রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৫

যাপিত জীবন - ২

সারারাত প্রচন্ড ঝামেলা শেষে, সেদিন যখন বাসা থেকে সাত সকালে বেরোলাম, ডিসিশন সন্ন্যাসী হয়েই যাবো। সোহরাওয়ার্দী ছাড়া যাওয়ার কোন যায়গা নেই, ঘুরে ফিরে সেখানেই গিয়ে থামি। সকাল বেলা এখানে মাল পাওয়া যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ওয়েটাতে হবে, সাড়ে ৮, ৯ বাজে পুলাপাইন এলো বলে গাঁজা খেতে। সঙ্গে ভিড়ে গেলেই হবে, এখানকার এটাই রীতি, গাঁজা না খেয়ে সোহরাওয়ার্দী থেকে কেউ ফেরে না। চুপচাপ গিয়ে বসলাম থিয়েটার গ্যালারিতে। কিছুক্ষনের মধ্যেই আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম, গাঁজা হাতে গাঁজাখোরের বদলে ছাতা হাতে প্রেমখোরের দল ঢুকছে। মনে পড়লো, আজ তো ভ্যালেন্টাইন্স ডে, গাঁড় মেরেছে, আজ তো এখানে টেকাই যাবে না। আমি গ্যালারির একদম উপরের ধাপে বসে, পকেটে করে নিয়ে যাওয়া কাগজ ভাঁজ করে এরোপ্লেন বানাতে বানাতে দেখছি একের পর এক জুটি এসে ছাতা খুলে প্রেম করতে বসে গেলো। যখন আমার ফুট বিশেক দূরেও দুজন ছাতা খুলে বসে পড়লো, আমি তখন ডিসিশন নিয়েই ফেলেছি প্রায়, আজ আর তারা আসবে না, এমন সময় এলো। আমার পাশে একজন, আমার নিচের ধাপে ৪/৫ জনের গ্রুপ। দুপাশেই উঁকি দিয়ে দেখলাম, ঐ গ্রুপ পচ্চুর মাল নিয়ে এসেছে, ওখানেই যাই বরং। ওদের কাছে রিকু দিতেই বললো, একটা শর্ত, যতক্ষন তারা খাবে একবারে, ততক্ষন খেতে হবে, ওঠা যাবে না, তাই সই, আমার দাঁতগুলো অজান্তেই বেরিয়ে গেলো। শুয়োরের বাচ্চারা সাথ সকালেই ৮/৯ টা স্টিক বানালো। এখন সেনারিও হচ্ছে, হাওয়া দিচ্ছে সামনে থেকে, পেছনে উপরের ধাপে আমাদের থেকে ১৫ ফুট দূরে ছত্রধারী জুটি বসা, তুমুল প্রেম চলছে, ছাতার আড়ালে, আমরা একে একে সবগুলো স্টিক ধরালাম, পুরো ধোঁয়াটা হাওয়ায় ভেসে ওদের বরাবর গেল, ওরা একটুও নড়লো না, খানিকটা প্যাসিভ নেশা তো ওদের হতেই হবে। বাঁড়া প্রায় মাস দেড়েক পরে সাত সকালে এত গাঁজা টেনে পুরো টই হয়ে প্রায় দু ঘন্টা ধরে বসে দেখলাম গাঁজাখোর বনাম প্রেমখোরদের টাগ অফ ওয়ার, কখনো টিম গাঁজার মেম্বার বেড়ে যাচ্ছে, কখনো টিম প্রেম, মাঝে পাশ থেকে কে যেন একটা স্টিক ধরিয়ে দিলো আমার হাতে, প্লেন বানাতে শেখানোর ফিস হিসেবে। প্রচুর কাগজ ছিলো সাথে, ৭/৮ রকমের এরোপ্লেন উড়িয়ে বেশ পার হয়ে গেলো সময় টা।

(২)

সারাদিনে না ইচ্ছে হয়েছে ঘরে ফিরতে না ইচ্ছে হয়েছে কিছু খেতে, দিনে দুপুরে প্রেতের মত ঘুরেছি চারুকলা থেকে ছবির হাট, শিখা চিরন্তন, বিজয়স্তম্ভ। একফাঁকে ছবির হাটের পাশে আরেকবার নেশা চড়িয়ে নিয়েছি, এখানে কেউ কাউকে ফেরায় না। শেষ বিকালে আবার যখন গ্যালারীতে ফিরে এলাম, গাঁজাওয়ালী মহিলারা ততক্ষনে চরে ফিরে বেড়াচ্ছে, ১০০ টাকার মাল নিয়ে সোজা গ্যালারির সর্বোচ্চ প্রান্তে। ওখানে সেদিন বেশ বড় সড় একটা গ্রুপ বসেছে, সাথে ৪/৫ টা গিটার, ১ জনের কাছে দোতারা, আর একজনের কাছে একটা খমক। পেছনে দেয়াল থাকায় এই উপরের স্টেপটা আমার খুব পছন্দ, হেলান দেয়া যায় আরামে। আরেকটা সুবিধা, শুধু এখান থেকেই গোটা ওপেন থিয়েটারে সব কিছু নজরে আসে, গাঁজা খাওয়াত পরে পিঁপড়ের ব্যস্ততায় মানুষের আসা যাওয়া দেখতে খুব ভালো লাগে। সারাদিন কিছুই খাই নি, নারকোল চিঁড়েওলার থেকে চিনিমাখানো নারকোল কিনে খেয়ে নিলাম। প্রচুর সময় হাতে, বাসায় তো ফিরবোই না, ধীরে সুস্থে বানাতে শুরু করলাম, আশায় আছি, যদি কোন গাঁজাহীন কেউ আসে, কথায় আছে, গাঁজার স্টিক যত বেশি ঠোঁট ঘোরে, ঘোর তত বেশি জমে, এলো না কেউ। আমি গোটাচারেক বানিয়ে দেয়ালে হেলান দিলাম যখন, ততক্ষনে সূর্য্য ঢলে পড়েছে, গ্যালারীতে কোন লাইটের ব্যবস্থা নেই, চারপাশের লাইটপোস্ট থেকে আসা আলোয় বেশ আলো আঁধারীর খেলা চলে। আমি জোর করেই গোটা দুই স্টিক মেরে যখন মুহ্যমান, ঐ গ্রুপটা একই সাথে শুরু করলো গাঁজা ও গিটার। ৪ টে একুইস্টিক আর দোতারার  জ্যামিং, পেছনের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আরো বেশি করে, পরিচিত গান সব,  একটার পরে একটা আধাঘন্টা, পৌনে এক। অবশেষে যখন তাদের গাঁজা খাওয়া শেষ হল, নিজেদের মধ্যে খানিক আলাপ সেরে শুরু করলো নিজেদের একান্তই নিজস্ব গান। এতক্ষন খমক হাতে ছেলেটা চুপচাপ ছিলো, এবার দেখালো নিজের খেল। আমি নিজের উপরে শেষ অত্যাচারটুকু চাপিয়ে বাকি দুই স্টিকও মেরে দিয়েছি, খালি পেটে সারাদিন এত গাঁজা, আমি তখন ঘামছি, শার্টের সব বোতাম খুলে দিয়েছি, স্বজ্ঞানতা এবং অজ্ঞানতার মাঝে দুলছি শুধু ওদের গান, আরো স্পেসিফিকালি ঐ খমকের বাজনাকে ফোকাস পয়েন্ট রেখে। আমি এর আগে কখনো সামনাসামনি বসে খমক বাজানো শুনি নি। ঐ ঘোরের মাঝেও আমি অবাক আওয়াজের তীব্রতায়, একেকটা হাই নোডে গোটা গ্যালারির সমস্ত আওয়াজকে ছাপিয়ে যাচ্ছে একটা খমক, সেই সাথে পেছনের দেয়ালে বাড়িয়ে খেয়ে আসা প্রতিধ্বনি ইফেক্ট তো আছেই। যতদূর মনে আছে, ওরা মাঝে কোনই গ্যাপ না দিয়ে টানা দেড় দুই ঘন্টা জ্যামিং করেছিলো, আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম, এই খমক হাতে ছেলেটাই ওদের টিমের মূল মিউজিশিয়ান, ওদের মূল ইন্সট্রুমেন্ট, গিটারগুলো এবং দোতারা, ঐ ছেলেটাকেই ফলো করে যাচ্ছে। আমি ঐ এক দেড় ঘন্টা আমার মাঝে ছিলাম না, সমস্ত মনোযোগ একাগ্রতা, সজ্ঞানতা ঐ ওদের মিউজিক কম্পজিশনে, আরো স্পেসিফিকালি খমকে। আই ওয়াজ নট ইন মাইসেল্ফ। ওরা যখন থামলো, আমার অনুভুতিটা ছিলো, কেউ যেন সপাটে চড় কষে আমায় বাস্তবতায় ফিরিয়ে নিয়ে এলো। এমন অভিজ্ঞতা এর আগে বা পরে কখনো হয় নি আর। সেদিনের মত আমার সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, কষ্ট, অভিমান সব ভুলে গেলাম। আস্তে আস্তে উঠে বাসার দিকে রওনা দিলাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন