(১)
তুই আমাকে ডাক দিয়ে যাস মুক্ত হাওয়ার পথে,
আমি নিজের শৃংখল নিজেই গড়েছি, সেই শৃংখলে বাঁধা পড়ে আছি,
গরাদের ফাঁকে চোখ মেলে দেখি মেঘহীন ঐ নীলাকাশ,
দূর থেকে রোজ নিয়ে যায় খোঁজ মুক্ত শীতল সুবাতাস
মন চাইলেও হয়না যে যাওয়া সেই তোর সাথে এক রথে
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারির এক বিকেলে, দশদিন বাড়িতে কাটিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। ভর্তি ফর্ম জমা দেয়ার মৌসুম না হলে আরো কদিন থেকে আসা যেত, কিন্তু এই কাজটা চাপানোর মত ভরসা করার কাঁধ কই? বাধ্য হয়ে তাও জগন্নাথের ফর্ম সৈকতের কাছে দিয়ে গিয়েছিলাম। কি অবস্থা কে জানে, ব্যাটা আবার ঢাকা শহর ঠিকঠাক চেনেনা। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকা প্রায় পনের ঘন্টা বাস জার্নির পরে আবার রুমের মধ্যে বসে থাকা অনেকটা কবরের আযাবের মত মনে হয় আমার কাছে বরাবরই, তাছাড়া ফর্মের খোঁজটাও নেয়া দরকার। সুতরাং ব্যাগটা কোনমতে ফেলেই, রাজাবাজারের দিকে রওনা হলাম।
সৈকত মেসেই আছে। আমাকে দেখেই ট্রেডমার্ক মুলোর খেত দেখিয়ে দিলো, কারেন্ট এফেয়ার্সের ফাঁকে আঙ্গুল গোঁজা। বসতে বলে আবার দেখি বইয়ের দিকে চোখ নামাচ্ছে।
" স্যার, আপনার জ্ঞানসাধনা বন্ধ করে চলেন বাইরে যাই, চা চু খাই", বিরক্ত হয়ে বললাম।
"চা?", হঠাৎ যেন মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে নামলো, "হ্যাঁ, চা তো খাওয়াই যায়। ইনফ্যাক্ট গত তিন ঘন্টা ধরে আমি তাই ভাবছি।"
আঁতলামো সহ্য করাটা মুশকিল। ঝটকা দিয়ে বই সরিয়ে, হাতে ওর শার্ট ধরিয়ে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চললাম।
"আরে দাঁড়া, তোর রাতের মিল দেই", বোতাম আটকাতে আটকাতে বললো সৈকত
"বাইরে খাবো"
"আমার মিল অফ করে দেই"
"তাড়াতাড়ি"
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে আইবিএ হোস্টেলের কাছে এসে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। চা খাওয়ার ফাঁকে জানতে চাইলাম,
"ফর্মের খবর কি? জমা দিছিস?"
"তোর কি সন্দেহ ছিলো, জমা দেবনা?"
"না, ঠিক তা নয়, তবে ঐ ইয়ে আরকি"
"আরে আমি আর লিওন গিয়ে জমা দিয়ে আসছি। কিন্তু দোস্ত, সে এক কাহিনী, এক নারী।"
"ফর্মের সাথে নারী আসলো কোত্থেকে আবার? তোর অবশ্য সব কিছুতেই কেমনে যেন নারী চলে আসে। তো কাহিনী কি?"
"কবিদের অমনই হয়, কাহিনীটা শোন আগে।"
সৈকতের ভাষ্য রং সহ অনেক বড়, আমি বরং সংক্ষেপে বলি। সৈকত আর লিওন দুইজনের কেউই জানতোনা জগন্নাথ যাওয়ার বাস কোনটা, আবার লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করতেও সংকোচ হচ্ছিলো। ওরা চিন্তা করে দেখলো, এই সময়ে একমাত্র ফর্ম জমা নিচ্ছে জগন্নাথ। সুতরাং অল্পবয়সী কেউ যদি ফাইল হাতে ফার্মগেটের ব্রিজের নীচে এসে দাঁড়ায়, তার জগন্নাথে যাওয়ার সম্ভাবনা শতকরা আশি ভাগ। সুতরাং ওরা ফার্মগেট ওভারব্রিজের নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রইলো। থারেড এটেম্পটে তারা পেয়ে গেলো এক জগন্নাথ যাত্রী। আসলে যাত্রী নয় যাত্রীনী, নাম পদ্ম। সে নিজেই লিড দিয়ে নিয়ে গেলো ওদের জগন্নাথে।
কথা ফুরাচ্ছে না সৈকতের। বলেই চললো,
"কি বলবো দোস্ত, এরকম স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড আর স্মার্ট মেয়ে আমি লাইফে দেখিনি। আর সেই রকম সাহস। দোস্ত তুমি বিশ্বাস করবানা, ফেরার পথে বাস যখন ফার্মগেট আসলো বাসে সেই রকম ভীড়। আমরা পিছনের দিকে সিটে বসে ছিলাম, ভীড় ঠেলে ওরে নিয়ে কেমনে নামব ভাবছিলাম। বললে বিশ্বাস যাবা না, ও বাসের জানালা দিয়ে এক লাফে নেমে পড়লো। আমি আর লিওন তো পুরা টকা। দোস্ত মেয়েই একটা। এই পশ্চিম রাজাবাজারে একটা হোস্টেলে থাকে। দোস্ত আমি তো বোধ হয় প্রেমেই পড়ে যাচ্ছি।"
"প্রেমে তো তুই বারো মাসে পনের বার পড়িস। স্কুলের বাচ্চা থেকে চেয়ারম্যানের বউ, কাজের মেয়ে থেকে বিসিএস ক্যাডার। কবে না তোর আবার পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙ্গে। দেখতে কেমন তোর এই পদ্ম?"
"সেই রকম দোস্ত সেই রকম, সূর্য্যের মতন, দেখলেই মনে হয় বলি, ওঁ জবা কুসুম শঙ্কাশং"
"আরে রাখ তোর জবা কুসুম শঙ্কাশং, লাস্ট টাইমে যার কথা বলে ল্যাটিন মারাইছিলি সে দেখতে ছিলো আমার শেষ বারে বাতিল করা জুতার মত।"
"ওরে না রে, এ আসলেই এক পদ্মফুল, তোরে দেখাবনে। কিন্তু লাইন মারতে পারবানা, আমার বুকিং।"
"যা ব্যাটা, মৃদুল যার তার পিছে লাইন মারে না। আর তোর বুকিং মানে? তুই না কদিন আগেই তোর ইয়ের কাছে গিয়ে প্রেমের রসে সাঁতার দিয়ে আসলি? কি যেন নাম।"
"তুই বড্ড বেরসিক। ওরে প্রেমে বার বার পড়তে হয়। তুই তার কি বুঝবি। নে চায়ের দাম দে।"
(২)
তোমার হৃদয় থেকে একমুঠো লাল আমায় দাও,
বিনিময়ে আমি তোমায় দেব এক চিমটি নীল আমার জীবন থেকে।
আমায় তুমি দাও একগুচ্ছ গোলাপ তোমার বাগান থেকে,
বিনিময়ে আমি তোমায় দেব কুড়িয়ে আনা একটি কৃষ্ণচুড়া
মার্চের ৪ তারিখে সৈকতের এতদিনের সাধনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের "ঘ" ইউনিটের পরীক্ষা। ওর জোরাজোরিতে আমিও ফর্ম জমা দিয়েছি, তবে কোন প্রস্তুতি নেই। ওর স্বপ্ন নাট্যকলায় পড়বে, আমার তো আর সেরকমটি নয়, শুধু ওকে সঙ্গ দিতেই হলে যাব। ও হ্যাঁ, পদ্মও পরীক্ষা দেবে। আমার সাথে পদ্মের এখনো দেখা হয়নি। সৈকতেরও কোন সুবিধা হয়নি, কারণ পদ্ম অলরেডী বুকড, তিন বছরের প্রেম। ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে একদিন ভাবলাম, পরীক্ষা যখন দেবই অন্তত এটা তো জানা উচিৎ কতটুকু কি ফেস করতে হবে, গেলাম সৈকতের মেসে। পড়াশুনার আলাপ হলো ঘন্টা, সারারাত কেটে গেল আড্ডায় আর ব্রিজ খেলায়। ভোর বেলা যখন আসর ভাংলো ততক্ষনে সবার স্টকের বিড়ি শেষ। বাধ্য হয়ে সবাই গেল ঘুমাতে। আমি আর সৈকত ভাবলাম, ভোর যখন হয়েই গেলো, আরেকটু পরে সকাল হোক, বাইরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে এসে তারপরে ঘুম দেই।
হাঁটতে হাঁটতে সংসদের সামনে চলে এলাম। মানিক মিয়া এভিন্যুতে রাস্তার পাশে অনেকগুলো কৃষ্ণচুড়া গাছ। ভরা বসন্তে গাছ ফুলে ছেয়ে আছে। গাছের নীচে ছড়িয়ে আছে কুঁড়ি, ফুল প্রস্ফুটিত, আধা ফোটা। আমরা দুজনে বাচ্চাদের মত ফুল কুড়ায়ে লাগলাম। ঠিক এসময়ে সৈকতের খুব জোরেসোরে কোবতে চেপে গেলো। বললো,
"এ কুড়োনো ফুল যদি কোন রক্তমাংসের দেবীর পায়ে অঞ্জলী নাই দেয়া গেলো, তবে বৃথা এ ফুল কুড়োন। মনকে চোখ ঠাউরে আজি এ কিসের তঞ্চকতা? বল সারথি, আজি দেবী পাব কোথা?"
ভাবলাম সব্বোনাশ করেছে, আজকে এই আঁতেল জ্বালিয়ে মারবে। এখন কি করা যায়? একটু চিন্তা করতেই ওর আঁতলামোর সমাধান পেয়ে গেলাম। বললাম,
"পাশেই পদ্মের হোস্টেল না? চল তোর পুষ্পাঞ্জলী দিয়ে আসি। সে নাকি সেই রকম স্মার্ট, দেখি তার দৌড় কতদূর"
আমার স্বভাব খুব ভালো করেই জানা আছে ওর, মাথায় একবার কিছু চাপলে তা করেই ছাড়ি। এক কথায় কোবতে টোবতে সব ভেতরে সেঁধিয়ে গেল। ব্ললো,
"পদ্মের হোস্টেলে তো আটটার আগে কল দেয়া নিষেধ। এখন সবে সাড়ে ছয়। বাদ দে, জাহান্নামে যাক পুষ্পাঞ্জলী। তুই রুমে চল।"
উঁহু, চল তুই আমার সাথে। কল কি করে দিতে হয় দেখাচ্ছি। আজ পুষ্পাঞ্জলী দিয়েই ছাড়বো, চল", আজ সোইকতের আঁতলামোর মজা বুঝিয়েই ছাড়বো।
হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেলাম ওকে পশ্চিম রাজাবাজারের দিকে। শেষ পর্যন্ত আমাকে বাধ্য হয়ে নিয়ে গেলো হোস্টেলের গেটে। বাইরের গেট খোলা। আমি সৈকতকে কথা বলতে মানা করে কল দেয়ার দায়িত্ব আমার হাতে ছেড়ে দিতে বললাম। ফুলগুলো পেছনে লুকিয়ে খুব সিরিয়াস চেহারা করে দারোয়ানকে বললাম,
"ভাই, পদ্ম আপুকে ডেকে দেয়া যাবে?"
"আটটার আগে কল দেয়া নিষেধ"
"আপুর বাসা থেকে ইমার্জেন্সী কল এসছে ভোর বেলা। সেই মিরপুর থেকে আসছি, ডেকে দেন না ভাই। ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি, বুঝেনই তো"
আমার সিরিয়াসনেস দেখে আমাদের দাঁড়াতে বলে দারোয়ান ভেতরে গেলো।
তিনেক পরে এক বাজখাঁি চেহারার চল্লিশের কাছাকাছি ভদ্রমহিলা এসে জানতে চাইলো, কি চাই। সৈকত কানে কানে বললো, হোস্টেল সুপার। আমি আরো করুণ চেহারা করে কাহিনী বললাম। বললাম, শেষ রাত থেকে আপনাদের ফোনে চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু লাইন পাওয়া যায় নি। প্লিজ ম্যাডাম, ইমার্জেন্সি। দুই মিনিট কথা বলে খবরটা দিয়েই চলে যাব। ভদ্রমহিলার দয়া হলো। ভতরে গেলেন। আমরা হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম, সৈকত পারলে লাফায় আরকি।
মিনিট কয়েক পরে, সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে হাজির হলো মেয়েটা, বেশ সাদামাটা দেখতে, কোথায় যেন একটা কিছু লুকিয়ে আছে এরই মাঝে। আমি চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম, চুপ রইলো সৈকতও। আসলে এই সদ্য ঘুম ভাঙা সাদামাটা মেয়েটা আমাদের মনের কোথায় যেন কি এক অপার্থিবের ছোঁয়া লাগিয়ে দিলো। বোধ হয় মিনিটখানেক আমরা দুইজনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পদ্মের ততক্ষনে বোঝা সারা, যে এ কোন ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি নয়। কাহিনী অন্য কিছু। পালা করে আমাদের দুইজনকে দেখে, নীরবতায় খানকটা বিরক্ত হয়েই ব্ললো
" কি ব্যাপার সৈকত, এত সকালে কি? এ কে?"
চটকা ভেঙ্গে গেলো আমাদের। সৈকত হঠাৎ ভাব ধরে বললো,
"ও, বেশী সকালে চলে এসেছি, তাইনা? আচ্ছা থাক, কিছুই না। মৃদুল চল।" হাঁটা দিলো গেটের দিকে। আমার সামনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পদ্ম। আমি আর কি করবো, ঘুরে আমিও হাঁটাদলাম। গেট থেকে বের হওয়ার সময়েও দেখলাম, পদ্ম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে সেখানে। আমার খুব খারাপ লাগলো, গেটের সামনে আমার হাতের কৃষ্ণচুড়াগুলো রেখে পদ্মের দিকে একবার তাকিয়ে, চলে এলাম। দূর থেকে হলেও আমার পুষ্পাঞ্জলী দেয়া হলো। দূরত্বও কোন কোন সময় নৈকট্যের চাইতে নিকট হয়ে দাঁড়ায়।
সৈকতের রূমে ফিরে ঘুমানোর আগে ওকে বলতে শুনলাম, আজ কোন মহাপ্রলয়ও আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারবে না।
(৩)
কে জানে, সে কিসের মায়া,
কার করকমলে কোথায় ফোটা পদ্ম?
মহাকালের ইশারা, নাকি গত জন্মের ফেলে আসা স্মৃতি,
কে জানে, এ কিসের বাঁধন?
হয়তো যুগান্তরের অভিশপ্ত প্রাণের শাপমোচন
মহাপ্রলয়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পর্বত্মালা ভেঙ্গেচুরে পড়ছে আমার উপরে। না আমি ঘুম থেকে উটঠলাম, এ এই তো সৈকতের রুমে আমি। বিছানার একপাশে সৈকত বসা, সকৌতুক কৌতুহলী চোখে তাকানো আমার মাথার পিছনে। সকৌতুক দৃষ্টি কে? ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, হাতে বেশ ওজন্দার একখানা ব্যাগ বেশ সন্দেহজনকভাবে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ নয়, পদ্ম। জানা গেল মহাপ্রলয়, পর্বতমালা কিস্যু নয়, হাজার চেষ্টার পরেও সৈকত আমার ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি দেখে বিরক্ত হয়ে পদ্ম তার হাতের ব্যগখানা সর্বশক্তিতে নামিয়েছে আমার উপরে। প্রত্যুৎপন্নমতিতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
আমরা আড্ডা দিতে দিতে কখন যেন কৃষ্ণচুড়ার কেশর দিয়ে কাটাকুটি খেলা শুরু করেছিলাম মনে নেই। খেলা শুরুর পরে কতক্ষন কেটে গিয়েছিলো তা কখনোই জানতে পারিনি। শুধু মনে আছে, আচ্ছন্নের মত দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে কাটাকুটি করেই চলেছি, করেই চলেছি, ঠিক যেন জীবনের কাটাছেঁড়া করে চলেছে অদৃশ্য বিশ্বাত্মা। সৈকত সম্ভবত আমাদের পাশে পায়চারি করেছিলো অনেক্ষন। কিন্তু আমাদের তখন পার্থিব কোন কিছুতেই কোন খেয়াল ছিলো না। বাস্তবে ফিরলাম যখন, বাইরে না হলেও ভেতরে ভেতরে জীবনটা আমাদের একেবারেই পাল্টে গেছে। কেউই আমরা তখন একে অপরের কাছে স্বীকার করিনি কিছু, বরং জোর দিয়ে অস্বীকারই করেছিলাম।
তারপর? সে অন্য গল্প, অন্য কোন সময়ের অন্য কোন বাস্তবতায়। হবে নাহয় অন্য কোন দিন, আজ এটুকুই থাক।
তুই আমাকে ডাক দিয়ে যাস মুক্ত হাওয়ার পথে,
আমি নিজের শৃংখল নিজেই গড়েছি, সেই শৃংখলে বাঁধা পড়ে আছি,
গরাদের ফাঁকে চোখ মেলে দেখি মেঘহীন ঐ নীলাকাশ,
দূর থেকে রোজ নিয়ে যায় খোঁজ মুক্ত শীতল সুবাতাস
মন চাইলেও হয়না যে যাওয়া সেই তোর সাথে এক রথে
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারির এক বিকেলে, দশদিন বাড়িতে কাটিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। ভর্তি ফর্ম জমা দেয়ার মৌসুম না হলে আরো কদিন থেকে আসা যেত, কিন্তু এই কাজটা চাপানোর মত ভরসা করার কাঁধ কই? বাধ্য হয়ে তাও জগন্নাথের ফর্ম সৈকতের কাছে দিয়ে গিয়েছিলাম। কি অবস্থা কে জানে, ব্যাটা আবার ঢাকা শহর ঠিকঠাক চেনেনা। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকা প্রায় পনের ঘন্টা বাস জার্নির পরে আবার রুমের মধ্যে বসে থাকা অনেকটা কবরের আযাবের মত মনে হয় আমার কাছে বরাবরই, তাছাড়া ফর্মের খোঁজটাও নেয়া দরকার। সুতরাং ব্যাগটা কোনমতে ফেলেই, রাজাবাজারের দিকে রওনা হলাম।
সৈকত মেসেই আছে। আমাকে দেখেই ট্রেডমার্ক মুলোর খেত দেখিয়ে দিলো, কারেন্ট এফেয়ার্সের ফাঁকে আঙ্গুল গোঁজা। বসতে বলে আবার দেখি বইয়ের দিকে চোখ নামাচ্ছে।
" স্যার, আপনার জ্ঞানসাধনা বন্ধ করে চলেন বাইরে যাই, চা চু খাই", বিরক্ত হয়ে বললাম।
"চা?", হঠাৎ যেন মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে নামলো, "হ্যাঁ, চা তো খাওয়াই যায়। ইনফ্যাক্ট গত তিন ঘন্টা ধরে আমি তাই ভাবছি।"
আঁতলামো সহ্য করাটা মুশকিল। ঝটকা দিয়ে বই সরিয়ে, হাতে ওর শার্ট ধরিয়ে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চললাম।
"আরে দাঁড়া, তোর রাতের মিল দেই", বোতাম আটকাতে আটকাতে বললো সৈকত
"বাইরে খাবো"
"আমার মিল অফ করে দেই"
"তাড়াতাড়ি"
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে আইবিএ হোস্টেলের কাছে এসে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। চা খাওয়ার ফাঁকে জানতে চাইলাম,
"ফর্মের খবর কি? জমা দিছিস?"
"তোর কি সন্দেহ ছিলো, জমা দেবনা?"
"না, ঠিক তা নয়, তবে ঐ ইয়ে আরকি"
"আরে আমি আর লিওন গিয়ে জমা দিয়ে আসছি। কিন্তু দোস্ত, সে এক কাহিনী, এক নারী।"
"ফর্মের সাথে নারী আসলো কোত্থেকে আবার? তোর অবশ্য সব কিছুতেই কেমনে যেন নারী চলে আসে। তো কাহিনী কি?"
"কবিদের অমনই হয়, কাহিনীটা শোন আগে।"
সৈকতের ভাষ্য রং সহ অনেক বড়, আমি বরং সংক্ষেপে বলি। সৈকত আর লিওন দুইজনের কেউই জানতোনা জগন্নাথ যাওয়ার বাস কোনটা, আবার লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করতেও সংকোচ হচ্ছিলো। ওরা চিন্তা করে দেখলো, এই সময়ে একমাত্র ফর্ম জমা নিচ্ছে জগন্নাথ। সুতরাং অল্পবয়সী কেউ যদি ফাইল হাতে ফার্মগেটের ব্রিজের নীচে এসে দাঁড়ায়, তার জগন্নাথে যাওয়ার সম্ভাবনা শতকরা আশি ভাগ। সুতরাং ওরা ফার্মগেট ওভারব্রিজের নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রইলো। থারেড এটেম্পটে তারা পেয়ে গেলো এক জগন্নাথ যাত্রী। আসলে যাত্রী নয় যাত্রীনী, নাম পদ্ম। সে নিজেই লিড দিয়ে নিয়ে গেলো ওদের জগন্নাথে।
কথা ফুরাচ্ছে না সৈকতের। বলেই চললো,
"কি বলবো দোস্ত, এরকম স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড আর স্মার্ট মেয়ে আমি লাইফে দেখিনি। আর সেই রকম সাহস। দোস্ত তুমি বিশ্বাস করবানা, ফেরার পথে বাস যখন ফার্মগেট আসলো বাসে সেই রকম ভীড়। আমরা পিছনের দিকে সিটে বসে ছিলাম, ভীড় ঠেলে ওরে নিয়ে কেমনে নামব ভাবছিলাম। বললে বিশ্বাস যাবা না, ও বাসের জানালা দিয়ে এক লাফে নেমে পড়লো। আমি আর লিওন তো পুরা টকা। দোস্ত মেয়েই একটা। এই পশ্চিম রাজাবাজারে একটা হোস্টেলে থাকে। দোস্ত আমি তো বোধ হয় প্রেমেই পড়ে যাচ্ছি।"
"প্রেমে তো তুই বারো মাসে পনের বার পড়িস। স্কুলের বাচ্চা থেকে চেয়ারম্যানের বউ, কাজের মেয়ে থেকে বিসিএস ক্যাডার। কবে না তোর আবার পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙ্গে। দেখতে কেমন তোর এই পদ্ম?"
"সেই রকম দোস্ত সেই রকম, সূর্য্যের মতন, দেখলেই মনে হয় বলি, ওঁ জবা কুসুম শঙ্কাশং"
"আরে রাখ তোর জবা কুসুম শঙ্কাশং, লাস্ট টাইমে যার কথা বলে ল্যাটিন মারাইছিলি সে দেখতে ছিলো আমার শেষ বারে বাতিল করা জুতার মত।"
"ওরে না রে, এ আসলেই এক পদ্মফুল, তোরে দেখাবনে। কিন্তু লাইন মারতে পারবানা, আমার বুকিং।"
"যা ব্যাটা, মৃদুল যার তার পিছে লাইন মারে না। আর তোর বুকিং মানে? তুই না কদিন আগেই তোর ইয়ের কাছে গিয়ে প্রেমের রসে সাঁতার দিয়ে আসলি? কি যেন নাম।"
"তুই বড্ড বেরসিক। ওরে প্রেমে বার বার পড়তে হয়। তুই তার কি বুঝবি। নে চায়ের দাম দে।"
(২)
তোমার হৃদয় থেকে একমুঠো লাল আমায় দাও,
বিনিময়ে আমি তোমায় দেব এক চিমটি নীল আমার জীবন থেকে।
আমায় তুমি দাও একগুচ্ছ গোলাপ তোমার বাগান থেকে,
বিনিময়ে আমি তোমায় দেব কুড়িয়ে আনা একটি কৃষ্ণচুড়া
মার্চের ৪ তারিখে সৈকতের এতদিনের সাধনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের "ঘ" ইউনিটের পরীক্ষা। ওর জোরাজোরিতে আমিও ফর্ম জমা দিয়েছি, তবে কোন প্রস্তুতি নেই। ওর স্বপ্ন নাট্যকলায় পড়বে, আমার তো আর সেরকমটি নয়, শুধু ওকে সঙ্গ দিতেই হলে যাব। ও হ্যাঁ, পদ্মও পরীক্ষা দেবে। আমার সাথে পদ্মের এখনো দেখা হয়নি। সৈকতেরও কোন সুবিধা হয়নি, কারণ পদ্ম অলরেডী বুকড, তিন বছরের প্রেম। ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে একদিন ভাবলাম, পরীক্ষা যখন দেবই অন্তত এটা তো জানা উচিৎ কতটুকু কি ফেস করতে হবে, গেলাম সৈকতের মেসে। পড়াশুনার আলাপ হলো ঘন্টা, সারারাত কেটে গেল আড্ডায় আর ব্রিজ খেলায়। ভোর বেলা যখন আসর ভাংলো ততক্ষনে সবার স্টকের বিড়ি শেষ। বাধ্য হয়ে সবাই গেল ঘুমাতে। আমি আর সৈকত ভাবলাম, ভোর যখন হয়েই গেলো, আরেকটু পরে সকাল হোক, বাইরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে এসে তারপরে ঘুম দেই।
হাঁটতে হাঁটতে সংসদের সামনে চলে এলাম। মানিক মিয়া এভিন্যুতে রাস্তার পাশে অনেকগুলো কৃষ্ণচুড়া গাছ। ভরা বসন্তে গাছ ফুলে ছেয়ে আছে। গাছের নীচে ছড়িয়ে আছে কুঁড়ি, ফুল প্রস্ফুটিত, আধা ফোটা। আমরা দুজনে বাচ্চাদের মত ফুল কুড়ায়ে লাগলাম। ঠিক এসময়ে সৈকতের খুব জোরেসোরে কোবতে চেপে গেলো। বললো,
"এ কুড়োনো ফুল যদি কোন রক্তমাংসের দেবীর পায়ে অঞ্জলী নাই দেয়া গেলো, তবে বৃথা এ ফুল কুড়োন। মনকে চোখ ঠাউরে আজি এ কিসের তঞ্চকতা? বল সারথি, আজি দেবী পাব কোথা?"
ভাবলাম সব্বোনাশ করেছে, আজকে এই আঁতেল জ্বালিয়ে মারবে। এখন কি করা যায়? একটু চিন্তা করতেই ওর আঁতলামোর সমাধান পেয়ে গেলাম। বললাম,
"পাশেই পদ্মের হোস্টেল না? চল তোর পুষ্পাঞ্জলী দিয়ে আসি। সে নাকি সেই রকম স্মার্ট, দেখি তার দৌড় কতদূর"
আমার স্বভাব খুব ভালো করেই জানা আছে ওর, মাথায় একবার কিছু চাপলে তা করেই ছাড়ি। এক কথায় কোবতে টোবতে সব ভেতরে সেঁধিয়ে গেল। ব্ললো,
"পদ্মের হোস্টেলে তো আটটার আগে কল দেয়া নিষেধ। এখন সবে সাড়ে ছয়। বাদ দে, জাহান্নামে যাক পুষ্পাঞ্জলী। তুই রুমে চল।"
উঁহু, চল তুই আমার সাথে। কল কি করে দিতে হয় দেখাচ্ছি। আজ পুষ্পাঞ্জলী দিয়েই ছাড়বো, চল", আজ সোইকতের আঁতলামোর মজা বুঝিয়েই ছাড়বো।
হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেলাম ওকে পশ্চিম রাজাবাজারের দিকে। শেষ পর্যন্ত আমাকে বাধ্য হয়ে নিয়ে গেলো হোস্টেলের গেটে। বাইরের গেট খোলা। আমি সৈকতকে কথা বলতে মানা করে কল দেয়ার দায়িত্ব আমার হাতে ছেড়ে দিতে বললাম। ফুলগুলো পেছনে লুকিয়ে খুব সিরিয়াস চেহারা করে দারোয়ানকে বললাম,
"ভাই, পদ্ম আপুকে ডেকে দেয়া যাবে?"
"আটটার আগে কল দেয়া নিষেধ"
"আপুর বাসা থেকে ইমার্জেন্সী কল এসছে ভোর বেলা। সেই মিরপুর থেকে আসছি, ডেকে দেন না ভাই। ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি, বুঝেনই তো"
আমার সিরিয়াসনেস দেখে আমাদের দাঁড়াতে বলে দারোয়ান ভেতরে গেলো।
তিনেক পরে এক বাজখাঁি চেহারার চল্লিশের কাছাকাছি ভদ্রমহিলা এসে জানতে চাইলো, কি চাই। সৈকত কানে কানে বললো, হোস্টেল সুপার। আমি আরো করুণ চেহারা করে কাহিনী বললাম। বললাম, শেষ রাত থেকে আপনাদের ফোনে চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু লাইন পাওয়া যায় নি। প্লিজ ম্যাডাম, ইমার্জেন্সি। দুই মিনিট কথা বলে খবরটা দিয়েই চলে যাব। ভদ্রমহিলার দয়া হলো। ভতরে গেলেন। আমরা হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম, সৈকত পারলে লাফায় আরকি।
মিনিট কয়েক পরে, সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে হাজির হলো মেয়েটা, বেশ সাদামাটা দেখতে, কোথায় যেন একটা কিছু লুকিয়ে আছে এরই মাঝে। আমি চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম, চুপ রইলো সৈকতও। আসলে এই সদ্য ঘুম ভাঙা সাদামাটা মেয়েটা আমাদের মনের কোথায় যেন কি এক অপার্থিবের ছোঁয়া লাগিয়ে দিলো। বোধ হয় মিনিটখানেক আমরা দুইজনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পদ্মের ততক্ষনে বোঝা সারা, যে এ কোন ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি নয়। কাহিনী অন্য কিছু। পালা করে আমাদের দুইজনকে দেখে, নীরবতায় খানকটা বিরক্ত হয়েই ব্ললো
" কি ব্যাপার সৈকত, এত সকালে কি? এ কে?"
চটকা ভেঙ্গে গেলো আমাদের। সৈকত হঠাৎ ভাব ধরে বললো,
"ও, বেশী সকালে চলে এসেছি, তাইনা? আচ্ছা থাক, কিছুই না। মৃদুল চল।" হাঁটা দিলো গেটের দিকে। আমার সামনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পদ্ম। আমি আর কি করবো, ঘুরে আমিও হাঁটাদলাম। গেট থেকে বের হওয়ার সময়েও দেখলাম, পদ্ম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে সেখানে। আমার খুব খারাপ লাগলো, গেটের সামনে আমার হাতের কৃষ্ণচুড়াগুলো রেখে পদ্মের দিকে একবার তাকিয়ে, চলে এলাম। দূর থেকে হলেও আমার পুষ্পাঞ্জলী দেয়া হলো। দূরত্বও কোন কোন সময় নৈকট্যের চাইতে নিকট হয়ে দাঁড়ায়।
সৈকতের রূমে ফিরে ঘুমানোর আগে ওকে বলতে শুনলাম, আজ কোন মহাপ্রলয়ও আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারবে না।
(৩)
কে জানে, সে কিসের মায়া,
কার করকমলে কোথায় ফোটা পদ্ম?
মহাকালের ইশারা, নাকি গত জন্মের ফেলে আসা স্মৃতি,
কে জানে, এ কিসের বাঁধন?
হয়তো যুগান্তরের অভিশপ্ত প্রাণের শাপমোচন
মহাপ্রলয়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পর্বত্মালা ভেঙ্গেচুরে পড়ছে আমার উপরে। না আমি ঘুম থেকে উটঠলাম, এ এই তো সৈকতের রুমে আমি। বিছানার একপাশে সৈকত বসা, সকৌতুক কৌতুহলী চোখে তাকানো আমার মাথার পিছনে। সকৌতুক দৃষ্টি কে? ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, হাতে বেশ ওজন্দার একখানা ব্যাগ বেশ সন্দেহজনকভাবে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ নয়, পদ্ম। জানা গেল মহাপ্রলয়, পর্বতমালা কিস্যু নয়, হাজার চেষ্টার পরেও সৈকত আমার ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি দেখে বিরক্ত হয়ে পদ্ম তার হাতের ব্যগখানা সর্বশক্তিতে নামিয়েছে আমার উপরে। প্রত্যুৎপন্নমতিতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
আমরা আড্ডা দিতে দিতে কখন যেন কৃষ্ণচুড়ার কেশর দিয়ে কাটাকুটি খেলা শুরু করেছিলাম মনে নেই। খেলা শুরুর পরে কতক্ষন কেটে গিয়েছিলো তা কখনোই জানতে পারিনি। শুধু মনে আছে, আচ্ছন্নের মত দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে কাটাকুটি করেই চলেছি, করেই চলেছি, ঠিক যেন জীবনের কাটাছেঁড়া করে চলেছে অদৃশ্য বিশ্বাত্মা। সৈকত সম্ভবত আমাদের পাশে পায়চারি করেছিলো অনেক্ষন। কিন্তু আমাদের তখন পার্থিব কোন কিছুতেই কোন খেয়াল ছিলো না। বাস্তবে ফিরলাম যখন, বাইরে না হলেও ভেতরে ভেতরে জীবনটা আমাদের একেবারেই পাল্টে গেছে। কেউই আমরা তখন একে অপরের কাছে স্বীকার করিনি কিছু, বরং জোর দিয়ে অস্বীকারই করেছিলাম।
তারপর? সে অন্য গল্প, অন্য কোন সময়ের অন্য কোন বাস্তবতায়। হবে নাহয় অন্য কোন দিন, আজ এটুকুই থাক।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন