বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

একদা কর্পোরেট - ১

২০০৬/৭ এ বাংলাদেশের আইটি জগতে তোলপাড় ঘটালো Joomla আর Elance আর Guru।  রাতারাতি ঢাকায় ওয়েব ডেভেলপমেন্ট প্রোফেশনালদের প্লাবন বয়ে গেলো, যেকোন যায়গা থেকে পাশ করা প্রোগ্রামার চলবে যদি PHP/MySQL জানা থাকে। আর বিবিএ পার করা বা এমবিএ শুরু করা ছেলেরা (মেয়েরা নয়) রাতারাতি পার্ট টাইম মার্কেটিং হয়ে গেলো, অফলাইন ছোটাছুটি আর অনলাইন বিডিং। হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলাম, আমি একজন বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ, আমার প্রোডাক্ট জুমলা বেসড ওয়েবসাইট এবং আমি জুমলা তো দূরের কথা PHP'র নামই কখনো শুনি নি।

এবং বলা হলো জুমলা শিখতে আমাকে কোন হেল্প করা হবে না, নিজে হাতিয়ে শিখতে হবে,  দয়া করে xampp ইন্সটল করে দেয়া হলো। ওরে ভাই আমার লাইফে আমি  জুমলার চাইতে ইউজার ফ্রেন্ডলি কোন ওয়েব এডমিনিস্ট্রেশন বা CMS এ দেখিনি, আমার মত নাম না শোনা পাব্লিকও ১ মাসে পুরো এডমিনিস্ট্রেশন বুঝে গেলো। আরে ভাই শ্রেফ সেটিংস চেঞ্জ করে গোটা ওয়েবসাইট পালটে দেয়া, আনবিলিভেল বাল।  সেই সময়ে বাংলাদেশের লোকাল মার্কেটে ওয়েবসাইট কোন প্রোডাক্ট না, কারণ এ নিয়ে ব্যাবসায়ীদের মাথা ব্যাথা নেই, ওয়েবসাইট দিয়ে কি বাল হয়। এখন আমি তো ত্যানা প্যাঁচানো কথায় এক্সপার্ট না, আমি টেকনিকাল এক্সপার্ট মার্কেটিং, তাই একজন সিনিয়র মার্কেটিং ধরিয়ে দেয়া হলো আমার সাথে, যে রিয়েল এস্টেট দালালের অফিসে ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেল করতো, আর আমার ক্লাসমেট।

আমি যেহেতু টেকনিকাল, প্রথম দিন বোঝাতে গেলাম, জুমলা কি। আধা ঘন্টা কি একঘন্টা ধৈর্য্য ধরে শুনলো, তারপর হাত তুলে স্টপ সাইন, বাঁড়া, থাম, আমারে ক, এইটা দিয়া ওয়েবসাইট বানায়, যার ওয়েবসাইট হেতে পিছে বইয়া পুন্দাইতে পারবো, এই তো বেসিক? আমি বললাম, হ্যাঁ। বললো, আমারে গোটা ৫০ টেকনিকাল শব্দ ক, মুখস্ত কইরা লই। সে সিরিয়াসলি মুখস্ত করে ফেললো। আমাদের অফিসে সাকুল্যে ৩ জন, একজন সিইও, দুইজন মার্কেটিং, এখনো প্রোগ্রামার নেই। আমরা মার্কেট যাচাই করতে বেরোই, এই মাল চাহিদা ক্রিয়েট করা যাবে কিনা, দাম কেমন হলে ভালো হয়। যারা ওয়েবসাইট চেনে বা যাদের আছে, তারা যানে ওয়েবসাইট আসলে কয়েকটা পাতা, পেজ, যত বেশি পেজ তত দাম।  প্রথমে আমার সঙ্গী শুরু করতো, বেসিক ব্যাপারটা হচ্ছে,  অসম্ভব দ্রুত গতির চাপাবাজী ঐ ৫০ টা শব্দ ব্যবহার করে, প্রোসপেক্ট তো প্রোসপেক্ট, আমিই মুগ্ধ। এরপরেই, একচুয়াল ব্যাপারটা আপনাকে আমার কলিগ বোঝাবে, আমি ১৫ মিনিট টেকনিকাল কচকচি। প্রায় ৬ মাস প্রায় সমস্ত ইন্ডাস্ট্রির অন্তত ৫০ টা করে অফিসে ঘুরলাম,। আমার কলিগ থেকে শেখা, প্রথম দুইদিন প্রচন্ড খাটতে হবে, দিনে ৫ টার বদলে ১০ টা অফিস ঘুরতে হবে, জমা দিতে হবে ৪ টা রিপোর্ট, বাকিগুলো হাতে থাকবে, এবার পরে ২/৩ দিন কাজ না করে, অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের কাজ, আড্ডাবাজী এসব করতে হবে, আর সময়মত গিয়ে ঐ আগের হাতে রাখা ভিজিটগুলো জমা দিতে হবে। মাঝে মাঝে এমন হতো, কিচ্ছু করার নেই, আমরা দুজনে হলে ঢুকে সাকিব খান, শাবনুরের ছবি দেখতাম, ৩ ঘন্টা স্পময় তো কাটতো

কিন্তু, ২০০৮ এও যখন একটা ওয়েবসাইট ৫ পাতা, ৩০০০ টাকা মার্কেটে চলছে, সেখানে ২০০৭-এর গোড়ায় স্পেশালাইজড জুমলা ওয়েবসাইট কি করে মার্কেট পাবে। আমরা হতাস, ঠিক এমন সময় চোখে পড়লো Elance, আরিসসালা, সিম্পল জুমলা সাইট ৫০০ ডলার, ৪০০০ ডলার পর্যন্ত কাজগুলো তে জুমলা খাটানো যাবে, আমরা ১০০০০ টাকায় বেচতে পারি নি লোকাল মার্কেটে। কিন্তু বিড করতে হবে, মার্কেটে ভারতীয় টিমই প্রায় সব, মানে বিডিং এ তাদের প্রাইসটাই বেঞ্চমার্ক। আহ ২০ ডলারে ৪০ কানেক্ট, সর্বোচ্চ ৪০ টা বিড, কপাল কপাল সবই কপাল। প্রোজেক্ট বাছাই, খুঁটিয়ে খুটিয়ে বোঝা, বেশি পোঁদপাকা রিকয়ারমেন্টস থাকলে দুরু দরু বক্ষে পিএম, এগুলো পাওয়ার সুযোগ বেশী, নিজেদের মত করে ক্লায়েন্টের রিকয়ারমেন্ট ডিজাইন করা যায়। যাই হোক দ্বিতীয় মাসেই ১০৭০০ ডলারের ৪ টা কাজ পাওয়া গেলো, বাঁড়া ৮ মাসে এই প্রথম সরাসরি মার্কেট থেকে কাজ বের হলো, কিন্তু আমাদের প্রোগ্রামার নেই,  প্রোগ্রামার রিক্রুট, তাড়াহুড়া, আমি বিডিএম থেকে লজিস্টিক্স, ম্যাটেরিয়াল, একেকজন ৩/৪ রকম দায়িত্ব। আমাদের গোটা সেটয়াপই দাঁড়িয়ে গেল।

এমন অজস্র ছোট ছোট ফার্ম শুরু করেছিলো, সেসময়, হয়তো নিজের বাড়ির ড্রয়িংরূমটাই প্রথম অফিস। অনেকেই দাঁড়িয়েছে আজ, কেউ মার্জ করেছে, কেউ নিজেই ফুলে ফেঁপে বেড়েছে। এই ২০১৫ তে তো এখন প্রায় ঘরে ঘরে ফ্রিল্যান্সার, প্রোগ্রামার, কিন্তু তখন, সেই পাইওনিয়ার যুগে, তখন খুবই রোমাঞ্চকর ছিলো, সবাই ফরমাল গেটাপে  মার্কেট ফার্কেট ঘুরে ঘাম ঝরাচ্ছে, আমরা জিন্স টি শার্ট চপ্পল পরে, এমনকি চাইলে লুঙ্গী পরে ঘরে বসে আম্রিকান ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেল, এসটিম, সেটার কোন তুলণা নেই। আমি সেই যে প্রেমে পড়লাম, এমনও পড়া পড়লাম, আজও হাবুডুবু খাচ্ছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন