রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৫

আমি ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হলাম কেন?


--------------------------

এক কথায় বলতে গেলে বিশ্বাস রাখার কোন কারণ ফাইনালি খুঁজে পেলাম না তাই। সব ঠিকঠাকই চলছিলো, ধর্ম বইয়ে, ইসলাম, পৌত্তলিকতা, মুসলিম, কাফের, মুশরিক শিখছিলাম। কলোনি লাইফ, মেরে  কেটে ৩/৪ শ ফ্যামিলি, বাড়ির পাশে হিন্দু, বৌদ্ধ। নিজের দুই একজন হিন্দু বন্ধু, তারা বন্ধু না, হিন্দু বন্ধু। শুক্রবার জুমার    নামাজ, আড্ডা, ক্লোজ ফ্রেন্ডরা  সব মুসলিম। ঐ বড় হতে হতে নামাজের হালকা চাপ, এমন কিছু না, পড়তামও না, কিন্তু মুসলিম তো। নাস্তিক ঘৃণার পাত্র জানি, আজাদ, আহমেদ শরীফ, তসলিমা, নাস্তিক, ওরে বাবা, ওহহ মাথার দাম ঘোষনা করা হয়েছে সালমান রুশদি। হেব্বি মডারেট মুসলিম এটমোসফেয়ার।

ছোট থেকে হিন্দুদের সম্পর্কে শুনছি, ওরা বাঞ্চোত, মালু কা বাচ্চা কভি নেহি আচ্ছা যো ভি আচ্ছা ও শুয়ার কা বাচ্চা,  প্রচলিত কথা। পুজোর দাওয়াতে পাওয়ার পরে শুনতেই হবে হিন্দুদের খাবার এমনি এমনি খাওয়া নাকি ইসলাম বিরোধী, হ্যাঁ বিনিময়ে কেনা যায়। খেয়ে আসার পরে ওদের রান্না অদ্ভুত, নাড়ুতে কর্পুর দেয়। মানে যেভাবেই হোক আমি যে ধর্মীয় সুপিরিয়র, সেটা আমাকে বুঝতেই হবে। বৌদ্ধ ফ্যামিলি একটা ছিলো, ওদের অন্য জীব মনে করা হতো। মানে শ্বাস নেয়ার মত করে শিখছিলাম, আমরা সুপিরিয়র, বাকিদের থেকে। তবে আমার পোষাচ্ছিলো না, মানে যা শিখছি, তা তো শিখবোই, শুধুই পরীক্ষা দেয়ার জন্য ক্লাসের বই পড়তে হয়েছে না? ঠিক তেমন, পোষাচ্ছিলো না। আমি পার্থক্যের কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, ওকে আল্লাহ মানে না, নবীর উপরে কষ্ট, মূর্তিপুজা, মানে করছে তো কিছু একটা, তো, সমস্যা কি? মানে আমরা কি এমন, আমরা বেহেশতে যাবোই, বাকিরা কেউ যাবেই না। পোষাচ্ছিলো না , তাই ভাবছিলাম এসব বানানো কথা, ইসলাম নাকি সর্বশ্রেষ্ট জীবনব্যবস্থা, কুরান সবকিছুর উত্তর, তো এমন কথা থাকতেই পারে না।

আসলে ছোট থেকেই পাকামির কারণ হচ্ছে, আমি ঐ একা একা চুপচাপই মানুষ একরকম, স্কুল আর বিকালে ২ ঘন্টা ছাড়া একা তো, মানে অলস ভাবনার পচ্চুউউর সময়। নবীদের কাহিনী পড়তে ভালোই লাগতো, বারবার পড়তাম, মানে ঐ মহাভারত, ওডিসির চিলড্রেন ভার্শান পড়তে যেমন ভালো লাগতো, তেমন ভালো, মাইথোলজি আমার খুব প্রিয়। গোলটা বাধলো, ক্লাস নাইন ফাইনালের পরে। পরীক্ষা শেষের অবসর সময়টা কুরান একবার পড়ে খতম করার জন্য হুজুরের কাছে যাওয়া ধরলাম। আমরা বিভিন্ন বয়েসী ছেলে বুড়ো, নিয়ম কানুন ইত্যাদি।  মাঝে গ্যাপ দিয়ে,  এস এস সি শেষে আবার শুরু, তখন ভাবলাম, সময় তো আছে, আর পড়েছি অর্থ বুঝে পড়তে গেলে ডাবল ছওয়াব। আমার উপরর অগাধ আস্থা, হুজুরের, আমি নিজেই পড়ে নিতে পারবো, মাঝে মাঝে একটু দেখিয়ে নিলেই হবে। অর্থ আর তাফছির বুঝে পড়তে গিয়ে ঘেঁটে গেলাম। আরে আসলেই তো, বেহেশত শুধু আমাদের, আমরাই সঠিক বাকিরা ভুল, যদি সঠিক পথে না আসে, দোজখের জ্বালানি, দে আর ডুমড, ধ্যুস এমন সম্ভব নাকি। মানে কেমন কথা, মরার পরে আমরা বেহেশতে যাবোই, ওরা, এত ভালো মানুষটা মুসলিম না তাই দোযখ। এমন আরো কিছু খটকা, হুজুরের উত্তর পছন্দ হয় না। রোজা মাফ হবে না, অসুস্থতা, দিনমজুরি কিছুতে কিছু এসে যায় না, করতেই হবে, নয়তো শাস্তি হবেই, এমন আনকনসিডারেশন। যাই হোক আমি উটপাখির মত মুখ গুঁজে নিলাম বালিতে, কুরান বাকিটা আর পড়লাম না, খতম দিলাম না, হুজুরকে বললাম একদিন শেষ, বাড়িতেও তাই জানলো, মিষ্টি খাওয়ানো হলো লোকজনকে। আমার বদ্ধমূল ধারণা আমি কোথাও ভুল, কুরান ঠিক আছে।

এর পরে পরেই বদলি, কলেজে আমার ক্লোজেস্ট দুই ফ্রেন্ডই হিন্দু, কিন্তু শালা ইসলাম তো খোঁচাচ্ছে, খুঁচিয়েই যাচ্ছে,  তবে ঐ দুই বছর আসলে ইসলাম কে পাত্তা দেয়ার, নামাজ পড়ার কোন টাইম ছিলো না  জুমা পর্যন্তই। পারফেক্ট মডারেট মুসলিম। ইন্টারের পরে, বন্ধুর থেকে ইসকেনের গীতা পেলাম, ভাব সম্প্রসারণ সহ। ওরেএএ ভাব সম্প্রসারণেও দেখি একই কেস, ঘুরে ফিরে বলা হচ্ছে, হয় হিন্দু হও, নয়তো নরকবাস। বাকি সব ভুল পথ, হিন্দুত্বই আসল পথ। খ্রিষ্টানরাও জানলাম তাই প্রচার করে। নিলক্ষেতের ফুটপাতে ৩০ টাকায় বাইবেল পেয়েছিলাম একটা, পড়তে গিয়ে দেখি, ইয়ো ম্যান, ইহা ধর্মগ্রন্থ? এ তো কপমপ্লিট রূপকথা, মাইথোলজি, এসব মাইথোলজির থেকে গ্রিক নর্স মাইথোলজি অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং। আমার তুলণামূলক ধর্মতত্বের এখানেই ইতি। ধারণা হলো, সব ঘুরে ফিরে একটাই ইশ্বর, সবাই যখন সাদা আর কালো দেখাচ্ছে, তো আল্লাহ ইজ ওকে, আই এম ফাইন উইথ আল্লাহ।

খানিকটা সুফী ঘরানায় ভেবে ফেললাম, ঐ নামাজ পড়েও কেউ কিছু পাচ্ছে  বলে দেখছি না, পার্থিব সাচ্ছন্দ তো উপরির টাকাতেই, নামাজ পড়ে হজ্জ্ব করে নাকি সওয়াব গুনাহ ব্যালান্স করছে। আমি তো গুনাহ বলতে কিছুই করছি না, তাহলে নামাজের দরকার কি? আর চাইতেই যদি হয় আল্লাহর কাছে, নামাজ পড়েই চাইতে হবে কেন? এমনি নিজের মত করে চাইলেই তো হয়। কিন্তু শালা কিছুতেই কোন কাজ হয় না, আল্লাহ বা অন্য কোন ঐশ্বরীক ফর্মকেই কিছু করতে দেখি না। তো সিম্পলি কেটে পড়তে থাকলাম, ইসলামের সবকিছু থেকে। বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বিজয়ার মঙ্গলঘট নিয়ে যাত্রাতেও আপত্তি নেই, আমাকে লক্ষীপুজোর ফল কাটার দায়িত্ব দিলেও আপত্তি নেই, খ্রিষ্টানরা কি করে প্রার্থনা করে বুঝতে চার্চে গিয়ে হাঁটু ব্যাথা করাতেও আপত্তি নেই, মিলাদে যাওয়া, ঈদের নামাজ পড়াতেও আপত্তি নেই। সর্বংসহা, সকল ঈশ্বরই আমার,  আলাদা ধর্ম আলাদা ঈশ্বর বিলীন হয়ে গেলো।

যতদিন যেতে লাগলো, ধর্মীয় রিচুয়াল একেবারেই অফ করে দিতে লাগলাম, জুমা, ঈদের নামাজও বাদ। প্রচন্ড সংশয় আমার ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তকে, আর সেগুলোতে বলা ধর্ম আর ঈশ্বরের কনসেপ্টে। এটুকু খেয়াল করে দেখলাম, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ছাড়া এরা আর কিছুই দিচ্ছে না, আর সবই মোল্লা পুরুতের হাতে বন্দী। সাধারণ মানুষের কোন ধারণাই নেই ধর্মের ভেতর সম্পর্কে, মোল্লা পুরুত যা যেভাবে বলবে সেটাই ধর্ম। সেখানেও আবার সবাই একমত নয়। সুন্নী শিয়াকে ভুল পথ বলছে, কাদিয়ানিদের মুসলিমত্ব খারিজ, শৈব শাক্তরা মারপিট করছে, খ্রিষ্টানরা ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, অর্থডক্সে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। সৌদি, নবীর দেশ, যেখানে লোকে  হজ্জ্বে যায়, তারা ইসলামের মা বোন এক করে দিচ্ছে খেয়াল খুশিমত। বালের ধর্ম। যতক্ষন নিজে না বুঝবো, আমি এর মধ্যে নেই। মোল্লারা যা বলবে তাই শুনতে হবে, অথচ ওরা পৃথিবীর সাথে আপটুডেট নয়। দিনমজুর রিকশাওলা রোজা রেখে খাটতে পারবে না, না খাটলে খালি পেট পরিবারের, অথচ রোজা মাফ নেই, এমন অমানুষিকতা, আর আবালতা ঈশ্বরের পক্ষে দেখানো অসম্ভব, এজিউমিং ঈশ্বর আছেন।

এহেন সময় এই ২০০৯ এর শেষে  এসে এর মধ্যেই সুসংগঠি বাংলা ব্লগোস্ফেয়ার আমার নজরে এলো, মনে হলো এতদিন যেন এর অপেক্ষাতেই ছিলাম। আমি হুমায়ুন আজাদ পড়িনি, আরজ আলি মাতুব্বর, হিচেন্স, ডকিন্স কিচ্ছু পড়িনি, খন্ডের পরে খন্ড  ইবনে কাসির পড়িনি, কিন্তু নিজে নিজে যা রিয়ালাইজ করেছি, সেটা যে অনেকেই রিয়ালাইজ করে আগে সেভাবে বুঝিনি। বহু কিছু শিখলাম, জানলাম, বুঝলাম, নিজের ধারণা কে সংগঠিত করলাম, সচলায়তন
দিয়ে শুরু করে,  মুক্তমনা, সামু, আমু হয়ে ধর্মকারী পর্যন্ত। ধর্মকারীকে অফেন্ডিং মনেই হলো না, আমি তো উপভোগই করতে থাকলাম। বিশেযষ করে থাবা আর কৌশিক এর কাজগুলো। বছরখানেকেই বুঝে গেলাম, ধর্ম আসলে আমি যা ভেবেছি তাই, কোনভাবেই ঈশ্বরের পাঠানো হতে পারে না। তাহলে?  ঈশ্বর হয়তো প্রত্যেকের নিজস্ব পারসোনিফিকেশন। যে যেভাবে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করবে ঈশ্বর তেমন। তাহলে সব ধর্ম মিথ্যা, সব ধর্মের ঈশ্বর মিথ্যা, কারণ ঈশ্বরের সার্বজনীনতা না থাকলে সে ঈশ্বর হতেই পারে না,  আর সার্বজনীন হতে গেলে রুল বুক চলে না।

তো আমি ২০১০ নাগাদ, পরিপূর্ণ কনফিডেন্সে নিধার্মিক। ঈদ সামাজিক উঠসব হতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় রিচুয়াল থাকতে পারে না।  ফ্যামিলি থেকে আমি একটু দূরে বহুদিনই, তাই আমার অধর্মাচরণ বিশাল প্রশ্নবিদ্ধ কখনোই হয় নি। আর আমি বরাবরই ঠোঁটকাটা, যে কোন কিছু নিয়েই বলে বসি, পাত্তা দেয় না কেউ, তাই সমস্যাও ফেস করিনি। যাই হোক, ধর্ম গেলেও ঈশ্বর রয়েই গেলো। অনেকটা এমন ধারণা, হয়তো পৃথিবী বা মহাকাশ, সিম্পলি একটা প্রোগ্রামড সিস্টেম, হয়তো বিবর্তন একটা ট্রায়াল-এরর সিস্টেম। সো এবার ঈশ্বরকে খুঁজতে হবে। প্রচুর পড়াশুনা শুরু করলাম, আমাদের বাংলা ব্লগো জগৎ রেফারেন্সে রেফারেন্সে পরিপূর্ণ, হয়তো এক করা নেই, কিন্তু ইচ্ছা থাকলে, রেফারেন্স বই আর লিঙ্কের বিশাল ভান্ডার হাতের মুঠোয় আনা যায়। ঈশ্বরের কনসেপচুয়েশন পড়তে থাকলাম। পড়তেই থাকলাম, আর অবাক হতেই থাকলাম, সেই নিয়ান্ডার্থাল যুগ থেকে সামহাও তাদের মধ্যে ভয় বা আকাঙখা কিছু একটা থেকে সুপিরিয়র বিং এ বিশ্বাস শুরু, আজও ফর্মেশন চলছেই। আর ঈশ্বর নামে কেউ থেকে থাকলে সে বসে মজা দেখছে, এবসার্ড, সৃষ্টিকর্তা হলে সামান্যতম কনসার্ন থাকবে, সুতরাং সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর বলতে কিছু নেই। বাকি রইলো ঈশ্বর নামক কনসেপ্ট। যদি সৃষ্টিকর্তাই না হবে, সৃষ্টি নিয়ে কোন কনসার্ন না থাকবে, তবে ঈশ্বর দিয়ে আমি বা আমরা কি করবো? ঈশ্বর কি তাহলে শুধুই স্পিরিচুয়াল প্লেইনে থাকে? মানে আমি নিজেকে যেভাবেই হোক উন্নত করবো, তার জন্য ঈশ্বর একটা ফোকাস পয়েন্ট? তবে তও আমার উপরে ঈশ্বর নির্ভরশীল, আমি ফোকাস করলে আছে, না করলে নেই। তাহলে ঈশ্বর নিয়ে কেয়ার করার কি আছে? থাকলেই কি?  না থাকলেই কি? উই আর অন আওয়ার ঔন।

এই তো, এভাবেই আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললাম। ধর্মকে সমাজের সরাসরি শত্রু ভাবি, ধর্ম আর ঈশ্বরকে গোলাই না, ঈশ্বরকে দূর্বলের আশা আর ভ্রান্তি ভাবি। আমার কোন ধর্ম বা ঈশ্বর প্রয়োজন নেই। অন্যকে অযথা সময় এসবের পিছে নষ্ট করতে দেখলে খারাপ লাগে, অনেক কিছু বলার চেষ্টা করি। আমায় নাস্তিক ভাবলে নাস্তিক, নিধার্মিক ভাবলে নিধার্মিক, নিরিশ্বরবাদী ভাবলে তাই। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন