মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৫

আইডেন্টিটি ক্রাইসিস

আমি একজন মানুষ, আমার জীবগত পরিচয়, আর দশজনের মতই মানবিক গুন দোষে পরিপূর্ণ, কারো চাইতে কম, কারো চাইতে বেশি। আমার একটা নাম আছে, জন্মের পরে দেয়া হয়েছে, আমার পছন্দে নয়, অন্য কারো পছন্দে, সেটাই সমাজস্বীকৃত পরিচয় আমার। কি বাচক পরিচয়? গুনবাচক? দোষবাচক? আমার চরিত্রবাচক? একটা নামে কি বোঝা যায়? আমার বয়েস? আমার ভাষা? আমার ভাবনা? আমার চিন্তা? আমার পরিস্থিতি? কিছুই বোঝা যায় না, কিচ্ছু না। আমি একটা চরিত্র, আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আমার প্রকাশভঙ্গী, আমার ভাবনা, সবকিছু আমার মধ্যে, আমার নামের মধ্যে নয়। আমার নাম, যদি কচটতপ হয়, তবুও আমি যে, খছঠথফ হলেও আমি সেই চরিত্রই থাকবো। তাহলে নামে কেন আইডেন্টিটি থাকবে? আমার ভাবনার প্রকাশে আমার আইডেন্টিটি। আমার আইডেন্টিটি আমার লেখায়, আমার ভাষায়, আমার যুক্তিতে, আমার দর্শনে, আমার তর্কে,  আমার বিতর্কে, আমার আবেগে, কতগুলো অসংলগ্ন অক্ষর মিলে ছোট্ট এক বা একাধিক শব্দের তৈরী কোন নামে নয়।

আমার একটা চেহারা আছে, মুখ, উচ্চতা, শরীরের গড়ন মিলে। কেউ সামনে থেকে দেখবে, কেউ ছবিতে, দেখেই চিনবে, বুঝবে আমি। কি চিনবে? কি বুঝবে? আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য? আমার সামাজিক অবস্থান? আমার বর্তমান আবেগ? আমার সুখ? আমার দু:খ? আমার আনন্দ? আমার কষ্ট? আমার ভালো লাগা? মন্দ লাগা? বোঝা যায়? আমি আমার সব কিছু গোপনও তো রাখতে পারি। কষ্টের মুহুর্তে হাসতে পারি, আনন্দ চেপে রেখে রাগ দেখাতে পারি, সামাজিক অবস্থানের কথা না ভেবে, উপরে বা নিচে যে কোন লেভেলে থাকতে পারি। নিজেকে সবার থেকে সম্পুর্ণ আড়াল করে রাখতে পারি সবার মাঝে বসে। দেখে চেনা গেলো আমায়? বোঝা গেলো? সামনে দেখে? ছবি দেখে? কিন্তু মন থেকে যদি আমার চেহারা মুছে ফেলা যায়, যদি আমি শুধুই একটা চেহারাবিহীন মানুষ হই, হিউম্যান বিং,  আমার ভাবনাকে যদি আমি প্রকাশ করি, আমার আবেগকে বুঝতে দিই, আমার মনের অবস্থা বুঝতে দিই, তখন? যাবে তো আমাকে বোঝা , চেনা। আমাকে দেখতে  হবে কি তখন? আমার চেহারার বর্ণনা লাগবে কি?

বিশ্বাসযোগ্যতা, হ্যাঁ, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নাম না জানলে, চেহারা না দেখলে বিশ্বাসযোগ্যতা কি? নাম, পরিচয়, চেহারা দেখেই না বিশ্বাস করা যায়, বিশ্বস্ততার প্রধাণ অনুসঙ্গ। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে বিশ্বাস করা যায়, আস্থা রাখা যায়। যার নাম জানি, যাকে দেখেছি, খুব সহজ তাকে বিশ্বাস করা। তারপর? সেই নামে চেহারায় পরিচিত মানুষটা কি বাই ডিফল্ট বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখে? বন্ধু, স্বজন, পার্টনার, সন্তান, সবাই শতভাগ বিশ্বস্ত? কেউ নিশ্চয় বিশ্বাস ভাঙে না, অবিশ্বাস্য আচরণ করে না, বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখে চলে? চলেছে? নিশ্চিত বুকে হাত রেখে বলা যায়? শুধু নাম আর চেহারা নেই বলে আমি কি তাদের থেকে কম বিশ্বাসযোগ্য? সব সময় ভয়ে থাকতে হবে? আমার আবেগের প্রকাশে, ভাবনার বিস্তারে, আমার অদৃশ্য ব্যক্তিদর্শনে কি বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারেই নেই? ওদের চেহারা থাকার পরেও তো বিশ্বাস ভাঙে, তাহলে চেহারার বা নামের বিশেষ কি বৈশিষ্ট্য আছে? আমি কেন বিশ্বাসযোগ্য নই?

আর রইলো, উপস্থিতি, সাহচর্য্য, ছুঁয়ে দেখা,  অনুভব করা। আমার শারীরিক উপস্থিতি নেই, কথা বলার সময় আমার এক্সপ্রেশন দেখা যাচ্ছে না। আমার সাহচর্য্য পাওয়া যায় না, আমার রেগুলার এটিচুড বোঝার উপায় নেই। আমায় ছুঁয়ে দেখা যায় না,  হাতের মুঠোয় ধরা যায় না, আমার সাহচর্য্য নেই। আমার চোখ দেখা যায় না কথা বলার সময়, আমাকে অনুভবের উপায় কি?  তাহলে আমি কই? আচ্ছা আমি যদি উপস্থিত থাকতাম, তাহলেই কি আমার সার্বক্ষনিক উপস্থিতি পাওয়া যেত? অন্যদের সময় সুযোগ হতো? আমি চাইলেই আমায় ছুঁয়ে আমায় সাহচর্য্য দিতে পারতো কেউ? আমার চোখে চোখ রাখতে পারলেই কি আমাকে অনুভব করা যেত? শতভাগ সুনিশ্চিত? কে দেবে এই নিশ্চয়তা? আমার উপস্থিতি থাকলেই অন্য কারো থাকবে, ছুঁয়ে দেখার দূরত্বে থাকলেই ছোঁয়া যাবে, আমাকে অনুভব করা যাবে, সম্ভব হবে কি? আমার টাইপ করা কথা, আমার ভয়েস কোনটাই কি আমার উপস্থিতি নয়? আমার আবেগের বহি:প্রকাশ, আমার ভাবনার প্রকাশ কোনটাই আমার সাহচর্য্য নয়? আমাকে কি মন দিয়েও অনুভব করা যায় না? ফিজিকাল প্রেজেন্স চাইই চাই?

আমার নাম নেই, চেনার মত চেহারা নেই, বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, শারীরিক উপস্থিতি নেই, আমি কি নোবডি? দৃশ্যমান নই বলে অদৃশ্য? আমি কি তবে কেউ নই? আমার লিখে চলা ভাবনা কি শুধুই সাজানো অক্ষর? মনের কোন অনুভুতি কি একেবারেই নেই? সলিড ফ্যাক্ট নই বলে শুধুই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি? আমি কি অস্তিত্বহীন?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন