাম উলসুর লেকে রোডে একবার আচমকা ঢুকে পড়ে। রাস্তাটা আমাদের পরিচিত ছিলো না, যখন ঢুকলাম, অন্তত ১০০ স্পিড আচমকা সামনে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি বাঁক, স্পিড কমানোর সময় নেই, কন্ট্রোল চলে যাবে, টার্নে যখন এলাম, স্পিড ৭০ এর কাছাকাছি, নিখুঁত টার্ন হলো, বিষ্ময় উপভোগ করারও সময় পেলাম না, মুহুর্তে ডানে বাঁয়ে আরো তিনটে একই রকম বাঁক এলো, যখন বেরিয়ে এলাম, স্পিড তখনো ৬০, ওয়াও, যাস্ট ওয়াও। বাইকটাকে অসম্ভব ভালোবাসতাম, আমরা দুজনেই শুধু না, আমাদের টিমের বাকি ৯ জনও।

আমাদের সময় শেষ হয়ে গেলো ২০০৪ এ। ফাইনাল দিয়ে এবারে দেশে ফেরার পালা, কিন্তু বাইকটার কি হবে? কি আবার হবে, দেশে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কিভাবে? বাইক নিয়ে আমাদের যত নলেজ, এসব আইন কানুন নিয়ে তো তার ১০% ও নেই। ব্যাঙ্গালোর থেকে কোলকাতা নিয়ে তারপরে বাংলাদেশে ঢোকাতে হবে। আমরা বোকাচোদা পোলাপান, ভাবলাম, বাইকও হয়তো ল্যাপটপেরই মত বগলদাবা করে বর্ডার পার করা যাবে। আসলে অন্য কিছু ভাবা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না, সেপারেটেড কি করে হবো, আমাদের সুইটহার্টের থেকে। ফার্স্ট স্টেপ ফার্স্ট, ব্যাঙ্গালোর আরটিএ'তে এপ্লিকেশন এবং ফি দিয়ে এনওসি নেয়া হলো, ওয়েস্টবেঙ্গলের জন্যে। এই কাগজের বলে ওয়েস্টবেঙ্গলে নিশ্চিন্তে বাইক চালানো যাবে। এদিকে ওয়েস্ট বেঙ্গলের বা বাংলাদেশের মডেলের সাথে ওদিকের মডেলের খানিকটা ডিফারেন্স আছে, তাই যেখানে যেখানে যা স্পেয়ার দরকার সেগুলো ব্যাঙ্গালোর ছাড়ার আগেই লাগিয়ে ফেলা হলো, ফলে ট্রেনে বাইক বুকিং দিয়ে আমাদের দুজনের রিজার্ভেশন যখন করানো হলো, আমাদের হাতে আর টাকা প্রায় নেই বললেই চলে। লেকিন, কুছ পরোয়া নেহি, সোনারপুরে অনুপমের প্রচুর আত্মীয় থাকে, বড়মামা , পিসতুতো দিদি, আরো কে কে যেন।  আমরা ওখানেই কিছুদিনের পিটস্টপ নেবো, অনুপমের বাবা টাকা পাঠালে আমরা নেক্সট চিন্তা করে দেখবো। অনুপমদেরও  একটা জায়গা কেনা আছে সেখানে, খানিকটা তদারকিও হবে। রথ দেখা, কলা বেচা, ইত্যাদি ইত্যাদি। আহোয়, সোনারপুর, উই আর কামিং।

জানা গেলো স্টেশন থেকে বাইক ছাড়াতে আরো হাজারখানেক ঢালতে হবে এবং অন্তত ৩/৪ দিন পরে দেবে। সো, অনুপমের টাকা আসা পর্যন্ত ওয়েট করতেই হবে। নো প্রব্লেমো , আমরা মামাবড়ি উপভোগ করতে লাগলাম। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো, পরদিন বাইক রিলিজ করা যাবে, আমরা হাইলি ইলেটেড। ট্রেনে তুলে দেয়ার আগে আমরা মাস্ক খুলে রেখেছিলাম, কারণ প্রায় আড়াই হাজার কিলো ট্রেন রাইডের পরে মাস্ক অক্ষত থাকবে এই ভরসা ছিলো না। ট্যাঙ্কও খালি করে রেখেছি, কারণ এমনিতেই খালি হয়ে যেত। সেই শুভদিনে আমরা দুজনে বাইকের মাস্ক, আর এক লিটারের বোতলে হাফ লিটার তেল নিয়ে ট্রেনে চাপলাম, সকালে ৮ টার দিকে, দুগগা দুগগা। ১০ টার মধ্যে হাওড়া স্টেশন, পেপারস জমা দিয়ে যা জানলাম, ১ টার আগে আর বাইক পাওয়ার সুযোগ নেই,  ওয়েস্ট বেঙ্গল অথরিটিকে খিস্তাতে খিস্তাতে আর আহা ব্যাঙ্গালোরে কি স্বর্গে ছিলাম ভাবতে ভাবতে অপেক্ষা করছি, ৩ ঘন্টা অপেক্ষা, চাট্টিখানি কথা নাকি, তাও আবার আমাদের মত এডিএইচডি'র পক্ষে। মনের দু:খে হাওড়া স্টেশনের পাশে গাঁজা খুঁজে বের করে ফেললাম, ইয়ে মানে গাঁজার স্পট বের করার আনক্যানি ক্ষমতা ছিলো আমার আরকি। আমরা ভুলে গেছিলাম, ওটা মে মাস, কোলকাতায় পিচগলা গরম পড়ছে, তিন বছর হয়, যেই গরমের সাথে আমাদের সাক্ষাত হয় নি। গাঁজা ফাজা খেয়ে আর প্রচন্ড গরমে আমরা দুজনে কেলিয়ে গেছি ১২টার মধ্যেই, জিভ বেরিয়ে গ্যাছে। আশেপাশে ঠান্ডা বলতে শুধু স্টেশন, কিন্তু কতক্ষন স্টেশনের মধ্যে থাকা যায়, তাও যদি মেইন স্টেশন আর স্টোরেজ কাছাকাছি হতো। ফাইনালি আমরা বাইক পেলাম, আড়াইটা নাগাদ। মাস্ক লাগানো হলো, টুকলিট সাথেই ছিলো, ট্যাঙ্ক চাবিতে খোলে না , বিশেষ ভাবে চাপ দিয়ে খুলতে হয়, এটা ঠিক করাতে খেয়াল ছিলো না, তেলও ভরা হলো, বাইকে উঠে স্টার্ট দেবে, কিন্তু চাবি? আমরা চাবি ফেলে এসেছি। মনে হলো বাইকটা ফেলে রেখে, ওখানেই শুয়ে পড়ি, সে কি আর সম্ভব। বাইক স্টার্ট দিতে হবে, সিনেমায় দেখায় ফটাফট দুটো তার টেনে হট ওয়ারিং করে স্টার্ট দেয়া যায়, বাস্তবে অত মাখনের মত মোলায়েম কাজ নয়, ফের মাস্ক খোলো, তারগুলো সামনে আনো, কোনটা লুজ করতে হবে, কোনটা জোড়া দিতে হবে এই করতেও আধা ঘন্টা। এর মধ্যে ইনফো নিয়ে নিলাম, এই দেড় দুই কিলো পরেই অমুক মোড়ে চাবিওলার দোকান, সেও খুঁজে বের করতে আধাঘন্টা, চাবি বানানো, মেকানিকের দোকান বের করে ফের ঠিকঠাক করা, তেল নিতে নিতে ৪ টে। সব ঠিক বেরিয়েই এক আধা মাতাল ট্রাফিক পুলিশ ৫০ টাকা খেয়ে নিলো, কিসের কাগজ কিসের কি, কিছুই মানতে রাজি না, টাকা দিতেই হবে। এদিকে কোলকাতা থেকে বেরোনোর রুটও জানি না। আমি চিন্তা করলাম, রুট জানতে চাইবো ট্রাফিক পুলিশের কাছেই, তাহলে ওরা আটকে টাকাও খেতে চাইবে না, আবার ঠিকঠাক বলবেও। এভাবেই আমরা খোঁজ পেলাম, ইএম বাইপাসের এবং ফাইনালি বিকাল ৬ টা নাগাদ সোনারপুর,  আমরা তখন বিধ্বস্ত।

আরো দিন দশেক ছিলাম, সেবারে। সোনারপুর এলাকা চষে ফেলা হলো, প্রায় প্রতিদিন একবার কোলকাতা আসতাম, একটা না একটা ছুতো বাধিয়ে। কোলকাতার কিছুই চেনা হয় নি, কারণ আমার এসবে তুমুল আগ্রহ থাকলেও অনুপম বড়ই নিরাসক্ত মাল। ফাইনালি এক ভোরে, আমরা ট্যাক্সিতে মালপত্র তুলে, বনগাঁ বর্ডারের দিকে রওনা দিলাম, আমি ট্যাক্সিতে, অনুপম বাইকে। এই লম্বা রাস্তা আর অপরিচিত এলাকা, আমাকে বাইক চালাতেই দেবে না। আমার কি? বুঝবে মজা অনুপম। বর্ডারে এলাম বোধহয় ১১ টার দিকে, এবারে ছোটাছুটি শুরু হলো, বাইক কিভাবে পার করা যায়। প্রায় ২/৩ ঘন্টা এখানে ওখানে দৌড়ে জানলাম, উঁহু, ওসব হবে না, বিআরটিএ'র ছাড়পত্র আনতে হবে আগে বাংলাদেশ থেকে তবেই বর্ডার ক্রস করতে দেবে, আমরা শ্রেফ হাল ছেড়ে বসে পড়লাম। উপায় একটা আছে, বাইকটা স্মাগল করানো তারপরে কাস্টমসে ধরিয়ে দেয়া, ওরা যখন অকশনে তুলবে তখন সেখান থেকে কিনে নেয়া, কিন্তু এটা যদি কাস্টমস খেয়ে ফেলে, কোন গ্যারান্টি নেই। ফাইনালি ডিসিশন নেয়া হলো, ওপারে নেয়া যাবে না, এপারেই রাখতে হবে, কিন্তু কোথায়? বাড়িতে পরামর্শ করে জানা গেলো, ২৫/৩০ কিলো দূরে, ভোমরা বর্ডারের কাছে গ্রামে ওদের পরিচিত লোক আছে সেখানে রাখা যাবে, আপাতত:, কিন্তু সে পর্যন্ত যেতে হবে তো, গ্রামের রাস্তায় বাইক চালানো মুখের কথা নাকি, আমি নোভাইস, অনুপমের আর শরীরে কুলাচ্ছে না। অত:এব খুলনা থেকে আমাদের এক ফ্রেন্ড সোহেলকে ডেকে আনা হলো, ৩০০ টাকায়, টারজান ভিসায় এপারে আনা হলো,  আমি দুজনের ব্যাগেজ নিয়ে বর্ডার ক্রস করলাম, টারজান ভিসাওয়ালাদের অফিসে অনুপমের ব্যাগ দুটো রেখে বাড়ির পথ ধরলাম, ওরা ওপারে বনগাঁ থেকে ভোমরা।

২)
জুলাইতে আমরা ফের ব্যাঙ্গালোর যাবো, মার্কসশিট, টিসি ইত্যাদি ইত্যাদি তুলতে হবে। আর যাওয়ার পথে ভোমরা থেকে বাইক কালেক্ট করবো, তাই মাল্টিপল বর্ডার এন্ট্রি ভিসা এবারে। আমি দুদিন আগেই খুলনায়, হয়তো এবারেই শেষবারের মত যাচ্ছি আমি ইন্ডিয়া, মন যথেষ্ট খারাপ, তুমুল আড্ডাবাজি করে নেয়া যাক। মেলা রাত পর্যন্ত মেলা গাঁজা খেয়েছি, বর্ডার পার হবার দিন সকালে তাই দুজনের ফিজিকাল কন্ডিশনই নড়বড়ে। আমাদের দুজনের জিনিস অনুপমের বিশাল হ্যাভারস্যাকে ভরা, অনুপম বাইক চালাবে, আমি পিঠে হ্যাভারস্যাক ঝুলিয়ে পিছে বসবো, অনুপমের এত ফিজিকাল স্ট্রেন্থ বা ব্যালান্স নেই, যে ওই বড় আর ভারি ব্যাগ সামলাবে, তাই ওই চালাবে। ভোমরা বর্ডার সচরাচর স্টুডেন্ট ভিসাধারী পায় না, তাই আমরা অলমোস্ট ভি আই পি ট্রিটমেন্ট পেলাম, এত স্মুদ ইমিগ্রেশন কাস্টমস আগে কখনো হয় নি। ওয়েল, মর্নিং শোজ দা ডে, আমরা খুবই আহ্লাদিত, সবই ঠিকঠাক হবে। কিন্তু, বর্ডার যখন পার হলাম তখন ১ টা পার হয়ে গ্যাছে, ঐ গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরো আধা ঘন্টা, বাইক নিয়ে তেল ভরতে ভরতে প্রায় ৩ টে। গ্রামের লোকে অতিথিপরায়ন, দুপুরে না খাইয়ে ছাড়লোই না। এবারে বাইক স্টার্ট দিয়ে রওনা হবার পরে দেখি, একি, আওয়াজ এমন কেন? কি স্মুদ রেসিং কন্ডিশনের বাইক, খুব লাইট আওয়াজ ছিলো, এখন এমন খড়খড়ে আওয়াজ করছে কেন? গিয়ার ফেলতে এত কষ্ট হচ্ছে কেন? ৪০ এর উপরে স্পিড তুললেই এমন ভাইব্রেশন কেন? হারামজাদারা গ্রামের রাস্তায় চালিয়ে বাইকের কন্ডিশন হেল করে ফেলেছে। গাঁড় মেরেছে, এভাবে যদি ৬০ এর উপরে স্পিডই না তুলতে পারি সোনারপুর তো সোনারপুর, কোলকাতাই পৌঁছাতে পারবো না আজ। সবথেকে বড় কথা রাস্তা তো জিজ্ঞেস করে যেতে হবে, আমাদের পরিচিত না। আর আমাদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে, আমরা ভোমরা থেকে বনগাঁ হয়ে না গিয়ে মাঝখান থেকে শর্টকাটে গেলে কম পথ পড়বে, এখন তো সাহসেই কুলাচ্ছে না, কি করা যায়? নেক্সট যেই শহর পড়লো, সেখানে এক চায়ের দোকানে বসে চা সহকারে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে আমরা আলোচনা করছি নেক্সট মুভ। আমাদের বন্ধু সঞ্জয়ের ফ্যামিলি, এই মাস ৭/৮ হলো কুমিল্লা থেকে বারাসাত শিফটেড হয়েছে। তো আমাদের উপায় এখন একটাই, এনিহাউ বারাসাত পৌঁছানো , সঞ্জয়দের বাড়ি, কোলকাতার কথা আর ভাবছিও না।

আমাদের আলোচনা শুনে চায়ের দোকানের কয়েকজন নিজেদের মধ্যে অনেক তর্ক বিতর্ক করে পরামর্শ দিলো, এই রাস্তা বারাসাত যাবে না, তাই আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে কিছুদূর, সেখানে জিজ্ঞেস করলে বারাসাতের রাস্তা দেখিয়ে দেবে। তখন শেষ বিকেল, আমরা হতাশ, ক্লান্ত, বিধস্ত, রওনা দিলাম, যা হয় হোক আমাদের, বারাসাত পৌঁছাতে হবে। বাইকে স্পিডও ৫০/৬০ এর উপরে নেয়া যাচ্ছে না, ভাইব্রেশনে মনে হচ্ছে সব খসে পড়বে, ইঞ্জিন পুরো শেষ, হায় রে আমাদের ১২৫ টপস্পিড। আমাদের কোন কিছু ভাবার শক্তি নেই, সিঙ্গেল ফোকাস মনে, বারাসাত। প্রতিটা বাজারে একবার করে থেমে, দাদা বারাসাতের রাস্তা কোনট? আমরা কি ঠিক পথে যাচ্ছি? সন্ধ্যে পার হয়ে গ্যাছে, রাত, আমরা তখনো পথে, কোথায় বারাসাত? কতদূরে? হয়তো খুব বেশি সময় লাগতো না, যদি আমরা রাস্তা চিনতাম, কিন্তু এ তো অচেনা পথ, যখন তখন রঙ টার্ন হতে পারে, এক কিলোও এক্সট্রা চলার সামর্থ্য নেই। মনে হচ্ছিলো, আমরা বুঝি অনন্তকাল ধরে পথ চলছি, পথ আর ফুরাচ্ছে না, নিজেরা কথা বলারও শক্তি নেই। অবশেষে যখন বারাসাত ঢুকলাম, তখন বোধহয় ৮ টা বাজে। আমাদের কাছে ঠিকানা আছে সঞ্জয়দের বাড়ির, আর একটুখানি কষ্ট। কিন্তু একবার দুর্ভোগ শুরু হলে এত সহজে রেহাই মেলে? খুঁজে খুঁজে যখন ওদের বাড়ি পৌঁছালাম, সঞ্জয় বাড়ি নেই, বেড়াতে গ্যাছে, ওর মা-বাবা আমাদের চেনেন না। আমরা তখন নি:শেষিত, সামান্য কোন শক্তি নেই আর অবশিষ্ট। আর এক কিলোও বাইক চালানো সম্ভব না। গাঁজা ফাজা খেলে হয়তো সম্ভব হতো, কিন্তু আমরা সকাল থেকেই কফি উইথ নো এডেড সুগার অর ক্রিম। এই সাড়ে আটটার সময় এখন কোথায় যাবো? হোটেলই ভরসা। দুটো হোটেলে ফেল মারলাম, ওরা বাইক রাখতে দেবে না। শেষ পর্যন্ত যখন ডিসাইডেড, জাহান্নামে যাক বাইক, আগে আমরা নিজেরা বাঁচি, এমন সময় তিন নম্বর হোটেলে বাইক রাখার জায়গা মিললো। শুধু রুম পর্যন্ত উঠে, বিছানায় বডি ফেলার শক্তিটুকু অবশিষ্ট তখন। রেজিস্টার রুমে পাঠিয়ে দিতে বললাম, দাঁড়িয়ে লেখার সামর্থ্য নেই। ওদের নিজেদের রেস্টুরেন্ট ছিলো, তাই রাতে খাওয়ার সুযোগ মিললো, নইলে হয়তো না খেয়েই ঘুমিয়ে যেতাম, আর খাওয়ার পরে বয়কে দিয়ে এক পাইন্ট রামও আনানো হতো না, ওটুকু খুবই দরকার ছিলো।

পরদিন ঘুম ভাংলো ১০ টার দিকে, প্রায় ১২ ঘন্টা পরে। আমরা খেয়ে দেয়ে কোলকাতার পথ ধরলাম, এবারে পুরো চেনা পথ, এবং দিনের বেলা, আর কোন কষ্ট হয় নি। এই ব্যাঙ্গালোর থেকে বর্ডার - বর্ডার থেকে সোনারপুর, এটাই আমাদের শেষ অভিযান এবং সম্ভবত বোকাচোদামো টু ইটস এক্সট্রিম, অপটিমাস, ম্যাক্সিমাস।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন