বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

হিপোক্রেটিক লিবারালস

১)

কপালগুণে ৮০'র দশকের গোড়ায় জন্ম হওয়াতে  ব্যাপক সুবিধা হয়েছিলো, আর বছর দুই পরে হলেই একরকম মানসিক বিকাশজনিত চোদা খেয়ে যেতাম। মোটামুটি বুঝতে শেখার পরপরই বাংলাদেশে এলো ৯০, অগ্নিঝরা ৯০, রক্তক্ষরা ৯০, রোমান্টিক ৯০, স্বপ্ন দেখার ৯০। ৯০, বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাসের সেরা পলিটিকাল মুভমেন্ট। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। ১০ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা সামরিক শাসক, এরশাদের বিরুদ্ধে প্রায় সবাই শেষপর্যন্ত একজোটে। যাই হোক,  আমরা এতো তো আর বুঝি না, আমরা সেই কোন মফস্বলের বাচ্চা কাচ্চা। আমরা ঐ নাম শুনলাম, রুদ্র, তসলিমা, মিনার, হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, আরো কত, এরা রেবেল, সব ভেঙে ফেলতে হবে। পলিটিকালরা তো পলিটিকাল, এদের লড়াই ফ্রিডম অফ স্পিচ নিয়ে। আমরা বাকস্বাধীনতা শব্দটা ১০ পার হবার আগেই শিখে গেলাম। এবং তারপরে ভুলে গেলাম। আসলে কিছু লড়াই কখনো থামে না।

আমরা বাংলাদেশের লিবারাল সমাজকেও খানিকটা ঐ প্রথম চিনলাম। তারা সবকিছুতে আছে, ডুডু'তেও আছে টামাকু'তেও আছে।  তারা সবকিছু জানে, সবখানে বড় বড় কথা তারা বলে। সবাই বলে তারা নাকি হেব্বি মাল, হোয়াট দে ডু  উই কান্ট ইভেন ড্রিম অফ। তারা মদ খায়, খেয়ে বলে বেড়ায়, অন্যরা খেলে নাক শিঁটকায়  বিয়ের সময় জাত ধর্ম মানে না, কিন্তু ধর্মীয় রিচুয়াল ঠিকই চালিয়ে যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। ঐ বয়সেই জেনে গেলাম, এরা আমাদের ধারে কাছের মানুষই না এবং হিপোক্রেসি চরম মাত্রায়, সুতরাং ওরা অফ লিমিট। আলাদা করে দুটো নাম কানে এলো আহমেদ শরীফ আর হুমায়ুন আজাদ, এরা নাকি আরো খারাপ, নাস্তিক। নাস্তিক কি? জিজ্ঞেস করা যাবেনা লোকের কাছে, কারণ ফিসফিস ককরে শব্দটা বলা হয়েছে। ডিকশনারি খুলে দেখলাম, লেখা, যে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, ঐ বয়সে প্রোসেস করতে পারলাম না।

আস্তে আস্তে বড় হতে হতে পড়লাম, শুনলাম, জানলাম, স্বৈরাচার গ্যাছে, কিন্তু গনতন্ত্রে বাক স্বাধীনতা শুধুই সাময়িক। আর জানলাম, পশ্চিমবঙ্গে সব মিলে একটা লিবারাল সমাজ আছে , সেখানে বাকস্বাধীনতা আছে, তারা যা বলে করে দেখাতে পারে, কারণ কেউ ঠেকানোর নেই। পড়ে এবং বুঝে প্রেমেই পড়ে গেলাম, গোটা টিনএজ প্রেমে পড়ে থাকলাম। তারপরে ফ্যান্টাসি হয়ে গেলো, ফ্যান্টাসিই রয়ে গেলো। ২০০০ এর বইমেলা আমার এটেন্ড করা প্রথম বইমেলা, ঢুকতেই সবার আগে দেখলাম, হুমায়ুন আজাদ, গেটের পাশেই একটা বড় প্যাভিলিয়নের সামনে বসে কথা বলছেন। লোকে জটলা ধরে শুনছে, মোহাম্মদ কি ভুলভাল লোক ছিলো। ওরে শালা এ কি অবস্থা, সব তো ঠিকই আছে, ৯০ তে যেমন ছিলো। যা খুশি তাই বলা যায়, পুরো বাক স্বাধীনতা। ৯০ এর সেই দূর্দান্ত রোমান্টিসিজম তাহলে বৃথা যায় নি? এই তো চেয়েছিলো সবাই, তাই না? কিন্তু হুমায়ন আজাদ একজনই হয়,  প্রোসেস করার সামর্থ্য তখন ছিলো না। ইনটেলেকচুয়াল লেভেলে তখনো লিবারালদেরই রাজ চলছে, তারা ধর্মেও আছে, জিরাফেও আছে, এত কিছু বোঝার আগেই সেনারিও থেকে আউট।

২)

সেনারিওতে ফিরলাম ফের ২০১০ এ। রেভলুশন ঘটে গ্যাছে ততদিনে। সেই ২০০৪ এ যেদিন হুমায়ুন আজাদ, সেই বইমেলা থেকে বের হবার পর কোপ খেয়েছেন, সবার সামনে বুক ফুলিয়ে কথা বলার  বাক স্বাধীনতা সেদিনেই শেষ, কমপ্লিটলি।   কিন্তু তাতে কি এখন অনলাইন আছে, কোন বালের লিভারাল কি বললো টাইম আছে নাকি ভাবার। সবাই বলবে কথা, প্রয়োজনে নিজের নাম ঢেকে রেখে কিন্তু বলবে। চিনলাম ব্লগার, মুক্তমনা, নাস্তিক,  মডারেশন,  নো মডারেশন। বাক স্বাধীনতার জন্য লড়াই, আর অনলাইনে ইচ্ছামত বলতে পারা, মুগ্ধ থেকে মুগ্ধ হতে লাগলাম, এই আমার কাছাকাছি, কিছু বড়, কিছু ছোট, অসংখ্য ছেলেমেয়েদের কারবার দেখে। ওফফফ, কি করছে সব। কত কি জানে এরা, কত বৈচিত্র। আমি সবার প্রেমে পড়ে গেলাম। ফাঁকে ফোঁকড়ে টুকটাক কমেন্ট করে পালটা কমেন্ট পেলে ঐ শালা কি ইলেটেড। একবার মনে হলো, ঐ বাংলায় ব্লগ নেই? থাকতেই হবে, খুঁজতে খুঁজতে পেলাম গুরুচন্ডা৯ ব্লগ সাইট। ওরে, ওরে, ওরে কি ইন্টেলেকচুয়ালিটি, আমার দাঁতে অত ধার ছিলো না, ফুটলো না, লেজ গুটিয়ে কেটে পড়লাম।

নিজেই কখন যে ফ্রিডম অফ স্পিচ, ফ্রিডম অফ থট আর পার্সোনাল চয়েস নিয়ে অনলাইন আন্দোলনে জড়িয়ে গেলাম নিজেও জানি না। মডারেটেড ব্লগে লিখবো না, নিজের নামে লিখবো, কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না ,  ছেলেমানুষি। বিরাট বড় বড় ব্লগাররা, আন্দোলন বন্ধন করে পুটকি জ্যাম করা ব্লগাররা, একদম চুড়ান্ত হিপোক্রেসি দেখিয়ে দিলো, মুখ খুলে কথা বলা ব্লগারদের ব্যান, কেন ব্যান, না এলিট ব্লগারদের সাথে হুক্কাহুয়া করে নি, মতে মেলেনি তাই ব্যান।  আরে এক বছরে সব থেকে বেশি কোয়ালিটি পোস্ট দেয়া মেম্বারকে, মতের অমিলে ব্যান,  কি বাল। ব্লগে ব্লগার চালায় না, ব্লগাররা ব্লগ চালায়, ব্লগার না থাকলে নামে কখনো ব্লগ চলে না, বুঝলো না। ব্লগের খোলস পড়ে রইলো, ব্লগারেরা ব্লগ ছেড়ে দিলো। ছেলেমানুষি ছেলেমানুষি, চামড়া এত পাতলা হলে হয় না।  যাই হোক, এখন ব্লগবিপ্লবের যুগ শেষ, বিপ্লব এখন ফেসবুকে, সবাই সেখানে, কিন্তু নিজের নামে তো চোদা খেতে হবে, তাই নিক চাই, নিক।

বেশ তো চলছিলো, শুধু তর্ক আর বিতর্ক, কাঁহাতক সম্ভব? এক জিনিসই বা কদিন ভালো লাগে। ভাবলাম, দেখিভনা লাক ট্রাই করে, ঐ যে গুরুচন্ডা৯ ফেসবুক গ্রুপ, দেখি না এবার, আমার সেইইই ফ্যান্টাসির লিবারালস, যাদের ফ্রিডম অফ স্পিচ আছে, চর্চা করে, হয়ার এনিথিং ক্যান বি সেইড, হার্ড, ডিবেটেড, আর মুক্তচিন্তার চর্চা তো বহুদিনের, ওহহহ, ফাইনালি। খুব অল্পদিনেই বন্ধু পেলাম, খুউউউব ভালো কিছু বন্ধু, খুউউউউউব ভালো বন্ধু। সবার আন্তরিকতায় ভুলেই গেলাম, আমাদের নিজেদের প্রথম অনলাইন রুল, অনলাইনকে কখনো পার্সোনালি নিতে নেই। কেন ভুলবো না, সবাই কি মনখোলা, কোন হিপোক্রেসি দেখি না সচরাচর, আর সব থেকে বড় কথা আমি অনলাইন লাইফে প্রথমবারের মত পার্টনার পেলাম। থ্যাঙ্ক ইউ পার্টনার, @Sanchari Sengupta, তুই অনলাইনে না থাকলে আমার অনেক কিছুই বলা হতো না, লেখা হতো না।

কিন্তু, হিপোক্রেসি এক অদ্ভুত জিনিস, ও থাকতেই হবে। এই যে বিরাট লিবারাল, এন্টি এসট্যাবলিশমেন্টে, পার্সোনাল চয়েসের ধ্বজ্বাধারীরা, নিজেরাও যে বিতর্কে পেরে উঠতে না পারলেই খিল্লি, তাতেও এঁটে উঠতে না পারলে ব্যান করেন, দেখে না হেসে থাকতে পারলাম না। তাঁরা মহামানব, মহাজ্ঞানী, মহাজন,  নিজেরা যা খুশি করবেন, অন্যে পারবে না,। ফ্রিডম  আর চয়েস শুধু তাঁদের জন্য, সাবস্ট্যান্ডার্ডদের জন্য নয়। তারা বন্ধুত্ব করতে পারে না, বন্ধু তাঁদের থাকে। তাঁরা ছেলেতে মেয়েতে বন্ধু, আর তাদের থাকে লাগানোর ধান্দা। তাঁরা লেখেন মেসেজ প্রদানকারী ইনটেলেকচুয়াল প্রভুখন্ড, তারা লেখে চটুল হিটসিকিং, সিমপ্যাথি সিকিং বালছাল। তাঁরা  পার্সোনাল ম্যাটারকে অনলাইনে নিয়ে আসেন। তাঁরা কিছু বললে হয় খিল্লি, আর তাদের কথা পিএ। কে কোথায় প্রেম করছে কিনা, সেটা পুলিসিং করে মেম্বার ধরে ব্যান করে দেন। কি যেন সেই ভ্যালেন্টাইনস ডে তে চাড্ডিরা বললো, প্রেম করতে দেখলে বিয়ে দিয়ে দেবে, খ্যাকস। এন্ড দে আর দা গ্রেট ইন্টেলেকচুয়াল লিবারালস। ২৪ বছর পরে এসে ফাইনালি বুঝলাম, যাহা হিপোক্রেট তাহারই অপরনাম লিবারালস, লাউ মানেই কদু, ২+২=৪।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন