বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

যাপিত জীবন - ৬

সেই স্কুল লাইফ থেকে আমি কনসিস্ট্যান্ট ৭ নম্বর ব্যাটসম্যান,  ৫ নম্বর বোলার ছিলাম। মানে দুটোই মোটামুটি। বেশিরভাগই যেহেতু ২৫ ওভারের ম্যাচ, ৭ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে আমার কাজ হয়, শেষ দিকে চোখ বন্ধ করে ব্যাট চালানো, লাগে তো ৪/৬ না লাগে তো বোল্ড, এলবি, স্নিক। অথবা কোনরকমে ঠেকিয়েই বাকি ওভারগুলো পার করা, একদিকের উইকেট ধরে রাখা। বোলার হিসেবে একেবারে খারাপ ছিলাম না, মানে স্লাইটলি বিলো এভারেজ, বলে ভেরিয়েশন ছিলো না, শুধুই অফস্পিন, উইকেট তেমন পেতাম না, ইকোনমি রেট ভালো, এই আরকি।

সে আমলে বাংলাদেশের মফস্বলে ক্রিকেট শুধুই শীতের খেলা, তখনো ক্রেজ শুরু হয় নি, বিশেষ করে গ্রামে। গ্রামে, হেমন্তের ফসল ওঠার পরে, কোন একটা বড় ক্ষেতকে দুরমুজ করে সমান করে ক্রিকেট গ্রাউন্ড বানিয়ে ফেলা হতো। পিচের অংশটা মোটামুটি সমান, আউটফিল্ড, সে আর কি বলবো, সমান বলে কোন শব্দের অস্তিত্বই নেই, মাঝখানে হয়তো বড় কয়েকটা গাছ, দুই পাশে বিশাল বিশাল পুকুর। গাছে বল লেগে ফিল্ডারের হাতে গেলে আউট, পুকুরে বল পাঠালে আউট, যা তা অবস্থা। আমাদের কলোনির ফ্রেশ এন্ড ফাইন ক্রিকেট মাঠ আর পিচের  তুলনায়, এখানে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিনটেই চ্যালেঞ্জিং, খুব খুব চ্যালেঞ্জিং।

প্রতি শীতে স্কুল ফাইনালের পরে প্রায় মাসখানেকের জন্য যেতাম গ্রামে। গ্রাউন্ড বদলাতো, কিন্তু আমার ৭ এবং ৫ বদলাতো না। তবে গ্রামের মাঠে খেলে বোলিং এ উন্নতি হচ্ছিলো, পিচ রিডিং শিখছিলাম, কোথায় একটু উঁচু তাতে আনইভেন বাউন্স, কোথায় বল ফেললে স্কিড করে, কোথায় বল ফেললে এমনিতেই স্লোয়ার যায়, এসব আরকি। ভ্যারিয়েশন বহু পরে শিখেছি। যাই হোক, ক্লাস নাইনের ফাইনালের পরের কথা, যথারীতি আমি ৭ নম্বর, তবে এবার বোলিং এ ফার্স্ট চেঞ্জ। সেদিন হলো কি, ২৫ ওভারে ওদের স্কোর ১৭৮, যা তা বোলিং হয়েছে, আমাকে পিটিয়ে তক্তাপাট করেছে, ৪ ওভারে দিয়েছি ৪৫, শেষ ওভারেই ২০। মানে অপজিশনের মাঠে খেলা, এতই বাজে পিচ, শালা লাইনই ঠিক রাখা যায় না, পেসারের বল পর্যন্ত সোজা হয় না, অযাচিত সুইং এবং ধোলাই। ওদের বোলিং আমাদের থেকেও খারাপ, কিন্তু, ১০ ওভারের মধ্যে আমাদের টপ অর্ডার ঘরে, ছক্কা মারতে গিয়ে গাছে বেধে কট, ভাব দেখিয়ে পুকুর পার করতে গিয়ে মাঝপুকুরে, যা তা অবস্থা। ১০ ওভারে ৭০/৭। একজন মাত্র ব্যাটসম্যান, আমাদের ক্যাপ্টেন, টিকে আছে, সে আবার ধুন্ধুমার পেটাতে পারে না। বেশি রান দেয়ার শাস্তি, আমাকে নামতে হবে ৯ নম্বরে। আমরা লোয়ার অর্ডার ৩ জন, যাদের সর্বোচ্চ মিলিত স্কোরের রেকর্ড ২৫। প্রথমবারের মত আমরা ঝাউগ্রামের কাছে হারবো।

নামার পরে ক্যাপ্টেন আমায় বললো, আমি যেন আউট না হই, অলয়াউট মানে মানসম্মান শেষ, আর ওকে আউট করার মত বোলার ঝাউগ্রামের নেই। প্রথম দুই বল আমি ঠেকাতে গিয়ে কোনমতে আউট হওয়া থেকে বাঁচলাম, এ বাল কি বল, ব্লক করতে গেলে স্নিক হয়। ভেবে দেখলাম, এভাবে হবে না, পেটাতে হবে, বাল কি আছে জীবনে, হেরেই তো গেছি, পেঁদিয়ে হারবো। লেগে ছাড়া মারতে জানি না, অফ স্ট্যাম্পে গার্ড নিলাম, বোল্ড হই হবো, কিন্তু সব বল লেগে ঝাড়বো। প্রথম বল বন্ধ চোখে ৪, পরের বল গাছের ফাঁক দিয়ে ৬, এরপরে আসলে কিছু খেয়াল নেই, বল আসছে আর আমি পেটাচ্ছি, বল মনে হচ্ছিলো খুব স্লো আসছে, যেভাবে খুশি লেগে পাঠাচ্ছি।  একদম ৯৬ এর জয়সুরিয়া। ম্যাচ জিতেই গেলাম।  অন্যরা কি অবাক হবে, আমি নিজেই ৩ দিন হতভম্ব ছিলাম।

সে বছর বোধহয় আর গোটা ৩/৪ ম্যাচ খেলেছিলাম, ৭ থেকে ৩ এ পদোন্নতি, সেই অফস্ট্যাম্পে স্ট্যান্স, সেই বেধড়ক লেগ। সেদিনের মত আর সম্ভব হয় নি, রোজ তো আর ভুতে ভর করে না। তবে উপকারটা হয়েছিলো, বলের লাইন চিনতে শিখেছিলাম। পরের সিজনে তাই অফ, অন, স্ট্রেইট সবই হয়েছিলো, স্বেচ্ছায়। অন্যদের মত সেই পুকুর পার, তেঁতুল গাছের মাথা পার, সব। আর শিখেছিলাম টপস্পিন, শ্রেফ গতি আর বাউন্স দিয়ে বোকা বানানো, বিশেষ করে যখন কেউ ডাউন দা উইকেট আসবে বলে ভাবতাম। কিন্তু দু:খের বিষয়, সেটাই ছিলো গ্রামে আমার লাস্ট সিজন। আর খেলা হয় নি ওখানে, আমিও তাই সেই ৭ নম্বর থেকে আর উঠতে পারি নি, বরং নেমে গেছি। শুধুই অফস্পিনার হয়ে শেষের কটা বছর।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন