বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

পিকনিক পিকনিক

ডিসেম্বরের গোড়াতেই স্কুল ফাইনাল শেষ। কিন্তু তারপরে আর কারো ট্রেস পাওয়া যায় না, কেউ মামাবাড়ি, লেউ নিজের বাড়ি। এই তো ইন্ডাস্ট্রিয়াল কলোনিতে থাকার ফলাফল। সবারই বাসা এবং বাড়ি থাকে। সারা বছর বাসায় থাকলেও, এই ছুটিতে বাড়ি যেতেই হবে। সবাই ফিরতে ফিরতে ডিসেম্বরের শেষ, রেজাল্টের সময় চলে আসে, লে পাশ করবে কে ফেল, বিরাট গিয়ানজাম। অন্যের কথা কি বলবো, আমিই তো এই সময়ের অপেক্ষায় থাকি, মামাবাড়ি গিয়ে পিঠে টিঠে খাবো। তো যাই হোক, ইয়ারলি পিকনিকটা সিজনে আর হয়ে ওঠে না আমাদের। সেইকালে এখনকার মত সুইফট সার্ভিস ছিলো না , বুক বোর্ডের। এখন যেমন জানুয়ারির ১ তারিখে সব বই হাতে হাতে পৌঁছে যায়, তখন প্রথম বই আসতেই হয়তো জানুয়ারির ফার্স্ট উইক পার হয়ে যেত, তারপরে হয়তো সব বই এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। গোটা জানুয়ারি তাই, বেশ একটা ছুটি ছুটি ভাব।  বই আসেনি, সবার তো আর ঠেকা পড়েনি, পুরোন বই জোগাড় করে নেবে, তাই ক্লাসও হয়তো, আজ একটা কাল দুটো। স্যারেরা খামাখা ক্লাসে সময় নষ্ট না করে নিজেদের স্টক মালের ব্যাবসার হিসেব মেলাতেই ব্যস্ত।  আমরাও মিলিয়ে দেখছি, কজন আগের ক্লাসেই পড়ে রইলো, পরের ক্লাস থেকে কজন ফেল করে আমাদের সাথে জুটলো। এবং সেই যে মিস হওয়া পিকনিকটা, সেটা এই ফাঁকে সেরে ফেলতে হবে।

ক্লাস এইটে ওঠার আগে আমাদের নিজে নিজে পিকনিক করার মত এলিজিবিলিটি ছিলো না। কারণ বাজার এবং রান্না, এই দুটো করার মত কেউ আমাদের ছিলোই না। বড়দের ঢুকতে দেয়া মানেই তাদের তদারকিতে নিজেদের সব নষ্ট, এর চাইতে ঐ পিকনিক না করাই ভালো। এইটে আমরা পেলাম, অন্তত এক ক্লাস ফেল করা রানা  আর দুই ক্লাস ফেল করা রাজকে। ওরা আমাদের বেশ সিনিয়র। ফেল করে আসা সিনিয়ররা যেখানে আমাদের পাত্তাই দিতো না, এই দুই জন নিজ দায়িত্বে আমাদের কেয়ারটেকার হয়ে গেল। যেকোন ইনফো জোগাড়, দরকারী জিনিস এনে দেয়া, কে কার সাথে প্রেম করবে, তাতে কি দরকার হবে, সব কিছুর দায়িত্বে এই দুইজন। এবং অবশ্যই পিকনিক এক্সিকিউটিভ কমিটির এক্সিকিউটিভ মেম্বার। ক্লাস নাইনে আমরা তখন নিজেদের আর বাচ্চা টাচ্চা ভাবিনা অফিশিয়ালি। সব মিলে এবারে আমরা আছি ৫৭ জন। ফেব্রুয়ারি চলে এসেছে, কিন্তু ক্লাসের সবাই এখনো আসছে না ক্লাসে। বই এবছর লেট, বেশিই। কিন্তু পিকনিকের সময় তো চলে যাচ্ছে। তো এমনই একদিন, ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড ক্লাস যখন হলো না, আমরা  প্রাইমারি কমিটির ৭ জন মাঠের পাশে নারকোল গাছ তলায় বসে, শিঙ্গাড়া খেতে খেতে আলোচনা শুরু করলাম, পিকনিক নিয়ে। আমরা ৪ টে ছেলে, ৩ টে মেয়ে। মেয়ে তিনজন বাকি সব মেয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে, ওরা যা বলবে, বাকিরাও তাই বলবে, ছোট থেকে দেখে আসছি। রানা, রাজ, থাকবেই, সব ছোটাছুটি তো ওদেরই করতে হবে। তিতাস আছে, কারণ সবকিছুর মধ্যে ওকে থাকতেই হবে। আর আমি? হেঁ হেঁ, গুডি বয় ফেস ভ্যালু, খুউউউউউব জরুরী। তাছাড়া আমিই সবথেকে লাউড মাউথ, আমি কিছু করতে পারি না সেটা আলাদা কথা, লাউড মাউথ মানেই আলগা প্রশ্রয়। আর প্রেমিকার বাসায় মিটিং সিটিং হবে, আমি থাকবো না, রানা-রাজ থাকতে এটা অসম্ভব।  কিন্তু শান্তি নেই, এসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার রব্বানী স্যার সাইকেল চালিয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হুঙ্কার দিলো, রস বেশি হয়ে গ্যাছে? বেশি হয়ে গেলে বাথরুমে গিয়ে ফেলো, এখানে ফেলে। (আবহমানকাল ধরে রব্বানী স্যারকে চাঁদনী নামে ডেকে আসছে, ব্যাচের পরে ব্যাচ ধরে। পাক্কা হুজুর লোকটাকে চাঁদনী কেন বলা হয়, তার সদুত্তর তো দূরে থাক, কোন উত্তরই কারো কাছে মেলেনি,  অনেক সিনিয়রদের কাছেও না।)

প্রথমে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, চাঁদা কত হবে। আইটেম তো ফিক্সড, খিচুড়ি, মাংস, কোল্ড ড্রিঙ্ক আর সাউন্ড বক্স। সাউন্ড বক্স খাবো না এটা ঠিক, কিন্তু না হলে পিকনিকই হয় না, ফুল ভলিউমে গান চলবে, তবেই না বলা যাবে, হ্যাঁ পিকনিক হচ্ছে। চাঁদা আবার বেশিও হতে পারবে না, বেশি হলে  অনেকে ন্যাকামি শুরু করবে, এত টাকা চাঁদা, আমি করবো না। খুব সম্ভব ১০০ টাকাই হতো তখন চাঁদা। ফাইনাল হলে পরের ক্লাসে এনাউন্সমেন্ট। এরপরে লিস্ট করা, কে কে করবে, প্রথম ৪/৫ দিনে দেখা গেলো ১৫/২০ জনের বেশি নামই দিলো না। ৫৭ জনে ১৫/২০, আমাদের তো মাথায় হাত। এবারে শুরু সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুরোধ, উপরোধ। আরে কি চাপ, এমন ভাব করছে একেকজন, যেন পিকনিক!!! সে কি জিনিস? কি আকাম কুকামের মধ্যে ঢুকতে বলা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার এমন, ওহ পিকনিক? অমুকে কি করবে? করবে? ওহহহ, তাহলে আমি করবো না। একেকসময় হাতে পায়ে ধরা বাকি থাকতো।  মেম্বার না বাড়লে চাঁদা বাড়াতে হবে, চাঁদা বাড়ালে মেম্বার কমে যাবে। কি শালার ফিনানশিয়াল ম্যানেজমেন্ট। ফাইনালি হয়তো সপ্তাহখানেক পরে ৪০/৪৫ জন পাওয়া গেলো, এই না কত, বাকি রা আমাদের সাথে না অন্যদের সাথ্র করবে, কত শত গ্রুপিং। যাক, তালিকা তো হলো, এবারে কালেকশন। আহা, প্রতি বেলায় দুয়ারে দুয়ারে ঘোরো, ভিক্ষাপাত্র নিয়ে। আজ না, কাল, আজ ৫০ বাকি পরে। কেউ আবার টাকা দেবে পিকনিকের দিনে, কনফার্ম হয়ে, পিকনিকটা হচ্ছে।  এই কালেকশনের মধ্যে ফের একবার, না করবো না রব। গ্রুপিং, কাজকর্মের দায়িত্বে ও থাকলে পিকনিক হবে না, অজস্র চাপ। কিন্তু পুরো চাপটাই আমাদের ৪ জনের মাথায়, মেয়ে তিনজন? ওরা অডিটর। কেন স্মুদলি হচ্ছে না, এটা নয় ওটা, ওটা নয় সেটা।

 মোটামুটি সপ্তাহ তিনেক ধরে অসম্ভব পরিশ্রমের পরে ফাইনাল আউটলাইন, ৪০+ পার্টিসিপেট করবে, ৭০% কালেকশন শেষ। এবার লোকেশন বাছাই। দা ট্রায়ো, প্রথমেই বলবে, পিকনিক হবে ওদের ছাদে। বিল্ডিং এর ছাদে পিকনিক, মেয়েরা তো সবাই রাজি হবে, কিন্তু ছেলেরা তো মানবে না। বিল্ডিং এর ছাদ মানেই জোরে গান বাজালে বিভিন্ন বাসা থেকে এসে বলবে, এই আওয়াজ কমাও। একটু ছোটাছুটি করলেই কমপ্লেইন, পিকনিক মানে অসভ্যতা নাকি, আর একবার শব্দ হলে নামিয়ে দেবো। আবার মাঠে তাঁবু গেঁড়ে পিকনিক টু মাচ বয়েজ অনলি। তো ভরসা আমাদের ট্রেইনিং কমপ্লেক্স। সে আবার অনুমতি নিতে হবে, সেদিন ওখানে কোন মিটিং বা প্রোগ্রাম আছে কিনা, সেটা বুঝে পিকনিকের ডেট ফেলতে হবে। পারমিশন নিতে জিএম এডমিনের কাছে যেতে হবে। কারেন্ট জি এম আবার পাত্তা দেবে কিনা, নাকি বাবাকে বলতে হবে। এই বাবা টাবা নিজেদের ঝামেলায় টানতে ইচ্ছা করে না। মানে সব শেষ করে পিকনিকের ডেট ফাইনাল করা হলো যেদিন, খুব সম্ভব তার পরের দিন থেকেই ফুল ক্লাস শুরু হবে। পিকনিক রব ওঠার  মাস খানেকেরও বেশি পার করে অবশেষে আমরা পিকনিক করছি।আমাদের মত এত যন্ত্রণা সহ্য করে একটা পিকনিক নামাতে আর কাউকে দেখিনি কখনো। খিচুড়ি ফাইনাল। চাল আর ডাল লাগবে। মাংস, গরু হবে না, হিন্দু আছে বলে নয়, ক্লাসের হিন্দু তিনটে পিকনিকে টাকা খরচ করে না, কিন্তু অন্তত ১০ জনের এলার্জি। খাসির মাংস খরচে পোষাবে না। সেই মুরগী। এবারে শালা মুরগী তো হিসাব করা চাপ। মাথা পিছু আড়াইশো গ্রাম মাংস তো এটলিস্ট হতে হবে। মুরগী তাহলে কেজি সাইজের অন্তত ১৫ টা লাগবে। কারণ মুরগীর বাদ যায়। এবারে শালা কুটবে কে।  ১৫ টা মুরগী পরিষ্কার কে করবে, তখনো ব্রয়লার মুরগী আসে নি বাজারে, দেশী মুরগী। আবার লোক ঠিক করা এই কাজের জন্যে। সে পিকনিকের দিন ৮ টার মধ্যে চলে আসবে কিনা সেটা ১০০ বার বলে ফাইনাল করার পরেও হয়তো ১০ টার আগে দেখাই মিললো না। ১২ কেজি মাংস রাঁধতে অন্তত আড়াই কেজি পেঁয়াজ বাছতে হবে, অন্তত আধা কেজি রসুন, আধা কেজি আদা। খিচুড়ির জন্যে আরো অন্তত এক কেজি পেঁয়াজ,   আধা কেজি রসুন। কাজের জন্যে তো কাউকে পাওয়া যাবে না। ৪/৫ টা মেয়ে আর আমরা ৪ টে ছেলে, সেই বিকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত নাকের জল চোখের জল এক করে বাছা। পেঁয়াজ বাছার সময় চোখ দিয়ে জল গড়ানো, উফফ, তখন যে কি ভয়াবহ লাগতো। মনে একটাই সান্তনা, বাঁড়া পিকনিকটা আমরা করছি কালকে।

সকালে ৭ তা সাড়ে ৭ টায়ই আমি বেরিয়ে পড়বো, রানা রাজ আর তিতাসকে বের করতে হবে। বাজারে যেতে হবে, মুরগীর অর্ডার দেয়া, নিয়ে আসতে হবে। ব্রেকফাস্টের প্যাকেট, বনরুটি কলা লাড্ডু নিয়ে এসে প্যাক করতে হবে। বসে বসে প্যাক করতে করতে অপেক্ষা মুরগী কোটার লোক আসবে কখন। বাড়ি কে চেনে, কেউ না। আরে বোকাচোদা, বাড়ি চিনে আসবি না একজন। আমরা তো ছোটাছুটিতে বিজি, মনে করানো যেত না,? এই নিয়ে ছোট খাটো এক দফা তর্কাতর্কি। ৯ টার মধ্যে রাজ গিয়ে সাউন্ডবক্স আর পাতিল নিয়ে এলো ডেকোরেটর থেকে,, গান শুরু। ১৫/২০ জন চলে এসেছে, মেয়েদের দেখা নেই এখনো। মুরগী স্পেশালিস্ট আসতে আসতে ১০ টা। এর মধ্যে চুলো তৈরী করে,  খড়ি জড়ো করে শেষ করে ফেলেছি। ১০ টা বেজে যায় তাও আসে না সবাই। একি রে বাল, দাওয়াতে ডাকা হয়েছে নাকি, খাওয়ার সময় আসবে। আবার বাড়ি বাড়ি পাঠানো কাউকে।  প্যাকেট হাতে নিয়ে, কলা এত কাঁচা কেন, বনরুটি বাসি কেন, লাড্ডু এত ছোট কেন। সালাদে কি থাকছে, আমি কিন্তু খিরা খাইনা, শসাই থাকতে হবে। খিচুড়ির পাতিল চড়িয়ে দেয়া হলো, আরে আরেকটু তাড়াতাড়ি কোটেন না মুরগী। নিজেরা কোটো, আমি কুটলে এমনই সময় লাগবে। কুটে ধুয়ে রেডি করতে করতে প্রায় ১ টা , খিচুড়ি হয়ে গ্যাছে। কিন্তু মাংস কবে রান্না হবে, কবেই বা খাবো। বড় মুরগী, সিদ্ধ হতে সময় নেবে। এই রানা বোকাচোদা কোথায় গেলো, সব রেডি ও না থাকলে রান্না করবে কে। কোল্ড ড্রিঙ্ক আনতে গ্যাছে, কেন রাজকে পাঠানো যেত না। রানা এলো,  রান্না শুরু। দুটো পার হয়ে যায়, আড়াইটে, তাও সিদ্ধ হয় না মাংস। খিচুড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছি, রানা হাতা হাতে পাহারা দিচ্ছে। ভিতরে অসন্তোষ, এদের সাথে এই কারণে পিকনিক করতে চাই না। তিনটে পার হয়ে গেলো। এই বাল, সিদ্ধ আর হতে হবে না, যা হয়েক্সহে তাই থাক, আর সহ্য হচ্ছে না। রানা আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছে, আর ১০ মিনিট, আর ১৫ মিনিট। অবশেষে যখন খাবার মিললো তখন প্রায় ৪ টে। আহা কি তার স্বাদ, এত খিদে আর নিজেদের রান্নার আনন্দ সব মিলে যেন অমৃত।

খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই শান্ত।  কোন তর্ক নেই, বিতর্ক নেই, শান্তি আর আড্ডা। পরের বছরের পিকনিকটা আরো আগে থেকে সব এরেঞ্জমেন্ট করতে হবে, চাঁদা একটু বেশি হয় হোক, তাও আরো ভালো আয়োজন চাই। অমুকের অমুক কানেকশন আছে, কমে পাওয়া যাবে, অমুকের অমুক চেনাশোনা আছে, ভালো পাওয়া যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি আরো কত কি। কিন্তু আমরা জানি, পরেরবারেও এমনই কিছু হবে। এমন না হলে আবার পিকনিক হয় নাকি। পিকনিকের আসল মজাই তো তার ঝামেলায়। জয় পিকনিক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন