সোমবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৫

যাপিত জীবন - ৯

২০০৩ এর ডিসেম্বরে ওটা একটা আনলিস্টেড  ভিজিট ছিলো দেশে, এবং বাধ্যতামূলক, কারণ অক্টোবরে বাবা মারা গেছিলো, ঐ ৪০ দিন পরে ইত্যাদি ইত্যাদি করতে এসেছিলাম। মনের কোন তাল ঠিকানাই তখন নেই,  ঐ অক্টোবরেই আমার ব্রেকাপ হয়েছে, আচমকা। আমার স্বভাবসুলভ ভাবেই আমি ডিপ্রেশনে, এসবের পরে এবং নিজেকে নিজের মধ্যে আটকে ফেলেছি, নাথিং গোইং আউট, এটা খুব ভালো, কিন্তু একই সাথে নাথিং কামিং ইন, একদম কোকুনে আবদ্ধ। যাই হোক, ব্যাঙ্গালোর ফিরে থার্টিফার্স্ট ধরতে হবে। শালা সব উড়িয়ে দেবো, উল্লাট মাস্তিতে, প্রোগ্রাম সব ঠিক, অল সেট, শুধু আমার পৌঁছানো। উই আর প্ল্যানিং সামথিং গ্রান্ড।

বেনাপোল দিয়ে ২৬ তারিখ বর্ডার পার হলাম। ২৭ দুপুরে করোমান্ডেল এক্সপ্রেসে রিজার্ভেশন করা, আমি ২৯ পৌঁছে যাবো। শালা ২৭ জনের জন্য স্টিক বানাতে হবে, এভারেজে ৪ টে তো বটেই, পার্সোনাল রেকর্ড ফেকর্ড নিয়ে ভাবছি। চিরচেনা রুট। এপারের ইমিগ্রেশন কাস্টমস, ওপারেএ ইমিগ্রেশন কাস্টমস, স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের জন্য নামমাত্র, আনুষ্ঠানিকতা শুধু, দুপার মিলিয়ে ঘন্টা দেড়েক, ফর্ম ফিলাপ আর জমা দিতে যতটুকু লাগে। তারপরেই বনগাঁ স্টেশন, ট্রেনে শিয়ালদা এবং মির্জা গালিব স্ট্রিটে হোটেল প্যারামাউন্ট। খুব বেশি হলে আড়াইটার মধ্যেই চেক ইন। তারপরে রেগুলার কাজ, বিকালে নিউমার্কেট যাওয়া, রোল খাওয়া, হলটাতে যেই সিনেমাই চলছে দেখে নেয়া, রাতে খাবার আর একটা বাকারডি পাইন্ট  নিয়ে হোটেলে। ২৭ দুপুরে ট্রেন,  ১১ টার মধ্য প্রভিশন নেয়া কমপ্লিট যার প্রধাণ উপকরণ ৫ বোতল ফেন্সিডিল। ওহহ হাউ আর মিস ঐ ফেন্সিডিল-জুস-ব্রেড-অমলেট  ৩৪/৩৫ ঘন্টা।

এই প্রথম একা, কোন বন্ধু নেই সাথে, সো ফাকিং হোয়াট। হুইলার থেকে দুটো বই বেশি নিলাম, নিশ্চিন্তে পড়বো, কেউ ডিস্টার্ব করবে না। স্মুদ টাইমিং এ হাওড়া, হাফ বোতল খেয়ে ট্রেনে, আমার সাইড লোয়ার, আহা, সাইড লোয়ার। সব ঠিক। আমি তো ঘুমাইনা ট্রেনে,  ফেন্সিডিল জাগিয়ে রাখে, ১৫ মিনিট পরপর সিগারেটের তেষ্টা পায়, ঘুম আসবে কি করে। এই ভাইজাগ পার হবার পরে, কি যেন মনে হলো, পাসপোর্ট নিয়ে, ভাবলাম একটু দেখি। যাহ বাঁড়া, আমার পাসপোর্ট কই? এটা কি হলো? আমি ফেললাম কোথায়? পাসপোর্ট ছাড়া তো অচল। বাল, আমি হোটেল থেকে চেক আউটের সময় পাসপোর্ট ফেরতই নিই নি। সব প্ল্যান দুচে গেলো, আমাকে ফের কোলকাতা ফিরতে হবে। চেন্নাই নেমেই ফের ছোট রিজার্ভ করতে, ঐ রাতেই পেয়ে গেলাম, করমান্ডেল, নাকি ত্রিভান্দরম, নাকি কোচি, নাকি চেন্নাই মেইল মনে নেই, তবে আমার ২৯ তারিখ সকালে যেখানে ব্যাঙ্গালোর থাকার কথা সেখানে ৩০ তারিখ দুপুরে আমি ফের কোলকাতা। হাওড়া নেমেই একবার চেক করলাম, উঁহু আগামী ১০ দিন কোন রিজার্ভেশন নেই।

যতটুকু লাইট ছিলো আমার মধ্যে সেটুকুও চলে গেলো, আমি কিচ্ছু দেখছিনা আর। ঘোরতর একা। কিচ্ছু করার নেই। প্যারামাউন্টে ফিরে পাসপোর্ট পেলাম, কিন্তু ওদের খালি নেই, অন্য হোটেল। হোটেলের এটেনডেন্টকে টিকেটের ব্যবস্থা করতে বললাম, ওরা খুব ভালো পারে কাজটা, ফেয়ারলি প্লেসে গিয়ে লাভ নেই, তাও গেলাম সন্ধ্যায়, কিস্যু হবে না। সব রিজার্ভড।  লাস্ট কয়েকবার, ফেরার পথে, রিজার্ভেশন বারাসাত থেকে করাতাম, ওখানকার একটা দালাল বেশ পরিচিত, অন্তত ২ বার আমাদের ১ দিনে করিয়ে দিয়েছে। পরদিন বারাসাত, চা খেতে খেতে বললো, বস, কোন লাভ নেই, সব দালাল বলবে করে দিচ্ছি, হবে না আসলে। আমার নাম্বার নিয়ে যান, আমি দেখছি, রোজ একবার করে ফোন দেবেন, আর্লিয়েস্ট পসিবল করে দিচ্ছি, তবে ধরে নিন সপ্তাহ। আমি এক সপ্তাহর জন্যে কোলকাতা আটকে গেলাম, আর এমন একটা সময়, যখন এনজয়মেন্ট বলতে কিছুই নেই মনের মধ্যে। ভালো কিছুই হচ্ছে না, আমি কোলকাতা থাকতে চাইনা, একা থাকতে চাইনা, হুল্লোড় করতে চাই, টানা ৩০ ঘন্টা, ৪০ ঘন্টা।

এরপরে রুটিনবাঁধা,  ১০/১১ টায় ঘুম থেকে ওঠা, ইচ্ছা হলে নিউমার্কেটের সামনে, পিৎসা, ৩/৪ টের দিকে মির্জা গালিবেই কোন একটা বাংলা রেস্তোরাতে খেয়ে নিউমার্কেটের সামনে ঐ রোলওলাদের পাশে ওখানে চুপচাপ বসে থাকা, প্রচুর লোক বসে ওখানে, আমার বয়েসি ছেলেমেয়েরা আসে বসে আড্ডা দেয়, রোল খায়, প্রেম করে, আমি চুপচাপ একটার পরে একটা সিগারেট। কে জানে, এই এখন যাদের সাথে কথা হয়, আড্ডা হয় অনলাইনে, অনেকেই হয়তো সেই ২০০৪ এর জানুয়ারির প্রথম ৫/৬ দিন ওখানে গ্যাছে, আড্ডা দিয়েছে, অতিরিক্ত সিগারেট খাওয়া ছেলেটার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছে, ফিচারলেস নোবডি। একদিন পরপর বারাসাত, কাজ তো নেই কোন, টিকেটের খোঁজা নেয়ার নামে বারাসাত স্টেশনে গিয়ে ঘুরে আসা, ঐ লোকটার  সাথে ঘন্টাখানেক গল্প, সময় তো কাটে। রাতে কোন একটা মুসলিম হোটেল থেকে প্রচুর কাবাব আর বাকারডির বোতল। রাতে টিভি দেখার ফাঁকে ফাঁকে আমার দুপাশের রুম থেকে ভেসে আসা আওয়াজ, একপাশে বর-বউ লাগাচ্ছে , আরেকপাশে প্রেমিক প্রেমিকা থ্রিএক্স দেখছে। একদিন খুব জোর আওয়াজে এক্স দেখছিলো, দিনের বেলা,  সেদিন হোটেলের লোকেদের সাথে ওদের হেব্বি বাওয়াল, যা করবেন করুন, সবাইকে জানিয়ে কেন? ৩/৪ তারিখ নাগাদ ৬ তারিখের টিকেট পাওয়া গেলো, রাতে চেন্নাই মেল। লোকটা এক্সট্রা ১০০ টাকা নিয়েছিলো, নিজে চেয়ে, যে আমি কিছুই নেবো না, এটা খরচ, এত ভালো দালাল  আমি আসলেই আর দেখিনি কখনো। প্রচুর সময় দিয়েছে আমাকে, কাজটা নিজের মনে করে করেও দিয়েছে, নামটা মনে নেই, তখন এমন করে ভাবিওনি, আজ যেমন ভাবে।

কলেজ স্ট্রিট যাওয়া আর বই কেনা বাকি ছিলো, ৬ তারিখেই সারলাম কাজটা। ৫ টা ইয়ে নিয়ে  রাতে হাওড়া স্টেশনের সামনের একটা হোটেলে খেয়ে,  রাতে ট্রেনে। ফাইনালি, ফাইনালি, আমি পৌঁছাবো। ৮ তারিখ দুপুরে যখন ঢুকছে ব্যাঙ্গালোর মেইল আস্তে আস্তে ব্যাঙ্গালোরে, ভাবছিলাম, কি মিস করলাম, আমার নিজের প্ল্যান, কি কি করা হবে, সবাই সব করলো, শুধু আমিই থাকলাম না। ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে ট্রেইন যখন ঢুকছে, দেখলাম প্লাটফর্মে ওরা ৫/৬ জন দাঁড়ানো, দাঁত বের করে, পিত্তি আরো জ্বলে গেলো। নেমে কাছে গিয়ে দেখি, একি!!! দুজনের নাক ভাঙা, একজনের ভুরুর কাছে কাটা, দুজনের চোখের নিচে হাড়ের উপরে কালো, শুধু সঞ্জয় সিংহ ঠিক, বরাবরের মতই। কি কেস? এ তো ক্যালাকেলির সিগনেচার মার্কস। বললো ক্যালাকেলি না, ক্যালানি খাওয়ার। থার্টি ফার্স্ট, ওরা মারাথাহাল্লি রিং রোড থেকে মাল ফাল খেয়ে ব্রিগেড রোডে এসে মাল দেখছিলো, আর গাঁজা রোল করছিলো, এমন সময় মুশকো ৩/৪ টে লোক এসে চলে যেতে বললো। ওরা ৭/৮ জন, হেব্বি রোয়াব নিয়ে নিলো। লোকগুলো কোন কথা বললো না, স্ট্রেইট হাত চালালো, তারপরে সবাই সবার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং পাইকারি ক্যাল। ওরা নাকি সিভিল ড্রেস পুলিস ছিলো, একদম মেপে মেরেছে, নাকে মেরে দুজনকে আউট, ৩ জনকে চোখে, দুজনের কলার ধরে টেনে নিয়ে মাথা দিয়ে ঠুকে দিয়েছে। কোনমতে ওরা ছুটে পালিয়েছে। মনটা জান্তব আনন্দে ভরে গেলো আমার, এইসব গল্প শুনতে শুনতে। আমার অভিশাপ একেবারে বৃথা যায় নি :P

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৫

১২ মাস কেন?


পয়লা, লুনার মান্থ ছিলো, চান্দ্র মাস, প্রতি ২৯.৫৩ দিনে চাঁদ পৃথিবী থেকে একই অবস্থানে থাকে, অমাবস্যা-পূর্ণিমা হয়, চান্দ্রমাস তাই ৩০ দিনে। এ প্রায় ৮০০০বিসি'তে চলতে কনফার্ম, আরো আগেও চালু হতে পারে।
আস্তে আস্তে মানুষের ভাবনা পরিণত হতে থাকলো, খুব খেয়াল ক করে দেখা গেলো, সিজনের সাথে তাল মিলিয়ে চাঁদের পজিশন চেঞ্জ হয় , ইজিপশিয়ানরা চিন্তাভাবনা করে রিসার্চ করে লুনিসোলার ক্যালেন্ডার তৈরী করলো। সূর্য্য ঘোরে, তাই এমন হয়, সূর্য্য একবার ঘুরে একই ইকুইনক্সে আসতে বারো বার অমাবস্যা, পূর্ণিমা হয়। এই কারণেই ১২x৩০= ৩৬০ দিন, ইজিপশিয়ান ক্যালেন্ডারে। এর পরে লিপ মান্থ হিসেব বের করা হয়, কোন কোন মাসে অমাবস্যা-পূর্ণিমা প্রায় ৩১ দিনে হয়। এভাবে ৩৬৫ দিন। কিন্তু সে অনেক পরে।
এরপরে গ্রিকদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের হাতে পড়ে তো সূর্য্যের অরবিটাল, ওদের অঙ্ক, কষে বের করলো সূর্য্য পৃথিবীর চারদিকে ৩৬৫.২৫ দিনে ঘোরে। তো ঘোরে। বছর ঐ বারো চাঁদ। ৩৬০ দিনেই খুশি। রোমানরা শুরু করেছিলো ৩০ দিনের ছয়টা, আর ৩১ দিনের ৪ টা মাস দিয়ে, এরাউন্ড ৭৫৩ বিসি তে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিনগুলো কোন মাস নয়, ফাঁকা।
আস্তে আস্তে গ্রীকরা শক্তিহীন হয়ে পড়লো, গ্রীকদের মেরে কেটে রিসার্চ কেড়ে নিলো। এই ৪৬ বিসির দিকে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রস্তাব করে, সূর্য্যের অরবিটালকে কেন্দ্র করে, আর গ্রিকদের ১২ মাস ধরে সোলার ক্যালেন্ডারের। ওরা ৩৬৫ দিন এবং .২৫ করে ধরে একটা লিপ ইয়ার ৩৬৬'র ধারণা আনে। এটা কার্যকরী হয়, ৪৫ বিসি তে।
পি.এস.: পরে ১৫৮২ তে, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে .০০২% সংশোধন করে ৩৬৫.২৪২৪ দিনে অরবিটাল ধরে গ্রেগরিয়ান বা ক্রিশ্চিয়ান ক্যালেন্ডার তৈরী করা হয়।
পি. এস. এস.: ভারতে বছর গননা অনেক দেরীতে, এই ১০০০ এডি'র কাছাকাছি সময়ে, আর এখন তো একেক এলাকায় একেক হিসেব।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

রূপচাঁদ পক্ষী ও সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি

আমার বসতবাটির অতি সন্নিকটে একখানি মধ্যমাকৃতির বাটিকা বিদ্যমান। উক্ত বাটিকার পশ্চাতেই ভুষূন্ডীর ময়দান, রাত্রিকালে চতুর্দিক বড়ই নিরব থাকে। বাটিকামধ্যে একখানি বটবৃক্ষ দন্ডায়মান। উহার নিম্নদেশে একখানি কোটর আমি সদা পরিচ্ছন্ন করিয়া রাখি। কোটরমধ্যে বসিয়া আমি রাত্রিকালিণ গঞ্জিকাসাধনা করিয়া থাকি। অদ্য নিশীথে রাত্রিকালীণ আহারাদী সমাপ্ত করিয়া গঞ্জিকার পুটুলিখানি পাকড়াইয়া উক্ত স্থানে হাজির হইয়া দেখি, সিড়িঙ্গে চেহারার জনৈক বৃদ্ধ দিব্বি আসন পাতিয়া বসিয়া আছে।
পুছিলাম, “মহাশয়ের পরিচয়”
জবাব আসিলো, “আমি পক্ষী”
কহিলাম, “মহাশয়কে তো জ্বলজ্যান্ত মানুষ রূপেই পরিলক্ষিত হইতেছে, পক্ষীর বিষয়াদি কিবা?”
তিনি কহিলেন, “ঘোর কলিকাল, যুব সমাজ উচ্ছন্নে গিয়াছে। বলি ওহে মর্কট, কদ্যপিও কি পক্ষীর নাম কর্ণগোচর হয় নাই?”
কহিলাম, “দেখুন মহাশয়, আজি অদ্যপ্রহরেও গঞ্জিকা সেবন করি নাই, যে পক্ষীকে মনুষ্যরূপে ভ্রমিব। পংখবিহীন মনুষ্যকন্ঠী পক্ষীর দর্শন আমার উর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষেও কেহ পায় নাই। আপনার পরিচয় কিবা, কিয়ৎমাত্র বিলম্ব না করিয়া প্রকাশ করুন। রাত্রি অনেক হইয়াছে, আমি সাধনা করিব”
মহাশয় কহিলেন, “মানির মান রাখিয়া বাক্যবর্ষন কর হে বারবণিতা সন্তান, আমি রূপচাঁদ পক্ষী”
ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিয়া গেল, কঠোর কন্ঠে কহিলাম, “ঢের হইয়াছে আপনার ঢপ, এবার গাত্রোত্থান করুন। রূপচাঁদ পক্ষী গতাসু হইয়াছেন আজি দ্বিশত বর্ষ হইয়া আসিলো। পঞ্চভূত ঢূঁড়িয়াও তাঁহাকে মিলিবে না, আপনি একটি শঠ”
তিনি মৃদু হাস্যে কহিলেন, “তব হস্তে গঞ্জিকা দেখিতেছি। কল্কিসজ্জা করিয়া মুখগ্নি কর হে শাখামৃগ, আমি প্রমাণ করিয়া দিব, আমিই আদি ও আসল পক্ষী”
বুঝিলাম বৃদ্ধের বড় বাড় বাড়িয়াছে, ফ্রড করিয়া গঞ্জিকা সেবনের মতলব। ঘুঘু দেখিয়াছ ফন্দ দেখ নাই। কিয়ৎমাত্র বিলম্ব না করিয়া কলকি প্রস্তুতপূর্বক অগ্নিসঞ্চার করিয়া উঠিতে পারিলাম না, বৃদ্ধ ছিনাইয়া লইয়া দম দিলো। আহঃ আহঃ সে কি দম, বৃদ্ধের দমদর্শনে আমারই বিভূতি বোধ হইল। বুঝিলাম, পাইলাম উহাকে পাইলাম। স্বয়ং রূপচাঁদ পক্ষী বিনে এ বিভূতি কদ্যপিও মিলিবে না।
ষষ্টাঙ্গ প্রণাম করিয়া কহিলাম, “গুরুদেব, আমি আপনার একলব্য। অদ্যবধি কোথা গুপ্ত রহিয়াছিলেন?”
পক্ষী মৃদু হাস্যে কহিলেন, “গতাসু হইয়াছিলাম, কৈলাশ শৃঙ্গে ভোলানাথের পদতলে ঠাঁই মিলিয়াছিলো। তাঁহার স্নেহধন্য হইয়া, তাঁহার প্রসাদে মত্ত ছিলাম।”
শুধাইলাম, “আজি তবে কিরুপে পষীলেন?”
তিনি কহিলেন, “আজি আসিয়াছি ভোলানাথের দূতরূপে। আ্মি তদন্ত নিমিত্তে প্রেরিত হইয়াছি”
পুছিলাম, “কিরূপ তদন্ত, গুরুদেব?”
তিনি কহিলেন, "সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি"
আশ্চর্য হইয়া পুছিলাম, "উহা কৈলাশে কি ঘটাইয়াছে?"
কহিলেন, “ কাহিনীবিস্তার শ্রবণ কর তবে,
মহেদেবের গঞ্জিকার স্টক শেষ হইয়া আসিতেছিল, ভৃঙ্গীকে পাঠাইয়াছিলেন স্পটে মাল আনিতে। আমি মানা করিয়াছিলাম, এ ভৃঙ্গী ভাং পাইলে সব বিস্মৃত হইবে, শুনিলেন না। সপ্তদিবস প্রতীক্ষায় কাটিয়া গেল। সর্বশেষ কলকি চলিতেছিলো, এমতে ভৃঙ্গী হন্তদন্তে হাজির হইলো। মহাদেব তো তৃতীয় নয়নে ভস্মই করিয়া দিতেন, ভৃঙ্গী করজোড়ে কহিলো, প্রভু, সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি। তৃতীয় নয়ন আপনা আপনি বুজিয়া গেল”
এই বলিয়া পক্ষী মহাশয় আরেকখানি বিভুতি দম মারিয়া লইলেন।
আমি পুছিলাম, “ততঃকিম, ততঃকিম?”
কহিলেন, “ভৃঙ্গী যাহা কহিলো, তাহা এরূপে,
ভৃঙ্গী ধরণীতে নামিয়া শুনিলো বঙ্গদেশে নাকি গঞ্জিকা বাম্পার ফলিতেছে। তথা নাকি আবালবৃদ্ধবণিতা লাইনে আসিয়া ছিন্নবস্ত্র প্যাঁচাইতেছে। তথা নাকি ইতিহাস প্রতিমূহুর্তে বদলাইতেছে। প্রথম পর্বতারোহী উবিয়া যাইতেছে। সদ্য নাকি জনৈক নির্বাসিত স্বঘোষিত রাজপুত্র ছিন্নবস্ত্র প্যাঁচাইয়া কহিয়াছে তাহার পিতাই বঙ্গদেশের প্রথম রাজা। সে ভাবিলো গঞ্জিকা সেবন বিনা এরূপ ছিন্নবস্ত্র কিরূপে প্যাঁচাইবে।
সে বঙ্গদেশে আসিয়া এক তরুণে জিজ্ঞাসিলো, লাইনে কিরূপে আসিতে হইবে? তরুণ পুছিলো, কিসের লাইনে আসিতে চান? বিদ্যুৎ বিলের লাইন, চতুর্চক্রশকটের লাইন, নাকি চরম উদাসের লাইন? ভৃঙ্গী বিভ্রান্ত হইয়া কহিলো, এদেশে ছিন্নবস্ত্রের এত প্রকার লাইন? তরুণ মৃদু হাসিয়া কহিলো, ছিন্নবস্ত্রের কথা পূর্বে কহিবেন তো, আপনি অনলাইনে গমন করুন, সেথা মুখপুস্তকে প্রবেশ করিতে হইবে। ভৃঙ্গী কষ্টেসৃষ্টে অনলাইনে আসিয়া মুখপুস্তকে প্রবিষ্ট হইলো।
আচ্ছা অনলাইন কি হয়, বাপু? আর মুখপুস্তক গ্রন্থখানিই বা কি?”
কহিলাম, “অনলাইন হইতেছে, আসনে অনড় বসিয়া লাইন মারফতে এক আশ্চর্য্য দর্শনশাস্ত্র চর্চাকেন্দ্র। ইহা এমনই শাস্ত্র, যাহা চর্চিত হইতে হইতে ছিন্নবস্ত্ররূপ ধারণ করে। আপনি বুঝিবেন না, মহাদেব স্বয়ং বুঝিবেন কিনা আমি সন্দিহান।
মুখপুস্তক হইতেছে ছিন্নবস্ত্র দর্শনের প্রধানতম শাস্ত্রগ্রন্থ। ইহা সদা পরিবর্ধনশীল, গঞ্জিকাই ইহার চালিকাশক্তি বলিয়া আমি ধারণা করিয়াছি। আপনি কহেন, ততঃকিম। আমি গঞ্জিকা প্রস্তুত করি”
পক্ষী পুণরায় আরম্ভ করিলেন,
“ যাহা হউক, ভৃঙ্গী মুখপুস্তকে প্রবিষ্ট হইয়া স্বনাম ঘোষনা করিবামাত্র কতিপয় ব্যক্তি উচ্চকন্ঠে উচ্চকিত হইয়া উঠিলো। একপক্ষ কহিলো, তুমি ভৃঙ্গী হইলে অনলাইনে কিরূপে, আর ভৃঙ্গী বলিয়া কেহই নাই। অপরপক্ষ কহিলো, তুমি একেশ্বরবাদের বুকে কুঠারাঘাত করিতেছ, তোমাকে কুপানো হইবেক। ভৃঙ্গী ঘাবড়াইয়া কহিলো, ওগো আমি কেবলই নিরীহ ভৃঙ্গী, মহাদেবের তরফে গঞ্জিকা ক্রয় করিতে আসিয়াছি।
অচম্বিতে হয়রান নামধারী এক একেশ্বর পুরোহিত ঘোষনা করিলো, সে স্ক্রিনশট মারিয়াছে। ইহা একটি ফেক নিক। উক্ত নিক হইতে গোষ্ঠানুভুতি আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছে। ইহার নামে সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধিতে মোকদ্দমা করিয়া প্রত্যাঘাত করা হইবেক। ভৃঙ্গী কিছু বুঝিবার পূর্বেই কোটাল আসিয়া তাহাকে ফাটকে পুরিয়া দিল।
আচ্ছা, স্ক্রিনশট কাহাকে বলে? নিকই বা কি বস্তু? আর উক্ত অনুবিধিই বা কিরূপ?”
আমি দীর্ঘঃশ্বাস ত্যাগিয়া কলকি গুরুদেবের হস্তে হস্তান্তর করিয়া কহিলাম,
“ স্ক্রিনশট হইতেছে শাস্ত্রালোচনা কেন্দ্রে উপস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। কেন্দ্র হইতে কেহ পিছলাইয়া পলায়নরতঃ হইলেই, তাহার সূক্ষ্মশরীরকে আবদ্ধ করিয়া রাখা হয়। ইহাকে স্ক্রিনশট বলে। নিক হইতেছে স্বরূপ গোপনকরতঃ ভিন্নরূপের অবতার।
আর উক্ত অনুবিধি হইতেছে অজরূপে জন্ম লওয়া কতিপয় বরাহনন্দনের প্রতি রাস্ট্রপ্রধাণের প্রদেয় বর। এ একপ্রকার ব্রহ্মাস্ত্রবিশেষ।“
পক্ষী এক বিভূতিদম টানিয়া কহিলেন,
“ আহঃ আহঃ কত রঙ্গ এ বঙ্গদেশে। সত্যযুগের ন্যায় বরাহনন্দন অজরূপে জন্ম লয়। মানবসকল অবতার লয়। সূক্ষ্মশরীর আবদ্ধ করা হয়। সকলই গঞ্জিকার লীলা। যাহা হউক, কাহিনী আর বিশেষ নাই। তিন দিবসের সময় সূচক লইয়া ভৃঙ্গী মর্তে আসিয়াছিলো। ঘটনাপরাম্পরায় বিমূঢ় হইয়া আত্মবিস্মৃত হইয়াছিল। ষষ্ঠ দিবসে হুঁশ ফিরিলে সর্বশক্তিবলে ফাটক ফাঁড়িয়া বাহির হইয়া কামরূপ হইতে গঞ্জিকা ক্রয়পূর্বক সপ্তম দিবসে কৈলাশ পঁহুছিল।
মহাদেব সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি শুনিবামাত্র সেই যে সমাধিতে প্রবেশ করিলেন, তাঁহাকে আর কেহ টলাইতে পারিলাম না। অদ্য আমি সকলের পরামর্শে মর্তে আসিয়াছি তদন্তমারফত সকল তথ্য সংগ্রহের নিমিত্তে।“
আমি কহিলাম, “গুরুদেব অদ্য গঞ্জিকা সেবন করুন। আগামীকল্য হইতে তদন্ত আরম্ভ করা যাইবে”
পক্ষী সম্মত হইয়া আরেকবার বিভূতিটানে নিমগ্ন হইলেন।

যাপিত জীবন - ৮

সেটা ২০০০ সাল, সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, পূর্ব রাজাবাজারে কয়েক বন্ধু মিলে থাকি। পশ্চিম রাজাবাজারে একটা ফোন/ফ্যাক্সের দোকান এবং তার লাগোয়া হোটেলে আড্ডা দেই। প্রশ্ন করতে পারেন, পূর্বে থেকে পশ্চিমে আড্ডা দেয়ার কারণ কি? কারণ দুটো। প্রথমতঃ দোকান দুটো চালায় দুই ভাই যারা অতি মাত্রায় বন্ধু বৎসল, এলাকায় থাকা সমস্ত ব্যাচেলর পোলাপান এই দুই জায়গাতেই আড্ডা দেয়, আমাদের সাথে খাতির একটু বেশি। দ্বিতীয়তঃ ওখান থেকে ১০০ গজ দূরে একটা মহিলা হোস্টেল, যার অধিবাসিনীরা সব সময় এই দুই জায়গায় যাতায়াত করে। ভুল বুঝবেন না বন্ধুরা, আমার তৎকালীন প্রেমিকাও সেই হোস্টেলেই থাকতো, সুতরাং আমি লুলমুক্ত ছিলাম। ধরা যাক আমার প্রেমিকার নাম “পদ্ম”। একসাথে থাকা আমাদের তিন বন্ধুর সাথে এই হোস্টেলের সমবয়সী এবং সিনিয়র মেয়েদের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। আমার প্রেমিকার সূত্র ধরে একটা মেয়ের সাথে আমাদের পরিচয় হয়, আমি স্বচক্ষে তার মত সুন্দরী হয়তো দু’ একজনের বেশি দেখিনি। ধরা যাক, তার নাম “রাত্রী”। জ্বলন্ত আগুনের মত চেহারা ছিলো তার, হাসিতে ছিলো জলতরঙ্গের আওয়াজ।


সে বছর সিজনের মাঝখানে আবাহনী ক্লাবের হয়ে খেলতে আসে পাকিস্তানের উঠতি বাঁ’হাতি স্পিনার আব্দুর রহমান। হ্যাঁ, সম্প্রতি বাংলাদেশের বিপক্ষে বিনা বলে ৮ রান দিয়ে বিশ্বরেকর্ড করা আব্দুর রহমান। আমাদের তিন বন্ধুর মধ্যে সজল নামের ছেলেটা অসাধারণ পেস বোলার ছিলো, সে আবাহনী ক্লাবের প্রাকটিস নেটে বল করতো। তার সাথে আব্দুর রহমানের বিশেষ খাতির হয়ে গেল, সেই সূত্রে খাতির হলো আমাদের সাথেও। আমরা প্রায়ই সংসদে আর ধানমন্ডী লেকে আড্ডা দিতাম। আমি ওর কাছে স্পিন বলের দু’রকম গ্রিপ শিখেছিলাম। আমাদের আড্ডায় মাঝে মধ্য পদ্ম এবং রাত্রী যোগ দিত। রাত্রীর ছিলো অসম্ভব পাকিস্তান প্রীতি। দুইয়ে দুইয়ে চার হলো, জ্বলজ্যান্ত পাকিস্তানী বোলার হাতে পেয়ে রাত্রী তার প্রেমে পড়ে গেল। এত সুন্দরী মেয়ে কি আর উপেক্ষা করে থাকা যায়? আব্দুর রহমানও মজে গেল। আবাহনীর একটা ম্যাচের কথা মনে আছে, রহমান প্রথম বলে চার মেরে গ্যালারীতে থাকা রাত্রীর দিকে ব্যাট উঁচালো। পরের বলে ছয়, আবারো রাত্রী। বল আর রাত্রীর মধ্যে প্রতিযোগীতায় বলের জিত হলো, তৃতীয় বলেই রহমান আউট। যাই হোক এরপরে মাসখানেক ছিলো রহমান। চুটিয়ে প্রেম চললো তাদের। সিজন শেষে রহমান ফিরে গেল পাকিস্তান। আমরা যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।


মাস দুয়েক পরের ঘটনা, ফোনের দোকানে পদ্মের জরুরী মেসেজ পেয়ে দেখা করলাম তার সাথে। বললো ওর সাথে এক জায়গায় যেতে হবে, ক্ল্যান্ডেস্টাইন মিশন, ব্রিফিং পাওয়া যাবে পৌছানোর পরে। প্রেমিকার সকল আবদারই মধু, অতঃএব আপত্তি কিসে? গিয়ে উপস্থিত হলাম রমনা পার্কে, দেখি, সেখানে রাত্রী বসে আছে। ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় বললো, ডালমে শুধু কালা নয় আরো কিছু রঙ আছে। একটু পরে সেখানে হাজির হলো আব্দুর রহমান। জানা গেল, রহমান দেশে যাওয়ার আগে তারা দুইজনে বিয়ে সেরে ফেলেছে। রহমান দিন তিনেক হয় এসেছে বউ নিয়ে যেতে। হজম করতে বেশ কষ্ট হলেও, হজম করতে হলো। মনে মনে ভেবেছিলাম, শালা আমাদের সুন্দরী মেয়ে এক পাকিস্তানী নিয়ে যাবে, তরুণ সমাজের অপমান। যাই হোক, কি আর করা বন্ধু বলে কথা, সাধ্যানুযায়ী সাহায্য এবং গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি দিলাম তাদের। তারা থাকছিলো পুরানা পল্টনের হোটেল মেট্রোপলিটনে। 


পরবর্তি পনের দিন অনেক দৌড়াদৌড় করতে হলো। রাত্রীর আর্জেন্ট পাসপোর্ট করানো হলো, ভিসার জন্য পাকিস্তান দুতাবাসে জমা দেয়া হলো এবং দুদিন অন্তর-অন্তর রহমানের সাথে বারে যাওয়া হলো। ভিসা হয়ে গেল, এখন যাবার পালা। এবার জানা গেল, রহমান এসেছে পরিবারের সম্পূর্ণ অমতে। টাকা পয়সা যা এনেছিলো প্রায় শেষ। প্রতিদিন ফোন করে বাড়িতে, কিন্তু সেখান থেকে সাফ জবাব, নো মোর মানি, রিটার্ন ইমিডিয়েটলি। তাহলে রাত্রীর প্লেনের টিকেটের কি হবে? এমিরেটসের ঢাকা-করাচী-ঢাকা টিকেট কিনতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা প্রয়োজন, রাত্রী একেবারে ভেঙ্গে পড়লো। পিসির নতুন হার্ডডিস্ক কেনাবাবদে আমার কাছে হাজার পনের টাকা ছিলো, পদ্ম কিভাবে যেন ন’হাজার যোগাড় করলো। রহমান আমার দুই হাত ধরে বললো, দেশে ফিরে টাকা পাঠানোর ব্যাবস্থা করবে। মুখে বললাম দরকার নেই, মনে বললাম, আর পাঠাইছো মামা। তারা দুইজনে মহানন্দে পাকিস্তান চলে গেল, আমরা দুইজনে বিদায় জানিয়ে আসলাম। অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো!!!! তাহলে তো ভালই হত।


পরবর্তী মাস তিনেক রাত্রীর সাথে আমাদের বেশ যোগাযোগ ছিলো। শুনতাম, রাত্রী মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে, রহমানের পরিবার করছে মেনে নেয়ার চেষ্টা। ৩/৪ মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরে আমরা কল দিলাম, রাত্রীর হাসির জলতরঙ্গ আর নেই, শুনলাম রহমানের পরিবার খুব খারাপ ব্যবহার করছে, গালিগালাজ দিচ্ছে। এর পরে বাংলাদেশ থেকে কল শুনলেই খট করে রিসিভার নামিয়ে রাখা হতো। রাত্রীর সাথে আর কখনো দেখা বা কথা হয় নি আমার বা পদ্মের। বছর তিনেক আগে রাত্রীর এলাকার পূর্বপরিচিত একটা ছেলের সাথে দেখা হয়েছিলো আমার। জানতে চেয়েছিলাম, রাত্রীর কোন খোঁজ জানে কিনা। ও বললো, রাত্রী ২০০৩ এর শেষের দিকে ফিরে এসেছে দেশে। কিন্তু রাত্রী আর তখন জ্বলন্ত আগুন নেই, সে তখন একরকম অস্থিচম্মসার, পুরোন রাত্রীর খোলস মাত্র। জানি না সে এখন কোথায়।


দুঃখ হয়, কি বিচিত্র আমাদের পাকিস্তানী প্রেম।

কেপলার-২০এফ এ প্রথম মানব

আপ্নেরা তো জানেন ২০১১’তে ছাইনটিশরা কেপলার-২০এফ নামে আমগো দুইন্যার সাথে মিলে এমন একখান গ্রহ খুঁইজা বাইর করছে। তো হেইডা কুনু কতা না, কতা হইলো, গত বচ্ছর নাসা থিকা আমারে ফুন মাইরা কইলো, “ব্যাডা, হারাদিন তো গরেই বইয়া তুইলা তুইলা আডি বান্দ, কেপলারে এট্টা লুক পাডামু, যাইবা?”

জিগাইলাম, “টেকাটুকা কত দিবা?”

কইলো, “আগেই টেকার কতা কস ক্যালা। তুই ফারাবী নি?

ব্যাডা চিন্তা কইরা দেখ, তারেকানু পর্যন্ত অহনো কেপলারে যাইতারে নাই। তুই ব্যাডা যাবি, দুই তিন মাস মৌজ মাস্তি করবি, আইয়া বই লিখবি, আমার কেপলার জীবন। ব্যাস লালে লাল, শাহজালাল। আর যদি ঐখানে বইয়া নিজেরে আদম বইলা চালায়া দিতারো তাইলে ধর তোর চাইর ছক্কা হই হই”

ভাইবা দেখলাম বিষয়ডা খারাপ না। দুইডা শর্ত দিয়া রাজি হয়া গেলাম,
১) আমারে কেপলার টু আর্থ নেট কানেকশন দিতে হইবো (নাইলে ট্যাটাস দিমু কেম্নে)
২) আমার লগে পর্যাপ্ত গুল্লিফ দিতে হইবো (কারণ যৈবন একখান গুল্লিফ সিগারেট)।

যাই হোক টেরেনিংয়ে এক ব্যাডা আমারে বুঝাইলো, কেম্নে টিউবে কইরা খাইতে হবে, কেম্নে ভাইসা ভাইসা ইয়ে করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। জিগাইলাম, “বিড়ি খামু কেম্নে?”, আমারে বায়ুশুণ্য, অভিকর্ষ, অক্সিজেন ভগিজগি বুঝায়া দিলো। তাও একবার জিগাইছিলাম, মেশিন দিয়া বিড়ির ধুমা টিউবে ঢুকানি যায় কিনা, ব্যাডায় আমার দিকে এম্নে চাইলো, আর কতা কৈতে সাহস হইলো না। যাউকগা, দুই মাসের জার্নির পরে আমার রকেট গিয়া আমারে কেপলারে নামায়া দিলো।

দুই মাস বিড়ি খাইতারি নাই। তো রকেটের তে নাইমা, বিড়িডা ধরায়া কইষা একটা টান দিতে পারলাম না, নাকে আইলো কিমুন জানি চেনা চেনা গন্ধ। একটু তব্দা খাইয়া ইতিউতি চাইয়া দেহি, ইট্টু দূরে কালা চশমা চৌক্ষে, ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে, মুছওলা এক ব্যাডা একখান ভাঙ্গা সুটকেসের উপ্রে বইয়া হাতের গেলাসের দিকে চাইয়া রইছে। হের দিকে চাইতেই জিগাইলো , “রাম চলবে নাকি, ব্রাদার?”

আমি তো লগেলগেই চিন্যা ফালাইসি, আমগো তারেইক্কার বাপে। জিগাইলাম, “আরে! জেনারেল স্যার, আপ্নে এইহানে ক্যালা? আপ্নেরে না মঞ্জুর সাবে গুয়া......, ইয়ে মানে আপ্নে না শহীদ হইছিলেন?”

জোরে শ্বাস ছাইড়া কইলো, “আও, বও, রাম রুম খাও, কইতাছি”। গেলাস হাতে লইয়া বইলাম হের পাশে।

সারে শুরু করলো দুঃখের গফ,

“ বেস্তে তো সুখেই আছিলাম ৭২ হুরী নিয়া, আমারে স্পেশাল খাতির করা হইতো, আমি আবার বাংলাদেশের প্রথম ইসলাম প্রতিষ্ঠাকারী কিনা। হিটলার সাবের হেরেম পাশেই আছিলো। হের লগে আমার বেশ খাতিরও আছিলো, আমরা বদলা বদলি খেলতাম। কিন্তুক তুমি যাও স্বর্গে, তুমার কপাল যায় মর্গে, গুলাবী আর তারেইক্কা মিল্যা যা বাজাইলো।

একদিন ঘুম থিকা উইঠা দেহি, আমার পাশে মাত্র ৩২ টা হুরী। সার্ভিস সেন্টারে কল দিয়া জিগাইলাম, মামা কাহিনী কি? কইলো, গুলাবী কইছে তুই নিহি স্বাধীনতার ঘুষক, এইডা তুর জুরিমানা। মাইনা নিলাম, কিছু পাইতে গেলে কিছু ছাড়তে হয়।

কয়দিন পরে ঘুম ভাংতেই দেহি পাশে মাত্র ২ জন। আবার ফুন দিলাম, কইলো, তুর বেডি কইছে তুই নাকি বাংলাদেশের পরথম বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, এইডা তুর জুরিমানা। মাইনা নিলাম।

আর কয়দিন পরে ঘুম ভাইঙ্গা দেহি পাশে কেউ নাই। সার্ভিস কইলো, আবাগীর বেডি কইছে আমি নাকি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের রুদ্ধ কণ্ঠের মুক্তিদাতা, জরিমানা গুনলাম। হেতেও পব্লেম আছিলো না, হপ্তা দুই হপ্তায় হিটলার সাবে আমারে দিয়া স্বাদ বদল কইরা আমারে হের তে দুই একটা ধার দিতো

হের পরে একদিন আমার পিছে লাথথি মাইরা আমারে বেস্তের তে বাইর কইরা দিলো। জিগাইলাম, এইবার কি? কইলো, তারেইক্কা কইছে জজ মিয়া।

আমারে রাখলো দুজখে, পাইলাম মেরেলিন আর অস্ট্রেলিয়ান রাম। কি আর কমু, মালডা যা আছিলো রে মুমিন।” এই বইলা গেঞ্জীডা তুইলা জেনারেল সাবে চৌক্ষের পানি মুইছা এক ঢোকে গেলাস খালি কইরা ফালাইলো। কুন মালের কথা কইতাছে জিগামু ভাবছিলাম, বেয়াদবী হইতারে ভাইবা আর জিগাই নাই

আমি জিগাইলাম, “সারে তাইলে এইখানে ক্যান?”

জেনারেল সাবে হাউমাউ কইরা কাইন্দা দিয়া কইলো, “সব দুষ আমার রে মুমিন, সব দুষ আমার। একদিন মৌজ একটু বেশী হইয়া গেছিলো। মেরেলিনের লগে রাউন্ড শেষ কইরা, রামে চুমুক দিয়া, চিল্লায়া কইছিলাম, আই উইল মেক হেল ডিফিকাল্ট ফর ডেভিলস”

সারের দুক্কের কথা শুইনা আমার কইলজা ফাইট্টা গেল। সান্তনা দিয়া কইলাম, “সারগো, দুক্কু কইরেন না। কিছু হারাইলে কিছু পাওয়াও যায়। আমি ফির‍্যা গিয়া ব্যাকটিরে কমুনে, কুমারী কেপলারের আপ্নেই পয়লা”

নৈবেদ্য, কৃষ্ণচূড়ার পুষ্পাঞ্জলী

(১)
তুই আমাকে ডাক দিয়ে যাস মুক্ত হাওয়ার পথে,
আমি নিজের শৃংখল নিজেই গড়েছি, সেই শৃংখলে বাঁধা পড়ে আছি,
গরাদের ফাঁকে চোখ মেলে দেখি মেঘহীন ঐ নীলাকাশ,
দূর থেকে রোজ নিয়ে যায় খোঁজ মুক্ত শীতল সুবাতাস
মন চাইলেও হয়না যে যাওয়া সেই তোর সাথে এক রথে

২০০০ সালের ফেব্রুয়ারির এক বিকেলে, দশদিন বাড়িতে কাটিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। ভর্তি ফর্ম জমা দেয়ার মৌসুম না হলে আরো কদিন থেকে আসা যেত, কিন্তু এই কাজটা চাপানোর মত ভরসা করার কাঁধ কই? বাধ্য হয়ে তাও জগন্নাথের ফর্ম সৈকতের কাছে দিয়ে গিয়েছিলাম। কি অবস্থা কে জানে, ব্যাটা আবার ঢাকা শহর ঠিকঠাক চেনেনা। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকা প্রায় পনের ঘন্টা বাস জার্নির পরে আবার রুমের মধ্যে বসে থাকা অনেকটা কবরের আযাবের মত মনে হয় আমার কাছে বরাবরই, তাছাড়া ফর্মের খোঁজটাও নেয়া দরকার। সুতরাং ব্যাগটা কোনমতে ফেলেই, রাজাবাজারের দিকে রওনা হলাম।

সৈকত মেসেই আছে। আমাকে দেখেই ট্রেডমার্ক মুলোর খেত দেখিয়ে দিলো, কারেন্ট এফেয়ার্সের ফাঁকে আঙ্গুল গোঁজা। বসতে বলে আবার দেখি বইয়ের দিকে চোখ নামাচ্ছে।

" স্যার, আপনার জ্ঞানসাধনা বন্ধ করে চলেন বাইরে যাই, চা চু খাই", বিরক্ত হয়ে বললাম।

"চা?", হঠাৎ যেন মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে নামলো, "হ্যাঁ, চা তো খাওয়াই যায়। ইনফ্যাক্ট গত তিন ঘন্টা ধরে আমি তাই ভাবছি।"

আঁতলামো সহ্য করাটা মুশকিল। ঝটকা দিয়ে বই সরিয়ে, হাতে ওর শার্ট ধরিয়ে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চললাম।

"আরে দাঁড়া, তোর রাতের মিল দেই", বোতাম আটকাতে আটকাতে বললো সৈকত

"বাইরে খাবো"

"আমার মিল অফ করে দেই"

"তাড়াতাড়ি"

দুজনে হাঁটতে হাঁটতে আইবিএ হোস্টেলের কাছে এসে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। চা খাওয়ার ফাঁকে জানতে চাইলাম,

"ফর্মের খবর কি? জমা দিছিস?"

"তোর কি সন্দেহ ছিলো, জমা দেবনা?"

"না, ঠিক তা নয়, তবে ঐ ইয়ে আরকি"

"আরে আমি আর লিওন গিয়ে জমা দিয়ে আসছি। কিন্তু দোস্ত, সে এক কাহিনী, এক নারী।"

"ফর্মের সাথে নারী আসলো কোত্থেকে আবার? তোর অবশ্য সব কিছুতেই কেমনে যেন নারী চলে আসে। তো কাহিনী কি?"

"কবিদের অমনই হয়, কাহিনীটা শোন আগে।" 

সৈকতের ভাষ্য রং সহ অনেক বড়, আমি বরং সংক্ষেপে বলি। সৈকত আর লিওন দুইজনের কেউই জানতোনা জগন্নাথ যাওয়ার বাস কোনটা, আবার লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করতেও সংকোচ হচ্ছিলো। ওরা চিন্তা করে দেখলো, এই সময়ে একমাত্র ফর্ম জমা নিচ্ছে জগন্নাথ। সুতরাং অল্পবয়সী কেউ যদি ফাইল হাতে ফার্মগেটের ব্রিজের নীচে এসে দাঁড়ায়, তার জগন্নাথে যাওয়ার সম্ভাবনা শতকরা আশি ভাগ। সুতরাং ওরা ফার্মগেট ওভারব্রিজের নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রইলো। থারেড এটেম্পটে তারা পেয়ে গেলো এক জগন্নাথ যাত্রী। আসলে যাত্রী নয় যাত্রীনী, নাম পদ্ম। সে নিজেই লিড দিয়ে নিয়ে গেলো ওদের জগন্নাথে।

কথা ফুরাচ্ছে না সৈকতের। বলেই চললো,

"কি বলবো দোস্ত, এরকম স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড আর স্মার্ট মেয়ে আমি লাইফে দেখিনি। আর সেই রকম সাহস। দোস্ত তুমি বিশ্বাস করবানা, ফেরার পথে বাস যখন ফার্মগেট আসলো বাসে সেই রকম ভীড়। আমরা পিছনের দিকে সিটে বসে ছিলাম, ভীড় ঠেলে ওরে নিয়ে কেমনে নামব ভাবছিলাম। বললে বিশ্বাস যাবা না, ও বাসের জানালা দিয়ে এক লাফে নেমে পড়লো। আমি আর লিওন তো পুরা টকা। দোস্ত মেয়েই একটা। এই পশ্চিম রাজাবাজারে একটা হোস্টেলে থাকে। দোস্ত আমি তো বোধ হয় প্রেমেই পড়ে যাচ্ছি।"

"প্রেমে তো তুই বারো মাসে পনের বার পড়িস। স্কুলের বাচ্চা থেকে চেয়ারম্যানের বউ, কাজের মেয়ে থেকে বিসিএস ক্যাডার। কবে না তোর আবার পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙ্গে। দেখতে কেমন তোর এই পদ্ম?"

"সেই রকম দোস্ত সেই রকম, সূর্য্যের মতন, দেখলেই মনে হয় বলি, ওঁ জবা কুসুম শঙ্কাশং"

"আরে রাখ তোর জবা কুসুম শঙ্কাশং, লাস্ট টাইমে যার কথা বলে ল্যাটিন মারাইছিলি সে দেখতে ছিলো আমার শেষ বারে বাতিল করা জুতার মত।"

"ওরে না রে, এ আসলেই এক পদ্মফুল, তোরে দেখাবনে। কিন্তু লাইন মারতে পারবানা, আমার বুকিং।"

"যা ব্যাটা, মৃদুল যার তার পিছে লাইন মারে না। আর তোর বুকিং মানে? তুই না কদিন আগেই তোর ইয়ের কাছে গিয়ে প্রেমের রসে সাঁতার দিয়ে আসলি? কি যেন নাম।"

"তুই বড্ড বেরসিক। ওরে প্রেমে বার বার পড়তে হয়। তুই তার কি বুঝবি। নে চায়ের দাম দে।"

(২)
তোমার হৃদয় থেকে একমুঠো লাল আমায় দাও,
বিনিময়ে আমি তোমায় দেব এক চিমটি নীল আমার জীবন থেকে।
আমায় তুমি দাও একগুচ্ছ গোলাপ তোমার বাগান থেকে,
বিনিময়ে আমি তোমায় দেব কুড়িয়ে আনা একটি কৃষ্ণচুড়া

মার্চের ৪ তারিখে সৈকতের এতদিনের সাধনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের "ঘ" ইউনিটের পরীক্ষা। ওর জোরাজোরিতে আমিও ফর্ম জমা দিয়েছি, তবে কোন প্রস্তুতি নেই। ওর স্বপ্ন নাট্যকলায় পড়বে, আমার তো আর সেরকমটি নয়, শুধু ওকে সঙ্গ দিতেই হলে যাব। ও হ্যাঁ, পদ্মও পরীক্ষা দেবে। আমার সাথে পদ্মের এখনো দেখা হয়নি। সৈকতেরও কোন সুবিধা হয়নি, কারণ পদ্ম অলরেডী বুকড, তিন বছরের প্রেম। ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে একদিন ভাবলাম, পরীক্ষা যখন দেবই অন্তত এটা তো জানা উচিৎ কতটুকু কি ফেস করতে হবে, গেলাম সৈকতের মেসে। পড়াশুনার আলাপ হলো ঘন্টা, সারারাত কেটে গেল আড্ডায় আর ব্রিজ খেলায়। ভোর বেলা যখন আসর ভাংলো ততক্ষনে সবার স্টকের বিড়ি শেষ। বাধ্য হয়ে সবাই গেল ঘুমাতে। আমি আর সৈকত ভাবলাম, ভোর যখন হয়েই গেলো, আরেকটু পরে সকাল হোক, বাইরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে এসে তারপরে ঘুম দেই।

হাঁটতে হাঁটতে সংসদের সামনে চলে এলাম। মানিক মিয়া এভিন্যুতে রাস্তার পাশে অনেকগুলো কৃষ্ণচুড়া গাছ। ভরা বসন্তে গাছ ফুলে ছেয়ে আছে। গাছের নীচে ছড়িয়ে আছে কুঁড়ি, ফুল প্রস্ফুটিত, আধা ফোটা। আমরা দুজনে বাচ্চাদের মত ফুল কুড়ায়ে লাগলাম। ঠিক এসময়ে সৈকতের খুব জোরেসোরে কোবতে চেপে গেলো। বললো,

"এ কুড়োনো ফুল যদি কোন রক্তমাংসের দেবীর পায়ে অঞ্জলী নাই দেয়া গেলো, তবে বৃথা এ ফুল কুড়োন। মনকে চোখ ঠাউরে আজি এ কিসের তঞ্চকতা? বল সারথি, আজি দেবী পাব কোথা?"

ভাবলাম সব্বোনাশ করেছে, আজকে এই আঁতেল জ্বালিয়ে মারবে। এখন কি করা যায়? একটু চিন্তা করতেই ওর আঁতলামোর সমাধান পেয়ে গেলাম। বললাম,

"পাশেই পদ্মের হোস্টেল না? চল তোর পুষ্পাঞ্জলী দিয়ে আসি। সে নাকি সেই রকম স্মার্ট, দেখি তার দৌড় কতদূর"

আমার স্বভাব খুব ভালো করেই জানা আছে ওর, মাথায় একবার কিছু চাপলে তা করেই ছাড়ি। এক কথায় কোবতে টোবতে সব ভেতরে সেঁধিয়ে গেল। ব্ললো,

"পদ্মের হোস্টেলে তো আটটার আগে কল দেয়া নিষেধ। এখন সবে সাড়ে ছয়। বাদ দে, জাহান্নামে যাক পুষ্পাঞ্জলী। তুই রুমে চল।"


উঁহু, চল তুই আমার সাথে। কল কি করে দিতে হয় দেখাচ্ছি। আজ পুষ্পাঞ্জলী দিয়েই ছাড়বো, চল", আজ সোইকতের আঁতলামোর মজা বুঝিয়েই ছাড়বো।

হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেলাম ওকে পশ্চিম রাজাবাজারের দিকে। শেষ পর্যন্ত আমাকে বাধ্য হয়ে নিয়ে গেলো হোস্টেলের গেটে। বাইরের গেট খোলা। আমি সৈকতকে কথা বলতে মানা করে কল দেয়ার দায়িত্ব আমার হাতে ছেড়ে দিতে বললাম। ফুলগুলো পেছনে লুকিয়ে খুব সিরিয়াস চেহারা করে দারোয়ানকে বললাম,

"ভাই, পদ্ম আপুকে ডেকে দেয়া যাবে?"

"আটটার আগে কল দেয়া নিষেধ"

"আপুর বাসা থেকে ইমার্জেন্সী কল এসছে ভোর বেলা। সেই মিরপুর থেকে আসছি, ডেকে দেন না ভাই। ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি, বুঝেনই তো"

আমার সিরিয়াসনেস দেখে আমাদের দাঁড়াতে বলে দারোয়ান ভেতরে গেলো। 
তিনেক পরে এক বাজখাঁি চেহারার চল্লিশের কাছাকাছি ভদ্রমহিলা এসে জানতে চাইলো, কি চাই। সৈকত কানে কানে বললো, হোস্টেল সুপার। আমি আরো করুণ চেহারা করে কাহিনী বললাম। বললাম, শেষ রাত থেকে আপনাদের ফোনে চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু লাইন পাওয়া যায় নি। প্লিজ ম্যাডাম, ইমার্জেন্সি। দুই মিনিট কথা বলে খবরটা দিয়েই চলে যাব। ভদ্রমহিলার দয়া হলো। ভতরে গেলেন। আমরা হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম, সৈকত পারলে লাফায় আরকি।

মিনিট কয়েক পরে, সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে হাজির হলো মেয়েটা, বেশ সাদামাটা দেখতে, কোথায় যেন একটা কিছু লুকিয়ে আছে এরই মাঝে। আমি চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম, চুপ রইলো সৈকতও। আসলে এই সদ্য ঘুম ভাঙা সাদামাটা মেয়েটা আমাদের মনের কোথায় যেন কি এক অপার্থিবের ছোঁয়া লাগিয়ে দিলো। বোধ হয় মিনিটখানেক আমরা দুইজনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পদ্মের ততক্ষনে বোঝা সারা, যে এ কোন ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি নয়। কাহিনী অন্য কিছু। পালা করে আমাদের দুইজনকে দেখে, নীরবতায় খানকটা বিরক্ত হয়েই ব্ললো

" কি ব্যাপার সৈকত, এত সকালে কি? এ কে?"

চটকা ভেঙ্গে গেলো আমাদের। সৈকত হঠাৎ ভাব ধরে বললো,

"ও, বেশী সকালে চলে এসেছি, তাইনা? আচ্ছা থাক, কিছুই না। মৃদুল চল।" হাঁটা দিলো গেটের দিকে। আমার সামনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পদ্ম। আমি আর কি করবো, ঘুরে আমিও হাঁটাদলাম। গেট থেকে বের হওয়ার সময়েও দেখলাম, পদ্ম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে সেখানে। আমার খুব খারাপ লাগলো, গেটের সামনে আমার হাতের কৃষ্ণচুড়াগুলো রেখে পদ্মের দিকে একবার তাকিয়ে, চলে এলাম। দূর থেকে হলেও আমার পুষ্পাঞ্জলী দেয়া হলো। দূরত্বও কোন কোন সময় নৈকট্যের চাইতে নিকট হয়ে দাঁড়ায়।

সৈকতের রূমে ফিরে ঘুমানোর আগে ওকে বলতে শুনলাম, আজ কোন মহাপ্রলয়ও আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারবে না।

(৩)
কে জানে, সে কিসের মায়া,
কার করকমলে কোথায় ফোটা পদ্ম?
মহাকালের ইশারা, নাকি গত জন্মের ফেলে আসা স্মৃতি,
কে জানে, এ কিসের বাঁধন?
হয়তো যুগান্তরের অভিশপ্ত প্রাণের শাপমোচন


মহাপ্রলয়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পর্বত্মালা ভেঙ্গেচুরে পড়ছে আমার উপরে। না আমি ঘুম থেকে উটঠলাম, এ এই তো সৈকতের রুমে আমি। বিছানার একপাশে সৈকত বসা, সকৌতুক কৌতুহলী চোখে তাকানো আমার মাথার পিছনে। সকৌতুক দৃষ্টি কে? ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, হাতে বেশ ওজন্দার একখানা ব্যাগ বেশ সন্দেহজনকভাবে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ নয়, পদ্ম। জানা গেল মহাপ্রলয়, পর্বতমালা কিস্যু নয়, হাজার চেষ্টার পরেও সৈকত আমার ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি দেখে বিরক্ত হয়ে পদ্ম তার হাতের ব্যগখানা সর্বশক্তিতে নামিয়েছে আমার উপরে। প্রত্যুৎপন্নমতিতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। 

আমরা আড্ডা দিতে দিতে কখন যেন কৃষ্ণচুড়ার কেশর দিয়ে কাটাকুটি খেলা শুরু করেছিলাম মনে নেই। খেলা শুরুর পরে কতক্ষন কেটে গিয়েছিলো তা কখনোই জানতে পারিনি। শুধু মনে আছে, আচ্ছন্নের মত দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে কাটাকুটি করেই চলেছি, করেই চলেছি, ঠিক যেন জীবনের কাটাছেঁড়া করে চলেছে অদৃশ্য বিশ্বাত্মা। সৈকত সম্ভবত আমাদের পাশে পায়চারি করেছিলো অনেক্ষন। কিন্তু আমাদের তখন পার্থিব কোন কিছুতেই কোন খেয়াল ছিলো না। বাস্তবে ফিরলাম যখন, বাইরে না হলেও ভেতরে ভেতরে জীবনটা আমাদের একেবারেই পাল্টে গেছে। কেউই আমরা তখন একে অপরের কাছে স্বীকার করিনি কিছু, বরং জোর দিয়ে অস্বীকারই করেছিলাম।

তারপর? সে অন্য গল্প, অন্য কোন সময়ের অন্য কোন বাস্তবতায়। হবে নাহয় অন্য কোন দিন, আজ এটুকুই থাক।

২০২৬- মঙ্গলে বসতি স্বপ্ন

মঙ্গলে লোনা জল পাওয়ার খবরে আমার স্মৃতিতে খোঁচা দিলো বছরদুয়েক আগে পড়া একটা খবর। একটা এক্সপিডিশন প্রোজেক্ট, "মার্স ওয়ান - ২০২৬"  ।  মঙ্গলে বসতি। অলীক স্বপ্ন মনে হচ্ছে না? নেদারল্যান্ডের একটা   প্রাইভেট ফার্ম ২০১০ থেকে এই ভিশন নিয়ে এগোতে শুরু করে , ওরা মঙলগ্রহকে বাসযোগ্য করে কলোনাইজ করবে   http://www.mars-one.com। এই ২০১৬ নাগাদ অরবিটার, আর রোবোটিক ভেইকল, তারপরে ধাপে ধাপে ২০২২ এ এসে ৪ জনের একটা টিম পাঠাবে যারা ২০২৬ এর মধ্যে মঙ্গলে বসতি গড়বে, আস্তে আস্তে ৫ টা ধাপে  মোট ২০ জন টিম মেম্বার যাবে মঙ্গলে ওয়ান ওয়ে জার্নিতে, আর ফিরবে না।

২০১০ এ ভিশনারি প্রোজেক্ট শরু হয়, এবং করিতকর্মা বলতেই হবে, ২০১২ তেই প্রোজেক্ট এনাউন্সমেন্ট করে বসে। মুহুর্তে সাড়া পড়ে যায় ওদের ৬ বিলিয়ন ডলার প্রোজেক্ট আর আর প্রোসেস নিয়ে। ৪ জন্য হিউম্যান ক্রু জোগাড়ের জন্য এপ্লিকেশন প্রোসেস,  টেইন আপ ক্যাম্প রিয়েলিটি শো পর্যন্ত ওপেন করা হয়। ২০১৩ সালে এসে প্রথম ওদের প্রোজেক্টের ফুল ডিটেইল জানা যায়। প্রোজেক্টের ধাপগুলো মোটামুটি এমন:

২০১২-১৬ :  সিলেকশন প্রোসেস।  সম্ভ্যাব্য ক্যান্ডিডেট ৪০ জনে নামিয়ে আনা। ২০ জন যাবে, ২০ জন ব্যাকাপ।
২০১৭-      : Lockheed Martin আর Surrey Satellite Technology'র সাথে যৌথ উদ্যোগে নাসা ফিনিক্সের মত অরবিটারি এবং প্রিলিমিনালি ল্যান্ডিং ভেইকল পাঠানো হবে।  ১৮ তে ল্যান্ড করার পরে ওদের নিজস্ব ক্রাইটেরিয়ার তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, সোলার এন্ররজি সিস্টেম টেস্ট, দুই একটা টেস্ট প্রোজেক্ট চালাবে।
২০২২-      : আনম্যানড রোভার পাঠানো হবে, ২০২৭ এ মার্স ওয়ান ল্যান্ডিং এর জন্য কলোনিসাইট নির্ধারণ করতে। একই সময় একটা কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট লঞ্চ করবে।
২০২৪-      : দুটো কার্গো মিশন লঞ্চ হবে। এতে থাকবে দুটো লাইফ সেভিং ইউনিট, দুটো সাপোর্ট ইউনিট।
২০২৬-      : প্রথম ৪ জন নভোচারী ফ্যালকন হেভি  নভোজানে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবে, সাথে থাকবে ৪/৫ বছরের সাপ্লাই, বসতি শুরুর প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি,  ওরা ২০১৭ এ ল্যান্ড করবে। শুরু হবে মঙ্গলে মানুষের প্রথম বসতি।
২০২৭-       : ২০ জন নভোচারি পৌঁছে যাবে বসতি তে। শুরু হবে জীবন মঙ্গল্গ্রহে।

এপর্যন্ত অনেকদূর এগিয়েছে মার্স ওয়ান প্রোজেক্ট।,
★ ফাইনাল ১০০ জন প্রতিযোগী টিকে আছে, এদের মধ্যে ৬০ জন বাদ পড়ে যাবে। সেরা দশ প্রতিযোগী নিয়ে গার্ডিয়ানের রিপোর্ট http://www.theguardian.com/science/2015/feb/17/mars-one-shortlist-the-top-10-hopefuls
★ স্পন্সর যোগাড় হয়েছে, ডোনেশন কালেক্ট করা হয়েছে, মার্চেন্ডাইজ সেল করে পয়সা আসছে
★ টেক পার্টনারশিপ কমপ্লিট হয়েছে।

সাংঘাতিক রকমের কন্ট্রোভার্শিয়াল প্রোজেক্ট এটা।  অনেকে বলছে এসব ভুয়া। কারণ নাসা এমনই একটা প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলারের, যদিও নাসার প্রোজেক্ট নভোচারিদের ফিরিয়ে নিয়ে আসার। তাছাড়া স্বচ্ছতা বিতর্ক আছে, অনেকে তো ভাবছে শুধুই পাবলিসিটি স্টান্ট। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে।

রিলেটেড লিঙ্ক:
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Mars_One
https://m.youtube.com/#/user/MarsOneProject
http://www.dailymail.co.uk/sciencetech/article-3145670/How-build-house-red-planet-Mars-One-claims-solved-humans-survive-space-colony.html
https://medium.com/matter/mars-one-insider-quits-dangerously-flawed-project-2dfef95217d3
https://www.indiegogo.com/projects/mars-one-first-private-mars-mission-in-2018#/
http://www.techinsider.io/mars-one-mit-students-mission-not-feasible-debate-2015-8



হে ক্ষনিকের অতিথি!

১)
সৈকত সচরাচর মিসড কল ব্যাক করে না। সেবার মিসড কল ব্যাক করে ব্লাইন্ড ডেট ফেস করার পরে তো আরো না। যা তা লেভেলের ব্লাইন্ড ছিলো ঐ ডেটটা। কিন্তু ১০/১২ টা কল, ১৫ মিনিটে, কি ভেবে কল করেই বসলো। যাহ শালা এটাও মেয়ে।

"হ্যালো, এই নাম্বার থেকে কেউ একজনন কল করেছিলেন। কে, জানতে পারি কি?"
"হ্যাঁ, পারেন, যার সাথে কথা বলছেন সেই কল করেছিলো"
"ওহ, আমি কি আপনাকে চিনি?"
"না, প্রশ্নই ওঠে না। আমি চিনি"
"তাই নাকি? নিয়ার ইমপসিবল ব্যাপার। কিভাবে চেনেন?"
"জানবেন আস্তে আস্তে"
"ওহ, মানে আপনার সাথে আমার আরো কথা হবে?"
"অবশ্যই, সে জন্যেই তো কল করলাম"
"আমার সম্পর্কে কি কি জানেন?"
"আপনার ফ্যামিলি, পড়াশুনা, আচ্ছা এমবিএটা কি একবারে করে আসা যেত না বাইরে থেকে?"
"ওরেএ আপনি এটাও জানেন? আর কি জানেন?"
"জানবেন জানবেন, দেখা হলেই জানবেন"
"ওহ, আপনার সাথে দেখাও হবে? কবে?"
"এই তো আপনি থার্টি ফার্স্টে ঢাকায় আসছেন, ১ তারিখেই হতে পারে"
"ও আচ্ছা, এটা জানতেও বাকি নেই। বেশ। আপনি কোথায় থাকেন?"
"এয়ারপোর্টের দক্ষিনে"
"উত্তরা?"
"ওটা কি দক্ষিন?"
"তাই তো, বনানী?"
"নাহ অতও না, এয়ারপোর্টের আরেকটু কাছে"
"আমি অতশত চিনি না, এই ১ তারিখে দেখা হবে তো আপনার সাথে? কনফার্ম? সামনাসামনি জেনে নেবো"
 "এই তো পথে এসেছেন, এখন রাখছি পরে কথা হবে, টা টা"

কেটে দিলো। সৈকত তখন মাথার মধ্যে হিসেব কষছে সম্ভাব্য কে হতে পারে। লাস্ট কয়েকক মাসে মেয়ে বলতে কথা হয়েছে শুধু কলি'র সাথে, তাও সে তো হচ্ছে, ইনসান ভাই এর জিএফ, আর হোস্টেল বনানী, এটা কে? এত ইনফো কলি জানতে পারে নিশ্চয় ওর পরিচিত কেউই হবে। কেসটা দেখতে হচ্ছে। এই তো আজ ২৮, ৩১ সকালের বাসেই ঢাক। দেখা যাক, জল কতদূর গড়ায়।

২)
 ঢাকায় থার্টি ফার্স্ট মানে সাধারণ তরুণের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কিন্তু ২০০০ থেকে দুপুরের পরেই ক্যাম্পাসের সব প্রবেশমুখ সিল করে দেয়া হয়, শুধু আইডি দেখে ঢুকতে দেয়। তবে ওসব কোন ব্যাপার না, অন্তত ৯ টা জায়গা আছে যেখান থেকে ক্যাম্পাসে ঢোকা যায়।  যেমন, স্টাফ কলোনির বাউন্ডারি টপকে জহুরুল হক হলের ঝোপঝাড় ভেঙে। এক বোতল মাল ছয়জনে প্রায় শেষ করে সৈকত ঐ পথেই এ রাতে টিএসসি, ফিরে গিয়ে আরেক বোতল, হেব্বি ফুর্তি মনে। স্লোগান চলছে, "রোকেয়া হলে তালা কেন, ভিসি স্যার জবাব চাই"। টিএসসি'র, পাশেই মেয়েদের হল, খুব স্বাভাবিক ওদের বেরোতে দেবে না, এই রাতে, কিন্তু স্লোগান দিতে তো বাধা নেই। ঐ হৈ হট্টগোলের মধ্যেই অজানাকে ফোন, আগামীকাল ডেট কনফার্ম। গাঁজা খেতে খেতে, ট্রেডমার্ক গানে বাড়ির পথ, আরেকটা বোতল, আড্ডা, মনে উত্তেজনা, কালই তবে, দেখি তাহলে।

ঠিক ১১টায় টাইম, শাহবাগ, মিউজিয়াম গেট এ। কি করে চেনা যাবে? কেন? ফোনে কল করে। সৈকত আগেই দেখা দিতে রাজি নয়, শালা ব্লাইন্ড মানে আবারও ফুল ব্লাইন্ড হতেই পারে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর, ঐ মেয়েটা কি? নাহ, চলে গেলো, এটাও না, আরে সাড়ে এগারো, আর কখন? এই যে মেয়েটা নামলো, ছিপছিপে লম্বা, টকটকে লাল জামা, চোখে সানগ্লাস, মাথায় প্যাঁচানো ওড়না, দেখতেও খারাপ না, এটা নয়তো? আরে মিউজিয়ামের দিকেই যাচ্ছে যে, এটাই হবে, কপালটা ভালোই বোধহয়। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সৈকত, মোবাইলের বাটন টিপতে টিপতে, মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ালো, চোখাচোখি, কল দেয়ার আর প্রয়োজন হলো না, যা বোঝার বোঝা শেষ।

"আচ্ছা আচ্ছা, এই তাহলে আপনি, বেশ তো, দিব্যি দেখতে"
 "তাতে কি? আপনার কোন লাভ নেই, সাময়িক গল্প ছাড়া, আমি রেজিস্টার্ড এবং সিলড"
"তার মানে আপনি কলির সেই ফ্রেন্ড, যার সদ্য বিয়ে হয়েছে?"
"ধুর, বলে দিয়েছে, এটা ঠিক না, যা বলার আমি বলতে চেয়েছিলাম।"
"না না, বলেনি কিছুই, আমরা ডিডাক্ট করেছি। আরে বাবা, বাচ্চা তো আর নই। যাই হোক চলুন বসি কোথাও, কোথায়? আকাশের নিচে? না ছাদের নিচে?"
"নাহ, চলুন খোলা কোথাও বসি, কলিরাও আসবে,  এমন কোথাও বসি, যেখানে সহজে ওদের বলা যাবে।"
"ওহো! ডাবল ডেট, উমম শিশুপার্ক, ওখানে বসার মত অনেক জায়গা আছে, কিন্তু খাওয়ার মত কিছু নেই
"কে খেতে চাইছে এখন? এই সাত সকালে, ধুর। ওরা আসবে দুপুরে। আসুক তো, তারপর ওসব ভাবা যাবে, চলুন তো গল্প করি।"
"তাহলে চারুকলায় যাই চলুন, ওটা আমার সবথেকে পছন্দের জায়গা"
"যেখানে নিয়ে যাবেন, খোলা জায়গা হলেই হলো"

৩)
চারুকলা মেইন বিল্ডিঙ এর পিছনে একটা বিশাল বড় গর্ত। তার পাশে বসার মত প্রচুর জায়গা। উড ওয়ার্কশপের বারান্দায় বেঞ্চে বসলো দুজনে। সৈকত আর মিনা, নাম জানা গ্যাছে, তাহমিনার সংক্ষেপ। নিজেদের কথা, টুকরো কথা, পড়াশুনা, প্রেম, ব্রেকাপ, স্বপ্ন, ইচ্ছা, ভালো লাগা, এসব। এই মাস দুই হয় বিয়ে হয়েছে, প্রবাসী এক ছেলের সাথে, এরেঞ্জড। মিনা ব্রেকাপের পরে বিদ্ধস্ত ছিলো, যা করেছে ফ্যামিলি, চুপচাপ মেনে নিয়েছে, ভিসার জন্য এপ্লাইও করেছে। খুব শিঘ্রই বন্দীত্ব আসছে, তাই শেষবারের মত উড়তে চায়, শেষবারের মত ডানা ঝাপটাতে চায়, যা ইচ্ছা করতে চায়। সৈকতের ব্রেকাপ অনেকদিন হয়, বছর দেড়েক, এর মধ্যে আর কোন পরিস্থিতিও আসে নি, কারো সাথে ইনভলভড হবে, ইচ্ছাও জাগেনি তেমন, নতুন করে শুরু করতে চায় সবকিছু। যখন যেমন যা আসবে, তার মোকাবিলা তখন তেমনি হবে। কথায় কথায় কখন আপনি থেকে তুমি, কে জানে।

ইনসান-কলি সাথে কলির আরেক বান্ধবী সাজিয়া এলো এই আড়াইটের দিকে। এসেই ইনসানের সাজো সাজো রব, এই চলো চলো সবাই, আগে খেয়ে আসি, খুব খিদে পেয়েছে। কোথায়? কেন নিরবে। নাজিমুদ্দিন রোডের হোটেল নিরব, রেস্তোরাঁটার কোন তুলনা নেই আসলে ডেট লাঞ্চ বা গ্রুপ লাঞ্চের জন্য। ১২/১৩ রকম বাই ডিফল্ট ভর্তা আর সবজি, এর পরে যে যা খায়, বিশেষ করে মগজ ভুনা, আহা! ওখানে যেতে কোন না নেই। হাজার চেষ্টা করেও ওখানে কেউ অল্প খেতে পারে না, উপায় নেই, খাবার এতই দারুণ। খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় ৪ টে, ওদের হোস্টেলে ঢুকতে হবে ৭ টার মধ্যে, যেতেও তো এক ঘন্টা মিনিমাম, মানে হাতে আছে আর সাকুল্যে দু ঘন্টা। তাহলে বসার সহজ জায়গা হচ্ছে টিএসসি। জমিয়ে আড্ডা ৫ জনে। লেগপুলিং, বিশেষত সৈকতকে, বড্ড গোবেচারা টাইপ, ভাবা হয়েছিলো খেলানো হবে, কিন্তু খেলাই যদি না বোঝে তাকে কি করে খেলাবে। প্রেম, দুরছাই, কত আলোচনায় আড্ডা।

সাড়ে পাঁচ প্রায়, এবার উঠতে হবে, ৫ জন একটা বাজে নাম্বার, ক্যাব নিলে সামনে একজন পিছনে চার। সাজিয়ার স্বাস্থ একটু বেশিই ভালো, তাই সেই সামনে। পিছে কলিকে জড়িয়ে ধরে ইনসান, কলির পাশে মিনা, সব শেষে কোন মতে বসে থাকা সৈকত। গল্প কন্টিনিউজ। যথারীতি সৈকতের পিছে লেগে আছে। সাজিয়া জিজ্ঞেস করলো, একি সৈকত ভাই এর একি অবস্থা। সৈকত বললো, কি করা যাবে, ওপাশে দুজন কি সুন্দর জড়িয়ে থেকে জায়গা কমিয়েছে, আমার তো সে উপায় নেই। মিনা বললো, ধরে বসলেই হয়, কাঁচের পুতুল তো আর না। বেশ তো, জড়িয়ে না হলেও,  হাতটা পেছন থেকে নিয়ে,  ধরে বসলো সৈকত। ছোট ক্যাব, জায়গা তো অল্প, সৈকতের বুকের উপরে মিনা'র পিঠ, নাকের সামনে মিনার চুলের গোড়া, চুলের ঘ্রাণ, ভয়াবহ। হঠাৎই খেয়াল হলো সৈকতের, দুজনের হার্ট একই রিদমে বিট দিচ্ছে। সৈকতের শ্বাসের সাথে চুলের ঘ্রাণ, মিনার ঘাড়ে গরম শ্বাস,  ধীরে ধীরে বেড়ে চলা যৌথ কম্পাঙ্কের অনুরণন, একই তালে বাড়তে থাকা হার্টবিট। উফফফ, কি দু:সহ, সমস্থ রিয়েলিটি, সমস্ত আওয়াজ ঢাকা পড়ে গ্যাছে সারিয়েল হার্টবিটের কাছে, আর কোনকিছুর কোন অস্তিত্ব নেই, কিছুই কানে ঢুকছে না, শুধু ঐ অমোঘ যৌথ হৃদস্পন্দন, একই তালে, বেড়েই চলছে। ফাইনালি পথ ফুরোল, নেমে আর দুজন দুজনের দিকে চাইতে পারে না, পারেই না। হোস্টেলে ঢোকার সময় মিনা একটা কথাই বললো, আমাদের আর দেখা না হওয়াই ভালো।

পরিশিষ্ট:
দেখা না হওয়াই ভালো এতই সহজ? একদিন পরেই ফোন দিলো সৈকত, দেখো চলেই তো যাবে, যাবার আগে একবার দেখা হোক, ব্যস, এই একবারেই চলবে।   মিনা যেন প্রতীক্ষাতেই ছিলো, পরদিন ফের ১১ টা, টিএসসি। কি কথা তাহার সাথে? তার সাথে? মাথা থেকে ওড়না খুলতে বলা, পরিপূর্ণভাবে তাকিয়ে দেখা, অকালেই বিসর্জনের দু:খ, তবু উপহার দেয়া কাঁচা হাতের কবিতা:

দিকহারা আঁধারে দিশাহারা পাখির মত
প্রতিধ্বনির সন্ধানে কেন,
শুধুই ঘুরে ফেরো?
পথ চেনোনা? ভুলে গেছো?
নাকি ভাবনার ভিড়ে পথ হারিয়ে,
চেনা পথকেই অচেনা ভাবো?
নাকি ভয় পাও, তাই খুঁজে পাও না?
চেনা পথের অচেনা মোড়ে,
পরিচিত প্রতিধ্বনিকেই
আজ বড় অচেনা মনে হয়, তাই না?
বরং আলোর দিকে চাও, পথ দেখাবে,
বরং, বাতাসে কান পাতো, পথের নিশানা জানাবে,
বরং, হাতে হাত রাখো,
হারানো চেনা পথ, আবারো খুঁজে পাবে,
মন, তুমি ঘরে ফেরো,
এবার নতুনের সাথে মিতালি হবে

এরপরে? সে অন্য গল্প, পরে কোনদিন।

নাম-ঠিকানাবিহীন

মনে আছে? যখন তোমার সাথে আমার দেখা হলো, তুমি স্বপ্ন দেখতে
"আলো-আঁধারিতে নগ্ন তুমি শুয়ে আছো, শত শত নোংরা হাত এগিয়ে আসছে তোমার দিকে, সেই হাতগুলোর পেছনে শত শত কদর্য মুখ"

আর আমি স্বপ্ন দেখতাম,
"কোন এক বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের মাঝে একটা পাথুরে স্তম্ভ, তাতে তিনটে মুখ খোদাই করা, আমার মুখ, তিনটেই"

তাই তুমি জানতে চাইলে, আমি কি তোমায় স্বপ্ন দেখাতে পারি? বললাম, কেন নয়, হাতে হাত রাখো, তোমায় স্বপ্ন দেবো। হাতে হাত রাখলে, তোমার আঁধারের স্বপ্ন নিয়ে তোমায় আলোর স্বপ্ন দিলাম। আমার হাত তুমি আঁকড়ে ধরলে,  ধরলাম আমিও। আমরা এক হলাম। তুমি স্বপ্ন দেখতে লাগলে-
"কোন এক অচিন দেশের রাজকুমার তোমায় নিয়ে রাজহাঁসের পিঠে চড়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘের দেশে"

আমি সেই রাজকুমার হতে চাইলাম। তোমার জন্য রাজহাঁস আনতে চাইলাম। কিন্তু তুমি জানতেও চাইলে না আমি কি স্বপ্ন দেখছি। আমি স্বপ্ন দেখছি-
"এক অভিশপ্ত দেবতা, এক অভিশপ্ত রাজকন্যের হাত ধরে হাঁটছে অভিশাপের পথে"
লিখছি কবিতা-
কোন এক সময়
আমি ছিলাম তোমাদেরই একজন হয়ে
তোমরা ভালোবেসেছিলে আমায়
তারও আগে,
আরও, আরও আগে
আমি আরেকবার এসেছিলাম,
তখন তুমিও ছিলে,
আমি ভালোবেসেছিলাম তোমায়,
তাই তারা আমাদের অভিশাপ দিলো...............

মনে পড়ে? তোমায় বলেছিলাম, তুমি হাসলে, আমি নাকি ছেলেমানুষই রয়ে গেছি। আমি অবাক হলাম, মেনেও নিলাম, কিন্তু স্বপ্ন দেখা ছাড়তে পারলাম না। তুমিও আর জানতে চাইলে না, কি আমার স্বপ্ন, চাইলেনা তুমি আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যে হতে বরং অস্বীকার করলে, আমি তোমায় কখনও স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম, আমি আবারও অবাক হলাম, কিন্তু মেনে নিলাম।

আমি তখনও তোমার জন্য রাজহাঁস খুঁজে চলেছি, কিন্তু তুমি কোন এক অভিশপ্তের সাথে চলার চাইতে বরং সেই কোন এক রাজকুমার খুঁজতে চাইলে, তোমার স্বয়ংবরা। আমায় জানালে, আমি তখনও ভেবেছিলাম, অভিশাপের পথে তুমি চলবেই, হাঁটবেই হাত ধরে চিরকাল। শুধু এটুকু বুঝিনি, তোমার স্বপ্নের সেই রাজকুমার, তার রাজহাঁস নিয়ে তোমায় দেখা দিয়ে গ্যাছে।

কেন?
তুমি আর আমার প্রতীক্ষা করো না
কেন?
তোমার কথা আজ শুধুই শেষ হয়ে যায়
কেন?
তোমার ভালোবাসা আজ নির্বাসিত
কেন?
তুমি আজ ভালোবাসার ফুল পায়ে দল
কেন?
তুমি আর চাওনা হতে কল্পলোকের সঙ্গীনী
কেন?
তুমি আর আশ্রয় খোঁজনা প্রকৃতির মাঝে
কেন?
তুমি আজ শুধুই মানবী,
অভিশাপ নয়,
শুধুই আশীর্বাদ পেতে চাও

যখন জানলাম, বললাম, আমিও তোমায় রাজহাঁস এনে দেবো। বললে,  আচ্ছা, তবে জলদি আনতে হবে, হাতে সময় নেই। বললাম, আনবো, শুধু একটু অপেক্ষা করো আমার জন্য। বললে, করবো। আমি আমার স্বপ্ন ফেলে তোমার স্বপ্নের রাজহাঁস খুঁজতে ছুটলাম, সময় কম। কিন্তু হঠাৎ জানি না কি হলো, আমায় না জানিয়েই তোমার স্বপ্নের রাজকুমারের সাথে রাজহাঁসে চড়ে বসলে। হঠাৎই তোমায় বিদায় জানাতে বললে। হতবুদ্ধি আমি অভিশাপের পথ থেকে বিদায় জানালাম তোমায়।

সম্বিত ফিরলো কদিন পরে, তোমায় জোরে ডাক দিয়ে বললাম, আমার সেই সবুজ মাঠের স্বপ্ন আমায় ফিরিয়ে দাও। কিন্তু রাজহাঁসের পিঠে চেপে তুমি তখন মেঘের দেশে, অনেএএএএক দূরে। এত দূরে,  যে আমার সেই ডাক তোমার কানে পৌঁছালো না।

এখন আমি আর অভিশাপের পথে হাঁটবো না। এবার আমি শাপমোচন চাই। শাপমোচনের পথে চলার জন্য এবার আমি পঙ্খীরাজ ঘোড়া খুঁজবো

যৌনতা এবং বাঙালী - ২

আজব আমাদের সমস্ত ধর্মতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থা। পারষ্পরিক সম্পর্ক নিয়েও কেউ একমত নয়। সব না এক ঈশ্বর। সেই একক ঈশ্বর হিন্দুদের বলে দিলো, এই শোন, তুতো বোন তুতো ভাই, তোর বোন তোর ভাই, নো বিয়ে। সাউথের দ্রাবিড়রা অবশ্য এত চাপ নেয় নি। খ্রিস্টানদের বললো, ফার্স্ট কাজিন বাদে, বিয়ে, কিন্তু ফার্স্ট কাজিন নট এলাউড। মুসলিমদের বললো, আপন ভাই বোন, সৎ ভাই বোন বাদে সকল তুতো ভাই বোন ফ্রি ফর বিয়ে। বৌদ্ধদের ঈশ্বর লাগেনি, বিয়ে নিয়ে এইসব ল্যাঠা নেই ওদের, কাজিন ফাজিন আসল ফ্যাক্ট নয়। গোটা আব্রাহামিক এবং বৌদ্ধরা আর্য্য হিন্দুদের কাছে ইনসেস্টাস, কারণ এরা ভাই বোন বিয়ে করে, লাগায়। কি অদ্ভুত, পৃথিবীর প্রায় দুই তৃতীয়াংশের কাছে যেই সম্পর্ক স্বাভাবিক, বাকিদের কাছে এবোমিনেশন।


স্বীকার করি বা না করি আমরা প্রায় প্রত্যেকেই অন্তত একবার না একবার তুতো ভাই বোনের প্রতি রোমান্টিক এটাচমেন্ট ফিল করেছি। আমি মুসলিম সমাজে বড় হওয়া, নিজেদের মধ্যে রোমান্স দেখে শিখে বেড়ে উঠেছি। নিজে ফার্স্ট কাজিনের সাথে ইনভলভড ছিলাম।  আজ বন্ধুদের কাছে শুনি, শুধু যদি এই নিষেধটা না থাকতো, তবে হয়তো.......কথা ওখানেই থামে। তো জোর করে রুল তৈরী করে স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করা কেন? 

হিপোক্রেটিক লিবারালস

১)

কপালগুণে ৮০'র দশকের গোড়ায় জন্ম হওয়াতে  ব্যাপক সুবিধা হয়েছিলো, আর বছর দুই পরে হলেই একরকম মানসিক বিকাশজনিত চোদা খেয়ে যেতাম। মোটামুটি বুঝতে শেখার পরপরই বাংলাদেশে এলো ৯০, অগ্নিঝরা ৯০, রক্তক্ষরা ৯০, রোমান্টিক ৯০, স্বপ্ন দেখার ৯০। ৯০, বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাসের সেরা পলিটিকাল মুভমেন্ট। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। ১০ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা সামরিক শাসক, এরশাদের বিরুদ্ধে প্রায় সবাই শেষপর্যন্ত একজোটে। যাই হোক,  আমরা এতো তো আর বুঝি না, আমরা সেই কোন মফস্বলের বাচ্চা কাচ্চা। আমরা ঐ নাম শুনলাম, রুদ্র, তসলিমা, মিনার, হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, আরো কত, এরা রেবেল, সব ভেঙে ফেলতে হবে। পলিটিকালরা তো পলিটিকাল, এদের লড়াই ফ্রিডম অফ স্পিচ নিয়ে। আমরা বাকস্বাধীনতা শব্দটা ১০ পার হবার আগেই শিখে গেলাম। এবং তারপরে ভুলে গেলাম। আসলে কিছু লড়াই কখনো থামে না।

আমরা বাংলাদেশের লিবারাল সমাজকেও খানিকটা ঐ প্রথম চিনলাম। তারা সবকিছুতে আছে, ডুডু'তেও আছে টামাকু'তেও আছে।  তারা সবকিছু জানে, সবখানে বড় বড় কথা তারা বলে। সবাই বলে তারা নাকি হেব্বি মাল, হোয়াট দে ডু  উই কান্ট ইভেন ড্রিম অফ। তারা মদ খায়, খেয়ে বলে বেড়ায়, অন্যরা খেলে নাক শিঁটকায়  বিয়ের সময় জাত ধর্ম মানে না, কিন্তু ধর্মীয় রিচুয়াল ঠিকই চালিয়ে যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। ঐ বয়সেই জেনে গেলাম, এরা আমাদের ধারে কাছের মানুষই না এবং হিপোক্রেসি চরম মাত্রায়, সুতরাং ওরা অফ লিমিট। আলাদা করে দুটো নাম কানে এলো আহমেদ শরীফ আর হুমায়ুন আজাদ, এরা নাকি আরো খারাপ, নাস্তিক। নাস্তিক কি? জিজ্ঞেস করা যাবেনা লোকের কাছে, কারণ ফিসফিস ককরে শব্দটা বলা হয়েছে। ডিকশনারি খুলে দেখলাম, লেখা, যে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, ঐ বয়সে প্রোসেস করতে পারলাম না।

আস্তে আস্তে বড় হতে হতে পড়লাম, শুনলাম, জানলাম, স্বৈরাচার গ্যাছে, কিন্তু গনতন্ত্রে বাক স্বাধীনতা শুধুই সাময়িক। আর জানলাম, পশ্চিমবঙ্গে সব মিলে একটা লিবারাল সমাজ আছে , সেখানে বাকস্বাধীনতা আছে, তারা যা বলে করে দেখাতে পারে, কারণ কেউ ঠেকানোর নেই। পড়ে এবং বুঝে প্রেমেই পড়ে গেলাম, গোটা টিনএজ প্রেমে পড়ে থাকলাম। তারপরে ফ্যান্টাসি হয়ে গেলো, ফ্যান্টাসিই রয়ে গেলো। ২০০০ এর বইমেলা আমার এটেন্ড করা প্রথম বইমেলা, ঢুকতেই সবার আগে দেখলাম, হুমায়ুন আজাদ, গেটের পাশেই একটা বড় প্যাভিলিয়নের সামনে বসে কথা বলছেন। লোকে জটলা ধরে শুনছে, মোহাম্মদ কি ভুলভাল লোক ছিলো। ওরে শালা এ কি অবস্থা, সব তো ঠিকই আছে, ৯০ তে যেমন ছিলো। যা খুশি তাই বলা যায়, পুরো বাক স্বাধীনতা। ৯০ এর সেই দূর্দান্ত রোমান্টিসিজম তাহলে বৃথা যায় নি? এই তো চেয়েছিলো সবাই, তাই না? কিন্তু হুমায়ন আজাদ একজনই হয়,  প্রোসেস করার সামর্থ্য তখন ছিলো না। ইনটেলেকচুয়াল লেভেলে তখনো লিবারালদেরই রাজ চলছে, তারা ধর্মেও আছে, জিরাফেও আছে, এত কিছু বোঝার আগেই সেনারিও থেকে আউট।

২)

সেনারিওতে ফিরলাম ফের ২০১০ এ। রেভলুশন ঘটে গ্যাছে ততদিনে। সেই ২০০৪ এ যেদিন হুমায়ুন আজাদ, সেই বইমেলা থেকে বের হবার পর কোপ খেয়েছেন, সবার সামনে বুক ফুলিয়ে কথা বলার  বাক স্বাধীনতা সেদিনেই শেষ, কমপ্লিটলি।   কিন্তু তাতে কি এখন অনলাইন আছে, কোন বালের লিভারাল কি বললো টাইম আছে নাকি ভাবার। সবাই বলবে কথা, প্রয়োজনে নিজের নাম ঢেকে রেখে কিন্তু বলবে। চিনলাম ব্লগার, মুক্তমনা, নাস্তিক,  মডারেশন,  নো মডারেশন। বাক স্বাধীনতার জন্য লড়াই, আর অনলাইনে ইচ্ছামত বলতে পারা, মুগ্ধ থেকে মুগ্ধ হতে লাগলাম, এই আমার কাছাকাছি, কিছু বড়, কিছু ছোট, অসংখ্য ছেলেমেয়েদের কারবার দেখে। ওফফফ, কি করছে সব। কত কি জানে এরা, কত বৈচিত্র। আমি সবার প্রেমে পড়ে গেলাম। ফাঁকে ফোঁকড়ে টুকটাক কমেন্ট করে পালটা কমেন্ট পেলে ঐ শালা কি ইলেটেড। একবার মনে হলো, ঐ বাংলায় ব্লগ নেই? থাকতেই হবে, খুঁজতে খুঁজতে পেলাম গুরুচন্ডা৯ ব্লগ সাইট। ওরে, ওরে, ওরে কি ইন্টেলেকচুয়ালিটি, আমার দাঁতে অত ধার ছিলো না, ফুটলো না, লেজ গুটিয়ে কেটে পড়লাম।

নিজেই কখন যে ফ্রিডম অফ স্পিচ, ফ্রিডম অফ থট আর পার্সোনাল চয়েস নিয়ে অনলাইন আন্দোলনে জড়িয়ে গেলাম নিজেও জানি না। মডারেটেড ব্লগে লিখবো না, নিজের নামে লিখবো, কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না ,  ছেলেমানুষি। বিরাট বড় বড় ব্লগাররা, আন্দোলন বন্ধন করে পুটকি জ্যাম করা ব্লগাররা, একদম চুড়ান্ত হিপোক্রেসি দেখিয়ে দিলো, মুখ খুলে কথা বলা ব্লগারদের ব্যান, কেন ব্যান, না এলিট ব্লগারদের সাথে হুক্কাহুয়া করে নি, মতে মেলেনি তাই ব্যান।  আরে এক বছরে সব থেকে বেশি কোয়ালিটি পোস্ট দেয়া মেম্বারকে, মতের অমিলে ব্যান,  কি বাল। ব্লগে ব্লগার চালায় না, ব্লগাররা ব্লগ চালায়, ব্লগার না থাকলে নামে কখনো ব্লগ চলে না, বুঝলো না। ব্লগের খোলস পড়ে রইলো, ব্লগারেরা ব্লগ ছেড়ে দিলো। ছেলেমানুষি ছেলেমানুষি, চামড়া এত পাতলা হলে হয় না।  যাই হোক, এখন ব্লগবিপ্লবের যুগ শেষ, বিপ্লব এখন ফেসবুকে, সবাই সেখানে, কিন্তু নিজের নামে তো চোদা খেতে হবে, তাই নিক চাই, নিক।

বেশ তো চলছিলো, শুধু তর্ক আর বিতর্ক, কাঁহাতক সম্ভব? এক জিনিসই বা কদিন ভালো লাগে। ভাবলাম, দেখিভনা লাক ট্রাই করে, ঐ যে গুরুচন্ডা৯ ফেসবুক গ্রুপ, দেখি না এবার, আমার সেইইই ফ্যান্টাসির লিবারালস, যাদের ফ্রিডম অফ স্পিচ আছে, চর্চা করে, হয়ার এনিথিং ক্যান বি সেইড, হার্ড, ডিবেটেড, আর মুক্তচিন্তার চর্চা তো বহুদিনের, ওহহহ, ফাইনালি। খুব অল্পদিনেই বন্ধু পেলাম, খুউউউব ভালো কিছু বন্ধু, খুউউউউউব ভালো বন্ধু। সবার আন্তরিকতায় ভুলেই গেলাম, আমাদের নিজেদের প্রথম অনলাইন রুল, অনলাইনকে কখনো পার্সোনালি নিতে নেই। কেন ভুলবো না, সবাই কি মনখোলা, কোন হিপোক্রেসি দেখি না সচরাচর, আর সব থেকে বড় কথা আমি অনলাইন লাইফে প্রথমবারের মত পার্টনার পেলাম। থ্যাঙ্ক ইউ পার্টনার, @Sanchari Sengupta, তুই অনলাইনে না থাকলে আমার অনেক কিছুই বলা হতো না, লেখা হতো না।

কিন্তু, হিপোক্রেসি এক অদ্ভুত জিনিস, ও থাকতেই হবে। এই যে বিরাট লিবারাল, এন্টি এসট্যাবলিশমেন্টে, পার্সোনাল চয়েসের ধ্বজ্বাধারীরা, নিজেরাও যে বিতর্কে পেরে উঠতে না পারলেই খিল্লি, তাতেও এঁটে উঠতে না পারলে ব্যান করেন, দেখে না হেসে থাকতে পারলাম না। তাঁরা মহামানব, মহাজ্ঞানী, মহাজন,  নিজেরা যা খুশি করবেন, অন্যে পারবে না,। ফ্রিডম  আর চয়েস শুধু তাঁদের জন্য, সাবস্ট্যান্ডার্ডদের জন্য নয়। তারা বন্ধুত্ব করতে পারে না, বন্ধু তাঁদের থাকে। তাঁরা ছেলেতে মেয়েতে বন্ধু, আর তাদের থাকে লাগানোর ধান্দা। তাঁরা লেখেন মেসেজ প্রদানকারী ইনটেলেকচুয়াল প্রভুখন্ড, তারা লেখে চটুল হিটসিকিং, সিমপ্যাথি সিকিং বালছাল। তাঁরা  পার্সোনাল ম্যাটারকে অনলাইনে নিয়ে আসেন। তাঁরা কিছু বললে হয় খিল্লি, আর তাদের কথা পিএ। কে কোথায় প্রেম করছে কিনা, সেটা পুলিসিং করে মেম্বার ধরে ব্যান করে দেন। কি যেন সেই ভ্যালেন্টাইনস ডে তে চাড্ডিরা বললো, প্রেম করতে দেখলে বিয়ে দিয়ে দেবে, খ্যাকস। এন্ড দে আর দা গ্রেট ইন্টেলেকচুয়াল লিবারালস। ২৪ বছর পরে এসে ফাইনালি বুঝলাম, যাহা হিপোক্রেট তাহারই অপরনাম লিবারালস, লাউ মানেই কদু, ২+২=৪।

নৈর্ব্যক্ত অভিব্যক্তি - ১

নতুন শুরু সবসময়েই বড্ড যন্ত্রণাদায়ক, সে যেই কাজের শুরুই হোক না কেন, প্রেম, লেখা, পরিচিতি, ক্যারিয়ার, যে কোন কিছু। তাও আবার যদি তা হয় সোনালী ১০/১২ বছর নষ্ট করে নতুন শুরু, বা ৬ মাসের অনেক যত্নে গড়া পান্ডুলিপি ফেলে দিয়ে নতুন পান্ডুলিপি লেখা। ওয়েল সবাই তো আর রা নয়, যে প্রতি ভোরে নতুন শক্তিতে যাত্রা শুরু করবে।

আসলে জীবনটা যেন Chaos, গ্রীক ক্রিয়েশন মিথের সর্বপ্রথম Celestial being, অস্তিত্বধারী শুন্যতা, যেখান থেকে জন্ম নেবে গাইয়া, টারটারাস আর এরোস। জীবনের গতিপথও তো তেমনই, কদিন পরেই সবকিছু ভয়েড, ক্যাওস, তা থেকে জন্ম নেয়া নতুন শুরু, নতুন ভুল, নতুন ভালোবাসা।

তারপর কম সময়ে বেশি কাজের মত্ততায় বারে বারে জন্ম দেয়া সাইক্লপ্স, টাইটানস, জায়ান্টস সৃষ্টি এবং ভুল হাতে হাত ধরে, হয়তো আরো কিছু ভুল। কিন্তু ভুলগুলোই তো একমাত্র কর্ম নয় জীবনের। তাইতো, নিজের অজান্তেই হয়তো সৃষ্টি হয় এফ্রোদিতি বা মিউজ। অন্যদের মুগ্ধতা কাড়ে, আর নিজেকে মনে করিয়ে দেয়, হয়তো ভুলগুলো না থাকলে এমন আরো কিছু হতো, বাকিটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকতো না।
নিজেকে কখনো কখনো কখনো মনে হয় যেন ভুলে যাওয়া টেল মেগিডো শহর, ৭০০০ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ থেকেও হঠাৎ করেই গুরুত্বহীন। স্তরে স্তরে সাজানো অতীত, প্রতিটা স্তর একেকটা টাইমলাইন। অজস্র যুদ্ধ সহ্য করেও হঠাৎই নেই হয়ে যাওয়া। তারপরে কেটে যাওয়া আড়াই হাজার বছর, ফের চোখের সামনে আসা, নিজেকে মেলে ধরা সবার সামনে, একটা একটা করে স্তর উন্মোচন।

আমি হতে পারতাম রা এর মত প্রতিদিন পূর্ণদ্যোমে নবজন্ম, হতে পারতাম থথ দা ব্যালান্সিং ফ্যাক্টর, হোরাস দা রুলার, কিন্তু না সব সময়েই আমি যেন আমন দা হিডেন ওয়ান। কখনো নিজেকে নিজের থেকেই চাপিয়ে রাখা, অন্যদের থেকে গোপন রাখা, ধোঁয়াসা সৃষ্টি, আড়ালে থাকা, অন্ধকারের মানুষ, কাদা মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা, সব সময়, প্রকাশ্য আস্ফলন কেন যেন কখনোই আমার জন্য নয়। মাঝে মাঝে যেন নিজেই নিজেকে ভুলে যাওয়া, হু এম আই?

আসলেই তো,  আমি কে? কেমন আমি? যেমন ছিলাম তেমনটাই কি আসল আমি? নাকি নিজেকে সাজানো, ঘষে, পালিশ করে তৈরী করা এই আমি টা? নাকি মাঝে মাঝেই ফুঁসে ওঠা উশৃঙখল ছন্নছাড়া আমিটাই সেই আমি? জানি না, জানি না, কিচ্ছু জানি না। শুধু এটুকু জানি জীবনে শুধু চাই Ankh, জীবনের চাবি। খুলে যাক নিজের কাছেই  অজানা  জীবনের অজানা অচেনা দরজা, উন্মুক্ত উন্মোচিত হোক জীবনের তরে জীবন।

যাপিত জীবন - ৭

২০০৬ সাল, কুষ্টিয়াতে আছি প্রায় ৩ বছর হতে চললো, কেন কে জানে, লালন জন্মোৎসব তো দূর লালনের আখড়াতেই যাওয়া হয়ে ওঠে নি। সেবার ফাল্গুনে আর সহ্য হলো না ব্যাপারটা, এবার লালন উৎসবে যাবোই যাবো, যেতেই হবে। আমার চুল কাটে রেগুলার যে নাপিত, পাঁড় লালনভক্ত। তাকে বলতে সে সোৎসাহে একটা রিকশা ঠিক করে দিলো, ভাড়াও দিয়ে দিলো, আমি শত  না না করা স্বত্বেও।

বেশি দূরে না, এই এক দিক দিয়ে গেলে ৩ কিলো, আরেক দিক থেকে দেড় কিলো, কুষ্টিয়ার প্রাচীন মোহিনি মিল এরিয়ার গা ঘেঁসে, ছেউড়িয়া গ্রাম, কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে।  এখানেই সেই কোনকালে সদলেবলে আস্তানা গেঁড়েছিলেন লালন সাঁইজি, আজীবন প্রচার করেছেন মানবধর্ম। সরকারী উদ্যোগে তাঁর কবরের উপরে মেমোরিয়াল তৈরী হয়েছে, কিন্তু ডিজাইন দেখলে মনে হয়ে এ বোধহয় কোন পীরের মাজার, গম্বুজ মিনার সহ। যেই লালন   মানুষ ভজনার কথা,  নিজেকে রিয়ালাইজ করার কথা বলে গেলেন আজীবন, ধর্মকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, আজ তাঁর শেষ বিশ্রামস্থল দেখলে মনে হবে খাঁটি মুসলিম সুফী ছিলেন।

তো যাই হোক, গিয়ে পৌঁছুলাম সন্ধ্যের একটু আগে, লালন মেলায়, কালীগঙ্গার পাড়ে বিশাল মাঠের পুরোটা জুড়ে। আমি যেদিক দিয়ে ঢুকলাম, সেটা পেছনদিক, সামনে শত শত স্টল, কত রকমের খাবার, কত কিছুর দোকান, নাগরদোলা, ইত্যাদি ইত্যাদি। ঐ সামনে দেখা যাচ্ছে স্টেজ যেখানে প্রোগ্রাম চলছে। আগে পেটপুজো, খাবারের স্টলগুলো দেখেই খিদে পেয়ে গেলো, ভাবছি আগে খাবো, না পরে খাবো। ইয়ে মানে এটা তো হচ্ছে লালন জন্মোৎসব, মানে বাউলদের উৎসব, মানে গাঁজা,  তো আপাতত বাদাম চিবোই, পরে হবে।

পচ্চন্ড ভিড়, পচ্চন্ড। ভাবলাম এভাবে কিছুই তাল পাবো না, বরং স্টেজের কাছে যাই সেখান থেকে তাল ঠিক করে নিই কোনদিকে কি। আস্তে আস্তে গুটি গুটি পায়ে স্টেজের কাছে গিয়ে যা দেখলাম তা আমি সারাজীবনে ভুলবো না। স্টেজের উপরে তখন গন্যমান্য ব্যক্তিরা বসে, বক্তব্যবাজী চলছে।  স্টেজের সামনে ৮/১০ সারি চেয়ার।  তারপরে ১০ টা রো বাউলদের, কম করেও ৬০/৭০ টা গ্রুপ, আর গোটা সব কিছু ঘিরে বড় বড় তাঁবু স্পেশাল বাউলদের। এটা আসলে বিষয় না, বিষয় হচ্ছে, এই ৬০/৭০ টা গ্রুপের প্রতিটাতেই হয় গাঁজা কাটছে, নয় ডলছে, নয় কল্কেতে পুরছে, নয় টানছে। এভারেজে অন্তত ১০/১৫ টা কল্কে তো অলটাইম চলছেই। আর ঐ চেয়ার আর বাউলদের মাঝে অন্তত ২৫/৩০ জন বিভিন্ন কোয়ালিটির গাঁজা নিয়ে বসে আছে, কারো কারো কাছে ২/৩ পদের মাল।

আমি দেখে শুনে কমপ্লিট চোদনা হয়ে গেলাম। ওরে শালা, এ আমি কোথায় এলাম। কি কারবার রে ভাই, কি থুয়ে কি করবো, গাঁজা কিনবো, না কোথাও বসে গিয়ে খাবো। ভাবলাম আগে বাল গাঁজাই কিনবো, এতদিন জানতাম না কোথায় ভালো মাল পাওয়া যায় কুষ্টিয়ায়। বাঁড়া কাঙাল দেখেছে শাকের খেত, আমি ৭/৮ রকমের কিনলাম ২০/২৫ টাকা করে। কে জানে বাল কোনটা বেশি ভালো, কোনটা কম ভালো, কেরোসিন ল্যাম্পের আলোয় কি করে বুঝবো। রেন্ডম বাছাই, বিচি কম দেখে। রাত বাড়ছে, এখন গাঁজা খেতে হবে, এবং কেনা মালে আমি সন্তুষ্ট নই, খুব ভালো মাল চাই।

স্টেজের সামনের ঔ বাউলরা অনেক আলোর মধ্যে বসে, ওদের মধ্যে গিয়ে বসা চাপ। বাইরে দু চক্কর ঘুরে একটা সাধু টাইপ বাউল পছন্দ হলো এক কোনে আলোর দিকে পেছন ফিরে বসা, সামনে ২/৩ জন বসা আমিও বসে পড়লাম, একজন সামনে গাঁজা কাটছে। ঐ আমি কে , কোথায় থাকি, কি করি'র ফাঁকে আমার দু:খ, ভালো গাঁজা চাই, কোথায় পাই। পাশ থেকে একজন জিজ্ঞেস করলো,  কতটুকু, কি জবাব হয় রে ভাই, আমতা আমতা করে বললাম, এই ৫০ টাকার। এর মধ্যে কল্কে রেডি, মুখাগ্নি। আহা! আহা! কি মাল এক দমেই সব চক্কর দিয়ে উঠলো, ইন্সট্যান্ট চোখমুখ হাসিহাসি হয়ে গেলো আমার। কল্কেটা ছোট ছিলো, সাধু সহ আমরা ৫ জন ছিলাম, ৩/৪ টানের বেশি হয় নি, দরকারও ছিলো না, আমি ফুল হাই, হালকা, ফুররুরে। জিজ্ঞেস করলো এমন মাল হলে হয়? হয় মানে? ব্যাপকেস্ট হয়। কতটুকু দিলো, বোধহয় ৫/৬ স্টিকের মত মাল। আমি বিগলিত

উঠে যখন আবার নামলাম তখন আমি এতই হালকা, কালিগঙ্গার উপর থেকে আসা বসন্তের এলোমেলো হাওয়া আমাকে দেখি একেক দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, বেলুনের মত, কি চাপ রে ভাই, খেতে হবে যদি তাতে একটু ভারী হয় শরীর, মাটিতে থাকতে পারি। ওদিকে যাওয়ার পথে দেখি পাশেই এক ডালা ভর্তি কল্কে নিয়ে বসে আছে। তিন সাইজের কল্কে বোধহয় ছিলো, মনে নেই, সেখান থেকে দুটো কলকে কিনলাম।  সামনে দিয়ে ২৫০ গুড়ের জিলাপি আর গোটা ছয় চপ চালিয়ে দিয়ে মনে হলো না এবার একটু ঠিক আছে,। গজা, খাগড়াই, ছাঁচ, এরকম আরো কি কি যেন কিনে সেদিনের মত বাড়ির পথ ধরলাম।


আয়রনি হচ্ছে, সে বছরের শেষ দিকে এদেশের পলিটিকাল হেজিমনি হলো, আর্মি ব্যাকড সরকার এলো, বাউলিদের এই ওপেন উৎসব চুদে দিলো। ঐ এলাকায় রেন্ডম গাঁজা খাওয়া ফের চালু হতেই প্রায় ৬/৭ বছর। এখন বাউলদের খোলা অডিটোরিয়ামে রাখা হয়, গাঁজা তো তারা খাবেই, কিন্তু সেই গাঁজা উৎসব সে বছরই শেষ। আমি প্রায় ৭/৮ মাস ঐ ছেউড়িয়া গ্রাম থেকে মাল কিনেছি। ওহহহহহ কি মাল বেচতো রওশন। আহা!  আহা! মাইসোরের মালও অত ব্যাপক নয়। ঐ উৎসব ওয়াজ অসাম, অসাম, আজীবন মনে থাকবে আমার, আজীবন।

ধর্মের বিবর্তন - ২

মোটামুটি দেখা যায়, নিওলিথিক যুগের শুরু থেকে মানে ১০০০০ বিসি, স্টোন এজ শেষ হচ্ছে, কৃষি শুরু হবে হবে করছে, সামনে ধাতব যুগ, মানুষের খাবার নিয়ে চিন্তা কমছে, অলস সময় বাড়ছে, ঈশ্বর ফ্যাক্ট হয়ে উঠতে শুরু করে, কিন্তু যার যার ঈশ্বর তারতার, ঈশ্বরের মানে স্রষ্টা পালনকর্তা তখনো হয় নি, অনেকটা এমিবা লেভেলের ঈশ্বর, কালেকটিভ। আমরা Göbekli Tepe (১০০০০বিসি - ৮০০০ বিসি) কে উদাহরণ ধরে দেখতে পারি, এটা এ পর্যন্ত খুঁড়ে বের করা সব থেকে প্রাচীন উপাসনালয়, তুরস্কে, মানে এখানে আশেপাশের ট্রাইব এক হতো কালেকটিভ ঈশ্বরদের এক সাথে দেখা করাতে, আরবরা এই সেদিনও যা করতো, খুব সম্ভব ঐ ফসল তোলার পরে। তারেক অনুর অসামান্য একটা লেখা, এই জায়গাটা নিয়ে http://www.sachalayatan.com/tareqanu/43813

ঈশ্বরেরা হালকা পাতলা কাজ কর্ম নিয়ে দিব্যি ছিলো বহু  হাজার বছর, প্রায় ৭০০০ বছর। মুশকিল হলো, ধাতু আবিষ্কারের পর থেকে, বিশেষ করে কপার আবিষ্কারের পরে ব্রোঞ্জ বানাতে শেখার পরে আর সোনা মূল্যবান বিবেচিত হবার পরে, এই ব্রোঞ্জের প্রাচুর্যের উপরে ভিত্তি করে শক্তিশালী মিলিটারি রাষ্ট্র গড়ে উঠতে থাকলো, বিশেষ করে ওদিকে নাইল আর ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস অববাহিকায় ৩৫০০ বিসি তে, আর ঈশ্বরেরা কিংডম ধরণের হয়ে গেল। সিন্ধু উপত্যাকায় ব্রোঞ্জ যুগ কাছাকাছি সময়ে কিন্ত, এখানে কেন জানি ঈশ্বরের মিলিটারি পাওয়ার হতে একটু সময় নিলো।  পরে আসছি।

এখান থেকেই প্রথম অরগানাইজড প্যাগান ঈশ্বরদের যাত্রা শুরু, কিন্তু তবু ঈশ্বরেরা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে ব্যস্ত থাকে। মিশরে রা ব্যস্ত থাকে এপোফিসকে নিয়ে, সেট ওসিরিসকে ৩৬ টুকরো করে ছড়িয়ে দেয়, ঐশ্বরিক পোন্দাপুন্দি, মানুষের উপরে নজর রাখার জন্য, ঈশ্বরের অবতার ফারাও, আর ম্যাজিশিয়ান, মানে মিশরিয় মোল্লা, মেসোপটেমিয়ায় তখন প্যারালাল দুটো রাষ্ট্র এসিরিয়া আর ব্যাবিলন, কাছাকাছি ধরণের ঈশ্বরসিস্টেম। সিন্ধু তখনো কালেকটিভ ঈশ্বর (এই ব্যাপারে কেউ একজন বললে ভালো হয়)।

মোটামুটি ব্রোঞ্জ যুগের মাঝামাঝি গিয়ে ২০০০ বিসি থেকে ঐশ্বরিক ওয়েভ চেঞ্জ হতে শুরু করলো, একদিকে বৈদিক ঈশ্বর, যারা যখন তখন মানুষের কাজে দখল দেয়, ১৪/১৫০০ বিসি'র দিকে ইসরাইলি ট্রাইব জেরুজালেম  এলাকা দখল করে বাণিজ্যপথের মাঝখানে বসে শুরু করলো একেশ্বর সে ভয়াবহ পরাক্রমশালী ঈশ্বর, বাইরের লোকের জন্য না, সুপার এলিট ঈশ্বর। মিশর মেডিটেরিয়ানের দিকে ঐশ্বরিক আক্রমণ করতে গিয়ে, স্বাধীনচেতা গ্রীকদের হাতে নাস্তানাবুদ হচ্ছে, কিন্তু বৈদিক ঈশ্বর পারস্য ইজিয়ান হয়ে গ্রীসে পৌঁছে গেলো, আর গ্রীস পৌঁছালো মিশরে,  দুইয়ের কম্বিনেশনে ঈশ্বরেরা নিজেদের মধ্যে ইয়ে মারামারিতেও ব্যস্ত থাকে, আবার মানুষের সাথে হেব্বি খাতির, ডেমি গড ফড পয়দা হয়। প্যাগান ঈশ্বরের সেকেন্ড ফেজ আর মনোথেইস্টিক ঈশ্বরের ফার্স্ট ফেজ (২০০০ বিসি - ৫০০ বিসি)

প্যারালাল এক ধাঁচের ঈশ্বর গড়ে উঠতে থাকে ঈশ্বরের জন্মস্থান, এশিয়া মাইনরে, Zoroastrian সাদা ঈশ্বর, কালো এন্টি ঈশ্বর