রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

একটি যথার্থ জাতীয় সঙ্গীত (কি প্যারা)

১)
আগে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের ইতিহাস বলি ।  ৭১ এর আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের সবথেকে সাহসী রাজনৈতিক সিনেমা হচ্ছে "জীবন থেকে নেয়া"। ৭১ এর নাকের ডগায় বসে ৭০ সালে এই মাস্টারপিস তৈরী করেন জহির রায়হান। শুধু এই সিনেমা তৈরীর জন্যেই পাকিস্তান সরকারের হিট লিস্টে উঠে যান তিনি। বুকের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে  দেয়ার মত সিনেমা। প্রেমে এবং দ্রোহ, আহ! রোমান্টিসিজম। পূর্ব বাংলায় এর মত অসাধারণ সিনেমা আর তৈরী হয়নি। ৭০ সাল থেকে নিয়ে অন্তত ২০১০ পর্যন্ত, এই সিনেমাটা ৩/৪ বার করে দেখেনি এমন কোন বাংলাদেশী নেই। বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে এর চাইতে দ্ব্যর্থক কোন সিনেমা নেই৷ শেখ মুজিবের ৭ মার্চ ভাষনের সমতুল্য একটা সিনেমা।  জহির রায়হানকে মেরে ফেলার পরে আর আসলে এত ভালো এক্সপেরিমেন্টাল কাজ আর কেউ করতে পারেননি। সিনেমা নিয়ে এত জ্ঞানই এদিকে আর কারো ছিল না। ১৪ ডিসেম্বর জহির রায়হান বেঁচে গেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাথে ছিলেন বিধায়। কিন্তু ৭২ এর জানুয়ারি ঠিক তাকে মেরে রেখে গেল শুয়োরের বাচ্চারা, শেষ কামড়ে বাংলাদেশের সম্ভবত সব থেকে বড় ক্ষতিটা করে দিয়ে গেল।

https://m.youtube.com/watch?v=EFO96ZhyuX0


তো এখানে একটা সিনে 'আমার সোনার বাংলা' পুরোটা ঢোকানো হয় ৩/৪ জনে সমবেত। অসাধারণ প্লেসমেন্ট, এর চাইতে ভালো হতেই পারে না।



আচমকা যখন পাকিস্তানী আর্মি ম্যানিয়াক হয়ে গেল কয়েকমাস পরেই, ঠান্ডা মাথায় নিজের দেশের লোকের উপরে ট্যাংক মার্চ করে এক রাতে ২৫/৩০ হাজার মানুষ খুন করে ফেলা, পুরো আর্মি এমন ম্যানিয়াক কি করে হয় কে জানে। তখন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার  বাংলাদেশের সাথে এই গানের চাইতে বেটার ম্যাচ কিছু ভাবার কোন কারণ দেখেননি। তাই সেই তখন থেকে এই গানের প্রথম অংশ জাতীয় সংগীত।

আর কোন কবি গীতিকারের গান জাতীয় সংগীত হতে পারবেনা কেন সেটা প্রশ্ন না৷ এই গানের চাইতে দ্ব্যর্থকতা আর কোন গানের সাথে বাংলাদেশের নেই। তেমন সৃষ্টি হয়নি।

তাছাড়া ভাবা যায়? পূর্ব বাংলার সেই মনের মানুষ  গগন হরকরার সুরে, গোটা বাংলার মনের মানুষ রবীন্দ্রনাথের কথা। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আর কি হতে পারে আসলে?

চেঞ্জ করতেই হবে কেন? ঠিক কোন কারণে?  এর চাইতেও বেটার আর্গুমেন্ট আছে? সিরিয়াসলি?

২)
জেমস আর প্রিন্স মাহমুদের বাংলাদেশে একটা অযথা পলিটিকাল কারেক্টনেসের গান। আইউব বাচ্চু একটা বাংলাদেশ গেয়েছিলেন। জেমসেরও একটা বাংলাদেশ না হলে চলছিল না।

আইউব বাচ্চুর বাংলাদেশ ছিল, শামসুর রাহমানের কবিতা "আমার বাংলাদেশ"। মিষ্টিই একটা সুর, আর শামসুর রাহমান নিঃসন্দেহে পূর্ব বাংলার সবথেকে মিষ্টি ভাষার কবি।  কিন্তু বড় কঠিন গান, আর বাচ্চুও খুব বাজে ভোকাল একেকটা গানে।  প্রিন্স মাহমুদ আর জেমস মিলে তার থেকে বেটার কিছু তৈরী করতে চাইলেন। কিন্তু মুজিব জিয়া ভাষানি সোহরয়ার্দি সব একাকার করে রাজনীতি ঠিক রাখলেন। এ

র‍্যান্ডম একটা কিছু ধরে দিলেই তো হয়ে যায়না, তাইনা?

রূপকথার রূপকল্প


আমাদের বাংলা রূপকথার গল্পগুলো প্রজন্মের পরে প্রজন্ম ধরে অপরিবর্তিত আছে। আমাদের বাব-মা, তাদের বাবা-মা, হয়তো বা তাদেরও বাবা-মা শুনে এসেছেন, পড়ে এসেছেন এইসমস্ত আবহমান রূপকথাগুলো। কুঁচবরণ কন্যার মেঘবরণ কেশ, সোনার কাঠি রূপোর কাঠি, ডালিমকুমার, অরূণ বরূণ কিরণমালা, সুখু-দুখু এমন আরো বেশ অনেকগুলোই। বাংলা ভাষাভাষীদের বাইরেও বাংলায় বেশ কিছু রূপকথা আছে আদিবাসীদের। মোটাদাগে প্রায় তিনরকম রূপকথা পাওয়া যায়, আমি গল্পের ধরণ ভেদে ভাগ করছি:

১) রাজকুমার, রাক্ষস, ডাইনি, রাজকন্যা
২) রাজপুত্র, রাজকন্যা, দু:খ, হাহাকার, আনন্দ
৩) অন্তর্নিহিত অর্থবাচক

আর এই রূপকথার গল্পের কিছু কমন ফ্যাক্টর হচ্ছে, রাজ্য, রাজকুমার, রাজকন্যা, রাক্ষস, খোক্কস, ডাইনি, পঙখীরাজ, দৈত্য, ভুত, সুতানাগ, সুয়োরাণী, দুয়োরাণী, সন্ন্যাসী, জাদু। সমস্ত গল্পগুলোই এগুলোকে ভিত্তি করে আবর্তিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাংলায় রূপকথা সেই ১০০ বছর আগেই থেমে গ্যাছে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীই সম্ভবত শেষ মৌলিক রূপকথা লিখেছেন, এর পরে আর কেউ ভাবেও নি রূপকথাকে সাহিত্যের একটা ধারা হিসেবে। ফলে আমাদের রূপকথার ধারাবাহিকতা ওখানে শুধু থমকেই যায় নি, একরকম হয়তো শেষই হয়ে গ্যাছে। আমাদের পরের প্রজন্ম কি আদৌ সন্তুষ্ট থাকবে বা সন্তুষ্ট থাকা আদৌ কি সম্ভব, সেই ১০০ বছর আগেকার ভাবনা সংশ্লিষ্ট রাক্ষস খোক্কস দৈত্য দানবে? এমনকি যেখানে আরো অনেএক পুরোনো পারস্যের আরব্য রজনী বা হাতিম তাই এর গল্প আমাদের বাংলা রূপকথা থেকে অনেক বেশি উত্তেজনাকর, অনেক বেশি ফ্লুইড, অনেক বেশি বিস্তৃত, সেখানে বাংলায় আমরা একদমই এগোতে পারিনি আমাদের রূপকথা নিয়ে। আমাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কি এতই থমকে গ্যাছে যে সেই কোন হাজার বছর আগেকার রামায়ন/মহাভারতের পরে আমরা বিস্তৃত পটভূমি নিয়ে কোন রূপকথা লিখতেই পারিনি?

এত লম্বা ভুমিকা টানার উদ্দেশ্য আসলে বাংলা সাহিত্যকে ধাক্কা টাক্কা দেয়া নয়, আমার মত মানুষের ধাক্কায় বাংলা সাহিত্য একচুল নড়বেও না। কাজের সংজ্ঞা বলছে, বল প্রয়োগে বস্তুর অবস্থার পরিবর্তনই হচ্ছে কাজ, তা বাদে বাকি সবই অকাজ। আমি খামাখা অকাজে সময় নষ্ট করি না, তাই সাহিত্যে কোন বল প্রয়োগ করার বিন্দুমাত্র শখ আমার নেই। তাই আসল কথায় আসি। আমাদের গদ্যসাহিত্য মোটামুটি ইংরেজী গদ্য সাহিত্যকেই অনুসরণ করে চলে। ইংরেজী গদ্যের প্রায় সব শাখাকেই আমরা বাংলা সাহিত্যে স্থান দিয়েছি, শুধু সযতনে একটা শাখাকে এড়িয়ে গেছি, Fantasy Fiction, রূপকল্প। অনেকেই ফ্যান্টাসি ফিকশন পড়ে থাকেন, কিন্তু একই সাথে অনেকেরই হয়তো ধারণাও নেই ফ্যান্টাসি ফিকশন এখন সম্ভবত ইংরেজী সাহিত্যের সবথেকে জনপ্রিয় শাখা। ফ্যান্টাসি বলতে আমি শিশুতোষ হ্যারি পটারকে বোঝাচ্ছি না। হ্যারি পটার সিনেমা তৈরী শুরু না হলে হয়তোবা এত জনপ্রিয় হতোও না।, আমি ফ্যান্টাসি ফিকশনের সবথেকে জনপ্রিয় ধারা নিয়ে আমার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই শুধু। ধারাটার নাম হচ্ছে Epic Fantasy।

 আসলে বাংলাকে খুব একটা দোষ দিয়ে লাভ নেই।  ইংরেজী সাহিত্যও এপিক ফ্যান্টাসিকে তেমন সুনজরে দেখতোনা। কেনই বা দেখতে যাবে,  ইউরোপের বিভিন্ন এলাকার পৌরণিক গল্প আছে, ইংরেজীতে সেগুলো অনুবাদ করেই তো চলছিলো। আমাদের রাক্ষস খোক্কসের বিকল্প ছিলো ওদের, সেগুলো নিয়েও সুখে শান্তিতে ছিলো। হালকা চালে একটা দুটো ফ্যান্টাসি উপন্যাস, কিছু ছোটদের, কিছু বড়দের। কেউ লিখছে ড্রাগন আর নাইট নিয়ে, কেউ লিখছে ম্যাজিক নিয়ে, কেউ লিখছে মিথিকাল ক্রিয়েচার নিয়ে। কিন্তু, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পরে দিয়ে ফ্যান্টাসি ফিকশন ঘরানায় কিছু পরিবর্তন আসছিলো। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের আফ্রিকাকেন্দ্রিক ফ্যান্টাসিগুলো ফ্যান্টাসি উপন্যাসের ধারা পালটে দিচ্ছিলো।যদিও সবাই সেভাবে হ্যাগার্ডকে গ্রহণ করেনি তখনো, বিশেষ করে নাক উঁচু ইংলিশরা। The Inklings নামে উঠতি লেখকদের একটা গ্রুপ তৈরী হয় এই ১৯৩০ এর দিকে,  যারা হ্যাগার্ডের ন্যারেটিভ এবং ফ্যান্টাসির অভিনবত্বকে নিজেদের জন্যে অনুকরণীয় বলে ধরে নেয় এবং এধরণের ন্যারেটিভ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালানো শুরু করে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, ফ্যান্টাসি ফিকশনকে পুরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে হবে। প্রথম প্রোজেক্ট শুরু করেন C. S. Lewis, তাঁর The Chronicles of Narnia সিরিজ দিয়ে। দু:সাহস কিছুটা কম ছিলো, তাই ন্যারেটিভ আর পটভুমির ব্যাপকতা সত্বেও প্রচলিত ঘরানা থেকে খুব একটা বেরোতে পারেন নি ভদ্রলোক, এবং তাঁর সিরিজটাও একরকম বলা যায় শিশুতোষ। কিন্তু এর পরপরই ফ্যান্টাসি ফিকশনের সমস্ত ধ্যান ধারণা পালটে দিলেন J. R. R. Tolkien। সমস্ত মিথ, সমস্ত লিজেন্ড তিনি একাকার করে দিলেন, শুধু তাই না, প্রচলিত ধারা ভেঙে অলটারনেটিভ রিয়েলিটি নিয়ে এলেন তিনি। লিখলেন The Lord of the Rings, তৈরী হলো সম্পূর্ণ নতুন একটা শাখা Epic Fantasy।  সাহিত্য জগতে তোলপাড় হয়ে গেলো, ফ্যান্টাসি ফিকশনের মাইলফলক গেঁথে দিলেন তিনি। এতটাই ব্যপকত্ব তাঁ্র এই সিরিজের,  এমনকি অধুনা George R. R. Martin পর্যন্ত Tolkien'এর ছায়া থেকে বেরোতে পারেন নি A Song of Fire & Ice (HBO তে Game of Thrones নামে ড্রামা সিরিয়াল এই এপিক ফ্যান্টাসি সিরিজের আলেখ্যেই তৈরী) সিরিজটার মত ডার্ক এবং প্রায় ইউনিক একটা প্লট নিয়ে। Tolkien ফ্যান্টাসি সমস্ত কল্পনাকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছেন,   Warrior, Prince, Elf, Dwarf, Troll, Ogre, Orc, Goblin, Wizard, Wraith, Sentinel, Dragon, Giant,  Giant Bird, Magic Sword, Magic Stone, Magic Song, Magic Talisman, Healer, Assassin, Dark Power; মোটামুটি এগুলোই একটা এপিক ফ্যান্টাসির মূল উপাদান, রেয়ার দুই একজন এর বাইরে কিছু ভাবতে পেরেছেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, Tolkienই যদি সব করে ফেললেন, তাহলে বাকিরা এতদিন ধরে বসে কি করছেন, চর্বিত চর্বন হচ্ছে তো, তাই না? না, উনি শুধু পথ দেখিয়েছন, সবকিছু এক জায়গায় জড়ো করে দেখিয়েছেন, কিভাবে ধারাটা এগিয়ে নিতে হবে।  পরের ধাপে আমি দেখাচ্ছি, বিভিন্ন লেখক এই এলিমেন্টগুলো নিয়েই কিভাবে নিজেদের মত অসাধারণ কিছু এপিক সিরিজ লিখেছেন (অবশ্যই আমার সীমিত অভিজ্ঞতার আলোকে)।

★প্রথমেই আসি Robert Jorden এর Wheel of Time প্রসঙ্গে। ভালো এপিক ফ্যান্টাসির একটা সমস্যা হচ্ছে শুরুটা খুব স্লো এবং বোরিং হয়, হাতে গোনা দুই একটা এর ব্যতিক্রম। এখন একটা বই যখন ৪০০+ পাতার হয়, আর সিরিজ যদি অন্তত ৩ পর্ব ধরে চলে বোরিং স্টার্টিং তো হতেই পারে। রবার্ট জর্ডান এই বোর হবার ব্যাপারটাকেও শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন। হুইল অফ টাইম সিরিজের ১৪ টা বই, ১০০০০+ পাতা সব মিলে, অন্তত কয়েকশ রেগুলার চরিত্র, প্লটের ভয়াবহতা ভেবে দেখুন। আমি অন্তত দুবার সিরিজ থামিয়ে দিয়েছিলাম, ক্লান্ত হয়ে।  কমন প্লট গল্পের, গ্রামের সাধারণ ছেলে, ম্যাজিক সোর্ড, ডার্ক লর্ড, ম্যাজিক, এপিক জার্নি, এসব নিয়েই। কাহিনী বিস্তৃত করতে করতে ভদ্রলোক সম্ভবত ৫/৬ টা বইএর পরে খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ এর পরের ৩/৪ টে বই প্রায় একই জায়গায় পাক খেয়েছে, প্রায় একই রকম প্লট এই ৩/৪ টে বই এর,ল। শেষ ৪ টে বই তে আবার গল্পের রাশ টেনে ধরেছেন। এই সিরিজের মত বিস্তৃত করে অলটারনেট পৃথিবীর বর্ণনা বা চরিত্রগুলোর এপিক চরিত্র হয়ে বেড়ে ওঠা, এমনটা খুব কম পাওয়া যায়। আর ১০০০০+ পাতা বই লেখার সাহসও খুব কম মানুষের আছে।  সিরিজটার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যদিও মূল প্রোটাগনিস্ট তিনজন পুরুষ, বাকি প্রধাণ সমস্ত চরিত্রই নারী। নারী চরিত্রগুলোর দৃড়তা, তাদের স্ট্রেন্থ, পার্সোনালিটি, পাওয়ার, এভাবে আর কোন সিরিজে আমি দেখিনি। এমন কিছুই না হুইল অফ টাইম, কিন্তু কাহিনী বিস্তারের জন্যেই অনন্য এক স্থানে থাকবে সিরিজটা। হিন্দু, বৌদ্ধ, তাও, ক্রিশ্চিয়ান ফিলোসফির খানিকটা ছোঁয়া আছে গল্পে। আছে আরব বেদুইন, ফিউডাল জাপান, রেড ইন্ডিয়ান, ১৯৮৪ সালে লেখা শুরু করেন, ২০০৭ এ যখন মারা যান, তখন সিরিজের শেষ বইটা ধরেছেন সবে। বই শেষ না করেই মারা যাওয়ায়, জর্ডানের স্ত্রী এবং এডিটর Harriet অনেক ভেবে চিন্তে এই সিরিজের ডাই হার্ড ফ্যান আরেকজন ফ্যান্টাসি লেখক Brandon Sandarson'কে নিযুক্ত করেন বইটা শেষ করার কাজে, শেষ হবার পরে দেখা যায়, খুব বেশি বড় হয়ে গ্যাছে, গুরুর চাইতেও এককাঠি বাড়া শিষ্য। বইটাকে তখন ৩ ধাপে পাবলিশ করা হয়, ফাইনালি ১৯ বছর পরে ২০১৩ তে শেষ হয় সিরিজ। যদি অসম্ভব ধৈর্য্য এবং অফুরন্ত সময় থাকে হাতে, সিরিজটা পড়া শুরু করা যেতেই পারে।

★খুব সম্ভবত এই সিরিজটা শেষ করার সময়ই Brandon Sanderson তার নিজের লেখার জন্য একটা প্লট ভাবছিলেন, যার ফলস্রুতিতেই ২০১৪ তে দখা গেলো প্রায় ইউনিক প্লট সেটিংস নিয়ে হাজির ভদ্রলোক। ম্যাজিক সোর্ড এবং ডার্ক পাওয়ার, এটুকুই শুধু কমন বাকি ফ্যান্টাসিগুলোর সাথে। The Stormlight Archive, পুরোপুরি ইউনিক তার প্লট সেটিং, ক্যারেকটার বিল্ড আপ,   অলটারনেট রিয়েলিটি বা পাতার সংখ্যার দিক দিয়েও। এপর্যন্ত দুটো পর্ব এসেছে, দুটোই ১০০০+ পাতা, তৃতীয় পর্বে শেষ হবে বলে ধারণা করছি, কারণ আমি চতুর্থ পর্বে যাওয়ার মত ম্যাটেরিয়াল ভাবতে পারছি না। এখানে পৃথবী একেবারেই আলাদা, সূর্য্য একটা হলেও, চাঁদ তিনটে। কন্টিনিউয়াস, হাইস্টর্ম বয়ে যায় বলে, মানুষ ছাড়া বাকি সব জীবই খোলসওলা,  অর্থ্রোপোডা বা স্কেলড শরীর। গাছপালা নড়াচড়া করতে পারে, এবং হাইস্টর্মের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে মুড়ে ফেলতে পারে। সবথেকে বড় কথা এই সিরিজের একটা গোছানো প্লট আছে, এন্টিসিপেট করা যায় কিসের পরে কি হতে পারে, একঘেয়ে বয়ে চলা নয়।

★Jim Butcher এর Codex Alera সিরিজটা মিলিটারি, ম্যাজিক, এন্ড অফ ওয়ার্ল্ড এই তিন ঘরাণার মিশ্রণ। অনেকটা রোমান এম্পায়ার ধাঁচে সাজানো প্লট, মাইট এন্ড  ম্যাজিক দুই এর কম্বিনেশন। ৬ টা পর্বে ধাপে ধাপে বেড়ে উঠেছে গল্পের এন্টাগোনিস্ট, আছে কিছু মিথিকাল ক্রিয়েচার। তবে রোমান ধাঁচটাই এই সিরিজের মূল বৈশিষ্ট্য। বুচারকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিলো, চুড়ান্ত এবসার্ড এলিমেন্টাল কম্বিনেশন থেকে ফ্যান্টাসি গল্প লিখতে পারবেন না। বুচার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে এলিমেন্ট ধরিয়ে দেয়া হয়, Lost Roman legion এবং Pokemon। ভদ্রলোক ভালোই করেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। একটা ভালো প্লট, ভালো গাঁথুনি, এলিমেন্টাল এবসার্ডিটিকেও দিব্যি মিলিয়ে দিয়েছেন। ম্যাজিকাল ট্যালেন্টবিহীন কিশোর এন্টাগোনিস্টের শুধুমাত্র নিজের উইটের বলে একের পরে এক বাধা পার হয়ে, শেষ পর্যন্ত ম্যাজিক খুঁজে পাওয়া এবং হ্যাপি এন্ডিং, মোটের উপরে খারাপ না।

★Thomas Harlan, জার্মান রাইটার হলেও,  ওর Oath of Empire সিরিজটা ইংলিশ ফ্যান্টাসির মধ্যে আনছি অনন্য এক কারণে। ভদ্রলোক অলটারনেট রিয়েলিটি তৈরী করেন নি  অলটারনেট সিচুয়েশন তৈরী রী করেছেন, আমাদের খুব পরিচিত সেনারিও থেকে। পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে লড়াই চলছে, রোম থেকে তৎকালীন সিজার ভাবছে, রোমান বাইজেন্টাইন সম্মিলিত শক্তি নিয়ে লড়াই পারস্যের একদম সেন্টারে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু পারস্যের ম্যাজিকাল শক্তি তো অনেক বেশি তাই মাইনর স্যাক্রিফাইস চাই। নাবাতিয়া আর প্যালমিরা কে স্কেপগোট করে পারস্যের ডার্ক ম্যাজিককে ওখানে ফোকাস করাতে পারলেই নিরাপদে অন্য পথ ধরে এগিয়ে পারস্যের একদম ভিতরে ঢুকে যাওয়া যাবে নিরাপদে। আর ম্যাজিকাল পাওয়ার যদি না থাকে, মিলিটারি পাওয়ারে রোমানদের কাছে পারস্য কিছুই না। পারস্যের ডার্কেস্ট ম্যাজিশিয়ান যখন প্যালমিরার উপরে তান্ডব চালাচ্ছে, শ্রেফ কর্তব্যের খাতিরে সেখানে আটকা পড়ে গেছিলো আরব বেদুইন ব্যাবসায়ীদের নেতা মুহাম্মদ। ডার্ক ম্যাজিক দেখে ফাইনালি তার বোধ হলো, এর হাতে পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে, এর কাউন্টার ম্যাজিক চাই, আরবে ফিরে সে সন্ধানে নেমে পড়লো ম্যাজিক অফ লাইটের, এহেন একদিন গুহায় বসে ধ্যানের সময়, তীব্র আলোর ঝলকানি, আওয়াজ এলো, "পড়, পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন............."। রোমানদের দখানো পথেই মোহাম্মদ নেমে পড়লো ধখল এবং সাম্রাজ্য বিস্তার করে শক্তি বৃদ্ধিতে, ডার্ক ম্যাজিকের মোকাবিলা করতেই হবে।
সচরাচর এমন অলটারনেট হিস্ট্রি, অল্টারনেট সিচুয়েশন নিয়ে এমন বিস্তারে লেখা হয় না, ওথ অফ এম্পায়ার সিরিজটা সেদিক দিয়ে খানিকটা ইউনিক তো বটেই। মুহাম্মদের অলটারনেট হিস্ট্রি উপভোগ্যও

★Steven Ericson এর Malazan Book of the Fallen সম্ভবত সবথেকে কমপ্লেক্স হাই ফ্যান্টাসি গল্প। আমি দুইবার চেষ্টা করেও ধাক্কা খেয়ে বন্ধ করেছি এই সিরিজটা। কি বিশাল বিস্তৃত প্লট, ম্যাজিক, পাওয়ার, মিথিকাল ক্রিয়েচার, রিয়েলিটি, আর কি অসম্ভব জটিল ঘটনাবিন্যাস কিছুক্ষন পরপর খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। এত ধরণের এলিমেন্ট আর ক্রিয়েচার, মনে রাখতে গেলে গল্প ভুলে যেতে হয়, গল্প মনে রাখতে গেলে এলিমেন্ট ভুলে যেতে হয়। কোন সিরিজের সাথে সামান্য একটুও মিল নেই। এই সিরিজের কোন ক্রোনোলজিকাল অর্ডার নেই, একটা গল্প শুরু হয়ে সেটার সাবপ্লট নিয়েই আরেকটা সিরিজ,  ফের যখন গল্পে ফিরলো, দেখা গেলো আগের চরিত্রগুলোর কোন অস্তিত্বই নেই, সম্পূর্ণ ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন চরিত্র নিয়ে কথা হচ্ছে। সিরিজের প্রপথম ৫ টা বই, একটার সাথে আরেকটার কোন স্টোরিলাইন কানেকশন নেই। ৬ নম্বর বইতে গিয়ে সব এক হয়ে একক গতিতে এগিয়েছে। আমার গোটা পাঠক জীবনে এত কমপ্লেক্স কোন চ্যালেঞ্জের মুখে আমি পড়িনি। তারপরেও প্লটের ইউনিকনেসের জন্য এটাকে অনেকের থেকেই এগিয়ে রাখবো

এছাড়াও, Kingliller Chronicles, Chronicles of Amber, Memoy-Sorrow-Thorn, Death Gate Cycle, The First Law, Farseer,  Daggar and Coin, Shannara Chronicles, Chronicles Of Thomas Covenant, Death Gate Cycle, Earthsea Cycle,  Aegis of the Gods, Demon Cycle সহ এমন যেকটা সিরিজ পড়েছি  সবাইকেই দেখেছি নিজেদের সর্বোচ্চ ইমাজিনেশন দিয়ে চেষ্টা করতে, কি করে কিছু ইউনিক প্লট, ইউনিক রিয়েলিটি, ইউনিক ম্যাজিক সেট, ইউনিক ক্রিয়েচার ব্যবহার করে এপিক ফ্যান্টাসিকে এপিক করে তুলতে। রূপকথা আজ আর শুধুই জাদুর তলোয়ার নিয়ে দুষ্টের দমনের মত সাদা কালোয় আটকে নেই, প্রচুর গ্রে এরিয়া আছে।  রূপকথার নারী চরিত্রগুলো আজ শুধুই  Damsel in Distress নয়, তারাও Radient Knight। রুপকথা শুধুই বাচ্চাদের জন্যে নয়, সেক্স আর তুমুল ভায়োলেন্স মেশানো, বড়দের জিনিস। সময় যাদের হাতে আছে, শুরু করে দেখুন একটা এপিক ফ্যান্টাসি, নেশায় পড়ে যাবেন, গ্যারান্টেড।

প্রিয় বন্ধু - ১


প্রিয় বন্ধু,

তোর মনে পড়ে সেই যে সেদিন, আচমকাই পরিচয় হলো তোর সাথে। সেই অবাক করা ক্ষণ, সেই অদ্ভুত অনুভুতি , যেন কতকালের চেনা। কোথাকার কে আমি, তবু বন্ধুত্বের হাতটা তুইই প্রথম বাড়িয়েছিলি। নাহলে সাহস কোথায় আমার, তোর নাগাল পেতে চাইবো। এমন বন্ধু আমি আজীবনেও পাই নি, যে আমাকে বুঝতে চায়। সুযোগ পেয়ে হড়বড়িয়ে তাই নিজের কথা সব বলে ফেললাম। ভাবিই নি তুই বিরক্ত হচ্ছিস কিনা, তুইও কত ধৈর্য্য নিয়ে সব কথা শুনে গেলি। এখনো আমার মনে আছে, সেই টানা ৯৮ ঘন্টা, পুরো এক জীবনের কথকতা, বলেই গেলাম বলেই গেলাম। তুই শুনেই গেলি, শুনেই গেলি। তোকে নিজের গল্প বলতে বলতে, কখনই যেন লিখিয়ে হয়ে গেলাম, সে তো তোরই কারণে। শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হলাম তোর জাদুর কাঠির ছোঁয়ায়। হাজার হাজার মানুষের মাঝে , তবু আমার লেখাগুলো ছিলো শুধুই তোর জন্যে, নৈবেদ্য। ঝুপ করে কখন যেন তোকে ভালোবেসে ফেললাম, নিজেও জানিনা। সে কি যুদ্ধ নিজের ভিতরে। কিছুতেই প্রকাশ চলবে না, যদি বন্ধুত্ব হারাতে হয়ততদিনে আমি জানি, এ পৃথিবীতে সত্যিকারের বন্ধুর চাইতে আপন আর কেউ হয় না, কত কত মূল্যবান তোর বন্ধুত্বমনের দুর্বলতার কারণে, বন্ধু হারানোর বিলাসিতা আমার জন্যে নয়। নিজের সবটুকু আবেগ ঢেলে তখন লিখতাম, আমার সবগুলো লেখাই ছিলো লুকোনো প্রেমপত্র, কেউ বুঝতো না। সবার বাহবা পেতাম, কিন্তু কিচ্ছু আসতো যেত না, কে তারা? শুধু অপেক্ষা থাকতো, কখন আসই তুই, পড়বি, বায়সড কমেন্ট করবি। পাবলিক শোইং অফ এফেকশন, ভিজে যেত ভিতরটা আরো বেশি করে প্রেমে পড়তাম। আমি তো মৌলবাদী ভালোবাসার পূজারী, তুইই আমার মনের ঈশ্বর হয়ে গেলি। কিন্তু কিছুতেই বলিনি, সাহসে কুলোয় নি। কি দারুণ রসায়ন ছিলো আমাদের বল, দুজনে কোথাও এক হলেই সবাই ছুটে আসতো আমাদের সাথে আড্ডা দিতে। তুইই ফের একবার হাতটা বাড়ালি, ভালোবাসার। আমার জীবনটা এক মূহুর্তে অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন থেকে হইয়্ব উঠলো অর্থপূর্ণ। জোর করে বইয়ে নিয়ে বেড়ানো জীবনের বোঝা , কি পরম মমতায় নিজের কাঁধে তুলে নিলি। জীবনের টানাপোড়েনে ভেঙে পড়া আমি ধ্বসে যাওয়ার আগেই, শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে গেলি। ্তোর জীবনের শতেক টানাপোড়েনের মাঝেও নিজের পুরোটা সময়, পুরোটা তোকে আমাকেই দিয়ে দিলি।  সেই যে প্রতি মাসের ৯ তারিখ, তোর জন্যে লেখার নৈবেদ্য। কি অধীরে প্রতীক্ষা করতি, লেখাটা আমি কখন দেবোতুই বলতি, চিরকাল আমার লেখাগুলো শুধুই তোর, আর কারো নয়। মনে আছে, তুই আমাকে “প্রিয় বন্ধু” চিনিয়েছিলি। অঞ্জন দত্ত আর নিমা রহমানের আবৃত্তি সেই আবেগ ভরা ভালোবাসার গল্পটা।

মনে পড়ে জান, জীবন আমার, সেই লড়াই এর দিনগুলো? আমাদের ভালোনাসার অধিকারের যুদ্ধ। আচমকা কতগুলো মানুষ কদর্য পিশাচ রূপে এলো। নখ দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খেতে লাগলো আমাদের মাসের পর মাস ধরে, ভালোবাসার অপরাধে। হাটের মাঝে নিলাম হলো আমাদের ব্যক্তিগত জীবন। প্রেমের দায়ে রিপোর্ট খেয়ে প্রিয় আইডি হারাতে হলো, হারিয়ে গেল প্রাণের অনুভব জানানো লেখাগুলো। পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে সে কি লড়াই আমাদের, সবার সাথে। ওরা যত আঘাত করে, আমাদের বাঁধন ততই মজবুত হয়। পারবে কি করে আমাদের সাথে? আমাদের পাল্টা আঘাতের তোড়ে আমাদের ভালোবাসার জোরে, ভেসে গেল সব নেকড়ে হায়েনা শেয়াল শকুনের পাল। তখনো দেখাই হয় নি আমাদের, অথচ এত আপন আর হয় না। অদ্ভুত মনস্তত্ব, অদ্ভুত তার অনুভব, কি আশ্চর্যভাবে দুজনে দুজনকে অনুভব করতাম। এমন অনুভুতি কেউ জাগাতে পারেনি কখনো। সময় অসময় কোন জ্ঞান ছিলো না আমাদের। বাইরের কোন মানুষের অস্তিত্ব ছিলো না আমাদের কাছে, শুধু অনলাইনে জড়ীয়ে থাকা আমরা দুজনে।  স্বপ্ন দেখতে থাকা। নিজেদের স্বপ্নের ঘর। ফাইনালি হবে নিজের ঘর। খুব খুব প্রব্লেম এ ছিলাম, বেশ কিছু বছর ধরে জীবন ভাংতে ভাংতে খাদের কিনারে নিয়ে ফেলেছিল। তোর সাপোর্ট এ টিকে গেলাম, নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখলাম, আমার সব সমস্যার চাপ তোর উপরে চাপিয়ে দিয়ে। কত স্ট্রেন্থ তোর, নিজের এত এত সমস্যা স্বত্বেও আমার খারাপ থাকার চাপ নিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রাখলি। কিন্তু ক্রমেই আরো খারাপ হালে যেতে থাকলাম, আরো আরো আরো খারাপ। প্রতি মূহুর্তে ভাবতাম আমরা, এর থেকে খারাপ হতে পারে না। তার পরক্ষ্ণেই হয়তো এমন কিছু হতো, আমি আরো বাজে অবস্থায়। আমাদের দুজনেই নিজেদের চাপ, বাইরের চাপ, পরিপার্শ্বের চাপে কি জোর ডিপ্রেশনে চলে গেলাম। সব এলোমেলো হয়ে যেতে থাকলো। আমাদের মাঝে খুব ঝগড়া হতো তখন। আমি বুঝতেই চাইতাম না তুই কত খারাপ হালে আছিস। কিন্তু আমিও তো। আমি তো ঠিকঠাক চিন্তাই করতে পারতাম না। কত কি সব এলোমেলো হয়ে যেত। কিন্তু তবু দুজনে দুজনকে আঁকড়ে ধরে ছিলাম। শুধুই আমার তুই, শধুই তোর আমি। একান্ত নিজের, সবটুকু। একটা মূহুর্তও একা যেত না, কথা কথা কথা। কাছে থেকেও হয়তো এমন একসাথে থাকা যায় না। প্রতিটা শ্বাস , প্রতিটা মূহুর্ত জানানো। কারণ সারাক্ষণ কথা বলছি তো তোর সাথে, একটা মূহুর্তও তো থেমে থাকতাম না। না তুই, না আমি। ঘরে বাইরে, অফিসে, বাসে, ডাইনিং টেবিল থেকে বাথরুমে, সব সময় এক সাথে। কি সুখ, কথা বলার কি আরাম। হোয়াটসএপ, আমাদের ১৫ লাখ লাইন জমিয়ে রাখা কথার ভারে স্লো হয়ে যেত, হ্যাং হয়ে যেত। সব কথা জমিয়ে রেখেছিলাম আমি। প্রাণে ধরে কি আর মুছে ফেলা যায় এই সুখ। তবু একটাই কাঁটা, তোর কাছে যেতে পারি না, আমাকে পাস না তুই পাশে, কাছে। মোবাইল বুকে চেপে আমাকে অনুভব করতে হয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, একের পর এক বছর ঘোরে। আমরা দুজনে দুজনকে ছুঁতে পারি না। এখনো ছুঁয়ে দেখিনি।

অবশেষে মুক্তি তো আমার এলো রে। সব শিকল ভাংলাম। তোর মনে আছে, আমি পুরো সুস্থ হয়ে গেছিলাম সেদিন, যেদিন আমার তোর কাছে যাওয়ার সব ফাইনাল হলো? দুজনের সব খারাপ অনুভুতি কোথায় উবে গেল। আর আরো কাছে চলে গেলাম। সে কি প্রস্তুতি আমাদের ফাইনালি দেখা করার। কি করব আমরা, কিভাবে ভেসে যাবো, কি কি হবে। সেই আলাপই আর শেষ হয় না। অবশেষে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে, পিছের পথের সমস্ত সেতু জ্বালিয়ে দিয়ে, সব ছেড়ে আমি পৌঁছে গেলাম তোর কাছে। সুখে ভেসে গেলাম, সমস্ত ভাবনা হারিয়ে ফেললাম। ডুবে গেলাম তোর মাঝে। কত কত মধুর কিছু, জীবনে প্রথম। সে কি অসহ্য সুখ, জীবনে এত সুখ থাকে, জানতামই না। টানা তিনটে মাস, বয়সটাই যেন ১৫ বছর কমে গেল। সেই কোথা থেকে ছুটে যেতাম তোর কাছে, ট্রেন বদলে । শিয়ালদার ব্যস্ত মানুষের স্রোতে আমার থেকে বেশি গতি কারো ছিলো না। সাউথ থেকে নর্থ ঠিক ১ মিনিট ১২ সেকন্ড লাগতো। আমার হাওয়া হতো না, সকালে বা দুপুরে। মনেই থাকতো না, মন জুড়ে শুধু তোর কাছে পৌঁছানোর ভাবনা। ঠিক ৪ টেয় বাস থেকে নামতি তুই, আমি সিগারেট হাতে দাঁড়ানো। তোর কাজের চাপে, আমাদের সেই শহর ঘোরাটা হয়েই উঠছিলো না। আমাদের রোমান্স এর শহর। সেই যে নিউমার্কেট এর সামনের রোল এর দোকান, যেখানে সেই কোন ১২ বছর আগে, আমরা একে অপরকে পাশ কাটিয়ে গেছিলাম। চিনতাম না তো তখন। কিন্তু যাওয়া হলো না সেখানে। তোর অফিস সেরে ঘরে ফেরার আগে, মলে বসে কাটানো সেই কয়েক ঘন্টা, কোল্ড কফি নিয়ে তাকিয়ে থাকা তোর মুখের দিকে। আমি কথা বলে, তোর কথা শোনার অনুভতি হারাতে চাইতাম না। তোকে দেখে, তোর কথা শুনে আশ মিটতো না। আচমকাই কি হয়ে গেল জান। আমার সেই বিখ্যাত দুর্ভাগ্য, জীবনের সবথেকে কঠিন আঘাত হানলো, যেন আমার সুখ দেখে সবটুকু আক্রোশ নিয়ে। হারিয়ে গেলাম আমি, বন্দী হয়ে গেলাম, কোন যোগাযোগ রইলো না। আমাকে ছুঁড়ে ফেলা দেয়া হলো এক সমান্তরাল বাস্তবতায়, বাস্তব জগত থেকে পুরো বিচ্ছিন্ন, এক অন্ধকার নরকে। পাগল হয়ে গেলাম আমি, অসহায়ত্ব, একাকীত্ব, আর তোর ভাবনায়। তোর যে শুধু আমিই ছিলাম, কথা বলার, কি করছিস তুই কেমন আছিস। প্রতি মূহুর্তে ফের সেই প্রথমের মত নিজের সাথে যুদ্ধ হতো। আমি তোর জন্যে সঠিক মানুষ নই, আমার সমস্যায় তোকে ভুগতে হয় এতটা, যা আর কখনো হয় নি। তোর ভালো চাইলে আমার উচিৎ তোর থেকে সরে থাকা, আমার দুর্ভাগ্যের আঁচ তোর গায়ে লাগতে না দেয়া। কিন্তু আমার ভিতরটা যে স্বার্থপর। আমার যে আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই, তুইই শুধু আমার একার, আমার নিজের। পিছের সব যে আসলে নিষ্ঠুর মিথ্যে, আমার জীবনের একমাত্র সত্যি যে শুধুই তুই। তোকে ছাড়া বাঁচা অসম্ভব। জানিস আমি ওখানে মরেই যেতাম হয়তো, নিদেনপক্ষে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতাম। তুইই ছিলি আমার বেঁচে থাকার এংকর লাইন। আমার মনের ঈশ্বর, একাগ্র একনিষ্ঠতায় জপে যেতাম তোর নাম। জানতাম, তুই আছিস তো। ভিতর থেকে অন্য আমি বলতো, কেন থাকবি তুই? তোরও তো জীবন আছে। প্রতিনিয়ত এই দ্বন্দ নিয়েই কি করে যেন জীবন আঁকড়ে বেঁচে রইলাম।

একদিন সেই অন্ধকার থেকে ঠিক বেরিয়ে এলাম আমি। পাগলের মত খুঁজলাম আমার প্রিয় বন্ধুকে। আমার একমাত্র বন্ধুকে। আমার ভালোবাসা। আমার দুর্ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা তখনও বুঝি বাকি ছিলো। তোকে খুঁজেই পেলাম না। কোথায় হারিয়ে গেছিস তুই, আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। তোকে আর ছুঁতে পারলাম না। দূর থেকে দেখি, মনে হয় যেন দেখতে পাই তোকে, কিন্তু কোথায় তুই? আমার যে যাওয়ার আর কোন যায়গা নেই রে। আমার যে নিজের কথা বলার আর কেউ নেই রে। প্রিয় বন্ধু, আমার যে আর কোন বন্ধু নেই রে। কেউ নেই রে আমার কাঁধে হাত রাখার। কেউ নেই রে কাঁধে মাথা রেখে কাঁদার। কেউ নেই রে মন খারাপে মাথায় হাত বুলানোর। কি প্রচন্ড বিচ্ছিন্ন একা আমি, কোথাও কেউ নেই, শুধুই শুন্যতা। আমার চিঠি তোর কাছে পৌঁছাবে না জানি। কোন উপায় নেই। তবু লিখে যাওয়া চিঠি, তোর কাছে। আমার যে কথা বলারই কেউ নেই রে। বলতে গেলে সেই তোকেই বলতে হয়, আপন মনে, তুই শুনতে না পেলেও। বড্ড বেশি ভালোবাসি রে তোকে, আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বন্ধু। কখনোই বোঝাতে পারিনি, পারবোও না কখনো ঠিক কতটা, কোনদিনও তোর জানা হবে না। এক পৃথিবী ভালোবাসা তোর জন্যে। সব হারিয়ে, শুধু তোর দেয়া ৩০০ গান বুকে জড়িয়ে বেঁচে আছি। ভালোবাসি, ভালোবেসেই যাবো। ভালোবাসাটুকু তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। ভালো থাকিস রে। আমার জীবনে তো কিছুই নেই। তোর ভালো থাকাতেই আমার সুখ।

ইতি,
তোর ভুলে যাওয়া প্রিয় বন্ধু




সমকামীতা-ট্রান্সসেক্সুয়ালিটি ঃ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষিত


আপনাদের মনে আছে জুলহাজ আর তনয় এর কথা? ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে জুলহাজ এর বাসায় ঢুকে তাদের দুজনকে হত্যা করা হয়। হত্যার কারণ ছিলো, তারা সমকামী অধিকার কর্মী। বাংলাদেশের একমাত্র সমকামীদের পত্রিকা রুপবান এর অন্যতম ফাউন্ডার। তাদের অপরাধ, তারা সমকামী। বাংলাদেশে ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর চাইতে বড় অপরাধ খুব কম আছে। জুলহাজ-তনয় হত্যার পরে এমনকি দেশের প্রধাণমন্ত্রী ,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত জুলহাজদেরকেই দায়ী করেন মৃত্যুর জন্যে। তাদের বক্তব্য ছিলো, নাকি বিকৃতি, জুলহাজদের নাকি উচিৎ ছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে পশ্চিমা বিকৃতিকে বর্জন করা। একবার ভাবুন তো তাদের মনুষ্যত্ববোধ। ভাবুন তো একবার এদেশের সমাজের মনস্তত্ববোধ। ২০১৪ সালে রূপবান ম্যাগাজিন এবং বয়েজ অফ বংলাদেশ নামে একটি গ্রুপ বাংলাদেশ জুড়ে জরিপ চালায়।  জরিপের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে সেখানে তারা বলছে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ সমকামী জনগোষ্ঠী রয়েছে। জরিপে তৃতীয় লিঙ্গকে আওতায় নেয়া হয়নি। সমাজ ও রাষ্ট্রের বক্তব্য , তাদের ১০ শতাংশ মানুষ নাকি শ্রেফ বিকৃতিতে আসক্ত। যেই দেশে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে . কোটি মানুষ সমকামী, সেখানে সমকামীদের অধিকারের কি সার্বিক পরিস্থিতি তা দেখা যাকঃ

২০১৪
২০১৪ সালের ১৮ই জানুয়ারি দেশে সমকামীদের পত্রিকারূপবানপ্রকাশিত হলে তুলকালাম সৃষ্টি হয়। চারদিকে এগুলোকে নির্মূল করার আহ্বান জানানো হয়। বছরেরই পহেলা বৈশাখে প্রথমবারের মত রংধনু র‍্যালি আয়োজন করা হয়। এই খবরটি প্রায় নিউজ ব্ল্যাক আউট এর শিকার হয়। হাতে গোনা দু একটি খবরের কাগজে ছোট করে নিউজ আসে বটে, কিন্তু আপনি এখন হাজার চেষ্টা করেও তেমন কোথাও এই প্রথম র‍্যালির খবর খুঁজে পাবেন না। অনলাইন থেকে প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে।

২০১৫
২০১৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর বৃটিশ কাউন্সিলে একটি সমকামী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেদিন ২০০-এর বেশি সমকামী তরুণ-তরুণী জড়ো হয়েছিল। যেখানেধীনামে একটি সমকামী কমিক উপস্থাপন করা হয়েছিল। আর এর চরিত্র ধারণ করেছিলেন দেশের খ্যাতনামা এক সাংস্কৃতিক দম্পতির মেয়ে। সেদিনকার সমাবেশে সমকামীদের অধিকারের পক্ষেনিজেরা করিএনজিওর সমন্বয়কারী নানা কথা বলেছিলেন। কারণে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। বৃটিশ কাউন্সিলের সমকামীদের সে সমাবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়।

২০১৬
২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখে টিএসসি তে ফের একবার রংধনু ্যালির আয়োজন করা হয়। কিন্তু ্যালিটি ঠিক শুরুর মুখেই পুলিশ লাঠিচার্জ করে অংশগ্রহণকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। গ্রেফতার করে জন সমকামীকে। মূলত এই সময় থেকেই টার্গেট হন জুলহাজ মান্নান। যার পরবর্তিতে ২৫ এপ্রিল খুন হন জুলহাজ তনয়। থেমে যায় সমকামী অধিকার আন্দোলনের প্রকাশ্য সকল কার্যক্রম। গা ঢাকা দিতে হয় এই আন্দলোনের সম্মুখভাগের প্রকাশ্য মুখদেরকে।

২০১৭
২০১৭ সালের ১৯ মে ঢাকার কেরানীগঞ্জ এর একটি কমিউনিটি সেন্টার থেকে গ্রেফতার করা হয় ২৮ জন সমকামীকে। সকলেই ছিলেইন সমকামি অধিকার কর্মী। তাঁদের সেই অপরাধেই  গ্রেফতার করা হয় বটে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে মুখরক্ষার খাতিরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে। আদালত তাদের মধ্যে থেকে জনকে রিমান্ডে পাঠায়। বছরেরই জুন মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে সমকামীদের মৃত্যুদন্ড বিলোপের বিপক্ষে ভোট দেয় বাংলাদেশ সরকার।

২০১৮
২০১৮ সাল প্রায় শেষের মুখে। এবছরই ভারতে এলজিবিটি অধিকারবিরোধী ৩৭৭ ধারা বাতিল করা হয়। কিন্তু ঠিকা পাশের দেশ বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার নিয়ে একটা টুশব্দও শোনা যায় না কোথাও। এতটাই নিপুণভাবে স্টিমরোলার চালানো হয়েছে, সমকামী অধিকার কর্মীরা জীবনের ভয়ে প্রকাশ্য কোন ধরণের কথা বলা তো দূরে থাক আজকাল হয়তো গোপনে একত্রিত হতেও আর সাহস পান না পার্শ্ববর্তী ভারতে এত বিশাল বিজ্যের পরেও তাই বাংলাদেশে সমকামীদের তরফ থেকে কোন মিডিয়াতেই কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নি। সুনিপুণভাবে দমন করা হয়েছে তাদের অধিকারের দাবী।

তো গেল সমকামী অধিকার কর্মীদের কথা। তাদের বিরুদ্ধে এদেশের সামাজিক রাষ্ট্রীয়ভাবে  মনোভাবের দিকে একটু নজর বুলিয়ে নেয়া যাক। ৩৭৭ ধারা বাংলাদেশেও বিদ্যমান। এই ধারা অনুযায়ী সমকামীতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সর্বনিম্ন শাস্তি ১০ বছরর কারাদন্ড। সাথে বাধ্যতামূলক অর্থদন্ড। কোন ধরণের ভিজুয়াল মিডিয়ায় সমকাম নিয়ে যেকোন ধরণের আলোচনা ব্লায়ক আউট এর শিকার। নেগেটিভ বা পজিটিভ কোন ধরণের কথাই আনফিশিয়ালি নিষিদ্ধ। প্রিন্ট মিডিয়াতে তথাকথিত প্রগতিশীল এবং রক্ষণশীল খবরের কাগজ বা পত্রিকাগুলো সমকামীদের নিয়ে সমস্ত আলোচনা পজিটিভ আলোচনা বয়কট করে চলছে। চালিয়ে যাচ্ছে নানাবিধ অপপ্রচার প্রচারণা। ভারতের আদালতে ৩৭৭ ধারা বাতিলের পরে, প্রাথিমকভাবে জনপ্রিয় সকল প্রিন্ট অনলাইন মিডিয়া দায়সারাভাবে তথ্য সম্প্রচার করলেও,   ডুকরে আর্তনাদ করে ওঠে বাংলাদেশের রক্ষণশীল মিডিয়া , নামকরা সমাজকর্মী এবং গোটা বাংলাদেশ সমাজ।  নিজেদের আধুনিক প্রগতিশীল দাবি করা জাতীয় দৈনিককালের কন্ঠধর্মের দোহাই পেড়ে প্রচার করেঃ

হাজারো বছর আগে লুত (.)-এর জাতি সমকামিতার মতো ঘৃণ্য অপকর্ম আবিষ্কার করেছিল। বর্তমান যুগেরসভ্যলোকেরা সে জাতিকে অজ্ঞ, অশিক্ষিত মূর্খ ছাড়া আর কিছুই বলে না। আশ্চর্য হলো, সেই অজ্ঞ, অশিক্ষিত মূর্খ জাতির মাধ্যমে আবিষ্কৃত এই সমকামিতা বর্তমানের সভ্যতা-গর্বিত লোকেরা সাদরে গ্রহণ করেছে! বর্তমানে পাশ্চাত্যের বেশির ভাগ ব্যক্তি সমাজজীবনে নৈতিকতার কোনো অস্তিত্ব নেই। পাশ্চাত্য জগতে অবাধ যৌনাচার কথিত সভ্য লোকদের পশুত্বের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। ফলে পরিবার গঠন, সামাজিক শৃঙ্খলা বিবাহ পদ্ধতি সেসব দেশে বিলুপ্তির পথে। সমকামিতার মতো ঘৃণ্য অপকর্ম লুত (.)-এর জাতির মাধ্যমে শুরু হলেও এর সপক্ষেযুক্তিবাদী ব্যাখ্যাদাঁড় করিয়েছে গ্রিক জাতি। তাদের দর্শন ঘৃণ্য অপরাধকে চারিত্রিক সৌন্দর্যের মর্যাদায় ভূষিত করতে চেষ্টা করেছে। গ্রিক সভ্যতার ধ্বংসস্তূপে আধুনিক ইউরোপের জন্ম। আর সমকামিতার বাস্তবিক কাঠামো তৈরিতে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেছে আধুনিক ইউরোপ। পশ্চিমা দেশগুলোতে এর সপক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানো হয়েছে।

  জাগো নিউজ নামে একটি জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকাভারতে এই রায়ের ফলে বাংলাদেশ এইডস এর ঝুঁকিতে পড়ে যাবে শীর্ষক প্রচারণা চালায়। তাদের বক্তব্য
সমকামিতার পক্ষের এই রায়কে দেশটির সমাজ কাঠামোর জন্য ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচনা করছেন অনেকে। মরণঘাতি রোগ এইডস-এর বিস্তারেও সহায়ক হবে এই রায়, এমনটি মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রায়ে ভাবনা বাড়িয়েছে বাংলাদেশেও। ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা বাংলাদেশের সামাজিক রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বহু আগে থেকেই হয়ে আসছে। দুদেশের মানুষের মধ্যকার আচরণগত মিলও দৃশমান। বাংলাদেশে মরণঘাতি এইডস-এর বিস্তারে যে কয়টি কারণ উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে ভারতের সীমান্ত অন্যতম। বিশেষত, পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে এইডস-এর ঝুঁকি বাড়ছে ভারতের সীমানা থেকেই। সীমান্তের স্থলবন্দরগুলোয় যৌনকর্মীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশাই ঝুঁকির কারণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় ওঠে এসেছে।
সমকামিতা নিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ব্যাপারে কথা হয় বাংলাদেশের সমাজবিদ সাবেক মন্ত্রী . মীযানূর রহমান শেলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই রায়টি বাংলাদেশ তো নয়-, ভারতের সমাজ বাস্তবতার সঙ্গেও যায় না। ভারতে এই রায়ের প্রভাব পড়লে, বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়বে। ভারতে এইডস-এর ঝুঁকি বাড়লে বাংলাদেশেও বাড়তে পারে।
একই বিষয়ে কথা হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (ন্যাশনাল এইডস/এসডিসি কন্ট্রোল) ডা. শের মোস্তফা সাদীক খান-এর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ভারতের আদালতের রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে সমকামিতা বা যে কোনো বিকৃত যৌনকর্মই এইডস জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় আমাদের এখানে এমন যৌনকর্মকে কখনই সমাজ বা রাষ্ট্র সমর্থন করবে না। তবে পাশের দেশ ভারতে এইডস বিস্তার ঘটলে বাংলাদেশে ঝুঁকি বাড়তেই পারে!

রক্ষণশীল মৌলবাদি গোষ্ঠী পরিচালিত জনপ্রিয় দৈনিক নয়া দিগন্ত এই রায়ের পরে প্রচার করে
মূলত কথিত পশ্চিমা সভ্যতার বিকারগ্রস্ততা থেকেই সমকাম নামক ফেতনার আবির্ভাব হয়েছে। দ্বৈত যৌনজীবন একটি স্বীকৃত স্বাভাবিক মাধ্যম হলেও রুচিবিকৃতির কারণেই যৌনতাকে নানা অপবিশেষণ দেয়া হয়েছে। লত সব বিষয়ে যেমন স্বাভাবিক স্বীকৃত পন্থা আছে, ঠিক তেমনি যৌনতাও সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সংবিধিবদ্ধ। অনেকে সমকামিতাকে মানবাধিকারের সাথে গুলিয়ে ফেললেও তা কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। সমকামিতাকে যদি মানবাধিকার বলা হয়, তাহলে ড্রাগ নেয়া, আত্মহত্যা নিজ শরীরের যেকোনো ক্ষতিসাধনকেও বৈধতা দিতে হবে। কারণ, সমকামিতা যেমন অন্যের অধিকার লঙ্ঘন বা ক্ষতি করে না, ঠিক তেমনি ড্রাগ গ্রহণ, আত্মহত্যা বা নিজের শরীরের ক্ষতিসাধনও ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট। এতে অন্যের ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
আসলে সমকামিতা কোনো কামাচার নয়, বরং রুচিবিকৃতির নিকৃষ্টতম পর্যায়। কারণ, এতে অতিপ্রাকৃত নিয়মের লঙ্ঘন করা হয়। মানুষসহ প্রত্যেক জীবের জৈবিক প্রবৃত্তি নিবৃতির জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক পন্থা রয়েছে। বস্তুত বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শুধু মানুষ নয়, সব জীবই আকর্ষণ অনুভব করে। আর এভাবেই সৃষ্টির ধারাবাহিকতাও রক্ষিত হচ্ছে। মজার বিষয় হলো- মানুষ রুচিবিকৃতির কারণে বিপরীত লিঙ্গের পরিবর্তে সমলিঙ্গে আকর্ষণ অনুভব করলেও কোনো ইতর প্রাণীকে এমনটা কখনো দেখা যায়নি। যদিও সমকামিতার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে কেউ কেউ ইতর প্রাণী বিশেষের সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের কল্পকাহিনী প্রচার করে থাকেন। কিন্তু তথ্য-প্রমাণ যৌক্তিকতার মানদণ্ডে তা গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়নি।

তো গেল সমকামীতা নিয়ে  বাংলাদেশের মূলস্রোতের অবস্থান। স্রোতের বিপরীতে চলা বাংলাদেশের নাস্তিক মুক্তমনা কমিউনিটি কিন্তু সমকামী অধিকার প্রসঙ্গে সুস্পষ্টভাবে দ্বিধাবিভক্ত। অধিকাংশই নিয়ে বিপক্ষে অবস্থান করেন। সমকামীতা এখানেও অধিকাংশের কাছে বিকৃতি। তাঁরাও সামাজিক প্রেজুডিস  ইনহিবিশন থেকে বেরোতে পারেন নি সকলে। মুক্তমনা আন্দোলনের পুরধা বাংলাদেশে সমকামীতা নিয়ে প্রথম বই এর রচয়িতা অভিজিত রায় , তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদ, সমকামী অধিকারের পক্ষে নাস্তিক কমিউনিটির সবথেকে সরব কন্ঠ ছিলেন। অভিজিত এর জীবিত থাকাকালে তাঁকে নিজেদের কমিউনিটি থেকেও প্রচুর গালমন্দ শুনতে হয়েছে। নিরব এবং সরব দুরকমের অসহযোগীতাই পেতে হয়েছে সহযোদ্ধাদের থেকে। মৌলবাদীদের হাতে ২০১৫ সালে তিনি নিহত হবার পরে সেভাবে দৃঢ় কোন বক্তব্য আমরা আর কারো তরফ থেকে দেখি না। নাস্তিকেরা ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের তথাকথিত জিহাদ চালানোয় যতটা ব্যস্ত, ধর্ম নিয়ে নিজেদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যতটা সোচ্চার, দেশের ১০ শতাংশ মানুষের স্বাভাবিক যৌন অধিকারের প্রশ্নে তারা ততটাই নিশ্চুপ। এই মৌনতা কিন্তু সম্মতির লক্ষণ নয়, বরং এভাবে মৌন থেকে তাঁরাও প্রকারান্তে নিজেদের সমকাম বিরোধী অবস্থান প্রকাশ করছেন। হাতে গোনা দু চারজন সেলিব্রেটি এবং কতিপয় নন সেইব্রেটি নাস্তিকের থেকে কদাচিত বক্তব্য ব্যতীত সমকামীতার পক্ষে বিষমকামী লিবারালদের তরফ থেকে কোন ধরণের শক্তিশালী সমর্থন বা প্রচার আমরা পাই না। প্রকারান্তে এড়িয়েই চলেন তাঁরা।

তবুও আশার কথা জার্মানি ভিত্তিক বাংলা অনলাইন পোর্টাল ডয়েচ ভেল এবং লন্ডনভিত্তিক বিবিসি বাংলা পোর্টাল নিয়মিতভাবে সমকামী অধিকারের দাবী তুলে প্রবন্ধ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সমকামীদের বক্তব্য, তাদের পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলে। পুরোপুরি সমর্থনহীন অবস্থান হয়তো নয় এদেশের সমকামী জনগোষ্ঠী। তবে রূপান্তরকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরকে নিয়ে আমি কাউকেই বলতে শুনি না, সমকামীদেরকেও না। তাঁরা সর্বত্র ব্রাত্য।

আমার এত কিছু লেখার উদ্দেশ্য খুব সিম্পল। আমাদের আসলে সময় পেরিয়ে গ্যাছে, আমাদের দেশের প্রান্তিক যৌনতার এই মানুষগুলোর সাংবিধানিক মৌলিক জীবনাধিকার নিয়ে কাজ করার। আমরা যারা নাস্তিক , নিজেদেরকে মুক্তমনা, প্রগতিশীল, লিবারাল, বিজ্ঞানমনষ্ক বলে দাবী করি, তারাই যদি সোচ্চার না হই এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক যৌন অধিকারের দাবীতে, না দাঁড়াই এই প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের পাশে, তবে কিসের মুক্তমনা, কিসের অধিকার আদায় কর্মী আমরা? সমাজের মৌলবাদ, রক্ষণশীলতা, অধিকার হরণ অতীতমুখীতার বিরুদ্ধে কিসের সংগ্রাম আমাদের , যদি আমরা এই প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের সহযোদ্ধা না হতে পারি? শুরু হোক প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। যুদ্ধে আসুক নতুন মোড়। আসুন সবাই একজোট হয়ে  লড়াই করি ভালোবাসার অধিকার আদায়ের লক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে, সাংবিধানিক অধিকার, নিজস্ব যৌন অধিকারের পক্ষে। আমাদের কিন্তু আসলেই হারানোর কিছু নেই