রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৫

যাপিত জীবন - ১

সন ২০০৬, ফেব্রুয়ারি। সব ছেড়েছুড়ে লাইফে প্রথমবারের মত সিরিয়াসলি পড়াশুনা করছি। কারণ, প্রথমত এই পড়াশুনায় পড়ার চাইতে আড্ডার সুযোগ বেশি, দ্বিতীয়ত নিজের উচ্ছৃঙ্খলতায় সাময়িকভাবে ক্লান্ত, তৃতীয়ত  মাসখানেকের মধ্যে বিয়ে করে ফেলবো বলে সপ্তাহখানেক আগে ডিসিশন নিয়েছি, স্বাভাবিক লাইফের প্রাকটিস চালানো জরুরী, কাজে দিতে পারে। তাতে আমার হাউজমেটদের কি? তারা আমার নাকের ডগায় বসে দিব্যি সব চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে, ফাইনাল এটাকের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে, বিএনপি সরকার খড়গহস্ত, ধরছে আর ভরছে, যা তা অবস্থা।

এহেন এক দুপুরে আমার এক রুমমেট এবং বহিরাগত এক বন্ধুর সিদ্ধান্ত নিলো মেলাদিন পাতা গালানো হয় না, আজ গালাবে, মোহাম্মদপুর টাউনহল স্পটে যেতে হবে। আমি ছিলাম স্পটে যাওয়ার সেফটি মাস্কট, এন্টি ঠোলা চার্ম সমৃদ্ধ, তাই অনেক অনুরোধ করা হলো আমাকে সঙ্গে যেতে। আমি কানে ধরেছি অনেক আগেই, নো পাতা, নেভার এভার। কিন্তু ভেবে দেখলাম, অলস বসে আছি, তাছাড়া ওরা যখন কিনতে যাবে, সেই ফাঁকে আমি নাহয় এপার থেকে দু' পোঁটলা ইয়ে নিয়ে নেবো। টাউনহলের সামনে রিকশা থেকে নামলাম যখন, দেখলাম ওপারেই মামার গাড়ি দাঁড়ানো, ব্যাপার্না, এখানে সব সময়ই থাকে। আমার কাছে মোবাইলগুলো জমা রেখে ওরা দুজন গেলো, আমি তিরিশ টাকা দিয়ে দুই পোঁটলা কিনে ফেললাম ওরা চোখের আড়াল হবার আগেই।

মামার গাড়ি থেকে ৫০ গজ মত দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে গেম খেলছিলাম। আধাঘন্টা পরে যখন ওপারে দেখলাম ওরা আসছে, আমি গুটি গুটি পায়ে মামার গাড়ির দিকেই এগিয়ে গেলাম রিকশা নিতে। ভাড়া ঠিক করে ফেলেছি, এমন সময় পেছন থেকে বাঁজখাই আওয়াজ, হ্যালো। না ঘুরলেও পারতাম, কিন্তু রিকশাওলার চেহারার দিকে তাকিয়ে ঘুরতেই হলো, দেখি মামা ডাকছে। মামার ডাক অগ্রাহ্য করা যায় না, গেলাম, আর আমায় খপ করে ধরে বলে জিভ দেখি। অবাক হয়ে জিভ দেখাতেই বলে, এই শালা ডাইলখোর গাড়িতে ওঠ। আমি খুব খুউউউউউব আহত বোধ করলাম, আমি কোন কালেই ডাইলখোর ছিলাম না।  লাস্ট ২ বছরে আধাখানাও খাই নি,  অপমানকর ব্যাপারস্যাপার। ঠেলে গাড়িতে তুকে দিলো রে ভাই। আরো দুই তিনজন বসা, সাথে এক কনস্টেবল, আমি অপমানিত, তারেই জিগাইলাম, আমার জিভ দেখে ডাইলখোর লাগে? পালটা জিগায়, বাইরে কি ডাইলখোর কইলো? তাইলে হ।

আরো একজনকে তুলে আধা ঘন্টা পরে থানায় জমা দিয়ে দিলো। আমার মত অন্তত ১০/১২ জন রেন্ডম মানুষ। আমার মানিব্যাগ, ৩ টে মোবাইল, যার দুটোর নাম্বার মুখস্ত না, সব জমা দেয়ায়, বার বার কল আসছে। ইনচার্জ একবার রিসিভ করে জানিয়ে দিলো, উনি এখন মহাম্মদপুর থানায়। ব্যস দিলো ভরে লক আপে। লক আপ ভর্তি, কোন একটা মানুষের সাথে আরেকজনের মিল নেই
। সরকারের নির্দেশ, ডেলি থানা পিছু ৩০০ মানুষ কোর্টে তুলতে হবে, আওয়ামী লীগের মহাসমাবেশ থামাতেই হবে। পুলিশ এত মানুষ রোজ কোথায় পাবে? তাই যেখান থেকে যেমন পারছে ধরছে। কেউ হয়তো দুপুরে ভাত খেয়ে বাড়ির নিচের দোকান থেকে সিগারেটটা নিয়ে ধরালো, পুলিশে তুলে নিয়ে এলো
। ঢাকার কাজ সেরে ফেরার গাড়ি ধরার জন্য দাঁড়ানো, তুলে নিয়ে এলো। এলাকার উঠতি মাস্তান নাপা, সবে তিনমাস পরে হাজত থেকে সকালে ছাড়া পেয়েছে, সে মেনেই নিতে পারছে না, থানার চোদ্দগুষ্টি চুদে যাচ্ছে সমানে।

এক লকয়াপে আমরা প্রায় ৩০/৩৫ জন। এর ঐ দুই ফ্রেন্ড একবার দূর থেকে দেখে নেই। আমার সিগারেট আর পোটলা দুইটা নেয় নি। পুরো পরিস্থিতি বুঝে দেখলাম,  বের হবার আপাতত: কোন উপায় নেই, রাতের মধ্যে বেরোতে না পারলে, সকালে কোর্টে চালান, ১মাস, তবে জামিনযোগ্য। আমি একটা গ্রুপ বেছে নিয়ে সিগারেট বিলি করলাম, খাতির করা শুরু করলাম। জানলাম সন্ধ্যা পার হলে গাঁজাও চলবে।  বাহ! আর কি চাই। এর মধ্যে ফ্রেন্ডরা এলাকার বড়ভাই নিয়ে দেখা দিয়ে গেল, পাউরুটি কলা হ্যান্ডওভারের ফাঁকে জানা গেলো, কোন লাভ নেই, ওদের পক্ষে হচ্ছে না, খাতিরওলা সাব ইন্সপেক্টর কিছুই করতে পারবে না।

আমার পকেট থেকে দুই পোঁটলায় ৬/৭ টা স্টিক হবে, ৭/৮ জন,  পরিস্থিতি বিচারে অনেক কিছু। ৮/৯ টার মধ্যে পরিস্থিতি থিতিয়ে এলো, ৪ টা লক আপ প্রায় ১৫০ লোক। গান, খিস্তি, হাসি, খুচরা আলাপ, চলছে। দু' পিস গান আমিও শুনিয়ে দিলাম। ১০ টা নাগাদ নিশ্চিত আর হলো না। জামার বোতামগুলো খুলে, সারা রাতের প্রস্তুতি নিলাম। এর মধ্যে হট কানেকশন ওয়ালা ২/৩ জন করে বেরিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সাড়ে ১০ টায় সামনে অফিসে হৈ চৈ,  উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখা গেলো কালো ড্রেস মানে RAB। আমরা ভাবলাম কোন এক জাঁদরেল মাস্তান বোধহয় ধরে নিয়ে এলো। কিন্তু এ কি! ড়্যাবের পোশাক পরা ঐ কুৎসিত দেখতে লোকটা তো আমার এক নানা, মানে মায়ের দূ:সম্পর্কের চাচা। , তবে কি? হ্যাঁ, আমার দিকে যেই তাকানো টা দিলো, আমার আর কিছু বলার মত নেই। আমি সবার থেকে বিদায় নিয়ে নিলাম, ভাই ড়্যাব হাজির, আমি বের হলাম। হেব্বি পপুলার হয়ে গেলাম, নগদে।

এরপরে থানা অফিসে গিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়া, মালপত্র বুঝে নিয়ে বের হওয়া, সামনে উদ্বিগ্ন চেহারায় হবু বউ, চোরের মত মুখ করে দাঁড়ানো ৩ ফ্রেন্ড। জানা গেল,  ড়্যাবের কথা বউয়ের মনেই প্রথম আসে,  বিকেল নাগাদ ইউনি তে
গিয়ে খবর পাওয়ার পরে।  আমার নানা তখন অপারেশনে, মেলা কাপ কায়দা করে ধরে আনা। এই নিয়ে বউয়ের সাথে বিয়ের আগেই ডিভোর্স হয়ে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি এই লীগ গভমেন্টের আগেরটা পর্যন্ত মহাসমাশের ডাক শুনলেই গৃহবন্দী থাকতাম। ফ্যামিলিতে রেপুটেশন যেটুকু বাকি ছিলো, সেদিনই শেষ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন