বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

যাপিত জীবন - ৮

সেটা ২০০০ সাল, সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, পূর্ব রাজাবাজারে কয়েক বন্ধু মিলে থাকি। পশ্চিম রাজাবাজারে একটা ফোন/ফ্যাক্সের দোকান এবং তার লাগোয়া হোটেলে আড্ডা দেই। প্রশ্ন করতে পারেন, পূর্বে থেকে পশ্চিমে আড্ডা দেয়ার কারণ কি? কারণ দুটো। প্রথমতঃ দোকান দুটো চালায় দুই ভাই যারা অতি মাত্রায় বন্ধু বৎসল, এলাকায় থাকা সমস্ত ব্যাচেলর পোলাপান এই দুই জায়গাতেই আড্ডা দেয়, আমাদের সাথে খাতির একটু বেশি। দ্বিতীয়তঃ ওখান থেকে ১০০ গজ দূরে একটা মহিলা হোস্টেল, যার অধিবাসিনীরা সব সময় এই দুই জায়গায় যাতায়াত করে। ভুল বুঝবেন না বন্ধুরা, আমার তৎকালীন প্রেমিকাও সেই হোস্টেলেই থাকতো, সুতরাং আমি লুলমুক্ত ছিলাম। ধরা যাক আমার প্রেমিকার নাম “পদ্ম”। একসাথে থাকা আমাদের তিন বন্ধুর সাথে এই হোস্টেলের সমবয়সী এবং সিনিয়র মেয়েদের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। আমার প্রেমিকার সূত্র ধরে একটা মেয়ের সাথে আমাদের পরিচয় হয়, আমি স্বচক্ষে তার মত সুন্দরী হয়তো দু’ একজনের বেশি দেখিনি। ধরা যাক, তার নাম “রাত্রী”। জ্বলন্ত আগুনের মত চেহারা ছিলো তার, হাসিতে ছিলো জলতরঙ্গের আওয়াজ।


সে বছর সিজনের মাঝখানে আবাহনী ক্লাবের হয়ে খেলতে আসে পাকিস্তানের উঠতি বাঁ’হাতি স্পিনার আব্দুর রহমান। হ্যাঁ, সম্প্রতি বাংলাদেশের বিপক্ষে বিনা বলে ৮ রান দিয়ে বিশ্বরেকর্ড করা আব্দুর রহমান। আমাদের তিন বন্ধুর মধ্যে সজল নামের ছেলেটা অসাধারণ পেস বোলার ছিলো, সে আবাহনী ক্লাবের প্রাকটিস নেটে বল করতো। তার সাথে আব্দুর রহমানের বিশেষ খাতির হয়ে গেল, সেই সূত্রে খাতির হলো আমাদের সাথেও। আমরা প্রায়ই সংসদে আর ধানমন্ডী লেকে আড্ডা দিতাম। আমি ওর কাছে স্পিন বলের দু’রকম গ্রিপ শিখেছিলাম। আমাদের আড্ডায় মাঝে মধ্য পদ্ম এবং রাত্রী যোগ দিত। রাত্রীর ছিলো অসম্ভব পাকিস্তান প্রীতি। দুইয়ে দুইয়ে চার হলো, জ্বলজ্যান্ত পাকিস্তানী বোলার হাতে পেয়ে রাত্রী তার প্রেমে পড়ে গেল। এত সুন্দরী মেয়ে কি আর উপেক্ষা করে থাকা যায়? আব্দুর রহমানও মজে গেল। আবাহনীর একটা ম্যাচের কথা মনে আছে, রহমান প্রথম বলে চার মেরে গ্যালারীতে থাকা রাত্রীর দিকে ব্যাট উঁচালো। পরের বলে ছয়, আবারো রাত্রী। বল আর রাত্রীর মধ্যে প্রতিযোগীতায় বলের জিত হলো, তৃতীয় বলেই রহমান আউট। যাই হোক এরপরে মাসখানেক ছিলো রহমান। চুটিয়ে প্রেম চললো তাদের। সিজন শেষে রহমান ফিরে গেল পাকিস্তান। আমরা যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।


মাস দুয়েক পরের ঘটনা, ফোনের দোকানে পদ্মের জরুরী মেসেজ পেয়ে দেখা করলাম তার সাথে। বললো ওর সাথে এক জায়গায় যেতে হবে, ক্ল্যান্ডেস্টাইন মিশন, ব্রিফিং পাওয়া যাবে পৌছানোর পরে। প্রেমিকার সকল আবদারই মধু, অতঃএব আপত্তি কিসে? গিয়ে উপস্থিত হলাম রমনা পার্কে, দেখি, সেখানে রাত্রী বসে আছে। ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় বললো, ডালমে শুধু কালা নয় আরো কিছু রঙ আছে। একটু পরে সেখানে হাজির হলো আব্দুর রহমান। জানা গেল, রহমান দেশে যাওয়ার আগে তারা দুইজনে বিয়ে সেরে ফেলেছে। রহমান দিন তিনেক হয় এসেছে বউ নিয়ে যেতে। হজম করতে বেশ কষ্ট হলেও, হজম করতে হলো। মনে মনে ভেবেছিলাম, শালা আমাদের সুন্দরী মেয়ে এক পাকিস্তানী নিয়ে যাবে, তরুণ সমাজের অপমান। যাই হোক, কি আর করা বন্ধু বলে কথা, সাধ্যানুযায়ী সাহায্য এবং গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি দিলাম তাদের। তারা থাকছিলো পুরানা পল্টনের হোটেল মেট্রোপলিটনে। 


পরবর্তি পনের দিন অনেক দৌড়াদৌড় করতে হলো। রাত্রীর আর্জেন্ট পাসপোর্ট করানো হলো, ভিসার জন্য পাকিস্তান দুতাবাসে জমা দেয়া হলো এবং দুদিন অন্তর-অন্তর রহমানের সাথে বারে যাওয়া হলো। ভিসা হয়ে গেল, এখন যাবার পালা। এবার জানা গেল, রহমান এসেছে পরিবারের সম্পূর্ণ অমতে। টাকা পয়সা যা এনেছিলো প্রায় শেষ। প্রতিদিন ফোন করে বাড়িতে, কিন্তু সেখান থেকে সাফ জবাব, নো মোর মানি, রিটার্ন ইমিডিয়েটলি। তাহলে রাত্রীর প্লেনের টিকেটের কি হবে? এমিরেটসের ঢাকা-করাচী-ঢাকা টিকেট কিনতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা প্রয়োজন, রাত্রী একেবারে ভেঙ্গে পড়লো। পিসির নতুন হার্ডডিস্ক কেনাবাবদে আমার কাছে হাজার পনের টাকা ছিলো, পদ্ম কিভাবে যেন ন’হাজার যোগাড় করলো। রহমান আমার দুই হাত ধরে বললো, দেশে ফিরে টাকা পাঠানোর ব্যাবস্থা করবে। মুখে বললাম দরকার নেই, মনে বললাম, আর পাঠাইছো মামা। তারা দুইজনে মহানন্দে পাকিস্তান চলে গেল, আমরা দুইজনে বিদায় জানিয়ে আসলাম। অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো!!!! তাহলে তো ভালই হত।


পরবর্তী মাস তিনেক রাত্রীর সাথে আমাদের বেশ যোগাযোগ ছিলো। শুনতাম, রাত্রী মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে, রহমানের পরিবার করছে মেনে নেয়ার চেষ্টা। ৩/৪ মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরে আমরা কল দিলাম, রাত্রীর হাসির জলতরঙ্গ আর নেই, শুনলাম রহমানের পরিবার খুব খারাপ ব্যবহার করছে, গালিগালাজ দিচ্ছে। এর পরে বাংলাদেশ থেকে কল শুনলেই খট করে রিসিভার নামিয়ে রাখা হতো। রাত্রীর সাথে আর কখনো দেখা বা কথা হয় নি আমার বা পদ্মের। বছর তিনেক আগে রাত্রীর এলাকার পূর্বপরিচিত একটা ছেলের সাথে দেখা হয়েছিলো আমার। জানতে চেয়েছিলাম, রাত্রীর কোন খোঁজ জানে কিনা। ও বললো, রাত্রী ২০০৩ এর শেষের দিকে ফিরে এসেছে দেশে। কিন্তু রাত্রী আর তখন জ্বলন্ত আগুন নেই, সে তখন একরকম অস্থিচম্মসার, পুরোন রাত্রীর খোলস মাত্র। জানি না সে এখন কোথায়।


দুঃখ হয়, কি বিচিত্র আমাদের পাকিস্তানী প্রেম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন