বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

অনুবাদ - ১ (Ransom of Red Chief)

মাথায় দারুণ একটা প্ল্যান এসেছিলো,  এর চাইতে ভালো প্ল্যান আর হতেই পারেনা, কিন্তু দাঁড়ান, আগে পুরোটা শুনে নিন। আলাবামার ডাউন সাউথে ছিলাম আমরা তখন -- বিল ড্রিশোল আর আমি -- যখন অপহরণের বুদ্ধিটা মাথায় এলো। পরবর্তিতে বিল এ নিয়ে বলেছিলো, "ওই সময়টাতে আমাদের মাথায় ভুত ভর করেছিলো"; কিন্তু ফেঁসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি। শহরটার নাম ছিলো সামিট, একদম ফ্লানেল কেকের মত সাধারণ। এর অধিবাসী হচ্ছে একদল অখাদ্য, আত্মতৃপ্ত চাষা, মে'পোল'এর চারধারে যেমনটা সচরাচর ঘুরতে দেখা যায়।

বিল আর আমার যৌথ পুঁজি ছিলো ৬০০ ডলারের মত, ইলিনয়স'এ একটা ভুয়া জমি নিয়ে ঠগবাজীর ফন্দী খাটাতে আমাদের দরকার ছিলো আর ২০০০। একটা হোটেলের সিঁড়িতে বসে আমরা এই নিয়েই ভাবছিলাম। আমরা ভাবছিলাম, এই সমস্ত আধা গ্রাম্য এলাকার লোকেরা খুব বেশিই বাৎসল্যপ্রবণ, তো মূলত এটাই এবং আরো কিছু কারণে, আমরা ভেবে দেখলাম,  খবরের কাগজ এবং সাংবাদিকের দৌরাত্মপূর্ণ শহুরে এলাকাগুলোর চাইতে এখানেই বরং অপহরণ প্রকল্প সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করা যাবে। এখানে ঐ যত্রতত্র নাক গলানো সাংবাদিকেরা ঘাঁটাঘাটিও করতে আসবে না। আমরা জানতাম, সামিট আমাদের পিছনে সর্বোচ্চ ব্যয় করতে পারে, গোটা দুই  কনস্টেবল, দু' চারটে অলস বুড়ো কুকুর আর বড়জোর সাপ্তাহিক কৃষক সংবাদে এক বা দুই কলামে দু' চারটে তীব্র শব্দ। সবকিছু মিলে ঠিকঠাকই মনে হলো।

শহরের এক বিশিষ্ট নাগরিক ইবনেজার ডরসেট'এর একমাত্র সন্তানকে আমরা শিকার হিসেবে বাছাই করলাম। বাপটা বেশ সম্মানীয় একজন বন্ধকী কারবারী, চার্চের দানপাত্রে সচরাচর টাকা ফেলে না এবং প্রথম সুযোগেই বন্ধক রাখা জিনিস গিলে ফেলে। আর বাচ্চাটা, ১০ বছরের মুখে ফুটিফুটি দাগওলা একটা ছেলে, চুলের রংটা হচ্ছে ট্রেনে ওঠার আগে পত্রিকার স্টল থেকে কেনা ম্যাগাজিনের কাভারের মত। বিল আর আমি হিসাব করে দেখলাম, ইবনেজার বেশ বিগলিত হয়েই ২০০০ ডলারের প্রতিটা পাই পয়সা চুকিয়ে দেবে। দাঁড়ান, আগে বলা শেষ করি।

সামিট থেকে মাইল দুয়েক দূরে ঘন সিডার গাছে ছাওয়া একটা ছোট পাহাড়। এর পিছন দিকের খাড়াইতে একটা গুহা ছিলো। সেখানে আমরা রসদ জমা করে রাখলাম। একদিন সন্ধ্যায়, সূর্যাস্তের ঠিক পরপর একটা বাগিতে চেপে আমরা ডরসেটের বাড়ি থেকে একটু দূরে গিয়ে থামলাম। ছেলেটাকে দেখলাম  রাস্তায় দাঁড়ানো, রাস্তার ওপারে বেড়ার উপরে দাঁড়ানো বেড়ালের গায়ে পাথর ছুঁড়ছে।
"এই যে বাবু', বিল বললো, "চকোলেট খাবে? তোমাকে গাড়িতে চড়াবো।"
ছেলেটা বিলের চোখ বরাবর নিখুঁত নিশানায় একটা ঢিল ছুঁড়ে মারলো।
"এর জন্যে ওর বাপের থেকে বাড়তি ৫০০ ডলার আদায় করে ছাড়বো", তাড়াতাড়ি গাড়িতে চড়তে চড়তে বিল বললো।
ছেলেটা আমাদের সাথে একটা ছোটখাটো বাদামী ভালুকের মত লড়ছিলো, কিন্তু শেষপর্যন্ত ওকে আমরা কোনমতে বাগির ফ্লোরে চেপে ধরে কেটে পড়লাম। ওকে গুহায় ঢুকিয়ে রেখে, সিডার ঝোপের মধে ঘোড়া বেঁধে এলাম। পুরো অন্ধকার হয়ে এলে, আমি বাগিটাকে যেখান থেকে ভাড়া করে এনেছিলাম, তিন মেইল দূরের সেই ছোট্ট গ্রামটাতে চালিয়ে নিয়ে গেলাম, আর হেঁটেই ফিরলাম পাহাড়ে।

বিলকে দেখলাম, শরীরের এখানে ওখানে, আঁচড় আর থেতলানো জায়গায় মলম লাগাচ্ছে। গুহায় ঢোকার  মুখের কাছে একটা বড় পাথরের চাঁই এর আড়ালে আগুন জ্বলছে, ছেলেটা ফুটন্ত কফির কেটলির দিকে তাকিয়ে, ওর লাল চুলে বাজার্ডের লেজের দুটো পালক গোঁজা। আমাকে আসতে দেখেই, একটা লাঠি আমার দিকে তাক করে বললো,
"রে অভিশপ্ত পাঁশুটেমুখ, কোন সাহসে তুই সমতলের আতঙ্ক রেড চিফ'এর আস্তানায় পা দিয়েছিস?"
"ও একদম ঠিক আছে", ট্রাউজার গুটিয়ে হাঁটুর নিচে ছড়ে যাওয়া জায়গা টিপেটুপে দেখতে দেখতে বিল বললো। "আমরা ইন্ডিয়ান ইন্ডিয়ান খেলছি। আমাদের খেলার তুলনায় বাফেলো বিলের শো'কে মনে হবে টাউন হলে দেখানো প্যালেস্টাইনের ম্যাজিক ল্যান্টার্ন ছায়াচিত্র। আমি ওল্ড হ্যাঙ্ক, ফাঁদি, রেড চীফের বন্দী এবং কাল ভোরে আমার মাথার ছাল ছাড়ানো হবে। জেরোনিমোর কসম,  কি জোরে লাথি মারে ছোঁড়াটা!"
হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, জীবনের সেরা মুহূর্ত কাটাচ্ছে। বাইরে পাহাড়ি গুহায় ক্যাম্পিং করার মজায় ও ভুলেই গ্যাছে, ও নিজেই একজন বন্দী। কালবিলম্ব না করে ও আমার নাম দিয়ে দিলো, স্নেক আই, গুপ্তচর এবং ঘোষনা দিলো, ওর দলের যোদ্ধারা ফিরে এলে, কাল সূর্যোদয়ের সময় আমাকে খুঁটিতে বেঁধে অগ্নিকুন্ডে ঝলসানো হবে।

এরপরে আমরা রাতের খাবার সেরে নিলাম; আর ও মুখ বেকন, ব্রেড আর ঝোলে ভর্তি করে বকবকানি শুরু করলো। ওর ডিনারটাইম বক্তব্যগুলো ছিলো খানিকটা  এরকম,
"আমার খুবই ভালো লাগছে। আগে কখনো এভাবে ক্যাম্পিং করিনি; কিন্তু আমার একসময় একটা পসাম ছিলো, আর গত জন্মদিনে আমার বয়েস ছিলো নয়। আমার স্কুলে যেতে একদমই ভালো লাগে না। জিমি ট্যালবট'এর চাচীর ছিটে মুরগীটার ষোলটা ডিম ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে। আচ্ছা এই বনের মধ্যে কি সত্যিকারের ইন্ডিয়ান আছে? এই আমাকে আরেকটু ঝোল দে। আচ্ছা, গাছ নড়ে বলেই কি হাওয়া ওঠে? আমাদের ৫ টা কুকুরছানা আছে। এই হ্যাঙ্ক, নোর নাক এত লাল কেন? আমার বাবার অনেক টাকা। তারাগুলো কি খুব গরম? গত শনিবার আমি এড ওয়াকারকে পিটিয়েছি, দু'বার। আমি মেয়েদের দেখতে পারিনা। ভালো সুতো না হলে ব্যাঙ ধরা সহজ না। গরু আওয়াজ করে কেন? কমলালেবু গোল হয় কেন? গুহায় শোয়ার জন্যে বিছানা আছে? এমোস মারে'র পায়ে ছ'টা করে আঙ্গুল। তোতাপাখি কথা বলতে পারে কিন্তু বাঁদর বা মাছ পারে না। আচ্ছা, ১২ হতে আর কতদিন লাগবে?"
একটু পরপরই ওর মনে পড়ে যাচ্ছিলো ও ঝামেলাকারী লালমুখো, আর ওর লাঠি রাইফেল নিয়ে পা টিপে টিপে গুহার মুখে গিয়ে চোখ বুলাচ্ছিলো, ঘৃণ্য পাঁশুটেমুখদের কোন স্কাউট নজরে আসে কিনা। যখন তখন আচমকা যুদ্ধ নিনাদ ছাড়ছিলো, শুনে ফাঁদি ওল্ড হ্যাঙ্ক কেঁপে কেঁপে উঠছিলো। ছেলেটা একদম গোড়া থেকেই বিলকে আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে।

"রেড চীফ," আমি ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, "বাড়ি যেতে হবে না?"
"ওহ! কেন?" ও বললো, "বাড়িতে কোন মজা নেই। স্কুলে যাওয়াটা আমার খুবই অপছন্দ। আমার এমন বাইরে থাকতেই ভালো লাগে। এই স্নেক আই,  তুই আমাকে আবার বাড়িতে রেখে আসবি না তো?"
"নাহ, এখনই না," আমি বললাম, " আমরা এই গুহায় থাকবো ক' দিন।"
"ঠিক আছে," ও বললো, "তাহলে ভালোই হবে। আমার জীবনে কোনদিন এত মজা পাই নি"
১১ টা নাগাদ আমরা শুয়ে পড়লাম। একটা বড় কম্বল পেতে, চাদর বিছিয়ে, রেড চীফকে দুজনের মাঝখানে রাখলাম। ও পালিয়ে যাবে সেই ভয় একেবারেই ছিলো না। প্রায় ঘন্টা তিনেক ও আমাদের জাগিয়ে রাখলো, পাতা নড়ার বা আগুনে ডালের গিঁট ফাটার আওয়াজকে নিজের মনে ও কল্পনা করে নিচ্ছিলো আউটলদের এগিয়ে আসার আওয়াজ, আর আমাদের দুজনের কানের কাছে তীক্ষ্ণ আওয়াজে বলে উঠছিলো, "এই হুঁশিয়ার"। অবশেষে একসময় আমি ঘুমিয়ে গেলাম, আর স্বপ্ন দেখলাম, আমাকে লাল চুলের এক ভয়ঙ্কর ডাকাত অপহরণ করে এনে গাছের সাথে শিকল দিয়ে আটকে রেখেছে।

ঠিক ভোরবেলা, বিলের  মুহুর্মুহু  ভয়াবহ চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। সেগুলো, হুঙকার বা ধমক বা গর্জন বা হাঁকডাক বা সতর্ক সংকেত, মানে পুরুষের কন্ঠস্বর থেকে যা বেরোতে পারে এমন কিছুই ছিলো না --- ওগুলো ছিলো শ্রেফ অশোভন, আতঙ্কিত, অবমাননাকর আর্তনাদ, যা সাধারণত ভুত বা শুঁয়োপোকা দেখে মেয়েদের গলা থেকে বেরোয়। ভোরবেলা গুহার মধ্যে একটা মোটাসোটা, শক্তিশালী, বেপরোয়া লোকের থেকে এমন অসংযত আর্তনাদ শোনা একটা ভয়াবহ ব্যাপার।

ঘটনা কি বুঝতে এক লাফে উঠে বসলাম। দেখি কি, বিলের বুকের উপরে রেড চীফ বসে আছে, এক হাতে চুল মুঠ করে ধরা। আরেক হাতে আমাদের বেকন কাটার ধারালো ছুরি; ও খুব অধ্যাবসায়ের সাথে বাস্তবিকই বিলের মাথার ছাল ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, আগেরদিন সন্ধ্যায় বিলের জন্য যেই শাস্তির ঘোষনা দিয়েছিলো।
আমি ওর হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিয়ে ওকে ফের শুইয়ে দিলাম। কিন্তু, ওর পর থেকেই বিলের মনোবল ভেঙে গিয়েছিলো। এরপরে ছেলেটা আমাদের সাথে যতক্ষন পর্যন্ত ছিলো, বিল এক মুহুর্তের জন্যেও চোখ বোজেনি। আমি কিছুক্ষন ঝিমাচ্ছিলাম, কিন্তু যেই সূর্যোদয়ের সময় এগিয়ে আসতে  লাগলো, আমার মনে পড়ে  গেলো যে রেড চীফ বলেছিলো, সূর্যোদয়ের সময় আমাকে খুঁটিতে বেঁধে আগুনে পোড়ানো হবে। আমি যে ঠিক নার্ভাস ছিলাম বা ভয় পাচ্ছিলাম, এমন নয়; কিন্তু তাও আমি উঠে একিটা পাথরে হেলান দিয়ে বসে পাইপ জ্বালালাম।

"কিরে স্যাম, এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি যে?" বিল জিজ্ঞেস করলো।
"আমি?" আমি বললাম, "ওহ, ঐ আমার কাঁধের পাশটায় কেমন একটা ব্যাথা মনে হচ্ছে। ভাবলাম, হেলান দিয়ে বসলে হয়তো একটু আরাম হবে।"
"তুই একটা মিথ্যুক," বিল বললো, "তুই ভয় পাচ্ছিস। সূর্যোদয়ের সময় তোকে পোড়ানোর কথা, তুই ভয়ে আছিস, ও ঠিক সেটা করবে। আর ও তা করবেও, যদি দেশলাই হাতে পায়। কি ভয়াবহ ব্যাপার বল, স্যাম? তোর কি আসলেই মনে হয়, এমন একটা শয়তানের বাচ্চাকে কেউ পয়সা খরচ করে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে চাইবে?"
"অবশ্যই," আমি বললাম, " এমন বদমাশ বাচ্চারাই বাপ মায়ের নয়নের মনি হয়। যাকগে,  এবারে তুই আর রেড চীফ মিলে ব্রেকফাস্ট তৈরী কর; আমি এইফাঁকে উপরে উঠে আশপাশ ভালো করে ঝালিয়ে নিই।"

আমি পাহাড়ের চুড়ায় গিয়ে উঠলাম এবং আশপাশের বিস্তির্ণ এলাকায় ভালো করে নজর বুলিয়ে নিলাম। সামিটের দিক থেকে  একদল গাট্টাগোট্টা চাষাকে পিচফর্ক আর কাস্তে হাতে বদমায়েশ অপহরণকারীর খোঁজে ঝোপঝাড় ঠেঙাতে ঠেঙাতে এগিয়ে আসতে দেখবো বলে আশা করছিলাম। কিন্তু, যা দেখলাম, তা হচ্ছে, শান্ত প্রকৃতির মধ্যে  একটা মাত্র লোক মেটে রঙের খচ্চর দিয়ে লাঙল টানছে।  কেউ খাঁড়িতে জাল টানছে না, চিন্তিত বাবা-মা এর কাছে খবর দিতে বার্তাবাহকের এদিক ওদিক ছোটাছুটিও দেখা যাচ্ছে না। শান্ত বনানীর ঘুমঘুম পরিব্যপ্তিময় এলাবামার গ্রামাঞ্চল আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। "সম্ভবত," আমি নিজেকে বললাম, "গৃহস্ত এখনো জানেই না, নেকড়ের পাল এসে ঘরের কোণ থেকে মেষশাবক ধরে নিয়ে গ্যাছে। ঈশ্বর নেকড়ের পালের সহায় হোন!" এই বলে, ব্রেকফাস্টের জন্যে নিচে নেমে এলাম।

গুহায় ফিরে দেখি, বিল একপাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে, আর ছেলেটা, আধখানা নারকোল সাইজের একটা পাথর হাতে ওর মাথা থেঁতলে দেবে বলে শাসাচ্ছে।
"ও আমার পিঠের উপরে একদন গনগনে গরম একটা আলু রেখে, পা দিয়ে ভর্তা করেছে," বিল শশব্যস্ত হয়ে বললো, "আর আমি ওর কান মুচড়ে দিয়েছি। এউ স্যাম, তোর কাছে পিস্তল টিস্তল কিছু আছে?"
আমি ছেলেটার হাত থেকে পাথর নিয়ে একরকম মিটমাট করে দিলাম। "আমি তোকে দেখে নেবো," বিলকে বাচ্চাটা বললো, " আজ পর্যন্ত কেউ রেড চিফের গায়ে হাত তুলে রেহাই পায় নি। তুই সাবধানে থাকিস।"
ব্রেকফাস্ট শেষ করে, বাচ্চাটা পকেট থেকে ফিতে জড়ানো একটা চামড়ার টুকরো বের করে পাক খুলতে খুলতে গুহা থেকে বেরিয়ে গেলো।
"ও আবার কি করতে যাচ্ছে?" বিল উদ্বেগের সাথে বললো, " তোর কি মনে হয়, ও পালিয়ে যাবে না তো?"
"নাহ, এ নিয়ে ভাবছিই না, " আমি বললাম, "ওকে দেখে ঠিক ঘরে বসে থাকা বাচ্চা তো মনে হয় না। কিন্তু মুক্তিপনের ব্যাওয়ারে আমাদের জলদি একটা কিছু একটা করতে হবে। ওর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে সামিটের আশেপাশে তেমন কোন আলোড়ন তো নজরে এলো না, হয়তো এখনো বোঝেই নি, ও গায়েব। হয়তো ওর আত্মীয়স্বজন ভাবছে, ও কোন পাড়া পড়শির বাড়ি রাত কাটাচ্ছে। যাই হোক, আজ ঠিকই সবার টনক নড়বে। আজ রাতের মধ্যেই মুক্তিপণ বাবদ দুহাজার ডলার চেয়ে একটা চিঠি ওর বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।"

ঠিক তখনই আমরা একরকম যুদ্ধ হুঙ্কার শুনতে পেলাম, যেমনটা হয়তো গোলিয়াথকে হারানোর পরে ডেভিডের মুখ থেকে বেরিয়েছিলো। ঘুরে দেখি রেড চীফ, ও পকেট থেকে ওটা পাথর ছোড়ার স্লিং বের করেছিলো, সেটা এখন মাথার উপরে ঘোরাচ্ছে।
আমি বসে পড়লাম, আর শুনলাম  খুব জোর ধুপ করে একটা শব্দ, এবং বিলের থেকে দীর্ঘশ্বাসের মত একরকম আওয়াজ; অনেকটা পিঠ থেকে জিন নামানোর পরে ঘোড়া যেমন আওয়াজ করে থাকে। ঠিক ডিমের সাইজের একটা কালো পাথর বিলের কান বরাবর গিয়ে লেগেছে। বিল কাটা কলাগাছের মত পড়ে গেলো, আর পড়বি তো পড়,  বাসন কোসন ধোয়ার জন্যে জল গরম হচ্ছিলো, ঠিক তার উপরে। আমি তারাতাড়ি ওকে টেনে নিয়ে এসে, আধাঘন্টা ধরে ওর মাথায় গায়ে ঠান্ডা জল ঢাললাম।

একটু সুস্থির হয়ে বসে, কানের পিছনটা ডলতে ডলতে বিল বললো,  " স্যাম রে, বাইবেলের কোন চরিত্রটা আমার সবথেকে প্রিয় জানিস?"
"আরে, শান্ত হ," আমি বললাম, "একটু পরেই মন মাথা সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"কিং হেরড," ও বললো, "তুই আমাকে এখানে একা ফেলে রেখে চলে যাবি না তো স্যাম?"
আমি বাইরে এসে ছেলেটাকে পাকড়ে ধরে দাঁত খিঁচুনি না ওঠা পর্যন্ত ঝাঁকাতে থাকলাম।
"তুই যদি তোর আচরণ ঠিক না করিস," আমি ওকে বললাম, "আমি এক্ষুনি তোকে বাড়ি রেখে আসবো। এবার বল, তুই লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবি কিনা"
"আমি তো শুধু একটু মজা করছিলাম," ও থমথমে মুখে বললো, "হাঙ্ককে মারার কোনই ইচ্ছা ছিলো না আমার। ও আমার গায়ে হাত তুললো কেন? ঠিক আছে স্নেক আই, আমি দুষ্টুমি করবো না, যদি আমাকে বাড়ি না রেখে আসিস, আর আমাকে আজ ব্ল্যাক স্কাউট খেলতে দিস।"
"আমি ওসব খেলা টেলা জানি না," আমি বললাম, "তুই আর বিল মিলে ঠিক কর, কি খেলবি। আজকের মত ও'ই তোর সাথে খেলবে। আমি একটা কাজে কিছুক্ষনের জন্যে বাইরে যাচ্ছি। এখন তুই ভিতরে এসে বিলের সাথে মিটমাট করে নে, ওকে মারার জন্যে সরি বল, নয়তো  এক্ষুনি বাড়ি রেখে আসবো।"
আমি বিলের সাথে ওর হাত মিলিয়ে দিলাম, এরপরে বিলকে একপাশে ডেকে বললাম, এখান থেকে মাইল তিনেক দূরের পপলার কোভ গ্রামে যাচ্ছি। ওখানে গিয়ে বুঝেশুনে দেখি, সামিটের লোকেরা অপহরণ নিয়ে কেমন কি ভাবছে। তাছাড়া ভাবছি  মুক্তিপনের পরিমাণ আর কিভাবে সেটা দিতে হবে সেই নিয়ে নির্দেশমূলক একটা চিঠি ডরসেটকে আজকের মধ্যে পাঠানোই ভালো হবে।

"দেখ স্যাম," বিল বললো, " আমি সব সময়  কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তোর সাথে থেকেছি। ভুমিকম্প, টর্নেডো, বন্যা, অগ্নিকান্ড, সাইক্লোন, পুলিশ রেইড, পোকার টেবিল, ট্রেন ডাকাতি, ডিনামাইট বিস্ফোরণ, সব কিছুতে। কিন্তু এই দুপেয়ে পটকাকে অপহরণের আগে পর্যন্ত আমি সাহস হারাই নি। ও আমাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে। তুই আমাকে খুব বেশি সময়ের জন্যে ওর সাথে একা রেখে যাবি না তো, স্যাম?"
"আমি আজ বিকেলের মধ্যেই ফিরবো এক সময়," আমি বললাম, "তোর কাজ হচ্ছে আমি ফেরা পর্যন্ত বিচ্ছুটাকে মাতিয়ে রাখা, ওকে শান্ত রাখা। আর আয়, এখনই ডরসেটের কাছে চিঠি লেখার কাজটা সেরে নিই।
আমি আর বিল, কাগজ পেন্সিল নিয়ে চিঠি খসড়া করতে বসলাম, আর রেড চীফ নিজেকে কম্বলে মুড়ে, পায়চারি করতে করতে গুহার মুখ পাহারা দিতে লাগলো। মুক্তিপণের টাকা দুই হাজার থেকে পনেরশ'তে নামাতে প্রায় চোখে জল এনে কাকুতি মিনতি করছিলো বিল।
 "দেখ, আমি সুপ্রসিদ্ধ আপত্যস্নেহের নৈতিক দিক নিয়ে  প্রশ্ন তোলার কোন চেষ্টাই করছি না," বিল বলছিলো, "কিন্তু এটা মানবিকতার প্রশ্ন, আর এই ৪০ পাউন্ড ওজনের হিংস্র বনবেড়ালের জন্য কাউকে দুই হাজার দিতে বাধ্য করাটা একেবারেই অমানবিক হবে। তুই চাইলে আমার থেকে বাকিটা নিয়ে নিস।"
তো বিলকে শান্ত করতে আমি মেনে নিলাম ওর কথা, আর দুজনে মিলে যে চিঠিটা লিখলাম, তা অনেকটা এরকম:

ইবনেজার ডরসেট মহোদয়,
আপনার ছেলেকে আমরা সামিট থেকে বেশ দূরে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছি। শুধু আপনি নিজেই না, সবথেকে দক্ষ গোয়েন্দা দিয়েও খোঁজাখুঁজির চেষ্টা চালানোটা নিরর্থক। শুধুমাত্র যেই শর্তে আপনি ওকে ফিরে পেতে পারেন, তা হচ্ছে: ওকে ফিরিয়ে দিতে আমাদের দাবী হচ্ছে বড় অঙ্কের নোটে পনেরোশ ডলার; টাকাটা আজকে মাঝরাতেই পৌঁছাতে হবে ঠিক একই জায়গার একই বাক্সে, যেখানে আপনার জবাবের চিঠি রাখতে বলা হয়েছে -- জায়গাটার বর্ণনা নিচে দিচ্ছি। আমাদের শর্তে রাজি থাকলে, আজ রাত ঠিক সাড়ে আটটার সময়, একজন বাহক মারফত আপনার জবাব লিখে পাঠাবেন।  পপলার কোভ'এ যাওয়ার পথে ওল্ড ক্রিক পার হবার পরে, রাস্তার ডান হাতে গম ক্ষেতের বেড়ার কাছে, ১০০ গজ পরপর, তিনটে বড় গাছ আছে। তিন নম্বর গাছটার ঠিক বিপরীতে বেড়ার একটা খুঁটি, ওর নিচে একটা কার্ডবোর্ড বাক্স রাখা আছে। আপনার বার্তাবাহক ঐ বক্সে জবাব রেখে কালবিলম্ব না করে সামিটে ফিরে যাবে। যদি কোনরকম প্রতারণার আশ্রয় নেন, অথবা আমাদের দাবী মানতে রাজী না হন, তাহলে আপনার ছেলেকে আর কোনদিন দেখতে পাবেন না। যদি দাবী মোতাবেক টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে তিন ঘন্টার মধ্যে আপনার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দেয়া হবে। আমাদের শর্তটাই চুড়ান্ত, যদি আপনি রাজী না হন, আপনার সাথে যোগাযোগের আর কোন চেষ্টা করা হবে না
ইতি,
দুজন বেপরোয়া লোক।

খামের উপরে ডরসেটের ঠিকানা লিখে চিঠিটা পকেটে পুরলাম। আমি রওনা দিতে যাবো, এমন সময় বিচ্ছুটা আমার কাছে এসে বললো,
"এই স্নেক আই, তুই যে তখন বললি, তুই যাওয়ার পরে আমি ব্ল্যাক স্কাউট খেলতে পারবো।"
"খেল না, মানা করলো কে," আমি বললাম, "বিল তোর সাথে খেলবে। আচ্ছা খেলাটা আসলে কেমন?"
"আমি ব্ল্যাক স্কাউট," রেড চীফ বললো, "ঘোড়ায় চড়ে প্রতিরক্ষাব্যুহে গিয়ে আমাকে বসতিকারীদের সতর্ক করতে হবে, যে ইন্ডিয়ানরা আসছে। নিজে ইন্ডিয়ান সাজতে সাজতে বিরক্তি ধরে গেছে। এবারে আমি ব্ল্যাক স্কাউট হতে চাই।"
"ঠিক আছে," আমি বললাম, "শুনতে তো নিরীহই লাগছে। আশা করি বিল তোর সাথে মিলে ঐ বুনো বর্বরদের হারিয়ে দেবে।"
"আমাকে কি করতে হবে?" সন্দেহের দৃষ্টিতে বিচ্ছুটার দিকে তাকিয়ে বিল জিজ্ঞেস করলো।
"তুই হচ্ছিস ঘোড়া," ব্ল্যাক স্কাউট বললো, "আয় হামাগুড়ি দিয়ে বস। ঘোড়া না হলে আমি কিসে চড়ে প্রতিরক্ষ্যাবুহ্যে যাবো?"
"আমাদের ফন্দীটা খেটে না যাওয়া পর্যন্ত তুই ওকে মাতিয়ে রাখাটাই ভালো হবে," আমি বিলকে বললাম, "আরে এত ভাবিস না তো।"
বিল চার হাতপায়ে ভর দিয়ে বসলো, ওর চোখেমুখে ফাঁদে আটকা পড়া খরগোশের মত ভাবভঙ্গী ফুটে উঠছিলো।
"এই ছোঁড়া, প্রতিরক্ষাবুহ্য কতদূর রে?" নিরস কন্ঠে বিল জিজ্ঞেস করলো।
"নব্বই মাইল," ব্ল্যাক স্কাউটের নির্বিকার জবাব, "আর সময়মত ওখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তোর পিঠ বাঁকা হয়ে যাবে। এই ঘোড়া, চল হ্যাট"
একলাফে ব্ল্যাকস্কাউট বিলের পিঠে চড়ে বসে, গোড়ালি দিয়ে পাঁজরে জোর ঘা বসিয়ে দিলো।
"ঈশ্বরের দোহাই," বিল বললো, "জলদি ফিরিস স্যাম, যত জলদি পারিস। ইস মনে হচ্ছে, যদি মুক্তিপণটা হাজার ডলারের বেশি না ধরতাম। এই ছোঁড়া, তুই যদি লাথি মারা বন্ধ না করিস, আমি সোজা উঠে দাঁড়াবো, তখন বুঝবি মজাটা।"

আমি হাঁটতে হাঁটতে পপলার কোভ'এ গিয়ে, পোস্ট অফিস আর মুদি দোকানের আশেপাশে বসে কাজে আসা নোংরা লোকগুলোর সাথে খোশগল্প মারতে লাগলাম। এক দেড়েলের কাছ থেকে শুনতে পেলাম,  ইবনেজার ডরসেটের ছেলে হারিয়ে গ্যাছে বা চুরি হয়ে গ্যাছে বলে গোটা সামিট শহর খুবই অস্থির। এটুকুই জানার দরকার ছিলো। আমি পাইপের জন্যে খানিকটা তামাক কিনলাম, ক্যাজুয়ালি বিউলির ডালের দাম জিজ্ঞেস করলাম, চুপি চুপি চিঠিটা পোস্ট করে, কেটে পড়লাম। পোস্টমাস্টারের কাছে শুনেছিলাম, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই রানার এসে  চিঠিগুলো সামিটে নিয়ে যাবে।
যখন ফিরলাম, দেখি বিল বা ছোঁড়াটা কেউই নেই। আমি গুহার আশেপাশের তল্লাট তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই দু' চারবার নাম ধরে চেঁচালামও, কিন্তু কোন পাত্তা নেই।
তো আমি পাইপ ধরিয়ে বসে রইলাম, দেখি কি দাঁড়ায়।

প্রায় আধা ঘন্টা বাদে, ঝোপঝাড় ভাঙার আওয়াজে মুখ ফিরিয়ে দেখি, বিল ঝোপ ঠেলে লেংচাতে লেংচাতে গুহার সামনের ফাঁকা জায়গায় ঢুকছে। ওর পিছনে একগাল হাসি নিয়ে বিচ্ছুটা স্কাউটের মত পা টিপে টিপে এগোচ্ছে। বিল থামলো, হ্যাট খুললো, একটা লাল রুমালে মুখ মুছলো, বিচ্ছুটা বিলের ঠিক আট ফিট দূরে থেমে গেলো।
"স্যাম রে," বিল বললো, "আমার মনে হয় তুই আমাকে এখন আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভাববি, সে তুই ভাব, কিন্তু আমার আসলে কিচ্ছু করার ছিলো না। আমি একজন পৌরুষদীপ্ত আত্মরক্ষাপ্রবণ পূর্ণবয়স্ক মানুষ, কিন্তু কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন অহংবোধ বা আত্মশ্লাঘা কিচ্ছু কাজ করে না, কিচ্ছু না। ছেলেটা চলে গ্যাছে। আমি ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। সব খতম," বিল বলেই চলেছে, "এককালে লোকে আত্মোৎসর্গ করতো, নিজের বিশ্বাস পরিত্যাগের চাইতে মৃত্যুযন্ত্রণাকেও শ্রেয় ভাবতো। কিন্তু তাদের মধ্যেও কাউকে আমার মত এমন অতিপ্রাকৃত অত্যাচার সহ্য করতে হয় নি। আমাদের কুকর্মের নীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকার খুব চেষ্টা করেছি রে, কিন্তু সহ্যের তো একটা সীমা আছে।"

"হয়েছেটা কি, খুলে বলবি?" আমি জিজ্ঞেস করলাম
"ওকে পিঠে নিয়ে আমাকে ছুটতে হয়েছে," বিল বললো, "রক্ষণবুহ্য বরাবর পাক্কা ৯০ মাইল, এক ইঞ্চিও কম হবে না। এর পরে যখন বসতিকারীদের রক্ষা করা শেষ হলো, ও আমাকে ওট খেতে দিলো। কিন্তু বালি, ওটের খুব একটা স্বাদু বিকল্প নিশ্চয় না। আর তারপরে,  একঘন্টা ধরে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে, গর্তের মধ্যে ফাঁকা থাকে কেন, রাস্তার দুই দিক হয় কেন, ঘাস সবুজ হয় কেন। তুইই বল স্যাম, মানুষের সহ্যশক্তির তো একটা সীমা থাকে। তো আমি ওর কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে পাহাড় থেকে নামালাম। নিচে নামার পথে আমার হাঁটু নিচে এলোপাথাড়ি লাথিয়েছে, কামড়ে বোধহয় আমার বুড়ো আঙ্গুল আর হাত থেকে দুই চার টুকরো মাংসও তুলে নিয়েছে।"
"কিন্তু ও চলে গ্যাছে," -- বিল বলেই চলেছে--, "ও বাড়ি চলে গ্যাছে। আমি ওকে সামিটের পথ দেখিয়ে, পিছনে এক লাথ মেরে আট ফিটের মত পথ এগিয়েও দিয়েছি। আমি খুবই দু:খিত দোস্ত মুক্তিপণের টাকাটা আমাদেরকে হারাতে হচ্ছে; কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিলো, হয় এটা, নয়তো বিল ড্রুশোল পাগলাগারদে।"
বলতে বলতে বিল হাঁফাচ্ছিলো, কিন্তু ওর নধর গোলাপি চেহারায় ফুটে উঠছিলো অনাবিল প্রশান্তি, আর পরিতৃপ্তির ছাপ।

"ইয়ে, বিল," আমি আস্তে করে বললাম, "তোর ফ্যামিলির মধ্যে কারো তো হার্টের সমস্যা নেই, তাই না?"
"নাহ," বিল বললো, "ম্যালেরিয়া আর দুর্ঘটনা ছাড়া তেমন দীর্ঘমেয়াদী কিছুই নেই।"
"তাহলে এক কাজ কর," আমি বললাম, "ঘুরে দাঁড়িয়ে তোর পিছনে তাকা।"
বিল ঘুরেই ছেলেটাকে দেখলো এবং ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, আর ও ওখানে ধপ করে বসে পড়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘাস পাতা কাঠি নাড়তে শুরু করলো। পরের একঘন্টা আমি ধরেই নিয়েছিলাম বিলের মাথা খারাপ হয়ে গ্যাছে। আমি ওকে বোঝাতে থাকলাম, যে আমার ফন্দীটা হচ্ছে পুরো কাজটা ঝটপট সেরে ফেলা, আর ডরসেট আমাদের প্রস্তাব মেনে নিলে আজ মাঝরাতের মধ্যেই মুক্তিপণের টাকাটা নিয়ে কেটে পড়া। তো বিল আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিলো। বিচ্ছুটার দিকে মুখ ফিরিয়ে দুর্বল একটা হাসি দিলো, এবং একটু সুস্থ বোধ করলে জাপান যুদ্ধে রাশিয়ানের ভুমিকায় খেলতেও রাজি হলো।

আমার ফন্দীটা ছিলো একদম পেশাদার কিডন্যাপারের  মত, পালটা ফাঁদ এড়িয়ে মুক্তিপণ হাতিয়ে নেয়া। যেই গাছের নিচে চিঠি, এবং পরবর্তিতে টাকা রাখার কথা, সেটা চতুর্দিক খোলা বিশাল ফাঁকা মাঠের পাশে। তো একদল পুলিশ যদি নজর রাখে, তো বহু দূর থেকে দেখা যাবে রাস্তা বা মাঠ দিয়ে কে আসছে যাচ্ছে। না, আমাকে এত বোকা ভাববেন না। সাড়ে আট বাজার অনেক আগেই আমি গাছে উঠে গেছো ব্যাঙের মত ডালের সাথে লেপ্টে বসে বার্তাবাহকের আসার অপেক্ষায় ছিলাম।
একদম সময়মত, একটা উঠতি বয়েসি ছেলে রাস্তা ধরে বাইসাইকেল চালিয়ে এসে, গাছের কাছে থেমে, বেড়ার ধারে কার্ডবোর্ডের বাক্সটা খুঁজে নিয়ে, একটা ভাঁজ করা কাগজ রেখে, ফের প্যাডেল করে সামিটের দিকে ফিরে গেলো।

আমি ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করে সিদ্ধান্তে এলাম, সবই ঠিকঠাক আছে। আমি গাছ থেকে নামলাম, নোটটা পকেটে পুরলাম, বেড়ার ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চট করে টপকে জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম, এবং আধা ঘন্টার মধ্যেই গুহার ধারে পৌঁছে গেলাম। আমি কাগজের ভাঁজ খুলে, লন্ঠনের কাছে নিয়ে বিলকে পড়ে শোনাতে লাগলাম। চিঠিটা কলম দিয়ে লেখা, হাতের লেখাও জঘন্য। সার সংক্ষেপ মোটামুটি এমন:

দুই বেপরোয়া ভদ্রমহোদয়,
আমার ছেলের মুক্তিপণ দাবী করে পাঠানো চিঠিটা, ডাক মারফতে আজকেই পেয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, আপনারা বেশ খানিকটা বেশিই দাবী করে বসেছেন, বরং আমি আপনাদের কাছে একটা পালটা প্রস্তাবনা রাখছি, যা আমার বিশ্বাস আপনারা সানন্দে গ্রহণ করবেন। আপনারা জনিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবেন এবং আমাকে নগদ আড়াইশো ডলার দেবেন, বিনিময়ে আমি আপনাদের হাত থেকে ওকে ছুটিয়ে নিতে সম্মত হবো। খুব ভালো হয়, যদি আপনারা রাতের দিকে আসেন, কারণ পাড়া পড়শি বিশ্বাস করে বসে আছে, ও হারিয়ে গ্যাছে, আর যদি ওরা কাউকে দেখে ওকে ফিরিয়ে দিয়ে যেতে, তাহলে ওরা তাকে যা করবে, তার দায় আমি নিতে পারবো না।
অত্যন্ত শ্রদ্ধাবনত,
ইবনেজার ডরসেট।

"পেনজান্সের জলদস্যু," আমি বললাম, "কি অসম্ভব ধৃষ্টতা--"
কিন্তু বিলের দিকে চোখ পড়তেই আমি থমকে গেলাম। ওর মুখ যেন অপার্থিব আলোয় উদ্ভাসিত।
"স্যাম," ও বললো, "মোটে আড়াইশো ডলার আর এমন কিই বা বল? আমাদের কাছে তো টাকা আছেই। আর একটা রাত ওর সাথে কাটাতে হলে, ছোঁড়াটা আমাকে ঠিকই পাগলাগারদে পাঠাবে। ডরসেট আসলে শুধু একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোকই নন টাকা পয়সা নিয়েও ভাবেন না তেম,  নয়তো এত উদারমনা প্রস্তাব কেউ দেয়। এই সুযোগ তুই কিছুতেই ছাড়ছিস না, তাই না?"
"সত্যি বলতে কি বিল," আমি বললাম, "এই ছোট্ট মেষশাবক আমার নার্ভের অবস্থাও খারাপ করে ফেলেছে। তাহলে এটাই ঠিক রইলো, ওকে আমরা বাড়ি নিয়ে যাবো এবং মুক্তিপণের টাকাটা পরিশোধ করে সটকে পড়বো।"
আমরা ঐ রাতেই ওকে বাড়ি দিয়ে এলাম। বাড়ি ফিরতে আমরা ওকে এই বলে রাজী করালাম, যে ওর বাবা ওর জন্যে একটা রূপোর কাজ করা রাইফেল আর একজোড়া মোকাসিন কিনেছে, এবং পরের দিন ওই রাফেল নিয়ে আমরা তিনজনে ভালুক শিকারে বেরোবো।

ইবনেজারের বাড়ির দরজায় যখন নক করলাম, তখন কাটায় কাটায় রাত বারোটা বাজে। মূল প্রস্তাবনা অনুসারে ঠিক যেই মুহূর্তে গাছের নিচের কার্ডবোর্ড বাক্স থেকে পনেরশো ডলার হস্তগত করার কথা, ঠিক সেই মুহুর্তেই বিল গুনে গুনে আড়াশো ডলার ডরসেটের হাতে তুলে দিচ্ছিলো।
ছোঁড়াটা যখন টের পেলো, ওকে আমরা বাড়িতে ফেলে যাচ্ছি, সপ্তস্বরে চিলচিৎকার জুড়ে দিলো, আর জোঁকের মত বিলের পা আঁকড়ে ধরে রইলো। ওর বাবা ওকে কাপড়ের তৈরী প্লাস্টার ছাড়ানোর মত করে আস্তে আস্তে ছুটিয়ে নিলো।
"ওকে কতক্ষন আটকে রাখতে পারবেন?" বিল জিজ্ঞেস করলো।
"এখন আর আগের মত শক্তি নেই আমার শরীরে," বুড়ো ডরসেট বললো, "কিন্তু আমার মনে হয়, অন্তত মিনিট দশেক সময় আপনাদের দিতে পারি।"
"যথেষ্ট," বিল জবাব দিলো, "দশ মিনিট সময়ের মধ্যে আমি দক্ষিন আর মধ্য পশ্চিমের স্টেটগুলো পার হয়ে কানাডিয়ান সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে যাবো।"

আর, তারপরে? রাতটা খুবই অন্ধকার ছিলো, বিলও খুব মোটাসোটা এবং আমি খুব ভালো দৌড়াতে পারি বলেই জানতাম, কিন্তু অবশেষে যখন আমি দৌড়ে বিল'এর ধারে কাছে পৌঁছাতে পারলাম, ও ততক্ষনে সামিট থেকে মাইল দেড়েক পেরিয়ে এসেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন