১)
সৈকত সচরাচর মিসড কল ব্যাক করে না। সেবার মিসড কল ব্যাক করে ব্লাইন্ড ডেট ফেস করার পরে তো আরো না। যা তা লেভেলের ব্লাইন্ড ছিলো ঐ ডেটটা। কিন্তু ১০/১২ টা কল, ১৫ মিনিটে, কি ভেবে কল করেই বসলো। যাহ শালা এটাও মেয়ে।
"হ্যালো, এই নাম্বার থেকে কেউ একজনন কল করেছিলেন। কে, জানতে পারি কি?"
"হ্যাঁ, পারেন, যার সাথে কথা বলছেন সেই কল করেছিলো"
"ওহ, আমি কি আপনাকে চিনি?"
"না, প্রশ্নই ওঠে না। আমি চিনি"
"তাই নাকি? নিয়ার ইমপসিবল ব্যাপার। কিভাবে চেনেন?"
"জানবেন আস্তে আস্তে"
"ওহ, মানে আপনার সাথে আমার আরো কথা হবে?"
"অবশ্যই, সে জন্যেই তো কল করলাম"
"আমার সম্পর্কে কি কি জানেন?"
"আপনার ফ্যামিলি, পড়াশুনা, আচ্ছা এমবিএটা কি একবারে করে আসা যেত না বাইরে থেকে?"
"ওরেএ আপনি এটাও জানেন? আর কি জানেন?"
"জানবেন জানবেন, দেখা হলেই জানবেন"
"ওহ, আপনার সাথে দেখাও হবে? কবে?"
"এই তো আপনি থার্টি ফার্স্টে ঢাকায় আসছেন, ১ তারিখেই হতে পারে"
"ও আচ্ছা, এটা জানতেও বাকি নেই। বেশ। আপনি কোথায় থাকেন?"
"এয়ারপোর্টের দক্ষিনে"
"উত্তরা?"
"ওটা কি দক্ষিন?"
"তাই তো, বনানী?"
"নাহ অতও না, এয়ারপোর্টের আরেকটু কাছে"
"আমি অতশত চিনি না, এই ১ তারিখে দেখা হবে তো আপনার সাথে? কনফার্ম? সামনাসামনি জেনে নেবো"
"এই তো পথে এসেছেন, এখন রাখছি পরে কথা হবে, টা টা"
কেটে দিলো। সৈকত তখন মাথার মধ্যে হিসেব কষছে সম্ভাব্য কে হতে পারে। লাস্ট কয়েকক মাসে মেয়ে বলতে কথা হয়েছে শুধু কলি'র সাথে, তাও সে তো হচ্ছে, ইনসান ভাই এর জিএফ, আর হোস্টেল বনানী, এটা কে? এত ইনফো কলি জানতে পারে নিশ্চয় ওর পরিচিত কেউই হবে। কেসটা দেখতে হচ্ছে। এই তো আজ ২৮, ৩১ সকালের বাসেই ঢাক। দেখা যাক, জল কতদূর গড়ায়।
২)
ঢাকায় থার্টি ফার্স্ট মানে সাধারণ তরুণের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কিন্তু ২০০০ থেকে দুপুরের পরেই ক্যাম্পাসের সব প্রবেশমুখ সিল করে দেয়া হয়, শুধু আইডি দেখে ঢুকতে দেয়। তবে ওসব কোন ব্যাপার না, অন্তত ৯ টা জায়গা আছে যেখান থেকে ক্যাম্পাসে ঢোকা যায়। যেমন, স্টাফ কলোনির বাউন্ডারি টপকে জহুরুল হক হলের ঝোপঝাড় ভেঙে। এক বোতল মাল ছয়জনে প্রায় শেষ করে সৈকত ঐ পথেই এ রাতে টিএসসি, ফিরে গিয়ে আরেক বোতল, হেব্বি ফুর্তি মনে। স্লোগান চলছে, "রোকেয়া হলে তালা কেন, ভিসি স্যার জবাব চাই"। টিএসসি'র, পাশেই মেয়েদের হল, খুব স্বাভাবিক ওদের বেরোতে দেবে না, এই রাতে, কিন্তু স্লোগান দিতে তো বাধা নেই। ঐ হৈ হট্টগোলের মধ্যেই অজানাকে ফোন, আগামীকাল ডেট কনফার্ম। গাঁজা খেতে খেতে, ট্রেডমার্ক গানে বাড়ির পথ, আরেকটা বোতল, আড্ডা, মনে উত্তেজনা, কালই তবে, দেখি তাহলে।
ঠিক ১১টায় টাইম, শাহবাগ, মিউজিয়াম গেট এ। কি করে চেনা যাবে? কেন? ফোনে কল করে। সৈকত আগেই দেখা দিতে রাজি নয়, শালা ব্লাইন্ড মানে আবারও ফুল ব্লাইন্ড হতেই পারে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর, ঐ মেয়েটা কি? নাহ, চলে গেলো, এটাও না, আরে সাড়ে এগারো, আর কখন? এই যে মেয়েটা নামলো, ছিপছিপে লম্বা, টকটকে লাল জামা, চোখে সানগ্লাস, মাথায় প্যাঁচানো ওড়না, দেখতেও খারাপ না, এটা নয়তো? আরে মিউজিয়ামের দিকেই যাচ্ছে যে, এটাই হবে, কপালটা ভালোই বোধহয়। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সৈকত, মোবাইলের বাটন টিপতে টিপতে, মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ালো, চোখাচোখি, কল দেয়ার আর প্রয়োজন হলো না, যা বোঝার বোঝা শেষ।
"আচ্ছা আচ্ছা, এই তাহলে আপনি, বেশ তো, দিব্যি দেখতে"
"তাতে কি? আপনার কোন লাভ নেই, সাময়িক গল্প ছাড়া, আমি রেজিস্টার্ড এবং সিলড"
"তার মানে আপনি কলির সেই ফ্রেন্ড, যার সদ্য বিয়ে হয়েছে?"
"ধুর, বলে দিয়েছে, এটা ঠিক না, যা বলার আমি বলতে চেয়েছিলাম।"
"না না, বলেনি কিছুই, আমরা ডিডাক্ট করেছি। আরে বাবা, বাচ্চা তো আর নই। যাই হোক চলুন বসি কোথাও, কোথায়? আকাশের নিচে? না ছাদের নিচে?"
"নাহ, চলুন খোলা কোথাও বসি, কলিরাও আসবে, এমন কোথাও বসি, যেখানে সহজে ওদের বলা যাবে।"
"ওহো! ডাবল ডেট, উমম শিশুপার্ক, ওখানে বসার মত অনেক জায়গা আছে, কিন্তু খাওয়ার মত কিছু নেই
"কে খেতে চাইছে এখন? এই সাত সকালে, ধুর। ওরা আসবে দুপুরে। আসুক তো, তারপর ওসব ভাবা যাবে, চলুন তো গল্প করি।"
"তাহলে চারুকলায় যাই চলুন, ওটা আমার সবথেকে পছন্দের জায়গা"
"যেখানে নিয়ে যাবেন, খোলা জায়গা হলেই হলো"
৩)
চারুকলা মেইন বিল্ডিঙ এর পিছনে একটা বিশাল বড় গর্ত। তার পাশে বসার মত প্রচুর জায়গা। উড ওয়ার্কশপের বারান্দায় বেঞ্চে বসলো দুজনে। সৈকত আর মিনা, নাম জানা গ্যাছে, তাহমিনার সংক্ষেপ। নিজেদের কথা, টুকরো কথা, পড়াশুনা, প্রেম, ব্রেকাপ, স্বপ্ন, ইচ্ছা, ভালো লাগা, এসব। এই মাস দুই হয় বিয়ে হয়েছে, প্রবাসী এক ছেলের সাথে, এরেঞ্জড। মিনা ব্রেকাপের পরে বিদ্ধস্ত ছিলো, যা করেছে ফ্যামিলি, চুপচাপ মেনে নিয়েছে, ভিসার জন্য এপ্লাইও করেছে। খুব শিঘ্রই বন্দীত্ব আসছে, তাই শেষবারের মত উড়তে চায়, শেষবারের মত ডানা ঝাপটাতে চায়, যা ইচ্ছা করতে চায়। সৈকতের ব্রেকাপ অনেকদিন হয়, বছর দেড়েক, এর মধ্যে আর কোন পরিস্থিতিও আসে নি, কারো সাথে ইনভলভড হবে, ইচ্ছাও জাগেনি তেমন, নতুন করে শুরু করতে চায় সবকিছু। যখন যেমন যা আসবে, তার মোকাবিলা তখন তেমনি হবে। কথায় কথায় কখন আপনি থেকে তুমি, কে জানে।
ইনসান-কলি সাথে কলির আরেক বান্ধবী সাজিয়া এলো এই আড়াইটের দিকে। এসেই ইনসানের সাজো সাজো রব, এই চলো চলো সবাই, আগে খেয়ে আসি, খুব খিদে পেয়েছে। কোথায়? কেন নিরবে। নাজিমুদ্দিন রোডের হোটেল নিরব, রেস্তোরাঁটার কোন তুলনা নেই আসলে ডেট লাঞ্চ বা গ্রুপ লাঞ্চের জন্য। ১২/১৩ রকম বাই ডিফল্ট ভর্তা আর সবজি, এর পরে যে যা খায়, বিশেষ করে মগজ ভুনা, আহা! ওখানে যেতে কোন না নেই। হাজার চেষ্টা করেও ওখানে কেউ অল্প খেতে পারে না, উপায় নেই, খাবার এতই দারুণ। খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় ৪ টে, ওদের হোস্টেলে ঢুকতে হবে ৭ টার মধ্যে, যেতেও তো এক ঘন্টা মিনিমাম, মানে হাতে আছে আর সাকুল্যে দু ঘন্টা। তাহলে বসার সহজ জায়গা হচ্ছে টিএসসি। জমিয়ে আড্ডা ৫ জনে। লেগপুলিং, বিশেষত সৈকতকে, বড্ড গোবেচারা টাইপ, ভাবা হয়েছিলো খেলানো হবে, কিন্তু খেলাই যদি না বোঝে তাকে কি করে খেলাবে। প্রেম, দুরছাই, কত আলোচনায় আড্ডা।
সাড়ে পাঁচ প্রায়, এবার উঠতে হবে, ৫ জন একটা বাজে নাম্বার, ক্যাব নিলে সামনে একজন পিছনে চার। সাজিয়ার স্বাস্থ একটু বেশিই ভালো, তাই সেই সামনে। পিছে কলিকে জড়িয়ে ধরে ইনসান, কলির পাশে মিনা, সব শেষে কোন মতে বসে থাকা সৈকত। গল্প কন্টিনিউজ। যথারীতি সৈকতের পিছে লেগে আছে। সাজিয়া জিজ্ঞেস করলো, একি সৈকত ভাই এর একি অবস্থা। সৈকত বললো, কি করা যাবে, ওপাশে দুজন কি সুন্দর জড়িয়ে থেকে জায়গা কমিয়েছে, আমার তো সে উপায় নেই। মিনা বললো, ধরে বসলেই হয়, কাঁচের পুতুল তো আর না। বেশ তো, জড়িয়ে না হলেও, হাতটা পেছন থেকে নিয়ে, ধরে বসলো সৈকত। ছোট ক্যাব, জায়গা তো অল্প, সৈকতের বুকের উপরে মিনা'র পিঠ, নাকের সামনে মিনার চুলের গোড়া, চুলের ঘ্রাণ, ভয়াবহ। হঠাৎই খেয়াল হলো সৈকতের, দুজনের হার্ট একই রিদমে বিট দিচ্ছে। সৈকতের শ্বাসের সাথে চুলের ঘ্রাণ, মিনার ঘাড়ে গরম শ্বাস, ধীরে ধীরে বেড়ে চলা যৌথ কম্পাঙ্কের অনুরণন, একই তালে বাড়তে থাকা হার্টবিট। উফফফ, কি দু:সহ, সমস্থ রিয়েলিটি, সমস্ত আওয়াজ ঢাকা পড়ে গ্যাছে সারিয়েল হার্টবিটের কাছে, আর কোনকিছুর কোন অস্তিত্ব নেই, কিছুই কানে ঢুকছে না, শুধু ঐ অমোঘ যৌথ হৃদস্পন্দন, একই তালে, বেড়েই চলছে। ফাইনালি পথ ফুরোল, নেমে আর দুজন দুজনের দিকে চাইতে পারে না, পারেই না। হোস্টেলে ঢোকার সময় মিনা একটা কথাই বললো, আমাদের আর দেখা না হওয়াই ভালো।
পরিশিষ্ট:
দেখা না হওয়াই ভালো এতই সহজ? একদিন পরেই ফোন দিলো সৈকত, দেখো চলেই তো যাবে, যাবার আগে একবার দেখা হোক, ব্যস, এই একবারেই চলবে। মিনা যেন প্রতীক্ষাতেই ছিলো, পরদিন ফের ১১ টা, টিএসসি। কি কথা তাহার সাথে? তার সাথে? মাথা থেকে ওড়না খুলতে বলা, পরিপূর্ণভাবে তাকিয়ে দেখা, অকালেই বিসর্জনের দু:খ, তবু উপহার দেয়া কাঁচা হাতের কবিতা:
দিকহারা আঁধারে দিশাহারা পাখির মত
প্রতিধ্বনির সন্ধানে কেন,
শুধুই ঘুরে ফেরো?
পথ চেনোনা? ভুলে গেছো?
নাকি ভাবনার ভিড়ে পথ হারিয়ে,
চেনা পথকেই অচেনা ভাবো?
নাকি ভয় পাও, তাই খুঁজে পাও না?
চেনা পথের অচেনা মোড়ে,
পরিচিত প্রতিধ্বনিকেই
আজ বড় অচেনা মনে হয়, তাই না?
বরং আলোর দিকে চাও, পথ দেখাবে,
বরং, বাতাসে কান পাতো, পথের নিশানা জানাবে,
বরং, হাতে হাত রাখো,
হারানো চেনা পথ, আবারো খুঁজে পাবে,
মন, তুমি ঘরে ফেরো,
এবার নতুনের সাথে মিতালি হবে
এরপরে? সে অন্য গল্প, পরে কোনদিন।
সৈকত সচরাচর মিসড কল ব্যাক করে না। সেবার মিসড কল ব্যাক করে ব্লাইন্ড ডেট ফেস করার পরে তো আরো না। যা তা লেভেলের ব্লাইন্ড ছিলো ঐ ডেটটা। কিন্তু ১০/১২ টা কল, ১৫ মিনিটে, কি ভেবে কল করেই বসলো। যাহ শালা এটাও মেয়ে।
"হ্যালো, এই নাম্বার থেকে কেউ একজনন কল করেছিলেন। কে, জানতে পারি কি?"
"হ্যাঁ, পারেন, যার সাথে কথা বলছেন সেই কল করেছিলো"
"ওহ, আমি কি আপনাকে চিনি?"
"না, প্রশ্নই ওঠে না। আমি চিনি"
"তাই নাকি? নিয়ার ইমপসিবল ব্যাপার। কিভাবে চেনেন?"
"জানবেন আস্তে আস্তে"
"ওহ, মানে আপনার সাথে আমার আরো কথা হবে?"
"অবশ্যই, সে জন্যেই তো কল করলাম"
"আমার সম্পর্কে কি কি জানেন?"
"আপনার ফ্যামিলি, পড়াশুনা, আচ্ছা এমবিএটা কি একবারে করে আসা যেত না বাইরে থেকে?"
"ওরেএ আপনি এটাও জানেন? আর কি জানেন?"
"জানবেন জানবেন, দেখা হলেই জানবেন"
"ওহ, আপনার সাথে দেখাও হবে? কবে?"
"এই তো আপনি থার্টি ফার্স্টে ঢাকায় আসছেন, ১ তারিখেই হতে পারে"
"ও আচ্ছা, এটা জানতেও বাকি নেই। বেশ। আপনি কোথায় থাকেন?"
"এয়ারপোর্টের দক্ষিনে"
"উত্তরা?"
"ওটা কি দক্ষিন?"
"তাই তো, বনানী?"
"নাহ অতও না, এয়ারপোর্টের আরেকটু কাছে"
"আমি অতশত চিনি না, এই ১ তারিখে দেখা হবে তো আপনার সাথে? কনফার্ম? সামনাসামনি জেনে নেবো"
"এই তো পথে এসেছেন, এখন রাখছি পরে কথা হবে, টা টা"
কেটে দিলো। সৈকত তখন মাথার মধ্যে হিসেব কষছে সম্ভাব্য কে হতে পারে। লাস্ট কয়েকক মাসে মেয়ে বলতে কথা হয়েছে শুধু কলি'র সাথে, তাও সে তো হচ্ছে, ইনসান ভাই এর জিএফ, আর হোস্টেল বনানী, এটা কে? এত ইনফো কলি জানতে পারে নিশ্চয় ওর পরিচিত কেউই হবে। কেসটা দেখতে হচ্ছে। এই তো আজ ২৮, ৩১ সকালের বাসেই ঢাক। দেখা যাক, জল কতদূর গড়ায়।
২)
ঢাকায় থার্টি ফার্স্ট মানে সাধারণ তরুণের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কিন্তু ২০০০ থেকে দুপুরের পরেই ক্যাম্পাসের সব প্রবেশমুখ সিল করে দেয়া হয়, শুধু আইডি দেখে ঢুকতে দেয়। তবে ওসব কোন ব্যাপার না, অন্তত ৯ টা জায়গা আছে যেখান থেকে ক্যাম্পাসে ঢোকা যায়। যেমন, স্টাফ কলোনির বাউন্ডারি টপকে জহুরুল হক হলের ঝোপঝাড় ভেঙে। এক বোতল মাল ছয়জনে প্রায় শেষ করে সৈকত ঐ পথেই এ রাতে টিএসসি, ফিরে গিয়ে আরেক বোতল, হেব্বি ফুর্তি মনে। স্লোগান চলছে, "রোকেয়া হলে তালা কেন, ভিসি স্যার জবাব চাই"। টিএসসি'র, পাশেই মেয়েদের হল, খুব স্বাভাবিক ওদের বেরোতে দেবে না, এই রাতে, কিন্তু স্লোগান দিতে তো বাধা নেই। ঐ হৈ হট্টগোলের মধ্যেই অজানাকে ফোন, আগামীকাল ডেট কনফার্ম। গাঁজা খেতে খেতে, ট্রেডমার্ক গানে বাড়ির পথ, আরেকটা বোতল, আড্ডা, মনে উত্তেজনা, কালই তবে, দেখি তাহলে।
ঠিক ১১টায় টাইম, শাহবাগ, মিউজিয়াম গেট এ। কি করে চেনা যাবে? কেন? ফোনে কল করে। সৈকত আগেই দেখা দিতে রাজি নয়, শালা ব্লাইন্ড মানে আবারও ফুল ব্লাইন্ড হতেই পারে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর, ঐ মেয়েটা কি? নাহ, চলে গেলো, এটাও না, আরে সাড়ে এগারো, আর কখন? এই যে মেয়েটা নামলো, ছিপছিপে লম্বা, টকটকে লাল জামা, চোখে সানগ্লাস, মাথায় প্যাঁচানো ওড়না, দেখতেও খারাপ না, এটা নয়তো? আরে মিউজিয়ামের দিকেই যাচ্ছে যে, এটাই হবে, কপালটা ভালোই বোধহয়। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সৈকত, মোবাইলের বাটন টিপতে টিপতে, মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ালো, চোখাচোখি, কল দেয়ার আর প্রয়োজন হলো না, যা বোঝার বোঝা শেষ।
"আচ্ছা আচ্ছা, এই তাহলে আপনি, বেশ তো, দিব্যি দেখতে"
"তাতে কি? আপনার কোন লাভ নেই, সাময়িক গল্প ছাড়া, আমি রেজিস্টার্ড এবং সিলড"
"তার মানে আপনি কলির সেই ফ্রেন্ড, যার সদ্য বিয়ে হয়েছে?"
"ধুর, বলে দিয়েছে, এটা ঠিক না, যা বলার আমি বলতে চেয়েছিলাম।"
"না না, বলেনি কিছুই, আমরা ডিডাক্ট করেছি। আরে বাবা, বাচ্চা তো আর নই। যাই হোক চলুন বসি কোথাও, কোথায়? আকাশের নিচে? না ছাদের নিচে?"
"নাহ, চলুন খোলা কোথাও বসি, কলিরাও আসবে, এমন কোথাও বসি, যেখানে সহজে ওদের বলা যাবে।"
"ওহো! ডাবল ডেট, উমম শিশুপার্ক, ওখানে বসার মত অনেক জায়গা আছে, কিন্তু খাওয়ার মত কিছু নেই
"কে খেতে চাইছে এখন? এই সাত সকালে, ধুর। ওরা আসবে দুপুরে। আসুক তো, তারপর ওসব ভাবা যাবে, চলুন তো গল্প করি।"
"তাহলে চারুকলায় যাই চলুন, ওটা আমার সবথেকে পছন্দের জায়গা"
"যেখানে নিয়ে যাবেন, খোলা জায়গা হলেই হলো"
৩)
চারুকলা মেইন বিল্ডিঙ এর পিছনে একটা বিশাল বড় গর্ত। তার পাশে বসার মত প্রচুর জায়গা। উড ওয়ার্কশপের বারান্দায় বেঞ্চে বসলো দুজনে। সৈকত আর মিনা, নাম জানা গ্যাছে, তাহমিনার সংক্ষেপ। নিজেদের কথা, টুকরো কথা, পড়াশুনা, প্রেম, ব্রেকাপ, স্বপ্ন, ইচ্ছা, ভালো লাগা, এসব। এই মাস দুই হয় বিয়ে হয়েছে, প্রবাসী এক ছেলের সাথে, এরেঞ্জড। মিনা ব্রেকাপের পরে বিদ্ধস্ত ছিলো, যা করেছে ফ্যামিলি, চুপচাপ মেনে নিয়েছে, ভিসার জন্য এপ্লাইও করেছে। খুব শিঘ্রই বন্দীত্ব আসছে, তাই শেষবারের মত উড়তে চায়, শেষবারের মত ডানা ঝাপটাতে চায়, যা ইচ্ছা করতে চায়। সৈকতের ব্রেকাপ অনেকদিন হয়, বছর দেড়েক, এর মধ্যে আর কোন পরিস্থিতিও আসে নি, কারো সাথে ইনভলভড হবে, ইচ্ছাও জাগেনি তেমন, নতুন করে শুরু করতে চায় সবকিছু। যখন যেমন যা আসবে, তার মোকাবিলা তখন তেমনি হবে। কথায় কথায় কখন আপনি থেকে তুমি, কে জানে।
ইনসান-কলি সাথে কলির আরেক বান্ধবী সাজিয়া এলো এই আড়াইটের দিকে। এসেই ইনসানের সাজো সাজো রব, এই চলো চলো সবাই, আগে খেয়ে আসি, খুব খিদে পেয়েছে। কোথায়? কেন নিরবে। নাজিমুদ্দিন রোডের হোটেল নিরব, রেস্তোরাঁটার কোন তুলনা নেই আসলে ডেট লাঞ্চ বা গ্রুপ লাঞ্চের জন্য। ১২/১৩ রকম বাই ডিফল্ট ভর্তা আর সবজি, এর পরে যে যা খায়, বিশেষ করে মগজ ভুনা, আহা! ওখানে যেতে কোন না নেই। হাজার চেষ্টা করেও ওখানে কেউ অল্প খেতে পারে না, উপায় নেই, খাবার এতই দারুণ। খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় ৪ টে, ওদের হোস্টেলে ঢুকতে হবে ৭ টার মধ্যে, যেতেও তো এক ঘন্টা মিনিমাম, মানে হাতে আছে আর সাকুল্যে দু ঘন্টা। তাহলে বসার সহজ জায়গা হচ্ছে টিএসসি। জমিয়ে আড্ডা ৫ জনে। লেগপুলিং, বিশেষত সৈকতকে, বড্ড গোবেচারা টাইপ, ভাবা হয়েছিলো খেলানো হবে, কিন্তু খেলাই যদি না বোঝে তাকে কি করে খেলাবে। প্রেম, দুরছাই, কত আলোচনায় আড্ডা।
সাড়ে পাঁচ প্রায়, এবার উঠতে হবে, ৫ জন একটা বাজে নাম্বার, ক্যাব নিলে সামনে একজন পিছনে চার। সাজিয়ার স্বাস্থ একটু বেশিই ভালো, তাই সেই সামনে। পিছে কলিকে জড়িয়ে ধরে ইনসান, কলির পাশে মিনা, সব শেষে কোন মতে বসে থাকা সৈকত। গল্প কন্টিনিউজ। যথারীতি সৈকতের পিছে লেগে আছে। সাজিয়া জিজ্ঞেস করলো, একি সৈকত ভাই এর একি অবস্থা। সৈকত বললো, কি করা যাবে, ওপাশে দুজন কি সুন্দর জড়িয়ে থেকে জায়গা কমিয়েছে, আমার তো সে উপায় নেই। মিনা বললো, ধরে বসলেই হয়, কাঁচের পুতুল তো আর না। বেশ তো, জড়িয়ে না হলেও, হাতটা পেছন থেকে নিয়ে, ধরে বসলো সৈকত। ছোট ক্যাব, জায়গা তো অল্প, সৈকতের বুকের উপরে মিনা'র পিঠ, নাকের সামনে মিনার চুলের গোড়া, চুলের ঘ্রাণ, ভয়াবহ। হঠাৎই খেয়াল হলো সৈকতের, দুজনের হার্ট একই রিদমে বিট দিচ্ছে। সৈকতের শ্বাসের সাথে চুলের ঘ্রাণ, মিনার ঘাড়ে গরম শ্বাস, ধীরে ধীরে বেড়ে চলা যৌথ কম্পাঙ্কের অনুরণন, একই তালে বাড়তে থাকা হার্টবিট। উফফফ, কি দু:সহ, সমস্থ রিয়েলিটি, সমস্ত আওয়াজ ঢাকা পড়ে গ্যাছে সারিয়েল হার্টবিটের কাছে, আর কোনকিছুর কোন অস্তিত্ব নেই, কিছুই কানে ঢুকছে না, শুধু ঐ অমোঘ যৌথ হৃদস্পন্দন, একই তালে, বেড়েই চলছে। ফাইনালি পথ ফুরোল, নেমে আর দুজন দুজনের দিকে চাইতে পারে না, পারেই না। হোস্টেলে ঢোকার সময় মিনা একটা কথাই বললো, আমাদের আর দেখা না হওয়াই ভালো।
পরিশিষ্ট:
দেখা না হওয়াই ভালো এতই সহজ? একদিন পরেই ফোন দিলো সৈকত, দেখো চলেই তো যাবে, যাবার আগে একবার দেখা হোক, ব্যস, এই একবারেই চলবে। মিনা যেন প্রতীক্ষাতেই ছিলো, পরদিন ফের ১১ টা, টিএসসি। কি কথা তাহার সাথে? তার সাথে? মাথা থেকে ওড়না খুলতে বলা, পরিপূর্ণভাবে তাকিয়ে দেখা, অকালেই বিসর্জনের দু:খ, তবু উপহার দেয়া কাঁচা হাতের কবিতা:
দিকহারা আঁধারে দিশাহারা পাখির মত
প্রতিধ্বনির সন্ধানে কেন,
শুধুই ঘুরে ফেরো?
পথ চেনোনা? ভুলে গেছো?
নাকি ভাবনার ভিড়ে পথ হারিয়ে,
চেনা পথকেই অচেনা ভাবো?
নাকি ভয় পাও, তাই খুঁজে পাও না?
চেনা পথের অচেনা মোড়ে,
পরিচিত প্রতিধ্বনিকেই
আজ বড় অচেনা মনে হয়, তাই না?
বরং আলোর দিকে চাও, পথ দেখাবে,
বরং, বাতাসে কান পাতো, পথের নিশানা জানাবে,
বরং, হাতে হাত রাখো,
হারানো চেনা পথ, আবারো খুঁজে পাবে,
মন, তুমি ঘরে ফেরো,
এবার নতুনের সাথে মিতালি হবে
এরপরে? সে অন্য গল্প, পরে কোনদিন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন